লস্ট ইন ঢাকা
‘কই তুমি?’
‘বাসায়’
‘কি করো?’
‘কিছুই না। বইসা আসি’
‘তাইলে ফ্লাইওভারের গোড়ায় আসো। চাঁনখারপুল যামু’
‘আচ্ছা ভাই। আসতেছি।’
ফোন রেখে কিছুক্ষন পর সুনীল বাসা থেকে বের হয়। বিকালটা সুন্দর। শুধু গরমটাই বেশি। কদিন ধরে বেশ গরম। রাস্তায় মানুষগুলা যেইখানে একটু বাতাস পায় সেইখানে ভিড় জমায়। যেমনটা শীতকালে আগুনের তাপ শরীরে লাগানের মত। সুনীল বাসের জন্যে দাঁড়ায় আসে। একটুপর একটা তুরাগ আসলে দৌড়ায় বাসে উঠে। ঢাকা থেকে গাজীপুর যাওয়া বাস সার্ভিস হচ্ছে তুরাগ। লোকাল। বিকালে অফিস শেষে বাড়ি ফেরা মানুষের বড্ড ভিড় হয় বাসে। পিছনে এক চাচা নেমে গেলে সুনীল সীটটায় বসে। পিছনের সীটটা ভাল লাগে তার। মনে হয় তার সামনে মস্ত বড় এক ভ্রাম্যমান মঞ্চ। তার উপর সবাই সবার রোল প্লে করতে থাকে।
‘মামা, ভাড়া দেন’
‘যাত্রাবাড়ী’
এই বলে সুনীল পকেট থেকে টাকা বের করে দেয়। এর মধ্যে এক হুজুর বাসে উঠে। মাদ্রাসার জন্যে সাহায্য চাইতে থাকে। কম বেশি সবাই যে যার মত টাকা দিতে লাগলো। পরের স্টপেজে বাস থামতেই আরেক বই বিক্রেতা বাসে উঠে। হুজুর ততক্ষনে সাহায্য উঠায় দরজার কাছে দাঁড়ায় আছে। বই বিক্রেতা বই এর ভিতরের তথ্য সবার কাছে বলতে লাগলো। কেউ কানে হেডফোন দিয়া গান শুনতেসে। কেউ বা কথায় ব্যস্ত। বেশি সুবিধা করতে না পারায় বিক্রেতাও দরজায় দাঁড়ায় থাকে। বাস যাত্রাবাড়ী আসলে সবাই নামতে থাকে। শুধু চার-পাঁচ জন ছাড়া। তাদের মধ্যে সুনীল একজন। যাত্রবাড়ী হইলো তুরাগের শেষ স্টপেজ। তবে ফ্লাইওভারের গোড়ায় গিয়া বাস থামে বলে কিছু মানুষ সেইখানে নামে।
‘ভাই, ও ভাই। আপনে নামবেন না?’
সুনীলের দুই সীট সামনে বসা একটা লোকরে ডাকতে থাকে হেলপার। কিন্তু উত্তরে কোন সাড়া শব্দ পায় না। ঘুমায় গেসে মনে হতে থাকে সবার।
‘ঔ মিয়া, উঠেন।‘
ধাক্কা দিয়া ঢাকার পরেও সাড়া দেয় না। সবাই একটু করে সামনের সীটের দিকে যেতে থাকে।
‘আরে, উঠেন না কেন? মলম পার্টি ধরসে নাকি?’
‘হ, ওস্তাদ। আমার মনে হয় মলম পার্টির খপ্পরে পরসে’ বলার পর বাসের গেটে দাড়ানো কম বয়সের ছেলেটা হাসতে থাকে। হেলপার হলেও হতে পারে ছেলেটা।
লোকটার হাতে ব্যাগ। দুই হাতে জরানো। জামা কাপর দেখে মনে হয় ঢাকায় নতুন। হতে পারে কাজের সন্ধানে ঢাকায় আসা আবার নাও হতে পারে।
সবাই এর মধ্যে সীটের সামনে চিন্তিত ভাবে লোকটাকে পর্যবেক্ষন করতে থাকে। এক চাচা মিয়া হাত দিয়া লোকটাকে ডাকতে থাকে,
‘ভাই, ও ভাই, আসেন নাকি গেসেন?’
হেলপার তখন আরো জোরে হাসতে থাকে। সবাই আরো চিন্তায় পরে যায়। হেলপার তার সমস্ত শরীরের শক্তি দিয়া লোকটারে ঝাকি দেয়। লোকটা এবার নড়েচড়ে উঠে।
‘যাক, বাইচা আছে। আপনেরে কি মলম লাগাইসে? পাশের লোকটা লাগাইসে? হেলপার বলে। লোকটা চোখ খুলে সবার দিকে দেখতে থাকে। চারপাশ দেখতে থাকে।
‘ভাই, আপনি কি অসুস্থ?’ চাচা মিয়া প্রশ্ন করে।
‘আপনের মোবাইল আছে?’
‘মানি ব্যাগ আছে?’
‘টাকা পয়সা সব ঠিক আছে?’
‘আপনি যাইবেন কই?’
সবাই সবার প্রশ্ন একসাথে করতেছে। লোকটা দুই হাত ছড়ায় শরীরের ভাজ ঠিক করে। কাঁধে ব্যাগ নেয়। সবাইরে সরায় আস্তে আস্তে বাস থেকে নেমে সোজা হাঁটতে থাকে। সবাই দাড়ায় দেখতে থাকে লোকটারে। অবাক ভাবে। পিছনে আরেকটা বাস আসলে জোরে হর্ণ বাজতে থাকে।
খসড়া ৩.০ | ঢাকা | ৮ জুলাই ২০১৫












