New Post has been published on https://sentoornetwork.com/chupir-char-barddhaman-west-bengal-bird-watching-travelog/
লেখা ও ছবি: তন্ময় ভট্টাচার্য
চুপির চরে চুপি চুপি কেন! অবাক হচ্ছেন? না, অবাক হবেন না। পাখি দেখতে গেলে কেউ হইহল্লা করে? চুপি চুপি চুপচাপ নিঃশব্দে পাখি দেখতে হয়। আর ছবি তোলার শখ থাকলে তাহলে হাঁটার সময় শুকনো পাতার মচাৎ শব্দও যেন না হয়, সে-খেয়ালও রাখতে হবে। তাই চুপি চুপি চুপির চরে যাওয়া।
বর্ধমানের পূর্বস্থলীর কাষ্ঠশালী গ্রাম। এখানেই আছে ইউ আকৃতির বা ঘোড়ার খুরের মতো এক জলাভূমি। এরই নাম চুপির চর। বহুকাল আগে এই জলাভূমি ছিল গঙ্গার অংশ। গঙ্গা তার বয়ে-যাওয়া পথ পরিবর্তনের জন্য তৈরি হয়েছিল এই হ্রদ। তাই স্থানীয়দের কাছে এটি হল ছাড়ি গঙ্গা। নৌকাতে চেপে ঢুকতে হয় এই হ্রদে। এটি হল পাখিদের স্বর্গরাজ্য। আর আমাদের পাখি দেখার স্বর্গরাজ্য! শীতকালে কয়েক হাজার পরিযায়ী পাখি এখানে বাসা বাঁধে। ওইসব পাখির আগমন দূরদূরান্ত থেকে। পাখিদের কোনও পাসপোর্ট লাগে না, ভিসাও নয়। তাই ওদের কাছে কোনও দেশের কোনও সীমানাও নেই। উন্মুক্ত আকাশে ডানা মেলে দেয় অনন্য সুন্দর এই জলাভূমির চারিপাশে বাসা বাঁধবে বলে!
কলকাতা থেকে সড়ক পথে ১৩২ কিমি মতো। ট্রেনে কমবেশি ১২০ কিমি দূরত্বে পূর্বস্থলী।
চুপির চরে বহু মানুষ বহু দূর দূর থেকে পাখি দেখতে আসেন এখানে। স্থানীয় মানুষ এবং প্রশাসনের নজরদারিতে আছে পরিযায়ী পাখিদের নিরাপত্তা। আছে নজরমিনার। কেননা, একসময় এই অঞ্চল ছিল ছিল চোরা শিকারিদের নিয়ন্ত্রণে।
ইউ আকৃতির এই হ্রদটি লম্বায় প্রায় দশ কিমি। গভীরতাও তেমন নয়। অগভীর এই জলাশয় নানাধরনের জলজ উদ্ভিদে ভর্তি। এসব আবার মাছের পক্ষে ভাল। হ্রদের জলে রয়েছে কাঁকড়া, সাপ, নানা রকমের জলজ পোকামাকড়। এসব আবার পাখিদের খাদ্য। এর টানেই পাখিরা দলবেঁধে আসে চুপির চরে।
বাতাসে শীতের আমেজ লাগতেই পাখিরা হিমালয়, ইউরোপ, মঙ্গোলিয়া থেকে রওনা দেয় চুপির উদ্দেশে। এই সময় আসেন পক্ষীপ্রেমিকেরাও। আমিও এক রবিবার ভোরে হাজির হলাম চুপির চরে। এতটুকু সময় নষ্ট না করে ক্যামেরা নিয়ে উপস্থিত হ্রদের পাশে। চুপির চরে পাখি দেখা নৌকায় চেপে, জলে ভেসে। নৌকার মাঝিরাই গাইড। মাঝি আর পাখিদের বন্ধুত্ব বহুকালের। নিবিড় এক বন্ধুত্ব। মাঝিরা সব পাখিরই খবরও রাখেন। পাখিরাও রাখে মনে হয়! কেননা, নৌকার সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে চলেছে কয়েকটা পাখি। ধুর ছাই, সব পাখির আবার নাম জানি না। কেউ একজন বললেন, বার্ন সোয়ালো। মাঝি বললেন, ‘ওই দেখুন রাঙামুড়ি।’ দেখলাম একঝাঁক রাঙামুড়ি। দলবেঁধে সাঁতরাচ্ছে! কাটছে। আরও কতরকম পাখি দেখলাম। চুপির চরে উপভোগ করছে শান্ত, নিরিবিলি পরিবেশে। দেখেছি তিন-চার প্রজাতির মাছরাঙা। ক্যামেরায় ফ্রেম বন্দি করেছি কিছু কিছু মুহূর্ত। আবার লেন্স-বন্দি করতে গিয়ে পারিওনি।
পাখি দেখতে দেখতে কখন যে বেলা পড়ে এল বুঝতেই পারিনি! বুঝলাম যখন হ্রদের জল রং বদলাচ্ছে। সূর্য পাটে যাচ্ছে। চমৎকার এক প্রাকৃতিক রূপ-সৌন্দর্য ক্লান্তি ভুলিয়ে দেয় মুহূর্তে! এবার ফেরার পালা। অবশ্য থাকাও যেতে পারত। এখানে সে ব্যবস্থাও আছে।
কীভাবে যাবেন: হাওড়া অথবা শিয়ালদা থেকে কাটোয়া লাইনের ট্রেনে চেপে পূর্বস্থলী স্টেশনে নামা। স্টেশন থেকে টোটোতে চুপি পাখিরালয়ে। অথবা কলকাতা থেকে সড়ক পথে গাড়িতে কল্যাণী এক্সপ্রেসওয়ে ধরে সরস্বতী ব্রিজ পার করতে হবে। তারপর কালনা হয়ে সমুদ্রগড়। এরপর পূর্বস্থলী স্টেশন। সেখান থেকে কাষ্ঠশালী বাজার হয়ে পাখিরালয়। এখানে যাওয়ার সবচেয়ে ভাল সময় হল অক্টোবর থেকে মার্চের প্রথম সপ্তাহ।
আরও খবর পড়ুন : অরণ্য ছেড়ে সমুদ্রে