সূরাতুল আসর এর শিক্ষা কি?
থিম এবং বিষয়বস্তু। এই সূরাটি শেখায় যে সমস্ত মানুষ ক্ষতির মধ্যে রয়েছে, যারা ইমান (ইসলামে বিশ্বাসী), সৎ কাজ করে এবং অন্যদেরকে হক (সত্য, অধিকার, বাস্তবতা) স্মরণ করিয়ে দেয় এবং অন্যদেরকে সবর (ধৈর্য) স্মরণ করিয়ে দেয়।
সূরা আল-আসর জীবনের দর্শনকে সংক্ষিপ্ত করে এবং আমাদের শেখায় যে মানুষ ক্ষতিগ্রস্থ হয় যদি না সে বিশ্বাস করে এবং ভাল কাজ করে । এটি ধৈর্য, সততা, নম্রতা এবং ভাল কাজগুলিকে উত্সাহিত করে।
সুরা আসর: ৩টি শিক্ষা ও নির্দেশনা
সুরা আসর কোরআনের ১০৩তম সুরা। সুরাটি মক্কায় অবতীর্ণ, আয়াত সংখ্যা ৩টি রুকু ১টি। সুরা আসর কুরআনের সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত সুরাগুলোর একটি। তবে এর অর্থ ব্যাপক ও তাৎপর্যপূর্ণ। আল্লাহ তাআলা এ সুরায় মাত্র তিনটি আয়াতে মানুষের মুক্তির উপায় বলে দিয়েছেন। ইমাম শাফেঈ (রহ.) বলেন, আল্লাহ যদি কুরআনের শুধু এই সুরাটিই নাজিল করতেন, তাহলে এটিই মানুষের জন্য যথেষ্ট হতো।
এ সুরায় আল্লাহ যুগের কসম করে বলেছেন, মানুষের মধ্যে যারা ঈমান বা স্রষ্টার প্রতি বিশ্বাস রাখে না, সৎকর্ম ও অপরের কল্যাণ কামনা করে না, সদুপদেশ দেয় না, তারা ক্ষতিগ্রস্ত।
সুরা আসর
(১) মহাকালের শপথ! (২) মানুষ অবশ্যই ক্ষতির মধ্যে রয়েছে। (৩) কিন্তু তারা নয়, যারা ঈমান আনে ও সৎ কাজ করে এবং পরস্পরকে সত্যের উপদেশ দেয় ও ধৈর্য ধারণে পরস্পরকে উদ্ধুদ্ধ করে।
৩টি শিক্ষা ও নির্দেশনা
১. মানুষ দুনিয়ায় প্রচুর সাফল্য, সম্মান ও অর্থবিত্ত অর্জন করলেও সে ক্ষতিগ্রস্ত যদি সে কুফর ও মন্দ আমলের মধ্যে থাকে।
২. যারা ঈমান আনে ও নেক আমল করে তারাই সত্যিকার কৃতকার্য ও সফলকাম।
৩. মুমিনদের একটি আবশ্যিক গুণ হলো তারা পরস্পরের কল্যাণকামী হবে; পরস্পরকে সত্যের উপদেশ দেকে, ধৈর্যের উপদেশ দেবে।
ইমাম শাফেয়ি রহিমাহুল্লাহ বলেন, সুরা আসর ব্যতীত অন্য কোনো সুরা যদি অবতীর্ণ না হতো, তাহলে মানুষের হিদায়াতের জন্য এটিই যথেষ্ঠ হতো।-রুহুল মাআনি
‘যদি কেউ এ সুরায় গভীরভাবে দৃষ্টি দেয় তাহলে সে তাতে একটি উন্নত, সুন্দর, শান্তিময়, পরিপূর্ণ এবং সবার জন্য কল্যাণকর সমাজের চিত্র দেখতে পাবে।’ -আদওয়াউল বায়ান ৯: ৫০৭
সময় বা যুগ অত্যন্ত মুল্যবান। যুগের গর্ভেই এক জাতির উত্থান ঘটে, অন্য জাতির আসে পতন। রাত আসে। দিন যায়। পরিবর্তিত হয় পরিবেশ ও মানব সমাজ। কখনো এমন সব পরিবর্তন আসে যা মানুষ কল্পনাও করতে পারে না। কখনো বা প্রত্যাশার চেয়ে বেশি পরিবর্তন আসে এ সময়ের ব্যবধানেই। তাই এ যুগ বা সময় বড় বিস্ময়কর।
সুরার শুরুতে শপথ করলেন কেন?
