বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান – কাছে থেকে দেখা
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে আমি সংশ্লিষ্ট ছিলাম ১৯৬৯ সালের প্রথম থেকে ১৯৭৫ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত। এই সময়কাল ছিল ঘটনাবহুল এবং গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৬৯-১৯৭২ পর্বটি ছিল স্বাধীনতাসংগ্রামের শেষ বা চূড়ান্ত অধ্যায়। আর ১৯৭২-১৯৭৫ ছিল স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশ সরকারের মেয়াদকাল। স্বাধীনতার আগে ১৯৬৯ সাল থেকে আমার অন্য সহকর্মীদের সঙ্গে মিলে আমি বিশেষভাবে জড়িত ছিলাম যে বিষয়গুলােতে তা হলাে : ছয় দফার বিশদ বিশ্লেষণ, ১৯৭০ সালের নির্বাচনী ইশতেহার তৈরি, ১৯৭১ সালের অসহযােগ আন্দোলনের নির্দেশমালা তৈরি এবং পাকিস্তানের সম্ভাব্য নতুন সংবিধান নিয়ে যারা বঙ্গবন্ধুর তরফ থেকে পশ্চিম পাকিস্তানিদের সঙ্গে আলােচনা করছিলেন, তাঁদের পরামর্শ দেওয়া। ১৯৭২-৭৫ সময়কালে আমি বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশের প্রথম পরিকল্পনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান নিযুক্ত হয়েছিলাম। তাঁর সঙ্গে আমি জড়িত ছিলাম অর্থনৈতিক বিষয়ে; যদিও রাজনৈতিক, কূটনৈতিক এবং প্রতিরক্ষা বিষয়ে আমার সরাসরি কোনাে যােগাযােগ বা ভূমিকা ছিল না। তবে আমার অর্থনৈতিক কাজকর্মে এগুলাের পরােক্ষ সম্পর্ক ও প্রভাব ছিল।
উপরিউক্ত সময়কালে বিভিন্ন বিষয়, ঘটনা এবং ব্যক্তি নিয়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার অনেক আলােচনা, সাধারণ কথাবার্তা এবং মতবিনিময় হয়েছিল। সেগুলাে যত দূর মনে পড়ে, তা এই বইয়ে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। তা ছাড়া এখানে কিছু ঘটনা, বিষয় এবং ব্যক্তি সম্পর্কে বর্ণনা রয়েছে, যা তখনকার সার্বিক অবস্থার ওপর আলােকপাত করে করা হয়েছে।
বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার অনেক আলােচনার কথা এখানে বর্ণনা করা হয়েছে, যার অনেক কিছুই আমার সরকারি দায়িত্ব এবং কাজকর্মের সঙ্গে সরাসরি বা বিশেষভাবে সম্পর্কযুক্ত ছিল না। আলাপের বিষয়বস্তু ছিল বহু বিস্তৃত। আমি বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সহকর্মী বা তার দলের লােক ছিলাম না
কিংবা আমলাতন্ত্রের সদস্যও ছিলাম না। আমার কাজের ব্যস্ততার কারণে সমাজের এই দুই অংশের সঙ্গে আমার মেলামেশা ছিল না। আমাকে বলা যেতে পারে কিছুটা বাইরের এবং কিছুটা ভেতরের লােক। আমার সঙ্গে বিভিন্ন আলােচনায় বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত বিষয়াদি এবং নিজের সহকর্মী বা সমাজের বিভিন্ন অংশ সম্পর্কে তাঁর বিবেচনা বা ধ্যানধারণা প্রকাশ পেত।
বইটির প্রথম অধ্যায়ে ছয় দফা সম্পর্কে আলােচনা করা হয়েছে। ছয় দফার সঙ্গে পূর্ণ স্বাধীনতার বিশেষ পার্থক্য নেই। ছয় দফার বিস্তারিত বিষয়গুলাে অবিশেষজ্ঞ মানুষের জন্য সহজবােধ্য নয়। সেগুলাে এখানে সহজ করে বােঝানাের চেষ্টা করা হয়েছে। দ্বিতীয় অধ্যায়ে নতুন সরকার গঠনের সমস্যা, যেমন নতুন মন্ত্রণালয় স্থাপন এবং পুরােনাে মন্ত্রণালয়ের সম্প্রসারণ, যেমন পরিকল্পনা কমিশনের মতাে অপরিচিত মন্ত্রণালয় স্থাপন এবং অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের কাছে কমিশনের প্রয়ােজনীয়তা বুঝিয়ে এর গ্রহণযােগ্যতা তৈরি করা যে কঠিন ছিল, সেসবের বর্ণনা আছে। প্রসঙ্গক্রমে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিবর্তনে খােন্দকার মােশতাক এবং জিয়াউর রহমানের ভূমিকার আলােচনা আছে। এ ছাড়া দুটো বহু আলােচিত বিষয়ের বিশ্লেষণ আছে। এর একটি হলাে শিল্পের জাতীয়করণ আর অন্যটি দুর্ভিক্ষ।
তৃতীয় অধ্যায়ে বর্ণনা আছে কীভাবে নতুন দেশের জরুরি সমস্যাগুলাের দ্রুত সমাধানের প্রয়ােজনে একাধিক কারণে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয় প্রধানমন্ত্রীর হাতে। এ ছাড়া দেশের অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির পরিপ্রেক্ষিতে বাকশাল গঠন বিষয়ে আলােচনা করা হয়েছে। চতুর্থ অধ্যায়ে নতুন দেশের আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনে রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক বিষয়গুলাের আলােচনা রয়েছে। পাকিস্তানের মিথ্যা প্রচারণার কারণে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলাে বাংলাদেশের প্রতি অসন্তুষ্টি প্রকাশ করত। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের প্রচেষ্টার বর্ণনা আছে এই অধ্যায়ে, বিশেষ করে যে সময়টিতে দরিদ্র যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের জন্য বিদেশি সাহায্যের প্রয়ােজন ছিল। এই সূত্রে স্বাধীনতার আগের পাকিস্তানের ঋণের অংশগ্রহণের আলােচনা আছে।
