ডক্টর জসীম উদ্দীন আহমেদ রচয়িত “মৌলভী ওয়াজউদ্দিন আহমেদ” সংক্ষিপ্ত জীবন বৃত্তান্ত।
মৌলভী ওয়াজউদ্দিন আহমেদ ১৮৭৮ সনে জন্ম গ্রহন করেন। তাঁহার পিতার নাম আজিম উদ্দিন মুন্সী ও দাদার নাম আড়াই মাদবর; এলাকায় উভয়ই প্রভাবশালী লোক ছিলেন। তাঁহার নানার বাড়ী ছিল কদমতলী এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে। তিনি ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসায় লেখাপড়া করেন। দাখিল শেষ করে বাড়ীতে চলে যান। প্রথমে তিনি গৌরীপুর বাজারের পূর্ব পাশে, যেখানে বর্তমানে গৌরীপুর সুবল আফতাব হাইস্কুল অবস্থিত, সেখানে তিনি মক্তবে শিক্ষকতা আরম্ভ করেন। সেই মক্তবে তিন বছর বিনা পারিশ্রমিকে শিক্ষকতা করেন। সেই মক্তবে শিক্ষকতা করার সময়ে তিনি উপলব্দি করেন যে ভারত বর্ষে মুসলমানগন দারুন ভাবে হিন্দুদের থেকে অনেক পিছিয়ে আছে; সরকারী, বেসরকারী সর্বক্ষেত্রে হিন্দু সম্প্রদায় ব্রিটিশ শাষন ও শিক্ষা অঙ্গনে সমস্ত উচ্চ পদে সকলর্ ক্ষেত্রে চাকুরী স্থান দখল করে আছে। মুসলমানগন অবহেলিত প্রজা হিসেবে সবার করুনার পাত্র হয়ে আছে। তাহা ছাড়াও বঙ্গ প্রদেশে, যেখানে মুসলমান সংখাগরিষ্ঠ, প্রায় সকল জমিদারী হিন্দুদের মালিকানায় বিস্তৃত। তাই মুসলমানদের ছিল কৃষি ও নিম্নমানের মানের সরকারী কাজ।
যুবক ওয়াজউদ্দিন আহমেদ উপলব্দি করেন যে মুসলমান বাদশাদেরকে হারিয়ে ইংরেজগন ভারতের ক্ষমতা নেবার পর ভারতের এবং বিশেষ কওে বঙ্গ প্রদেশের মুসলমানগন ইংরেজ শাসনকে মনে প্রানে মেনে নিতে পারে নাই। অন্যদিকে হিন্দু সম্প্রদায় এই সুযোগ ব্যবহার করে ইংরেজী শিক্ষায় সর্বাস্তকরনে মনোযোগী হয়ে ইংরেজদের সুনজরে পড়ে। তাই সর্বক্ষেত্রে হিন্দু সম্প্রদায় উপরের স্থান লাভ করতে থাকেন এবং প্রশাসন ও শিক্ষায় সর্বস্তরে স্থান দখল করিয়া ইংরেজ প্রভুদের প্রিয়ভাজন হয়ে যায়।
যুবক ওয়াজউদ্দিন আহমেদ বুঝতে পারলেন যে ইংরেজী শিক্ষা না করিলে মুসলমান সম্প্রদায় দৈনন্দিন কেবল পিছিয়ে পড়তে থাকবে। তিনি মক্তবে শিক্ষকতা ছেড়ে গৌরীপুর ইংরেজী স্কুল প্রতিষ্ঠানের পরিকল্পনা করতে থাকেন। মক্তবের পূর্ব পাশে অধরবাবুর টোল বলে একটি ইংরেজী শিক্ষার ক্লাশের ব্যবস্থা ছিল। সেখানে অধরবাবুর গাছের নীচে টেবিল বসায়ে ছাত্রদেরকে ইংরেজী পড়াতেন। মৌলভী ওয়াজউদ্দিন আহমেদ অধরবাবুর সাথে ব্যবস্থা করে ইংরেজী শিখাতে থাকেন। গাছের নীচে রৌদ্র বৃষ্টি বাদলে পড়াশুনা করানো সঠিক পরিবেশ নয় বিধায় মৌলভী ওয়াজউদ্দিন আহমেদ ঘোপচরের জমিদার ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী সুবল সাহার স্বরনাপন্ন হন। সুবল সাহা তাহার একটি পাটের গুদাম খালি করে দিয়ে সেখানে ইংরেজী ক্লাশ চালু করার অনুমতি দেন। তখন হিন্দু মুসলমান ছাত্র এই ইংরেজী স্কুলে ভর্তি হয়। পাটের গুদামে আলো বাতাসের সুবিধা না থাকায় পড়াশÍনার ব্যঘাত হওয়ার কারনে মক্তবের পূর্ব পাশে জমিদার সুবল সাহা বাঁশ ও ছনের লম্বা ঘর করার দায়িত্ব মৌলভী ওয়াজউদ্দিন আহমেদ কে দেন। ইহার কয়েক বছর পর জমিদার সুবল সাহা কঠ এবং ঢেউটিন দিয়ে ষষ্ঠ শ্রেনী পর্যন্ত ইংরেজী মাইনর স্কুল তৈরী করার জন্য মৌলভী ওয়াজউদ্দিন আহমেদ কে দায়িত¦ দেন। সুবল সাহার অর্থে মৌলভী ওয়াজউদ্দিন আহমেদ উদয়পুর থেকে কাঠের চালান এনে অক্লান্ত পরিশ্রম করে ইংরেজী মাইনর স্কুল স্থাপন করেন। এই স্কুল ১৯১১ সালে চালু হয়। সেই স্কুলটিকে ১৯৪৩ সালে ৮ম শ্রেনী পর্যন্ত চালু করে হাইস্কুল করা হয়। ১৯১১ সাল থেকে ১৯৪৪ সাল পর্যন্ত মৌলভী ওয়াজউদ্দিন আহমেদ এই স্কুলে শিক্ষকতা করেন। তাহার সকল ছেলে-মেয়ে এই স্কুলে লেখাপড়া করেছেন। ৩০ বৎসর বয়সে মৌলভী ওয়াজউদ্দিন আহমেদ ফতেরকান্দির পীরবংশের মেয়ে রাহাতুন্নেছা কে বিবাহ করেন। তাহাদের সন্তান ৮ ছেলে ২ মেয়ে।
