বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় দিবস ২০১৬ যেদিন রোপিত হয়েছিল স্বপ্নের, স্মৃতির বীজ
ঋতুরাজ বসন্ত। ফাল্গুনের সোনা রোদ বিলাচ্ছে মিষ্টি উষ্ণতা। সেই উষ্ণতার পরশ সঞ্চারিত হচ্ছে দেহমনে। উত্তরের হিমেল হাওয়াও ছড়াচ্ছে নৈসর্গিক আবেশ। গাছে গাছে ফিরে পাচ্ছে পাতায় পাতায় প্রাণ। চলে যাচ্ছে ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে একটি করে দিন। ঠিক এমনি সময় বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় ভুল করছে না তার জন্মদিন পালন করতে। দিনটি ছিল ২০১৬ সালের ৮ মার্চ।
রাজশাহীর খড়খড়ি বাইপাস সংলেœ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাসের জন্য নির্ধারিত স্থানে আয়োজন করা হয়েছে এক মহাযজ্ঞের। উদ্দেশ্য একটিই। বিশ্ববিদ্যালয় দিবস পালন। এই স্থানটি শহর ছেড়ে পাঁচ কিলোমিটার উত্তরে পবা থানার খড়খড়ি নামক স্থানে অবস্থিত।
সকাল ৮:৩০ মিনিট। শহরের ক্যাম্পাস থেকে শিক্ষার্থীদের বহনকারী বাসগুলো একে একে থামা শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাসের জন্য নির্ধারিত স্থানে। অপরূপ সাজে সাজানো হয়েছে স্থানটি। প্রবেশদ্বারের সজ্জাও দৃষ্টি নন্দন। মাঠের ভিতরে তৈরি করা হয়েছে একটি ভিআইপি প্রবেশ পথ। প্রবেশপথে ঢুকতেই চোখে পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভবিষ্যৎ স্থাপনার কিছু প্রদর্শনী এবং কারুকার্য। ছাত্রছাত্রীদের বসার জন্য সুন্দর ব্যবস্থা করেছে প্যান্ডেলের ভেতরে। বিশ্ববিদ্যায়ের সকল বিভাগের জন্য আলাদা করে স্টল করে দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও স্টল ছিল সাংবাদিকদের। গাড়ি পার্কিং এর জন্যও রয়েছে সুব্যস্থা। সাংবাদিকতা বিভাগ এবং ইলেক্ট্রিক্যালয় ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ছাত্রছাত্রীরা তাদের জন্য নির্ধারিত স্থানের সামনে বিভিন্ন কাজের প্রর্দশনী তুলে ধরতে ভুল করেনি।
ঘড়ির কাটায় ১০:৪০ মিনিট। বিশেষ নিরাপত্তার বলয়ে আসেন প্রধান অথিতি বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা মন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। তাকে স্বাগত জানান বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যায়ের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়্যারম্যান হাফিজুর রহমান খান, উপদেষ্টা ড. সাইদুর রহমান খান, উপাচার্য ড. ওসমান গণি তালুকদার এবং উপ-উপাচার্য ড. নুরুল হোসেন চৌধুরীসহ অন্যান্য শিক্ষকবৃন্দ।
অতিথিদের ফুল দিয়ে বরণ করেন দায়িত্বপ্রাপ্ত কয়েকজন শিক্ষার্থী। কোরআন তেলোয়াত ও গীতা পাঠের মধ্যেদিয়ে প্রথম পর্বের অনুষ্ঠানের সূচনা ঘটে। পায়রা উড়িয়ে প্রথম পর্বে অনুষ্ঠান উদ্ভোধন করেন প্রধান অতিথি। অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়্যারম্যান হাফিজুর রহমান খান।
এই দিবসের স্বাক্ষী হতে অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সদস্য আতফুল হাই, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মুহম্মদ মিজানুদ্দীন, প্রধান মন্ত্রীর ব্যক্তিগত সচিব সাইফুজ্জামান শেখর ও রাজশাহীর সাবেক সিটি মেয়র এএইচএম খাইরুজ্জামান লিটন।