বিনায়ক সেন এবং আখতার মাহমুদ এই বইয়ের বিষয়ে তাদের মতামত ও পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করেছেন। আমি তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ। প্রতিচিন্তার সহকারী সম্পাদক খলিলউল্লাহ্ জীবন আমার পাণ্ডুলিপি সম্পাদনা করে দিয়েছেন। আমি তাকে ধন্যবাদ জানাই।।
যেসব ঘটনা, ব্যক্তি ও বিষয় এই বইয়ে উল্লেখ করা হয়েছে, তার বিশদ বিবরণ ও বিশ্লেষণ রয়েছে আমার তিনটি বইয়ে। বইগুলাে হলাে :
১. মেকিং অব আ নেশন বাংলাদেশ : অ্যান ইকোনমিস্টস টেল, | ইউপিএল, ২০০৩, ঢাকা। ২. ডেভেলপমেন্ট প্ল্যানিং ইন বাংলাদেশ: আ স্টাডি ইন পলিটিক্যাল
ইকোনমি, সি হার্স্ট অ্যান্ড কোং, ১৯৭৭ এবং ইউপিএল, ঢাকা,
১৯৭৯। ৩. অ্যান ওডেসি: দ্য জার্নি অব মাই লাইফ, প্রথমা প্রকাশন, ২০১৭, | ঢাকা।
নুরুল ইসলাম ওয়াশিংটন, মার্চ ২০২০
বাংলাদেশের জন্ম : রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পটভূমি
১৯৭১ সালে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ বিচ্ছিন্ন হওয়ার মূলসূত্র এক অর্থে খুঁজে পাওয়া যায় উপমহাদেশে ইংরেজ শাসনের অবসানের সময়। মূলত ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম থেকেই বিচ্ছিন্নতার লক্ষণগুলাে লক্ষ করা যায়। পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভৌগােলিক অবস্থান ও তার গুণগত বৈচিত্র্যের মধ্যেই এসব লক্ষণ নিহিত ছিল।
হাজার মাইলের ব্যবধানে অবস্থিত দুই অঞ্চলের মধ্যে মাত্র একটি জায়গায় মিল ছিল—তা হলাে ধর্ম। তারপর যেখানে কিছুটা মিল ছিল, সেটা ভারত বা হিন্দু সম্প্রদায়ের আধিপত্য থেকে উদ্ধার পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। এই দুই অঞ্চলের যে শুধু ভাষাগত, নৃতাত্ত্বিক বা সাংস্কৃতিক অমিল ছিল, তা-ই নয়, এই দুই অঞ্চলের ঐতিহ্যগত কোনাে মিলও ছিল না। শুধু ধর্মের মিল কিংবা হিন্দু আধিপত্য থেকে মুক্ত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকেই কি দুই অঞ্চলের একত্র থাকা সম্ভব ছিল? | সদ্য প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রে স্বল্প সময়ের মধ্যে দুটি প্রধান রাজনৈতিক দল গড়ে ওঠে। দেশব্যাপী নীতি, কর্মসূচি বা আদর্শের ভিত্তিতে এই দলগুলাে গড়ে ওঠেনি। দলগুলাের ভিত্তি ছিল ভৌগােলিক অবস্থান। অর্থাৎ এক দলের প্রতিনিধিত্ব পশ্চিম পাকিস্তানে আর অন্য এক দলের প্রতিনিধিত্ব পূর্ব পাকিস্তানে। অবশ্য বিদ্যমান ওই অবস্থায় কোনাে গণতান্ত্রিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ব পাকিস্তানের যেই রাজনৈতিক দল, তারই স্থায়ীভাবে কেন্দ্রীয় সরকার গঠন করার সম্ভাবনা ছিল।।
জনসংখ্যার দিক থেকে পূর্ব পাকিস্তান সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও
আমলাতন্ত্রে ও সব ধরনের বেসামরিক শাসনযন্ত্রে পশ্চিম পাকিস্তানিদের সম্পূর্ণ প্রাধান্য ছিল। স্বভাবতই পূর্ব পাকিস্তানের কোনাে দলের কেন্দ্রীয় সরকার গঠনের সম্ভাবনা পশ্চিমের কাছে গ্রহণযােগ্য ছিল না। এ কারণেই দুই অঞ্চলের কাছে গ্রহণযােগ্য সংবিধান গঠন বিলম্বিত হয় এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। শুরু থেকেই পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী রাজনীতিতে সক্রিয় ছিল। এই বাহিনীতে বিপুল সংখ্যাধিক্য ছিল পশ্চিম পাকিস্তানিদের। যার ফলাফল ১৯৫৮ সালে সামরিক অভ্যুত্থান এবং গণতন্ত্রচর্চার অবসান। ইতিমধ্যে পশ্চিমের পক্ষে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অপব্যবহার ছিল উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা ঘােষণা করা। পূর্ব পাকিস্তানের জন্য এটা ছিল অত্যন্ত কষ্টদায়ক, অনৈতিক ও অযৌক্তিক আঘাত। তা ছাড়া ভাষার মাধ্যমে পশ্চিমের সংস্কৃতিকে নগ্নভাবে পূর্বের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার বিষয়টি এতে স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছিল। যার পরিপ্রেক্ষিতে পূর্ব পাকিস্তানব্যাপী প্রচণ্ড প্রতিবাদ ও আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। ইতিমধ্যে পশ্চিমের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা অর্জন ও নিজেদের সুবিধার্থে সেই ক্ষমতার প্রয়ােগের ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আর্থিক অবস্থায় দুই অঞ্চলের মধ্যে অসমতা বৃদ্ধি পেতে থাকে। এমনিতেই রাষ্ট্র গঠনের সূচনায় পশ্চিমে অধিকতর বিস্তৃত এবং উন্নত অবকাঠামাে ছিল। পশ্চিমের কুক্ষিগত কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষপাতিত্বমূলক নীতিমালা, দুই অঞ্চলের মধ্যে অসম সম্পদ বণ্টন ও আর্থিক বিনিয়ােগ—সব মিলে উভয় অঞ্চলের মধ্যকার আর্থিক বৈষম্য ক্রমাগত বাড়তে থাকে। নিচের উদাহরণগুলাে থেকে তা-ই ফুটে ওঠে : ১. ১৯৫১-৫২ এবং ১৯৫৯-৬০ সালে পূর্ব পাকিস্তানের চেয়ে পশ্চিম
পাকিস্তানের মাথাপিছু সরকারি উন্নয়ন ব্যয় ছিল ৩.৫ থেকে ৫ গুণ বেশি। ১৯৬০-৬১ ও ১৯৬৯-৭০ সালে তা ছিল ২.২ থেকে ২.৬ গুণ বেশি। এদিকে ১৯৬৪-৬৫ সালে মােট উন্নয়নমূলক সরকারি ব্যয়ে পূর্ব
পাকিস্তানের অংশ ছিল ৩১ শতাংশ। ২. বেসরকারি খাতে বিনিয়ােগের নিয়ন্ত্রকও ছিল কেন্দ্রীয় সরকার। ‘শল্প
বিনিয়ােগের লাইসেন্স ও বৈদেশিক মুদ্রা বণ্টনের মাধ্যমে বেসরগরি বিনিয়ােগে ১৯৬০-এর দশকের শুরুতে পূর্ব পাকিস্তানের অংশ ছিল ত্র ১৩ শতাংশ এবং ১৯৬০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে তা ২০ শতাংশে গিয়ে দাঁড়ায়। ১৯৬০-এর দশকের শেষে এই বিনিয়ােগের সর্বোচ্চ মাত্রা
দাড়ায় ২৫ শতাংশে। ৩. সরকারি ও বেসরকারি কোনাে খাতেই পূর্ব পাকিস্তান ওই দুই দশকে
৩৬ শতাংশের বেশি বিনিয়ােগের সুযােগ পায়নি। ৪. ফলাফলে দেখা গেছে, পশ্চিম পাকিস্তানের মাথাপিছু আয় পূর্ব
পাকিস্তানের চেয়ে ১৯৪৯-৫০ সালে ১৭ শতাংশ, ১৯৫৯-৬০ সালে ৩২ শতাংশ এবং ১৯৬৯-৭০ সালে ৬১ শতাংশ বেশি ছিল।
১৯৫০-এর দশকের শুরু থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনৈতিক উন্নতির ভিত্তি তৈরি করা হয়েছিল ভৌত অবকাঠামাে ও মানবসম্পদ উন্নয়নে প্রচুর বিনিয়ােগ করার মাধ্যমে। তখন থেকেই এসব ক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তান। তুলনামূলকভাবে বঞ্চিত হতে থাকে। বৈষম্যমূলক বাণিজ্য এবং বৈদেশিক মুদ্রানীতির দ্বারা পূর্বের সম্পদকে পশ্চিমে ব্যাপকভাবে পাচারের পথ সুগম করা হয়। ১৯৫০ ও ৬০-এর দশকে সম্পদ পাচার পুরােদমে শুরু হয়। রপ্তানি বাণিজ্যে পূর্ব পাকিস্তানের আয়ের উদ্বৃত্ত অংশ অধিক হারে পশ্চিম পাকিস্তানে ব্যয়িত হতাে। এটা ঘটত সরকার-নির্ধারিত পাকিস্তানি মুদ্রার বৈদেশিক মূল্যহারের কারণে, যা ছিল প্রকৃত বিনিময় হারের চেয়ে কম। এই রপ্তানি উদ্বৃত্তের পরিমাণ এতই বেশি ছিল যে তা পশ্চিমের সঙ্গে পূর্বের যে (ক) আঞ্চলিক বাণিজ্যের ঘাটতি এবং (খ) বৈদেশিক সাহায্যে পূর্বের যে অংশ, দুইয়ের সমষ্টির চেয়ে বেশি ছিল।
উপরিউক্ত পরিস্থিতিতে সম্পদের অসম বণ্টন ও ব্যবহারের ফলে পশ্চিমে পূর্বাঞ্চলের সম্পদ পাচারের পরিমাণ ছিল ১৯৪৮-৪৯ থেকে ১৯৬০৬১ সাল পর্যন্ত পূর্বের মােট আঞ্চলিক উৎপাদনের ৬.৫ শতাংশ। ১৯৬১-৬২ থেকে ১৯৬৯-৭০ সাল পর্যন্ত তা হ্রাস পেয়ে ২.৯ শতাংশে দাঁড়ায়। পশ্চিমে স্থানান্তরিত বৈদেশিক রপ্তানি বাণিজ্যের উদ্বৃত্তের বদলে পূর্ব পাকিস্তান একদিকে পেল বৈদেশিক ঋণের বােঝা, সেই সঙ্গে পশ্চিমের অদক্ষ ও অপ্রতিযােগিতামূলক শিল্প খাতের উৎপাদিত দ্রব্যাদি পূর্বের সংরক্ষিত বাজারে বিক্রি হতাে আন্তর্জাতিক বাজারমূল্যের চেয়ে অনেক বেশি দামে। তা ছাড়া পূর্বের দরিদ্র কর্মহীন শ্রমশক্তির পক্ষে কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে অপেক্ষাকৃত উন্নত পশ্চিম পাকিস্তানে পাড়ি দেওয়া প্রায় অসম্ভব ছিল; কারণ, দুই অঞ্চলের মধ্যে যাতায়াত ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল।
পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে সম্পদ বণ্টন ও বৈষম্য হ্রাসের সম্ভাব্য নানা পদক্ষেপ নিয়ে আলাপ-আলােচনা এবং মীমাংসার প্রচেষ্টা অবশ্য হয়েছিল। তবে বাস্তব সত্যটি হলাে, সম্পদ বণ্টন, বিনিয়ােগ ও বিভিন্ন আর্থিক নীতিমালার বিষয়ে সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে পূর্বের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের যে ন্যায্য প্রধান ভূমিকা ও অধিকার থাকা উচিত, পশ্চিম পাকিস্তান তা স্বীকার করত না। এভাবে রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক—দুই ক্ষেত্রেই পূর্বের