কোনো বস্তু বা বিষয়ের শপথ করলে তার গুরুত্ব বেড়ে যায়। সময় এমনই এক বিস্ময়ের আধার, আমরা জানি না অতীতকালে এটা কী কারণে হয়েছে। আমরা জানি না ভবিষ্যতে কী ঘটতে যাচ্ছে। এমনকি আমাদের নিজেদের জীবন, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র সম্পর্কে আমরা বলতে পারি না, আগামী কালের পরিবশে ঠিক আজকের মত থাকবে কি থাকবে না! দেখা যায়, মানুষ একটি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে; যা আগামীকাল সে বাস্তবায়ন করবে, অর্জন করবে এটা সেটা অনেক কিছু। সে দৃঢ় প্রত্যয়ী থাকে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের। সব উপকরণ থাকে হাতের নাগালে। সব মাধ্যম থাকে নখদর্পনে। অভাব নেই কোনো কিছুর। তবুও এ ‘সময়’ নামক বস্তুটির ব্যবধানে এমন কিছু ঘটে যায়, যা তার সব কিছু তছনছ করে দেয়। সে ভাবতেই পারে না- কেন এমন হল। অনেক বড় বড় হিসাব সে মিলিয়েছে কিন্তু এর হিসাব মেলাতে পারছে না। এটাই হল ‘সময়’। আল্লাহ তাআলা এর প্রতি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্যই বলেছেন, ‘ওয়াল আসর’ – শপথ সময়ের।
দ্বিতীয় আয়াত : ‘অবশ্যই মানুষ ক্ষতির মধ্যে রয়েছে’
যদিও এখানে পুরো মানব জাতিকে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ পুরো মানবগোষ্ঠি ক্ষতিগ্রস্ত। তারা ধ্বংসের দিকে ধাবিত হচ্ছে। তবে যাদের মধ্যে চারটি গুণ আছে তারা ব্যতীত। এ চারটি গুণের অধিকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত নয়। তারা সর্বদা লাভবান। মর্যাদাবান ইহকাল ও পরকালে। পরবর্তী আয়াতে এ চারটি গুণের কথাই বর্ণিত হয়েছে।
তৃতীয় আয়াত : ‘তবে তারা নয়; যারা ইমান এনেছে, সৎকাজ করেছে, পরস্পরকে সত্যের উপদেশ দিয়েছে এবং পরস্পরকে ধৈর্যের উপদেশ দিয়েছে।’
চারটি গুণ যাদের মধ্যে থাকবে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে না- এক. ইমান। দুই. সৎকাজ বা আমালে সালেহ। তিন. অন্যকে সত্যের পথে আহবান। চার. অন্যকে ধৈর্যের উপদেশ দান প্রথম দুটো আত্মগুণ, আর অপর দুটো পরোপকার গুণ। প্রথম গুণদুটি দ্বারা একজন মুসলিম নিজেকে পরিপূর্ণ করে, আর অপর দুইগুণ দ্বারা অন্যকে পরিপূর্ণ করার সুযোগ পায়।
প্রথম গুণটি হল ইমান। ইমানের পর নেক আমল বা সৎকর্মের স্থান। সৎকর্ম কম বেশি সব মানুষই করে থাকে। তবে ইমান নামক আদর্শ সবাই বহন করে না। ফলে তাদের আমল বা কর্মগুলো দিয়ে লাভবান হওয়ার পরিবর্তে ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে থাকে। সৎকর্মশীল মানুষ যদি ইমান নামের আদর্শকে গ্রহণ করে; তাহলে এ সৎকর্ম দ্বারা তারা দুনিয়াতে যেমন লাভবান হবে আখেরাতেও তারা অনন্তকাল ধরে এ লাভ ভোগ করবে।
