আমার জীবনে রবীন্দ্রনাথের গান।
বাঙালীর ঘরে জন্ম হয়েছে আর রবীন্দ্রনাথের গানের সঙ্গে পরিচয় নেই এতো হয় না। কিন্তু আমি নিজেকে ব্যাতিক্রমি বলেই মনে করি। ছোটবেলা কেটেছে প্রবাসে, উত্তর বিহারের ছোট শহর মুজফঃরপুরে। শুনেছি এই শহর ছিল রবীন্দ্রনাথের বড় মেয়ে মাধুরীলতার শ্বশুরবাড়ি এবং তিনিই এই শহরের প্রথম মেয়েদের ইস্কুল শুরু করেছিলেন। আমি আমার স্কুল যাওয়ার পথে তাদের বিরাট বাগানবাড়ির গেটটা দেখতাম আর ভাবতাম কি বিশাল লোকজন এরা। ছোটবেলায় কিন্তু ওইটুকুই ছিল রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে আমার কৌতুহল।
হয়ত প্রবাসী বাঙ্গালী বলেই বোধহয় বছরে একদিন; ২৫শে বৈশাখ, রবি ঠাকুরের জন্মদিনে; দেখতাম ওই শহরের সব বাঙ্গালীরা কি সুন্দর বাঙ্গালী হয়ে উঠত। কিন্তু ওই একদিনই, সারাদিন রবি ঠাকুরের ছবি আঁকার প্রতিযোগিতা, রবি ঠাকুর সাজার প্রতিযোগিতা, সন্ধে বেলায় দিদি-দাদাদের রবি ঠাকুরের গান গাওয়া আর কাকুদের রবি ঠাকুরের নাটক করা। বাড়ির বড়রা যেত বলে আমাকেও যেতে হত। খুব বিরক্ত হতাম, কিন্তু উপায় ছিলনা। সারা বছর যার কথা কেউ বলেনা, হঠাৎ একদিন তাকে নিয়ে এত মাতামাতি বড্ড চোখে লাগত, খারাপ লাগলেও মুখে বলার উপায় ছিলনা, ছোট ছিলাম যে। বাড়িতে দেখতাম রবীন্দ্রনাথের বই সঞ্চয়িতা, গীতাঞ্জলী, গীতবিতান আল্মারীতেই রাখা থাকে, কেউ পড়েও দেখেনা। আমি হাতে নিলে মায়ের বাকুনি খেতাম, ছিড়ে যাবে এই ভয়ে, হাত দেওয়া বারন ছিল। এইসব কারনেই বোধহয় ছোটবেলায় আমি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের থেকে অনেক দূরে ছিলাম।
আমার দাদুর ইচ্ছায় আমার লেখাপড়া উত্তর বিহারের একমাত্র বাংলা স্কুল- হরিসভা মাধ্যমিক বিদ্যালয়-এ। তাই বিহারে বড় হলেও বাংলার চর্চা থেকেই গেছিল। জীবনে প্রথম রবীন্দ্রনাথের গানের সঙ্গে পরিচয় আমার ওই স্কুলে। ক্লাস টু-য়ে উঠতেই আমাকে স্কুল শুরুর আগে প্রার্থনা সঙ্গীতের লাইনে দাঁড়াতে হল। সেই আমার মনে থাকা, প্রথম রবীন্দ্রসঙ্গীত গাওয়া- ‘শুভকর্ম পথে, ধর নির্ভয় গান’ মানে বুঝিনি, দাদা-দিদিরা গাইছে, তাদের সঙ্গেই কথায় মিলিয়ে গেয়েগেছি। কেউ ভূল গাইছি কিনা দেখে ঠিক করে দেয়নি। তখন বুঝিনি এই গানটার কি অর্থ আর কি ভীষণ শক্তি লুকিয়ে আছে এর ভেতরে। সোম থেকে শুক্র এই ছিল আমাদের প্রার্থনা, আর শনিবার গাইতে হত- ‘আগুনের পরশমণি’। এই গানটারও মানে না বুঝলেও জানিনা কেন এটা গাইতে ভীষন ভাল লাগত, মনে হত শরীরের ভেতর একটা শক্তি ভর করছে। আজও যখন ভীষণ হতাশ লাগে, মনে হয় এবার হেরে যাবই, এই গানটাই গেয়ে উঠি আর অদ্ভুত ভাবে এই গানটা আমায় শক্তি যোগায়।