যাহোক, ১০:৫৭ মিনিটে পতাকা উত্তোলন করেন শিক্ষামন্ত্রী। জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। জাতীয় সঙ্গীত শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সবাই দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন করেন।
অতিথিদের বক্তব্য শুরু হয় ১১:১৫ মিনিটে। প্রথমে বক্তব্য দেন বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. ওসমান গণি তালুকদার। সকলকে শুভেচ্ছা জানিয়ে তিনি তাঁর কথা শুরু করেন । এরপর একে একে বক্তব্য রাখেন অতিথিরা। অনুষ্ঠানে সমাপনী বক্তব্য দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য ড. নুরুল হোসেইন চৌধুরী।
ঘড়ির কাঁটা যখন মধ্য দুপুরের কোটায়, উপস্থাপক বক্তব্য দিতে আমন্ত্রণ জানান শিক্ষামন্ত্রী নুরুর ইসলাম নাহিদকে। সবাইকে সালাম দিয়ে মন্ত্রী বক্তব্য শুরু করেন। দীর্ঘ ৪৫ মিনিটের বক্তব্যে তিনি জোর দিয়ে বলেন সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে পর বিরতি দেওয়া হয়। বিরতিতে মজাদার খাবার খেয়ে শিক্ষার্থীরা প্রস্তুতি নেয় পরবর্তী অনুষ্ঠানের জন্য ৩০ মিনিটের বিরতির পর দ্বিতীয় পর্বের মুল অনুষ্ঠান শুরু হয় ২:২০ মিনিটে। এপর্বে শিক্ষার্থীদের মন মাতান ব্যান্ড তারকা জেমস ও সুবীর নন্দী। তারা একে একে গেয়ে শোনান তাদের জনপ্রীয় গানগুলো। এসময় কালো ক্যাপ ও সাদা টি-শার্ট পরে শিক্ষার্থীরা মাতামাতি করেছে, কেউ ফেস্টুন হাতে নিয়ে ঘোরা ফেরা করেছে কিংবা কেউবা তুলছে সেলফি।
মঞ্চের সামনে বিশাল আকারের সাউন্ড সিস্টেম ছিল। দুপুর ২:২৪ মিনিটে অনুষ্ঠান মাঠে দুটি মাইক্রো বাস প্রবেশ করে। সবাই মনে করে জেমস আসছে। আবেগে ছুটে যায় সবাই। কিন্তু গিয়ে দেখা যায় হাজির হয়েছেন সুবীর নন্দী ও তার দল।
মাঝখানে পরিবেশিত হয় নৃত্য। এরপর মঞ্চে পা রাখেন বর্ষীয়ান কণ্ঠশিল্পী সুবীর নন্দী। উল্লাসের জোয়ার বয়ে যায় সবার মাঝে। তাঁর গান শুনে অতীতের দিন গুলোতে হারিয়ে যাচ্ছিল উপস্থিত দর্শক-শ্রোতা। তিনি একে এক পরিবেশন করেন পাঁচটি গান। হৃদয় স্পর্শ করা ২৫ মিনিটের মনোমুগ্ধকর পরিবেশনায় সবার মন জয় করেন এই শিল্পী।
ঘড়ির কাটায় ৪:০৫ মিনিট। অনুষ্ঠান প্রাঙ্গনে থামে একটি কাল মাইক্রোবাস। নেমে আসেন ব্যান্ডগুরু জেমস। শুরু হয় শিক্ষার্থীদের ছুটাছুটি। উদ্দেশ্য জেমসের সঙ্গে সেলফি তোলা। এক পলক দেখা। এজন্য শুরু হুড়াহুড়ি শুরু করে তারা। সবাই একই কন্ঠে চিৎকার দিচ্ছে গুরু গুরু বলে। গাড়ি থেকে নামতেই চোখে পড়লো জনপ্রিয় ব্যান্ড তারকা জেমস্কে কাল রংয়ের টি-শার্ট ও কাল জিন্স পরেনে। এরপরে পুরো সময়টি পাগলের মত মুখরিত করে রাখেন নাচ আর গানের মধ্য দিয়ে সবাইকে। জনপ্রিয় গান আর জেমসকে এত কাছে পেয়ে সবাই উল্লাসিত হয়। তিনি মায়ের গান, বিরহের গানসহ বিভিন্ন গান করেন। গলা মেলায় শিক্ষার্থীরাও। যখন জেমস্ নেমে গেলেন তখন শিক্ষার্থীদের সাথে সাথে পশ্চিম আকাশে সূর্যকেউ যেন গ্রাস করেছে ক্লান্তি গ্রাস করেছে।
অনুষ্ঠান শেষে যখন অন্যান্য বিভাগের শিক্ষার্থীরা ব্যস্ত ফেরার জন্য তখন জার্নালিজম, কমিউনিকেশন ও মিডিয়া স্টডিজ বিভাগের শিক্ষার্থীরা ব্যস্ত এই ফেরার মুহূর্তটিকে ফ্রেমে বন্দী করায়। এভাবেই রোপিত হয় ভালোবাসার ভবিষ্যৎ ক্যাম্পাস প্রাঙ্গনে স্মৃতি ও স্বপ্ন অমিত বীজ।