কোনাে অর্থবহ ভূমিকা পালন বা সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়াই দুটি দশক অতিক্রান্ত হয়। বিরাজমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অচলাবস্থা তৈরি হতে তাই বেশি সময় লাগেনি। সংবিধানের মৌলিক পরিবর্তন ছাড়া পূর্বের প্রাপ্য অধিকার অর্জন বা উন্নতি সম্ভব নয়—এ ধারণা ক্রমশই বদ্ধমূল হয় এবং তা অচিরেই দেশব্যাপী আন্দোলনে রূপান্তরিত হয়। এই আন্দোলনের পুরােভাগে ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তার নেতৃত্বে উদ্বুদ্ধ ও সংগঠিত পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ তৎকালীন সাংবিধানিক ব্যবস্থার দ্রুত অবসান দাবি করে ।
বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা কর্মসূচি পূর্ব পাকিস্তান প্রস্তাব করে, এ পরিস্থিতিতে দুটি অঞ্চলকে যথেষ্ট পরিমাণে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বায়ত্তশাসন দেওয়াই হবে একমাত্র সমাধান। এই প্রস্তাবই হলাে অচলাবস্থার সমাধান ও সহাবস্থানের যুক্তিসংগত উপায়। এই পদ্ধতিতে কেন্দ্রীয় সরকারের দায়িত্ব সীমিত ও নির্দিষ্ট করে দেওয়া ছাড়া অন্য কোনাে পথ ছিল না। পূর্ব পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান প্রত্যাশা এবং পুঞ্জীভূত হতাশার স্পষ্ট এবং জোরালাে প্রকাশে অগ্রগণ্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর বিখ্যাত ছয় দফা দাবি উত্থাপন করেন। এই ছয় দফা ছিল ১৯ বছর ধরে পূর্ব পাকিস্তানে ক্রমাগত বিকশিত হওয়া বিভিন্ন প্রস্তাব ও ধারণার পরিষ্কার ও সুদৃঢ় ঘােষণা। পূর্ব পাকিস্তানের ধারণা অনুযায়ী, এর ফলে দেশটির দুটি অঞ্চলই শান্তিতে থাকবে এবং সমৃদ্ধিশালী হয়ে উঠবে। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পরপরই ১৯৬৬ সালে ছয় দফা কর্মসূচি আইয়ুব সরকারের প্রতি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দেয়। এর অভিঘাত ছিল অত্যন্ত জোরালাে। এরপর পাকিস্তানের রাজনৈতিক দিগন্ত আর আগের মতাে রইল না।।
ছয় দফা দাবির খসড়া কে লিপিবদ্ধ করেছিলেন, তা আমার প্রত্যক্ষভাবে জানা নেই। তবে বঙ্গবন্ধু নিজেই ছয় দফার মূল সূত্রগুলাের খসড়া তৈরি করেছেন, এমনটাই সবাই বিশ্বাস করতেন। বলা হতাে, তিনি তাজউদ্দীনকে মূল বিষয়গুলাে সাজিয়ে দফা হিসেবে লেখার জন্য নির্দেশ দেন। পরে এক জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তাকে দিয়ে এর ইংরেজি অনুবাদ করানাে হয়, যিনি বঙ্গবন্ধুর খুবই নিকটজন ছিলেন এবং প্রথমে আগরতলা মামলার একজন। আসামি ও পরে ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ সরকারের মুখ্য সচিব পদে অধিষ্ঠিত হন।
ছয় দফার যে মূল দাবিগুলাে অর্থনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল, তা নিম্নরূপ। কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে শুধু প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতিবিষয় দুটি থাকবে। বাকি সব বিষয়ের দায়িত্ব প্রদেশের ওপর বর্তাবে। ছয় দফার মূল সূত্রগুলাে নিম্নরূপ : (ক) দুই অঞ্চলের জন্য পৃথক কিন্তু সহজে পরিবর্তনযােগ্য মুদ্রা চালু থাকবে; অথবা (খ) একই মুদ্রা প্রচলিত থাকবে কিন্তু দুই অঞ্চলের জন্য দুটি পৃথক ব্যাংক ব্যবস্থা চালু করা হবে, তাদের রাজস্ব ও আর্থিক নীতি ভিন্ন হবে এবং সংবিধানে পূর্ব থেকে পশ্চিমে পুঁজি পাচারের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হবে; (গ) কর ও রাজস্ব আদায়ের ভার থাকবে প্রদেশের ওপর এবং কেন্দ্র তার এক অংশ পাবে, যা আয়কর থেকে দায় হিসেবে কেন্দ্রের খরচ চালানাের জন্য দেওয়া হবে; (ঘ) প্রতি প্রদেশের অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা সেই প্রদেশেই ব্যয় করা হবে এবং কেন্দ্রের চাহিদা মেটাতে দুই প্রদেশই সমান অথবা নির্দিষ্ট অনুপাতে অর্থ প্রদান করবে; (ঙ) দেশীয় পণ্য দুই অঞ্চলেই শুল্ক ছাড়া বিক্রি হবে এবং এক প্রদেশ থেকে অন্য প্রদেশে তার যাওয়ার সুযােগ থাকবে; (চ) বিদেশের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক এবং ব্যবসায়িক চুক্তি করার স্বাধীনতা থাকবে প্রদেশের এবং এ জন্য তারা স্বতন্ত্র বাণিজ্য মিশন স্থাপন করতে পারবে। পরে এর সঙ্গে যুক্ত করা হয়, প্রতিটি অঞ্চল অন্য রাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ও ঋণবিষয়ক আলােচনা করতে পররাষ্ট্রনীতির কাঠামাে মেনে নেবে, যাতে কেন্দ্রীয় নীতির বিচ্যুতি না ঘটে।
