গৌরীপুর সুবল আফতাব উচ্চ বিদ্যালয়ের উৎপত্তি।
“ডক্টর জসীম উদ্দীন আহমেদ রচয়িত”
আজ থেকে ১০০ বছর পূর্বের কথা। আমার তখন জন্ম হয়নি। আমার জন্ম ১৯৩৩ খৃষ্টাব্দের জানুয়ারি মাসে। ১৯০৩ থেকে আমার বুঝ-জ্ঞান হওয়ার বয়স পর্যন্ত গৌরীপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের স্থাপনার ঘটনাপ্রবাহ আমি স্বচক্ষে দেখিনি। আমার পিতা মৌলভী ওয়াজউদ্দিন আহম্মেদ সাহেবের কাছ থেকে শুনেছি। এ সমস্ত ঘটনাবলী কোনদিন লেখা হয়নি, কেবল এলাকার জনসাধারণের মুখে মুখে প্রচলিত ছিল। সে সময়ের যুবক বৃদ্ধ সকলেই পৃথিবী থেকে অনেক আগেই বিদায় নিয়েছেন। তাদের তিরোধানের সাথে সাথে সে সময়ের কথা ও ঘটনার বিষয়গুলোও বিলীন হয়ে গেছে।
গলিয়ারচর নিবাসী মৌলভী ওয়াজউদ্দিন আহমেদ ঢাকার আলিয়া মাদ্রাসা থেকে পড়াশুনা শেষ করে ১৯০৩ বা ১৯০৪ সালে গৌরীপুরে ফিরে আসেন। গৌরীপুরে সে সময় উল্লেখযােগ্য কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল না। যুবক মৌলভী ওয়াজউদ্দিন আহমেদ সমাজে শিক্ষা বিস্তারের চিন্তা-ভাবনা করেন। প্রথমে তিনি গৌরীপুরের যেখানে বর্তমান উচ্চ বিদ্যালয় অবস্থিত, সেখানে কোরআন ও হাদিস শিক্ষার জন্য একটি মক্তব শুরু করেন । তিন বছর তিনি বিনা পারিশ্রমিকে সেখানে শিক্ষকতা করেন। পরবর্তীতে তিনি বুঝতে পারেন, এলাকার লোকজনের উন্নতির জন্য ইংরেজি শিক্ষা ও সাথে সাথে অন্যান্য বিষয়ের শিক্ষার প্রয়োজন। তখন তিনি এ কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন।
এলাকার বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে তিনি ইংরেজি বিদ্যালয় স্থাপনের ব্যাপারে পরামর্শ ও আলাপ আলোচনা করতে থাকেন। এ সকল বিশিষ্ট ব্যক্তির মধ্যে অন্যতম ছিলেন গোপচর নিবাসী পাট ব্যবসায়ী ও বিত্তশালী সুবল চন্দ্র সাহা। তিনি মৌলভী ওয়াজউদ্দিন আহমেদকে উৎসাহ দিলেন।
এখানে উল্লেখযোগ্য যে, বর্তমান বিদ্যালয় এলাকায়ই অধর বাবুর একটি ছোট বিদ্যাপীঠ ছিল। এটা অধর বাবুর টোল নামে পরিচিত ছিল । মৌলভী ওয়াজউদ্দিন আহমেদ প্রথমে সেই টোলে ইংরেজি শিক্ষার সূচনা করেন। কিছুদিনের মধ্যে বিত্তশালী সুবল সাহা মৌলভী ওয়াজউদ্দিন আহমেদকে তার একটি পাটের বালি গুদাম ঘর ব্যবহার করতে দেন। এই পাটের গুদামটি পুলের গোড়ায় দক্ষিণ-পশ্চিম পাশে অবস্থিত ছিল। সে পাটের গুদামটি ১৯৪০ দশক পর্যন্ত বিদ্যমান ছিল। স্কুলের কাজ ক্রমে ক্রমে এলাকার জনসাধারণের দৃষ্টি আকর্ষণ করায় ছাত্রসংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। পাটের গুদাম ঘরটিতে বস্তুত জানালা না থাকার কারণে আলো-বাতাস লাগতো না। এই অসুবিধার কথা মৌলভী ওয়াজউদ্দিন আহমেদ জমিদার সুবল সাহাকে জানান। এবং পৃথকভাবে একটি স্কুল ঘর তৈরি করার জন্য অনুরোধ করেন। এই প্রস্তাবে তিনি রাজি হন এবং একটি লম্বা ছনের ঘর খালের পূর্ব পার্শ্বে নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন। কম খরচে কাজটি করার জন্য মৌলভী ওয়াজউদ্দিন আহমেদ একটি প্রস্তাব দেন যাতে উদয়পুর (বর্তমানে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের অধীন) থেকে বাঁশ ও ছনের চালান আনা হয়। সিদ্ধান্ত নেয়ার পর মৌলভী ওয়াজউদ্দিন আহমেদ পায়ে হেটে ৪০ মাইল দূরে উদয়পুরে যান। তখনকার দিনে নৌকা বা পায়ে হাঁটা ছাড়া অন্য কোন বিকল্প ব্যবস্থা ছিল না।