মরহুম মৌলভী ওয়াজউদ্দিন আহমেদ নিজে একজন শিক্ষক ছিলেন। তিনি শিক্ষার গুরত্ব উপলব্দি করে ছেলে-মেয়েদের উচ্চ শিক্ষায় বিশেষ সুযোগ সুবিধা দেন। তখনকার সমসাময়িক অন্যান্য গ্রামবাসীর মত কৃষি কাজ ও ব্যবসায়ে অধিক মনোনিবেশ না করে নিজের সন্তানদের উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করার জন্য সাধ্যমত চেষ্টা করেন। তাঁহার ২ ছেলে জসীম উদ্দিন আহমেদ এবং রফিকুল ইসলাম পি এইচ ডি ডিগ্রী লাভ করেন।
আরও একটি কথা এখানে বলা যায় যে বালক ওয়াজউদ্দিন ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসায় ৬ষ্ঠ শ্রেনীতে পড়াশুনা করার সময় বঙ্গ প্রদেশে প্রাইমারী স্কুল স্থাপনের সূত্রপাত হয়। এই সময় তিনি বাড়ীতে এসে ৬ মাস ঢাকায় না গিয়ে সরকারী অনুদান অনুমোদন করায়ে অনেক পরিশ্রম করে আমাদের পুকুররের উত্তর পাড়ে প্রাইমারী স্কুল স্থাপনের পর তিনি ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসায় ফেরৎ চলে যান। মৌলভী ওয়াজউদ্দিন আহমেদ বিশাল ব্যক্তিত্ব ছিলেন। শিক্ষকতার পামাপাশি তিনি সমাজ সেবা, এলাকায় বিচার-আচার করতেন। ইউনিয়ন কাউন্সিল চালু হবার পর থেকে শেষ বয়স পর্যন্ত ইহার চেয়ারম্যান অথবা মেম্বার হিসেবে জনসেবা করেছেন। তিনি জেলা শিক্ষা বোর্ডের মেম্বার ছিলেন। তিনি বহু বছর যাবত সিভিল কোর্টে জুরী বোর্ডের মেম্বার অথবা ফোরম্যানের দায়িত্ব পালন করেছেন।
মৌলভী ওয়াজউদ্দিন আহমেদ পরিবারের কৃষি কাজের তত্ত্বাবধান করতেন এবং আরও বিভিন্ন কাজে কর্মে লিপ্ত থাকতেন। তিনি সারা জীবন দূর্বলকে সবলের অন্যায় ক্ষমতার চাপ থেকে রক্ষা করতেন। তাঁহার বিচার দক্ষতা এমন ছিল তিনি জীবিত থাকাকালীন এলাকায় লোক কঠিন সমস্যায়ও কোর্ট কাচারীতে না যেয়ে তাঁহার বিচারে সন্তুষ্ট হতেন। তাঁহার ব্যক্তিত্ব ও চোখের দৃষ্টি এমন তেজদীপ্ত ছিল যে ছোটবড় কেহ তাঁহার চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে সাহস পেতনা। সবাই তাদের দৃষ্টি নত রেখে তাঁহার সাথে কথা বলতেন। আমরা ভাইবোনও তাঁহার আদর পেয়েও তাঁহার চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে পারি নাই।
মৌলভী ওয়াজউদ্দিন আহমেদ অত্যন্ত ধার্মিক লোক ছিলেন। প্রায়ই গভীর রাতে পুকুরের উত্তর পাড়ে মসজিদে নামাজ ও অজিফায় মগ্ন থাকতেন। তিনি জুম্মা ও ঈদের নামাজে ইমামতি করতেন এবং গ্রামে মানুষের বাড়ীতে অনুরোধক্রমে মিলাদ ও দোয়া পড়াতেন। তাঁহার অনেক আধ্যাত্মিক অলৌকিক কাহিনী আমাদেরকে শুনায়েছেন।
মৌলভী ওয়াজউদ্দিন আহমেদ সু-স্বাস্থের অদিকারী ছিলেন।তিনি ৬ ফুট লম্বা, বিশাল বক্ষ, অনুপাতে লম্বা হাতের অদিকারী শক্তিশালী পুরুষ ছিলেন। ছোট বেলায় দেখেছি কোন অনুষ্ঠানে যেতে তিনি পায়জামা, আস্কান ও বড় পাগড়ী পড়তেন। শেষ বয়সে সাদা পোশাক,সাদা টুপি পড়তেন। সাদা চুল,শুভ্র চাপদাড়ি ও বিশার শরীর নিয়ে চলার পথে গ্রামে বা শহরের দুই পাশ থেকে লোকজন তাকে ছালাম দিতেন। ১৯৫৬ সালের জুন মাসের ২১ তারিখ, ৮০ বৎসর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন।