ছয় দফা দাবির অন্তর্ভুক্ত কয়েকটি মৌলিক বিষয়ে অতীত ইতিহাস আছে। ১৯৪৬ সালে ব্রিটিশ সরকার ভারতের স্বাধীনতার পরিপ্রেক্ষিতে কেবিনেট মিশন পরিকল্পনা পেশ করে। এ পরিকল্পনা অনুসারে প্রতিরক্ষা, বিদেশনীতি এবং যােগাযােগব্যবস্থা কেন্দ্রীয় সরকারের জন্য রাখা হয়। পূর্ব পাকিস্তানের ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের ২১ দফাতেও একই কথা বলা হয়েছিল। তাতেও প্রতিরক্ষা, বিদেশনীতি এবং মুদ্রানীতি কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে রাখার কথা বলা হয়। ১৯৬১ সালে আইয়ুব খানকে দেওয়া স্মারকপত্রেও এই বিষয়গুলাের সারবস্তুর উল্লেখ ছিল। আইয়ুব খান ছয় দফা দাবি প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি আওয়ামী লীগের কর্মীদের বিরুদ্ধে কঠোর দমন-পীড়ন শুরু করেন এবং বঙ্গবন্ধুসহ প্রধান নেতাদের কারাগারে বন্দী করেন।
১৯৬৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বঙ্গবন্ধু আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে রেহাই পাওয়ার পর আমি ছয় দফা কর্মসূচির পক্ষে কাজ করতে শুরু করি। সে সময় পূর্বাঞ্চলের অধিকাংশ মানুষই বুঝতে পেরেছিল, পাকিস্তানের পূর্ব ও পশ্চিম অংশের মধ্যে সম্পর্ক এক অন্ধ গলিতে প্রবেশ করেছে।
গতানুগতিক উপায়ে এর সমাধান নেই। উত্তাল গণ-আন্দোলনই একমাত্র আশার আলাে দেখাতে পারে। এই বিশেষ সময়ে গণ-আন্দোলন গড়ে তােলা এবং তাতে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য যােগ্য রাজনৈতিক নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন বঙ্গবন্ধু। পূর্বাঞ্চলের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণের এই আন্দোলনে জনতাকে উদ্দীপ্ত করতে তাঁর যােগ্যতাই ছিল সর্বাধিক।
ছয় দফার সঙ্গে আমার সম্পৃক্ততা ১৯৬৯ সালের গােড়ার দিকে আমার এক বন্ধু তৎকালীন পাকিস্তান স্টেট ব্যাংকের গভর্নর এম রশিদের কাছ থেকে আমি একটি বার্তা পাই। সে আমাকে জানায়, বঙ্গবন্ধু যত শিগগির সম্ভব ঢাকায় আমাকে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে বলেছেন। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে এর আগে কখনােই আমার সাক্ষাৎ হয়নি, এমনকি সাক্ষাতের চেষ্টাও করিনি। পাকিস্তানের পূর্ব-পশ্চিম অংশের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিষয়ে আমার কাজ সম্পর্কে আমার বন্ধু রশিদ বিশদভাবে অবগত ছিল। পাকিস্তানের পরপর দুটি অর্থ কমিশন সম্পর্কে আমার যন্ত্রণাদায়ক ও হতাশাব্যঞ্জক অভিজ্ঞতার কথা সে জানত। আমার সন্দেহ যে রশিদই সম্ভবত আমার সম্পর্কে বঙ্গবন্ধুকে অবহিত করেছিল । আমি রশিদের কাছে এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সে বলে যে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনৈতিক বিষয় নিয়ে আমার কাজ সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু অবগত আছেন এবং আমি তাকে কীভাবে সাহায্য করতে পারি, সেটা জানার জন্য তিনি নিজে থেকে আমার সঙ্গে দেখা করতে বিশেষ আগ্রহী। আমাদের দুজনেরই বন্ধু এক অবাঙালি ব্যবসায়ীর বাড়িতে আমাদের সাক্ষাতের ব্যবস্থা করা হয়। আমাদের এই বন্ধুটি পাকিস্তান সৃষ্টি হওয়ার পরপরই ঢাকায় চলে আসেন। তিনি পূর্ব পাকিস্তানের স্বার্থ নিয়ে চিন্তাভাবনা করতেন এবং বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাঁর ভালাে জানাশােনা ছিল। সাক্ষাৎকালে বঙ্গবন্ধু আমাকে বােঝালেন যে তিনি বেশ কিছু বিশেষজ্ঞের প্রয়ােজন অনুভব করছেন, যারা তার স্বাধিকারের দাবি ও ছয় দফার প্রতিটি দফাকে জোরালাে ও বিস্তারিতভাবে যুক্তিতর্কের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করবেন এবং এ জন্য প্রয়ােজনীয় তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করবেন। তার ধারণা যে আগামী দিনে পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে কঠিন বােঝাপড়া করতে হবে। তিনি আরও বললেন যে আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারের অর্থনৈতিক নীতিমালা রচনা ও সেসবের বিস্তারিত ব্যাখ্যা দান করার জন্য তাঁর যে টিম
