মন ভাল করা ছোট্ট দুই পাহাড়ি গ্রামের রূ-সৌন্দর্যের কাহিনি
New Post has been published on https://sentoornetwork.com/a-short-trip-in-kaluk-a-village-of-sikkim/
মন ভাল করা ছোট্ট দুই পাহাড়ি গ্রামের রূ-সৌন্দর্যের কাহিনি
মৌসুমী ঘোষ
নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে পৌঁছেই উপেনের গাড়িতে আমরা রওনা দিলাম কালুকের পথে। পশ্চিম সিকিমের ছোট্ট এক গ্রাম কালুক। জোড়থাং পাহাড়ি শহর ছাড়িয়ে দুপুরের পরই আমরা পৌঁছলাম কালুক। তাড়াতাড়ি ডিনার করে শুয়ে পড়লাম। শুনেছি কালুক থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায় চমৎকার। ঠিক ভোর চারটেয় উঠে পড়লাম অ্যালার্মের আওয়াজে। অ্যালার্ম বন্ধ করে তৎক্ষণাৎ উঠে পড়লাম। কাল রাতে লেপ মুড়ি দিয়ে শুয়েছিলাম। লেপ বাইরে আসতেই বেশ ঠান্ডা লাগল।চাদর একটা হাতের কাছেই ছিল। কোনওরকমে জড়িয়ে জানলার পাশে। বাইরে বেশ অন্ধকার। অনেকে যেন কথা বলছে নীচের রাস্তায়। জানলা অল্প ফাঁক করে দেখি কয়েকজন মানুষ টর্চ জ্বালিয়ে একটা গাড়ির সামনে কি যেন করছেন। চারিদিকে মেঘ।কাচগুলো মুছে নিয়ে জানলা বন্ধ করে বসে রইলাম প্রবল হতাশায়। একবার নীচে ওঁদের দেখছি একবার সামনের দিকে তাকাচ্ছি। কি যে করব, বুঝতে পারছিলাম না! ভাল করে পুরো জানালাটা মুছে পর্দা সরিয়ে বিছানায় এসে বসলাম। কাঞ্চনজঙ্ঘা যদি সত্যি দেখা দেয় আমি বিছানায় শুয়ে শুয়েও দেখতে পাব। পাহাড়ে খুব তাড়াতাড়ি সকাল হয়। ঠায় বসে আছি।প্রায় পৌনে পাঁচটার সময় মনে হল মেঘও একটু একটু সরছে। কি যেন একটু দেখা যাচ্ছে। সাদা মেঘও হতে পারে। তড়াক করে লাফিয়ে আবার জানলার ধারে। নীচে ওঁরা তখনও আছেন। এতক্ষণে বুঝলাম গাড়ির চাকা পাল্টাচ্ছিলেন। হঠাৎ করেই সামনের পাহাড়ের পিছনে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখলাম। তখনও সূর্যের রশ্মি পড়েনি। আমার চিৎকারে মেয়ে বর উঠে পড়ল। ভাল করে দেখার জন্য ওপরের রেস্তরাঁয় গিয়ে বসলাম।অসাধারণ! আমি মেয়েকে এই প্রথমবার (বড় হওয়ার পরে) কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখাতে পারলাম। ক’দিন ধরে অনেক প্রার্থনা করেছিলাম ভগবানের কাছে। সামান্য হলেও যেন তার দেখা পাই। তাহলে জীবন সার্থক হবে। আজ সকালটা এইভাবেই শুরু হবে ভাবতেও পারিনি! আশ মিটিয়ে দু’চোখ ভরে দেখলাম। কি বিশাল তার ব্যাপ্তি! চা খেতে খেতে, বিছানায় বসে বসে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছি। জানি একটু পরেই মেঘের দলের মাঝে সে লুকিয়ে পড়বে। আজ রিংচেনপং ঘুরব। কালুক থেকে মোটে চার কিমি। তাই আমাদের কোনও তাড়া নেই।