বাঁশ ও ছন দিয়ে তৈরি স্কুল ঘরটি রথ ঘর ও কালী মন্দিরের মাঝামাঝি জায়গায় স্থাপিত হয়। ক্রমান্বয়ে ছাত্রসংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় বড় আকারের স্কুল ঘর তৈরি করার চিন্তা-ভাবনা করা হয়। এ সময় জানা গেল ১৯১১ সনে সম্রাট পঞ্চম জর্জ ভারত সফরে আসবেন। সে উপলক্ষে সারা বৃটিশ ভারতে নতুন নতুন প্রকল্পের হিড়িক পড়ে যায় । মৌলভী ওয়াজউদ্দিন আহমেদ জমিদার সুবল সাহার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে কাঠ ও ঢেউ টিন দিয়ে বড় আকারের একটি মাধ্যমিক ইংলিশ স্কুল তৈরির প্রস্তাব দেন, যার নাম হবে গৌরীপুর সুবল মিডল ইংলিশ স্কুল । এতে রাজি হয়ে জমিদার সুবল সাহা মৌলভী ওয়াজউদ্দিন আহমেদকে এই দায়িত্ব অর্পণ করেন।
মৌলভী ওয়াজউদ্দিন আহমেদ স্কুলের কাঠ ক্রয়ের জন্য পায়ে হেঁটে উদয়পুর চলে যান। শুনেছি ৪০ মাইল পথ তিনি একদিনে চলে যেতেন। ফিরে আসার সময় সকালে রওয়ানা দিয়ে রাতের প্রথম প্রহরে বাড়ি এসে পৌছতেন। তখনকার দিন বনজঙ্গলে পরিপূর্ণ উদয়পুরের রাস্তায় চলাফেরা সহজ ছিল না । মৌলভী ওয়াজউদ্দিন আহমেদ প্রায় ছয় ফুট লম্বা, সুস্বাস্থ্যের | অধিকারী, সাহসী ও শক্তিশালী পুরুষ ছিলেন। কাঠ ও ঢেউ টিন দিয়ে স্কুল ঘর তৈরি হলো। স্কুলের | এই স্কুল ঘরটিতে শিক্ষকদের জন্য একটি কমনরুম এবং ক্লাস ওয়ান থেকে ক্লাস সিক্স পর্যন্ত ছয়টি রুম ছিল। কঠোর পরিশ্রম করে কম খরচে মৌলভী ওয়াজউদ্দিন আহমেদ স্কুল ঘরটি তৈরি করতে সক্ষম হন এবং তখনকার দিনে মোট ১ হাজার ৫০০ টাকা খরচ হয়। শুনেছি সে সময় এক মণ চালের মূল্য এক টাকার মতো ছিল । ১৯১১ সালে অর্থাৎ যে বছর সম্রাট পঞ্চম জর্জ ভারত সফর করেন সে বছর স্কুলটি “গৌরীপুর সুবল মিডল ইংলিশ স্কুল” নামে খোলা হয়। মৌলভী ওয়াজউদ্দিন আহমেদ এই স্কুলে শিক্ষকতা করতে থাকেন। প্রথম কে হেড মাস্টার ছিলেন আমার জানা নেই, তবে স্কুলের প্রথমাবস্থায় | গৌরীপুর গ্রামের কাদিম আলী মাস্টার সাহেব হেড মাস্টার ছিলেন। পরবর্তীতে বানিয়াপাড়ার রোস্তম আলী মাস্টার সাহেব | হেড মাস্টার ছিলেন অনেক বছর । এই স্কুলটি উচ্চ বিদ্যালয় হওয়ার পরও তিনি অনেক বছর শিক্ষকতা করেন। এই মিডল স্কুলের শিক্ষকদের মধ্যে যাদের কথা সবসময় মনে উদয় হয় তারা হলেন রোস্তম আলী মাস্টার, আমার পিতা মৌলভী ওয়াজউদ্দিন আহমেদ, জিংলাতলীর অশ্বিনী কুমার সাহা, গোপালপুরের কুমুদ চন্দ্র সাহা এবং বিক্রমপুরের হেরম্ব চন্দ্র সাহা। কজনের কথা মনে থাকার আসল কারণ হলো তারা অতও কড়া শিক্ষক ছিলেন । অপরাধের জন্য তারা ছাত্রদের কঠোর শাস্তি দিতেন এবং এ কারণে তাদের ক্লাসে পড়াশুনা বেশ ভাল হতো এবং ছাত্ররা ও খুব মনােযােগী থাকত। এ সকল শিক্ষকের অসাধারণ ব্যক্তিত্ব ও নীতির জন্য তাঁরা সকল ছাত্রের কাছে শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন।