রয়েছে, আমি যেন একজন সদস্য হিসেবে তাতে যােগ দিই। আমি তাঁর আহ্বানে সাধ্যমতাে সহযােগিতার আশ্বাস দিই।
১৯৭০ সালের নির্বাচনের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ছিল ছয় দফা কর্মসূচির ভিত্তিতে সংবিধানের খসড়া তৈরি করা। এর জন্য বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে যে রাজনৈতিক স্টিয়ারিং গ্রুপ বা পরিচালনা কমিটি গঠিত হয়, তাতে ছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, খােন্দকার মােশতাক, কামারুজ্জামান, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ও কামাল হােসেন। সংবিধানের খসড়া তৈরি করার দায়িত্ব ছিল কামাল হােসেনের ওপর। আর পেশাজীবী বিশেষজ্ঞ দলে ছিলেন মােজাফফর আহমেদ, রেহমান সােবহান, আনিসুর রহমান, খান সরওয়ার মুরশিদ এবং আমি। বঙ্গবন্ধু আলােচনায় সক্রিয় অংশগ্রহণ করতেন। এ ব্যাপারে তার উৎসাহের অন্ত ছিল না। আর আমরাও খসড়া প্রণয়নের সময় তাঁকে তাঁর সব চিন্তাভাবনা স্পষ্ট করে ব্যাখ্যা করতে বলতাম। অন্যান্য রাজনৈতিক নেতার মধ্যে বঙ্গবন্ধুর পর তাজউদ্দীন ছিলেন এ ব্যাপারে সবচেয়ে কর্মতৎপর ও উৎসাহী একজন আলােচক।
পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের দুই অংশ একটি যুক্তরাষ্ট্রীয় (ফেডারেল) সরকার ব্যবস্থার অধীনে চলছিল। ছয় দফা কর্মসূচি সেই ব্যবস্থার আওতায় প্রচলিত অর্থে কেবল পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের দাবি ছিল না। ছয় দফা। কর্মসূচির বিস্তারিত বিশ্লেষণ করলে বােঝা যায় যে এটা যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের দাবি থেকে মৌলিকভাবেই ভিন্ন ছিল। এই কর্মসূচিতে বলা হয়েছিল যে শুধু প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতির বিষয়গুলাে যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকারের আওতায় থাকবে। কিন্তু বৈদেশিক বাণিজ্যের শুল্ক ও নিয়ন্ত্রণ; মুদ্রা, ব্যাংকিং নীতি ও প্রতিষ্ঠান; আর্থিক নীতি (রাজস্ব, সরকারি ব্যয়সহ) এবং বৈদেশিক লেনদেনের বিষয়গুলাে থাকবে প্রতিটি অঞ্চলের নিজস্ব নিয়ন্ত্রণে। একক মুদ্রা থাকলেও এক অঞ্চল থেকে আরেক অঞ্চলে মুদ্রা বা সম্পদ পাচার হবে না। এমনকি পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে পরিবহন ও যােগাযােগের মাধ্যমগুলােও সব আঞ্চলিক সরকারগুলাের। অধীনে থাকবে।
এই বর্ণনা থেকে পরিষ্কার যে ছয় দফা কর্মসূচিতে কাস্টমস ইউনিয়ন বা অর্থনৈতিক ইউনিয়নের কথা বলা হয়নি। আমদানি শুল্ক বা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে প্রতিটি অঞ্চলের ভিন্ন ভিন্ন পর্যায় বা হার ও কাঠামাের কথা বলা হয়েছিল । এক অঞ্চল যদি কোনাে বিদেশি পণ্য আমদানি করে, তবে সেই নির্দিষ্ট পণ্য অন্য অঞ্চলে রপ্তানি করতে পারবে না। কিন্তু দুই অঞ্চলের মধ্যে অভ্যন্তরীণ
পণ্যের অবাধ চলাচল থাকতে পারবে । এর কারণ যে অঞ্চলের শুল্কহার কম, সে যদি উচ্চ শুল্কহারসম্পন্ন অঞ্চলে পণ্য রপ্তানি করে, তাহলে উচ্চ শুল্কহারসম্পন্ন অঞ্চলের রাজস্ব ক্ষতি হওয়ার পাশাপাশি তার অভ্যন্তরীণ শিল্পকে যদি কোনাে সুরক্ষা দিয়ে থাকে, তা-ও টিকবে না। এর বাইরেও, উচ্চ শুল্কহারসম্পন্ন অঞ্চল তৃতীয় দেশ থেকে সুলভ মূল্যে পণ্য আমদানি করার মাধ্যমে এক অঞ্চলের অভ্যন্তরীণ পণ্যে অন্য অঞ্চলের প্রবেশাধিকার নষ্ট করে ফেলতে পারে। এ ছাড়া এই ব্যবস্থায় কোনাে অঞ্চল যদি তার নতুন শিল্প খাতকে অন্য অঞ্চলের প্রতিষ্ঠিত শিল্পের সঙ্গে প্রতিযােগিতা থেকে রক্ষা করতে চাইত, তাহলে সে তার শিল্প খাতের উৎপাদনসামগ্রী বা উৎপাদনে ভর্তুকি দিতে পারত। ব্যাপারটা এমন হতাে যে প্রতিটি অঞ্চলই যেন একেকটি স্বাধীন দেশ। এভাবেই প্রতিটি অঞ্চল কার্যকরভাবে তার ইচ্ছেমতাে অর্থনৈতিক যেকোনাে খাতকে অন্য অঞ্চলের প্রবেশাধিকার বা প্রতিযােগিতা থেকে আলাদা করে রাখতে পারত। ছয় দফা কর্মসূচিতে এসব সুযােগের কথা অন্তর্নিহিত ছিল।