ক্লাস সেভেনে ওঠার পর আমাদের প্রার্থনা হল ‘আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে বিরাজ সত্য সুন্দর’। এই গানটা আমার খুব প্রিয় কারন সেইই প্রথম আমি আমাদের স্কুলের কোন দলে যোগ দেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম। গোটা স্কুল থেকে মাত্র ছয়জন ছাত্রছাত্রী কে নিয়ে এই গান শেখান হল এবং স্কুল ছেড়ে আসা অবধি এই গানটাই প্রার্থনার সময় আমরা গাইতাম, বাকি ছাত্রছাত্রীরা তাতে সুর মেলাত। এই তিনটে রবীন্দ্রসঙ্গীত ছাড়া আর একটির কথা জানতাম, সেটা আমাদের ক্লাসের ফার্স্ট গার্ল রূপা দত্ত প্রত্যেক বছর রবীন্দ্রজয়ন্তীতে গাইত- ‘আমার বেলা যে যায়, সাঁঝবেলাতে’।
আজ স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে, উচ্ছমাধ্যমিক পাশ করার আগে পর্যন্ত এই চারটে গানের বাইরে তেমন কোন রবীন্দ্রসঙ্গীত আমার জানাছিল না। জানার আগ্রহও হয়নি। আমিও প্রবাসে বড় হওয়া আর পাঁচজন ছেলেদের মতই রবীন্দ্রনাথ এবং তার গান কে মেয়েলিপনা আর ন্যকামির সঙ্গে এক করে দেখতাম।
আমি যে কত বড় ভূল করছিলাম সেটা বুঝতে অবশ্য বেশী দিন লাগেনি। ঊচ্ছমাধ্যমিক পাশ করার পর হঠাৎ করেই রেডিও শোনার নেশা হল। আর সেই আমার রবীন্দ্রসঙ্গীত কে ভালবাসতে শেখার শুরু। যে গানটা শুনে আমি রবীন্দ্রনাথের গানের ভক্ত হয়ে পড়েছিলাম সেটা হল – ‘যে রাতে মোর দুয়ার গুলি ভাঙল ঝড়ে’। এই গানের কথায় মধূ ছিল না সুরে নেশা ছিল, আজও ঠিক জানিনা, শুধু জানি আমি রবীন্দ্রসঙ্গীতের প্রেমে পরে গেলাম।
সেই শুরু হল আমার বাড়ির আলমারিতে সাজিয়ে রাখা গীতাঞ্জলি, গীতবিতান কে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়া আর রবীন্দ্রনাথের গানে আরও আরও তলিয়ে যাওয়া। তারপর মায়ের কাছে পাওয়া হাতখরচা বাঁচিয়ে রবীন্দ্রসঙ্গীতের ক্যাসেট কেনা আর শোনা শুরু হল। দেবব্রত বিশ্বাসের গলায় ‘আজ জ্যোৎস্না রাতে সবাই গেছে বনে’, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের ‘ক্লান্তি আমার ক্ষমা কর প্রভু’ , দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়ের ‘সফল কর হে প্রভু আজি সভা’ , সুচিত্রা মিত্রের কণ্ঠে ‘রজনীর শেষ তারা’, কণীকা বন্ধ্যপাধ্যায়ের গলায় ‘ওই বুঝি কালবৈশাখী’, একের পর এক সবাই কে শোনার নেশার মাঝেই আমি রবীন্দ্রনাথের গান কে আমার মত করে চিনতে শুরু করলাম। ওই সময় আমার অবস্থাকে রবিন্দ্রনাথের গানেই বোঝাতে হলে আমায় গাইতে হয় ‘প্রান ভরিয়ে, তৃষা হরিয়ে, মোরে আরও আরও আরও দাও প্রান’।