মিডল স্কুল চলাকালীন সময় থেকে মৌলভী ওয়াজউদ্দিন আহমেদ ও এলাকার বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ যেমন গৌরীপুর গ্রামের আক্ৰাম আলী সরকার, ভুলিরপাড়ের জমিদার জ্ঞান চন্দ্র সাহা, কাদিম আলী মাস্টার সাহেব এবং স্কুলের অন্য শিক্ষকগণও | স্কুলটিকে উচ্চ বিদ্যালয়ে পরিণত করার পরিকল্পনা করতে থাকে। এ সময় ১৯৩০ সালের মাঝামাঝি ডা. শামছুল হুদা গৌরীপুরে সরকারি দাতব্য চিকিৎসালয়ে ডাক্তার হিসেবে যোগদান করেন। তিনি ও সমাজ সেবায় উৎসাহী ও উদ্যোগী ছিলেন এবং এক পর্যায়ে স্কুলের কার্যকলাপে জড়িত হন। তাঁকে স্কুল কমিটিতে সেক্রেটারি হিসেবে নেয়া হয় এবং তিনি উৎসাহের সঙ্গে কাজ করতে থাকেন।
তাঁর প্রচেষ্টায় ১৯৪১ সালের প্রথমদিকে স্কুলটিতে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত খুলে গৌরীপুর সুবল হাই স্কুল নামে চালু করা হয় । আমার জেঠাত ভাই হাফিজউদ্দিন আহমেদ বি.এসসি. বিটি দেৱীস্থার ফুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক ছিলেন। তাঁকে ১৯৪১ সালে গৌরীপুর সুবল হাই স্কুলের হেড মাস্টার হিসেবে নিয়ােগ করা হয়। স্কুল ভাল ভাবেই চলতে থাকে। হাফিজউদ্দিন সাহেব কিছুকাল পরে স্কুল থেকে দেবীদ্বার চলে যান এবং পরে তুমি হাই স্কুল পুনঃস্থাপন করেন এবং এর প্রধান শিক্ষক হিসেবে বহুদিন চাকরি করে অবসর গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে তিনি অজিত গুহ কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। হাফিজউদ্দিন সাহেব চলে যাওয়ার পরে জিংলাতলীর সিরাজউদ্দিন বি.টি সাহেব হেড মজার পদে নিয়োজিত ছিলেন।
১৯৪৩ সালের বর্ষাকালে আমার পিতা অবসর গ্রহণ করেন। কিন্তু বাড়ি না প্রবাহে মৌলভী ওয়াজউদ্দিন আহমেদের স্মৃতি স্কুলের ইতিহাসে উল্লেখ নেই। যে লোক জীবনের ব্রত হিসেবে গৌরীপুরে শিক্ষার আলো ছড়াতে নিজেকে নিয়োজিত করে ৩৫ বছর | কাল কাজ করেছেন এবং তার আপ্রাণ চেষ্টার ফলস্বরুপ গৌরীপুরে শূণ্য থেকে শুরু করে হয়েছে যার স্মৃতি ক্রমান্বয়ে বিলোপ হয়ে যায়! গৌরীপুর স্কুলে মৌলভী ওয়াজউদ্দিন আহমেদের কোন নাম নেই, কোন স্মৃতি নেই। মহান আল্লাহ মৌলভী ওয়াজউদ্দিন আহমেদের নিয়তের দুয়ার খোলা রাখেন। তাঁর নিজের পরিবারে জ্ঞানের আলোর শিখা উত্তরোত্তর প্রজ্বলিত হতে থাকে। তার ছেলেমেয়ে ও নাতি নাতনীদের মধ্যে বর্তমানে পাঁচজন দেশে ও বিদেশে মাস্টার্স ডিগ্রি করা, ১২ জন গ্র্যাজুয়েট, একজন চার্টার্ড-একাউন্ট্যাট, দু'জন ইঞ্জিনিয়ার রয়েছে।
গৌরীপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের কাজ পরবর্তীতে বর্ধিত হতে থাকে। এক পর্যায়ে সরকাপুরের মোহাম্মদ সিরাজ মিয়ার অর্থায়নে স্কুলটি বেশ বাড়ানো হয় এবং আর্থিক সাহায্যের জন্য সিরাজ মিয়া সাহেবের পিতা আফতাব নামের সাথে উল্লেখ করে স্কুলের নাম গৌরীপুর সুবল-আফতাব হাই স্কুল করা হয়। আর একজনের অবদান বিশেষ উল্লেখযোগ্য, তিনি হলেন মাইথারকান্দির কেরামত আলী মোল্লা সাহেব। তিনি স্কুলের খেলার মাঠের জন্য যতটুকু জানি বেশকিছু জমি দান করেন।
নিরঙ্কুশভাবে বিবেচনা করলে দেখা যাবে যে গৌরীপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের জন্য মৌলভী ওয়াজউদ্দিন আহমেদের অবদান প্রচুর ও অমূল্য। তাঁর অবদান বিস্তৃত হওয়া বাঞ্ছনীয় নয়, কারণ তিনিই ছিলেন গৌরীপুর হাই স্কুলের সর্বপ্রথম উদ্যোক্তা। এই স্কুলের উপর ভিত্তি করেই পরবর্তীতে গৌরীপুর কলেজ, টেকনিক্যাল কলেজ, গার্লস স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়। যার ফলশ্রুতিতে এই অঞ্চলে শিক্ষার আলোকবর্তিকা প্রজ্বলিত হয়।