অঞ্চলগুলাের মধ্যে লেনদেনের ভারসাম্য উদ্বৃত্ত বা ঘাটতি বৈদেশিক মুদ্রার মাধ্যমেই মেটানাের কথা বলা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল প্রতিটি অঞ্চল বৈদেশিক লেনদেনের মাধ্যমে যা আয় করবে, তা যেন তার নিজের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকে। অন্যথায়, ঘাটতিতে থাকা অঞ্চল যদি একক মুদ্রায় মূল্য পরিশােধ করে, তবে উদ্বৃত্ত অঞ্চল থেকে ঘাটতি অঞ্চলে সম্পদ বা পুঁজির পাচার ঘটবে । ছয় দফায় এ ধরনের সম্পদ পাচারের সম্ভাবনাকে পরিষ্কারভাবে বাতিল করে দেওয়া হয়েছিল।
একইভাবে, যদি একক মুদ্রা থাকে কিন্তু একেক অঞ্চলের মুদ্রানীতি ও সুদের হার বিভিন্ন রকম হয়, তাহলে উচ্চ সুদহার অঞ্চলের বাসিন্দারা নিম্ন সুদহার অঞ্চল থেকে ধার করতে পারবে না। কারণ, এতে নিম্ন সুদহার অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণমূলক সুদ/আর্থিক নীতি নষ্ট হবে। একই সঙ্গে, প্রতিটি অঞ্চল একটি বিস্তৃত লেনদেনের ভারসাম্যের হিসাব বজায় রাখবে এবং তার দেখভাল করবে। এই হিসাবে পণ্য ও সেবা বাণিজ্যের পাশাপাশি সব ধরনের আর্থিক লেনদেনের হিসাব থাকবে। আর্থিক লেনদেনের হিসাবে বৈদেশিক ও আন্ত-অঞ্চল লেনদেনও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। দুই অঞ্চলে একই ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের যদি ভিন্ন ভিন্ন ব্যবসা বা শাখা থাকে, সে ক্ষেত্রেও তা প্রযােজ্য হবে। উপরিউক্ত পরিস্থিতিতে একক মুদ্রা কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়ে। তার মানে শুধু নামেই একক মুদ্রা। অর্থাৎ একক মুদ্রা চালু রাখার কোনাে বাস্তবিক তাৎপর্য থাকবে না। আরেকটি বিষয় থেকেও ব্যাপারটা
পরিষ্কার বােঝা যায়। যদি এমন ঘটে যে একটি অঞ্চলের বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যে ঘাটতি আছে, কিন্তু অন্য অঞ্চলের সে রকম ঘাটতি নেই অথবা উল্টো উদ্ধৃত্ত আছে, তাহলে কী হবে? সে জন্যই প্রতিটি অঞ্চলের আলাদা বিনিময় হার থাকা দরকার। তা না হলে একক মুদ্রার ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে, যেহেতু প্রতিটি অঞ্চলের স্বাধীন বা আলাদা বিনিময় হারের ব্যবস্থা নেই।
ছয় দফা কর্মসূচির আরও দুটি দিক ছিল। এই দিকগুলাে কেন্দ্রীয় সরকারব্যবস্থার দুর্বলতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল এবং এর স্থায়িত্বকে করে তুলেছিল আরও বেশি বিপন্ন। একটা দিক হলাে কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থায়নের ব্যবস্থাবিষয়ক। অন্যটি আঞ্চলিক আধা সামরিক বাহিনী গড়ে তােলার সঙ্গে সম্পর্কিত। কেন্দ্রীয় সরকারের কোনাে স্বাধীন আয়ের উৎস ছিল না। তাকে তাই নির্ভর করতে হতাে দুই অঞ্চলের আর্থিক অনুদানের ওপর। আর এই অনুদান এমন অনুপাতে হওয়ার কথা বলা হয়েছিল যেন। তা পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে সংবিধানে যুক্ত করা হয়। | তবে চুক্তিতে ফাঁক রয়ে গিয়েছিল । যদি পূর্ব পাকিস্তান বলত যে সে এই ব্যবস্থায় থাকবে না এবং যেটুকু অর্থ দেওয়ার কথা সেটা দেবে না, তাহলে কী ঘটত? যদি কোনাে একটি অঞ্চল যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকারব্যবস্থা থেকে বের হয়ে যেতে চাইত, তাহলে দুই অঞ্চলকে একসঙ্গে রাখার জন্য সাংবিধানিক বিধান প্রয়ােগের ক্ষমতা কেন্দ্রীয় সরকারের ছিল না। এই সূত্রে বলা যায় ছয় দফা কর্মসূচির বেশ কিছু বৈশিষ্ট্য ছিল, যেগুলাে তত বেশি পরিষ্কার করে আলােচিত হয়নি। | প্রথমত, কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিষ্ঠান যেমন আইনসভা ও নির্বাহী বিভাগ দুটোতেই জনসংখ্যার ভিত্তিতে আঞ্চলিক প্রতিনিধিত্ব রাখার কথা বলা হয়েছিল। অতএব, কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্ত প্রণয়ন প্রক্রিয়ার কর্তৃত্ব থাকত পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিনিধিদের হাতেই। কারণ, জনসংখ্যার বেশির ভাগ ছিল পূর্ব পাকিস্তানের। এর অর্থ দাঁড়াত এমন যে সশস্ত্র বাহিনীতেও পূর্ব পাকিস্তানের বেশির ভাগ অংশগ্রহণ থাকত। এ ছাড়া সেনাবাহিনীর আকার, গঠন ও শক্তি নির্ধারণ এবং বিশেষ পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনী মােতায়েন করার সিদ্ধান্তের ব্যাপারে কেন্দ্রীয় সরকারকে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিনিধিদের কাছ থেকে সম্মতি নিতে হতাে। এর ফলে যদি এমন পরিস্থিতি দেখা দিত যে পূর্ব পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার থেকে বের হয়ে যেতে চায়, তাহলে তার বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় সরকার সেনাবাহিনী মােতায়েন করতে চাইলে সেটা ঠেকানাে সম্ভব ছিল। দ্বিতীয়ত, বলা ছিল যে পূর্ব পাকিস্তানের নিজস্ব
