কিংবদন্তি শচীন দেববর্মন
New Post has been published on https://sentoornetwork.com/sachin-dev-barman-birth-annivarsary/
কিংবদন্তি শচীন দেববর্মন
শ্যামল কর
‘বর্ণে গন্ধে ছন্দে গীতিতে, হৃদয়ে দিয়েছ দোলা, রঙেতে রাঙিয়া রাঙাইলে মোরে, একি তব হরি খেলা, তুমি যে ফাগুন রঙেরও আগুন, তুমি যে রসের ধারা, তোমার মাধুরী তোমার মদিরা করে মোরে দিশাহারা, মুক্তা যেমন শুক্তিরও বুকে, তেমনি আমাতে তুমি, আমার পরানে প্রেমের বিন্দু তুমি শুধু তুমি’ সহধর্মিণী মীরা দেববর্মণ এই গান তাঁর প্রাণের মানুষ শচীনদেবের দিকে তাকিয়ে রচনা করেছিলেন কিনা জানি নেই কিন্তু শচীনকর্তার গাওয়া এই গানের প্রতিটা শব্দ মিলে যায়, বিশেষ অনুনাসিক কণ্ঠস্বর ও গায়কির কালোত্তীর্ণ সঙ্গীতশিল্পী শচীন দেববর্মণের সঙ্গে। তাঁর প্রতিটি গানের মাধুরী মদিরায় দিশাহারা করে, হৃদয়ে দোলা দিয়ে যায়। শচীনদেব বর্মণ ছিলেন একাধারে কণ্ঠশিল্পী, সুরকার, গীতিকার, সঙ্গীতপরিচালক।১৯০৬-র এক অক্টোবর অর্থাৎ আজকের দিনে শচীন দেববর্মনের জন্ম কুমিল্লায়।তখন ত্রিপুরা সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল নোয়াখালি, চট্টগ্রাম, শ্রীহট্ট ও কুমিল্লা।ত্রিপুরার চন্দ্রবংশীয় রাজপরিবারের সন্তান হয়েও, রাজকীয় সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ছেড়ে মিশে গিয়েছিলেন বাংলার মাটির সঙ্গে, ভাটি গাঙ বেয়ে তুলেছিলেন সুরের মূর্ছনা, কোলে তুলে নিয়েছিলেন ঢোল, তাতে তাকডুম তাকডুম বোল তুলে গেয়েছিলেন, ‘আমি সব ভুলে যাই, তাও ভুলি না ,বাংলা মায়ের কোল’। সঙ্গীতসাধনাই ছিল তাঁর ব্রত। ছোটবেলা থেকেই সঙ্গীতময় পরিবেশে বেড়ে ওঠেন শচীন দেববর্মন। বাবা নবদ্বীপচন্দ্র দেববর্মণ ছিলেন সজ্ঞীতপ্রেমী মানুষ, ছিলেন সেতারবাদক ও ধ্রুপদী সঙ্গীতশিল্পী। বাবার কাছেই শচীনদেব গ্রহণ করেন সঙ্গীতের প্রথম তালিম। তাঁর প্রথম শিক্ষাগুরু সঙ্গীতাচার্য কৃষ্ণচন্দ্র দে। যিনি সুপরিচিত ‘কানাকেষ্ট’ নামে। ছিলেন প্রখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী মান্না দের কাকা। ১৯ বছর বয়সে সঙ্গীতচর্চা শুরু করে টানা পাঁচ বছর শচীনদেব তালিম নেন তাঁর কাছে।এরপর সঙ্গীতের শিক্ষা নেন, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, ফৈয়াজ খাঁ, আফতাবুদ্দিন খাঁ, করিম খাঁ, ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ বিখ্যাত ধ্রুপদী গায়কদের কাছে। ধ্রুপদী সঙ্গীতের এই মৌলিক শিক্ষা তাঁর সঙ্গীতজীবনে গভীর জ্ঞান সঞ্চারে ভূমিকা পালন করেছিল, যা দেখা গেছে তাঁর নিজের গাওয়া গানে, রাগসঙ্গীতের সংম্রিশ্রণে সুর সৃষ্টিতে। ১৯২৩-এ তিনি প্রথম গান করেন আকাশবাণী কলকাতায়। তাঁর প্রথম গ্রামাফোন রেকর্ড প্রকাশিত হয় ১৯৩২-এ বাংলা গানের। এরপর রেকর্ড করেছেন বহু বাংলা ও হিন্দি গান, যা মন মাতিয়েছে শ্রোতাদের। এখনও সমানভাবে মাতায়! তিনি নজরুল গীতিও রেকর্ড করেছিলেন। কাজি নজরুল ইসলাম ছিলেন শচীন দেববর্মনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু।কুমিল্লায় তাঁর বাড়িতে নজরুল থাকতেন তালপুকুরের পশ্চিম পাড়ের একটা ঘরে। সেখানে বসেই তিনি লিখেছিলেন বিখ্যাত ছড়া, ‘বাবুদের তালপুকুরে, হাবুদের ডাল কুকুরে’।
শচীন দেববর্মনের স্কুলশিক্ষা শুরু কুমিল্লা জেলা স্কুলে, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে বিএ পাশ করে ১৯২৫-এ চলে আসেন কলকাতা, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএ পড়ার জন্য। সঙ্গীতচর্চায় নিজেকে ডুবিয়ে রাখার জন্য এমএ পাশ করা হয়ে ওঠেনি। সঙ্গীতই ছিল তাঁর ধ্যানজ্ঞান। বেঙ্গল মিউজিক কনফারেন্সে গাওয়া ঠুমরি গান ওস্তাদ ফৈয়াজ খাঁকে মুগ্ধ করেছিল। শচীন দেববর্মন থাকতেন কলকাতার ত্রিপুরা প্যালেসে। পিতা নবদ্বীপচন্দ্র প্রয়াত হন এখানেই। তখন তিনি ত্রিপুরার প্রধানমন্ত্রী। শচীন দেববর্মন কুমিল্লা বা আগরতলার গিয়ে রাজকীয় আয়াসে নিশ্চিন্তে জীবনযাপন করতে পারলেও, তিনি সেখানে না-ফিরে সঙ্গীতসাধনা ও নিজে উপার্জনের জন্য কিছুকাল কলকাতায় থেকে চলে যান বম্বে (মুম্বাই) হয়ে ওঠেন ফিল্মি দুনিয়ার ওন্যতম শ্রেষ্ঠ সুরকার সঙ্গীত পরিচালক এসডি বর্মণ।