কাঞ্চনজঙ্ঘার রূপ-সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে আমরা তিনজন নানারকম গল্পে মেতে উঠলাম। চোখ কিন্তু সামনে। কাঞ্চনজঙ্ঘার দিকেই। ঘরেতেই ব্রেকফাস্ট দিয়ে গেল। সুস্বাদু আলুরপরোটা সঙ্গে আচার। টকদই দিয়েও আলুপরোটা বেশ লাগে। আর গরম গরম ব্ল্যাক কফি। ধীরে ধীরে কাঞ্চনজঙ্ঘা ঢাকা পড়ে গেল মেঘের আড়ালে।আমরাও ফ্রেশ হয়ে দীপেনের গাড়িতে বেরিয়ে পড়লাম। মিনিট কয়েকের মধ্যেই পৌঁছলাম রিনচেনপং। নেমে ভাবলাম হেঁটে এলেই হত এতটুকু পথ। তাহলে আরও বেশি উপভোগ করতাম পাহাড়ের খোঁজখোঁজ। প্রথমেই গেলাম রিনচেনপং গুম্ফা। পাহাড়ের ওপরে দারুন লোকেশনে ওই মনাস্টেরি। সেইসময় চলছিল ভগবান বুদ্ধের প্রার্থনা। চমৎকার লাগছিল! অপূর্ব এক স্বর্গীয় পরিবেশ তৈরি হয়েছিল গুম্ফা জুড়ে! মেঘ উড়ে যাচ্ছিল এক পাহাড় ছেড়ে অন্য আর এক পাহাড়ে। পাহাড়ের শরীর জুড়ে যেন মেঘের চাদর মেলা! এ-দৃশ্য উন্মুক্ত আকাশের নীচে না-বসলে উপভোগ করা যায় না। তাই মা-মেয়ে বসলাম নরম ঘাসে। চারপাশে কেউ নেই। এ যে কী শান্তি, ভাষায় বর্ণনা করা মুশকিল! চারিদিকে পাহাড়। হাওয়াতে পবিত্র পতাকাগুলো উড়ছিল পতপত পতপত করে। সিকিমের তৃতীয় প্রাচীন মনাস্টেরি এটি। ১৭৩০ সালে প্রতিষ্ঠিত। কিছুক্ষণ একটু শান্তির মধ্যে বসে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য দেখলাম দু’নয়ন মেলে। তারপর গেলাম পয়জন লেক। তবে এখন কিছুই বোঝা যায় না ওপর থেকে। পাইন অরণ্যের ভিতর দিয়ে সামান্য দেখা গেল। জলও নেই তেমন। বহু বছর আগে ব্রিটিশ সেনারা যখন আক্রমণ করেছিল তখন এখানকার রাজা এই লেকের জলে বিষ মিশিয়ে দিয়েছিলেন। ব্রিটিশ সেনারা এই লেকের জল খেয়ে মারা গিয়েছিল। সেইথেকেই এই লেক লোকমুখে হল পয়জন লেক। দীপেন তারপর নিয়ে গেল ভূতবাংলোয়। ব্যাপারটা বুঝতেই পারছিলাম না। গিয়ে দেখি ব্রিটিশদের বাংলো রয়েছে সেখানে। গেট বন্ধ।ডেকেও কাউকে পাওয়া গেল না। কয়েকটি ছবি তুলে ভূতবাংলোকে বাই জানিয়ে নেমে এলাম। রিনচেংপং গ্রামটা দারুণ! পাইনের সারির ভেতর দিয়ে একাকী হাঁটা, পাখির কুজন শুনতে শুনতে… এমন পরিবেশ আর কোথাও পাব! পাখির ডাক আর বাতাসে গাছের পাতার শব্দ ছাড়া কোনও কোলাহল নেই। নিশ্চুপ নিস্তব্ধতা বিরাজমান! এরপর পৌঁছলাম রিংচেং চোলিং মনাস্টেরিতে। এখানে বাইরে কাজ চলছিল। একটা বেঞ্চে বসলাম। দূরে পাহাড়। পাহাড়ের গায়ে আঁকাবাঁকা সর্পিল পাহাড়ি রাস্তা। গ্রামও দেখা যাচ্ছে। একাকী বসে পাহাড়ের রূপ-সৌন্দর্যের মুগ্ধতায় নিজেকে ভরিয়ে তুলছি। কি শান্তি। তারপর মিনিটখানিক হেঁটে রবীন্দ্র স্মৃতি ভবনে পৌঁছলাম।রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এখানে কিছুদিন ছিলেন। সেই স্মৃতির উদ্দেশে এবং গীতাঞ্জলির একটি কবিতা ফলকের ওপরে লেখা। আর কিছুই নেই। আরও কিছুক্ষণ ওখানেই রইলাম। দীপেন বলল, “এবার যাব আজিং মডেল ফার্মে। অনেককিছু ওখানে তৈরি হয়, ওয়াইনও।” উৎসাহ নিয়ে চললাম। অনেকক্ষণ যাওয়ার পর এক জায়গায় থামল। বলল, “এবার হেঁটে নীচে যেতে হবে। নীচে ফ্যাক্টরি।” ওপর থেকে কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না। আদৌ নীচে কিছু আছে? অনেকগুলো সিঁড়ি। বললাম, তোমরা যাও। আমি ওপরেই থাকি। মুশকিলটা হল ফাঁকা রাস্তা। গ্রামও নেই কাছাকাছি।তাই অতনু বলল, ওরাও নামবে না। সিঁড়ির কয়েক ধাপ নামলাম। দারুণ জায়গা! চারিদিকে শুধু অরণ্যের সবুজ। দীপেন লাফিয়ে লাফিয়ে নীচে নেমে গেল।দেখতে গেল কেউ আছে কিনা। একটু পরেই ও গভীর জঙ্গলের মধ্যে হারিয়ে গেল।আমি ওপর থেকেই ডাকতে লাগলাম ওকে৷ চলে এস বাবা আর নীচে যাওয়ার দরকার নেই।। ১০ মিনিট পর আবার লাফিয়ে লাফিয়ে চলে এল। হাতে কয়েকটা গ্রিন আপেলের মতন ফল।আমাদের দিল। নিজেও খেতে শুরু করল। দেখাদেখি অতনুও একটা খেল। কী ফল কে জানে! আমরা এবার ধরলাম ফেরার রাস্তা।রিনচেংপং পার হয়ে সোজা কালুক। হোটেলে ঢুকতেই ইচ্ছা করছিল না। অতনু রুমে গেল। আমি আর মেয়ে একটু নীচের রাস্তায় হাঁটাহাঁটি করে রুমে এলাম। ফ্রেশ হয়ে লাঞ্চ খেয়ে ওখানেই বসে পাহাড় দেখতে দেখতে লুডো খেললাম মা-মেয়েতে। এ-সময়গুলো জীবনে খুব অমূল্য। প্রতিটা মুহূর্ত উপভোগের। দূরে পাহাড়ের গায়ে আলো ফুটে উঠল। প্রচণ্ড জোরে বৃষ্টি এল। নির্জনে একান্তে দুটো রাত কালুকে অথবা রিনচেনপংয়ে কাটিয়ে আসতেই পারেন। আমি ছিলাম কালুকে। সুদীপদার কাঞ্চন ভ্যালি ট্যুরিস্ট লজে। রিংচেংপংয়েও বহু হোটেল আছে। সেখানেও থাকা যেতেই পারে।
Prev 1 of 5 Next
var prt_gal_img_1430781869 = ["https:\/\/sentoornetwork.com\/wp-content\/uploads\/2020\/06\/13c028cf-a773-449b-bc07-58651b391a36.jpg","https:\/\/sentoornetwork.com\/wp-content\/uploads\/2020\/06\/99bf9cd0-1d2d-4075-876d-696d2cf39b2d.jpg","https:\/\/sentoornetwork.com\/wp-content\/uploads\/2020\/06\/3203dec1-7c50-4b76-9e1a-d7557d908062.jpg","https:\/\/sentoornetwork.com\/wp-content\/uploads\/2020\/06\/49666dc1-2f96-40b4-a21c-0380df458e07.jpg","https:\/\/sentoornetwork.com\/wp-content\/uploads\/2020\/06\/cab6801e-8ab8-44db-be0d-de5ac35ee224.jpg"]; var prt_gal_cap_1430781869 = ["","","","",""];
আরও পড়ুন: জৈষ্ঠ্য মাসে দশেরায় এবং পঞ্চমী তিথিতে মা মনসার পুজো হয় কেন?