আর হঠাৎই একদিন আবিস্কার করলাম যে আমার ভাল লাগা, কষ্ট পাওয়া, আনন্দ বা দুঃখের মত দৈনন্দিন ছোটখাটো সমস্ত অনুভুতিগুলোকে আমি রবীন্দ্রনাথের গান দিয়েই বুঝে নিচ্ছি। কোন আনন্দের মুহূর্তে আমার গলায় এসেছে ‘ওরে বকুল পারুল’, আবার দুঃখের মুহূর্তে গাইতে ইচ্ছে করেছে ‘অশ্রু ভরা বেদনা’। কখন ভালবেসে মনের মানুষকে বলেছি- ‘সখী ভাবনা কাহারে বলে’; তার অভিমান ভাঙাতে গেয়েছি ‘সহে না যাতনা দিবস গণিয়া গণিয়া’; আবার মাঝরাতে হঠাৎ জেগে ওঠা আমার দুই মাসের মেয়েকে আবার ঘুম পারাতে নিজের মনেই গুনগুন করছি ‘ফুলে ফুলে, ঢলে ঢলে’ গানটা।
আজ লিখতে বসে এমন অনেক ঘটনার কথাই মনে পরছে, যেখানে আমি আমার অজান্তেই রবীন্দ্রনাথের গানকে আঁকড়ে ধরেছি। সে হঠাৎ করে পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে বসে কোরাসে ‘পুরানো সেই দিনের কথা’ গেয়ে ওঠাই হোক অথবা একা একা রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে ‘জানি জানি তুমি এসেছো এ পথে’ গুনগুণ করাই হোক। কারণে অকারণে রবীন্দ্রনাথের গান আমার সঙ্গী হয়ে গেল।
তবে যে ঘটনাটা আমার এই গান গুলোর ওপর অসীম বিশ্বাস জাগিয়েছে, সেটা ঘটে ২০০৫ সালে। তখন আমি প্রায় মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে আছি। ডাক্তারবাবু জানান অপারেশন করতেই হবে কিন্তু প্রাণ সংশয় কাটবে কিনা জানেন না। সেদিন অপারেশন টেবিলে অজ্ঞান হয়েও আমি শুনতে পেয়েছিলাম ‘এই আকাশে আমার মুক্তি আলোয় আলোয়’। কখন আমার অপারেশন শেষ হল, কখন আমায় হস্পিটালের বিছানায় শোয়ানো হল কিছুই জানি না, শুধু মনে আছে চোখের সামনে ভাসছিল নানান রকমের ফুলে ভরা অপূর্ব সুন্দর এক পাহাড়ি উপত্যকায় আমি ঘুরে বেরাচ্ছি আর কানের কাছে সুচিত্রা মিত্রের গলায় এই রবীন্দ্রসঙ্গীতটি শুনতে পাচ্ছি।তাই আমার ইচ্ছে, যেদিন আমার মৃত্যু হবে, সেদিনও যেন আমার শেষকৃত্যে এই গানটাই গাওয়া হয়।
ওই ঘটনা থেকেই আমার দৃঢ় বিশ্বাস হয়েছে, রবীন্দ্রনাথের গান আমার কাছে শুধু মাত্র গান নয়, এ আমার বেঁচে থাকার শক্তি। আমার অন্তরে যেদিন এই গান থাকবে না, সেদিন হয়ত আমিও থাকব না। ততদিন শুধু গেয়ে যাব ‘তুমি যে সুরের আগুন লাগিয়ে দিলে মোর প্রানে’।