এ জন্য আল্লাহ রাব্বুল আলামীন প্রথমে ইমানের কথা বলেছেন। যখন মানুষ ইমান স্থাপন করল, তারপর সৎকর্ম করল, তখন সে নিজেকে পরিপূর্ণ করে নিল। নিজেকে লাভ, সফলতা ও কল্যাণের দিকে পরিচালিত করল। কিন্তু ইমানদার হিসাবে তার দায়িত্ব কি শেষ হয়ে গেল? সে কি অন্য মানুষ সম্পর্কে বে-খবর থাকবে? অন্যকে কি সে তার যাপিত কল্যাণকর, সফল জীবনের প্রতি আহবান করবে না? সে তো মুসলিম। তাদের আভির্ভাব ঘটানো হয়েছে তো বিশ্ব মানবতার কল্যাণের জন্য। আর এ জন্যই তো মুসলিমরা শ্রেষ্ঠ।
আল্লাহ তাআলা তো বলেই দিয়েছেন: ‘তোমরা হলে সর্বোত্তম জাতি, যাদেরকে মানুষের জন্য বের করা হয়েছে। তোমরা ভাল কাজের আদেশ দেবে এবং মন্দ কাজ থেকে বারণ করবে, আর আল্লাহর প্রতি ইমান আনবে।’ -আলে ইমরান : ১১০
অতএব নিজেকে ঠিক করার পর তার দায়িত্ব হবে অন্যকে সত্য ও কল্যাণের পথে আহবান করা। এ আহবান করতে গিয়ে ও আহবানে সাড়া দিতে গিয়ে যে বিপদ-মুসিবত, অত্যাচার-নির্যাতন আসবে তাতে ধৈর্য ধারণের জন্য একে অন্যকে উপদেশ দেয়া কর্তব্য।
সূরা আসরের ৪ টি আয়াতের ব্যাখ্যা
https://www.youtube.com/watch?v=Y9jKfde9Nmc
সূরা আসরের সম্পূর্ণ তাফসির
সূরা আসর নিয়ে চমৎকার একটি প্রশ্ন
https://www.youtube.com/watch?v=iXpqc2d2hbM&t=224s
জান্নাতে যাওয়ার চারটি শর্ত
https://www.youtube.com/watch?v=4VyzWJ-u6x4
এটা কি সত্য যারা মুসলিম তারাই জান্নাতে যাবে আর যারা অমুসলিম তারা জাহান্নামে যাবে?
https://www.youtube.com/watch?v=_wN7BUErcOA&t=1s
সূরা আসর জান্নাতের পথ দেখায়
মানুষ যখন ঈশ্বরে বিশ্বাস করে, এবং সৎকাজ করে, তখন সে নিজেকে পরিপূর্ণ করে তোলে। তিনি নিজেকে লাভ, সাফল্য এবং কল্যাণের দিকে নিয়ে যান। কিন্তু বিশ্বাসী হিসেবে তাঁর দায়িত্ব শেষ হয়না । তিনি অন্যদেরও ডাকবেন একটি সমৃদ্ধ, সফল জীবনের দিকে। মুসলমানদের উত্থান হয়েছে বিশ্ব মানবতার কল্যাণের জন্য। তাঁর দায়িত্ব হলো নিজের সাথে অন্যকেও সত্যের দিকে ডাকা।
সূরা আসর এ আল্লাহ গুরুত্বপূর্ণ বেশকিছু শিক্ষা ও চমৎকার হেদায়েত রেখেছেন। মাত্র তিন আয়াত বিশিষ্ট ছোট্ট এ সূরাটি ইহকালীন ও পরকালীন মুক্তির স্পষ্ট সনদ। ‘আল্লাহ যদি কুরআনে অন্য কোনো সূরা নাযিল না করে শুধু সূরা আল আসর নাযিল করতেন তাহলে এটা মানুষের হেদায়াতের জন্য যথেষ্ট হত।'(মিফতাহুস সাআদাহ : ইমাম শাফেয়ি) যদি কেউ এ সূরায় গভীরভাবে দৃষ্টি দেয় তাহলে সে তাতে একটি উন্নত, সুন্দর, শান্তিময়, পরিপূর্ণ এবং সবার জন্য কল্যাণকর সমাজের চিত্র দেখবে। (আদওয়াউল বায়ান : ৯/৫০৭)
সূরা আসর জান্নাতের পথ দেখায়
সুরা আসর: শিক্ষা ও নির্দেশনা