বেসামরিক সেনা বা আধা সামরিক বাহিনী থাকবে। এই বাহিনীর আকার, গঠন ও শক্তি নির্ধারণের কর্তৃত্ব থাকবে সম্পূর্ণ পূর্ব পাকিস্তানের হাতেই। ফলে পূর্ব পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের যেকোনাে সম্ভাব্য হস্তক্ষেপ ঠেকাতে সক্ষম থাকবে। | ফলে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক বা কৌশলগত—যে দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখা হােক না কেন, ছয় দফা কর্মসূচির প্রস্তাব ছিল মূলত দুটো আলাদা রাষ্ট্রকে নিয়ে একটি দুর্বল সম্মিলিত রাষ্ট্রীয় জোট। এই দুই রাষ্ট্রের মধ্যে প্রস্তাবিত সংযােগ বা সম্পর্ক এতই ভঙ্গুর ছিল যে যেকোনাে অঞ্চল চাইলেই তাতে ছেদ ঘটাতে পারে। | সাধারণ মানুষের কাছে এবং আপাত অর্থে ছয় দফা কর্মসূচি ছিল পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের কর্মসূচি, যার মাধ্যমে পূর্ব বাংলা তার বৈদেশিক বাণিজ্য ও বৈদেশিক আয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারবে। এ ছাড়া সরকারের আয় ও ব্যয়ের ওপরও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারবে। এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে মুদ্রা বা পুঁজির পাচার হবে না। কিন্তু ওপরে বর্ণিত ছয় দফার বিস্তারিত বর্ণনা এবং এর অর্থনৈতিক বিধানগুলাে ছিল অর্থশাস্ত্রের বিষয়। তাই সবার কাছে তা সহজবােধ্য ছিল না। ফলে বিশেষজ্ঞরা ছাড়া অন্যদের বােঝার উপায় ছিল না যে ছয় দফা আসলে স্বাধীনতার পথে বিরাট একটি পদক্ষেপ।
বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন ১৯৭১-পরবর্তী পাকিস্তানের সংবিধানে এই বিষয়গুলাে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। ছয় দফা কর্মসূচির মূল বিষয়গুলাে সম্প্রসারণ করার কাজ তিনি দিয়েছিলেন আমার কিছু সহকর্মী এবং আমাকে। তার কিছু ঘনিষ্ঠ সহযােগীসমেত তিনি ছয় দফা কর্মসূচি বাস্তবায়নে প্রয়ােজনীয় নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা অনুমােদনের কাজে খুবই সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। এই বিষয়গুলাের সঙ্গে তাঁর নিজের যে লক্ষ্য বা আকাঙ্ক্ষা ছিল, সেটা মিলে গিয়েছিল। সেই উদ্দেশ্য ছিল, সহজেই ভেঙে দেওয়া যায় এমন একটি প্রায় স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহের সম্মিলিত জোট বা সংঘ তৈরি করা।
অন্যদিকে পাকিস্তানের সামরিক ও বেসামরিক নেতৃত্ব তাদের বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় শুরু থেকেই ভালােভাবে বুঝতে পেরেছিল এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের অর্থ কী। তারা বুঝতে পেরেছিল এর ফলে নামেই কেবল পাকিস্তান এক দেশ থাকবে। কিন্তু বাস্তবে পূর্ব বাংলার স্বাধীনতার পথে এটা হবে একটা বিরাট পদক্ষেপ। সে জন্যই বঙ্গবন্ধু ১৯৬৬ সালে যখন ছয় দফা কর্মসূচি ঘােষণা করেছিলেন, তখন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট
আইয়ুব খান ঘােষণা করেছিলেন যে তিনি ছয় দফা বা সিক্স পয়েন্ট দাবির মােকাবিলা করবেন ওয়ান পয়েন্টের মাধ্যমে। সেটা হবে গান পয়েন্ট। তখন থেকেই পূর্ব পাকিস্তানকে দমনের ব্যাপারে পাকিস্তানের নেতারা মনস্থির করে রেখেছিলেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের পর পূর্ব পাকিস্তানে অভিযানের লক্ষ্যে তারা সামরিক প্রস্তুতি শুরু করেন, যা ১৯৭১ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত চলে। রাজনৈতিক সমঝােতার জন্য আলােচনার আড়ালে তারা আসলে তাদের সামরিক প্রস্তুতি নিতে থাকেন।
১৯৭০ সালের নভেম্বর থেকে ১৯৭১ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত সময়ের মধ্যে বঙ্গবন্ধু ও তার ঊর্ধ্বতন সহকর্মীদের তত্ত্বাবধানে বিশেষজ্ঞদের কাজ গােপনে শেষ করে ফেলার কথা ছিল । আলােচনার স্থান বারবার পরিবর্তন। করা হয়। আশা করা হয়েছিল যে পাকিস্তানের গােয়েন্দা সংস্থা এই গােপন সংবিধান তৈরির কাজটি সম্পর্কে জানতে পারবে না। সংসদ অধিবেশন শুরুর সঙ্গে সঙ্গে বঙ্গবন্ধু ছয় দফা অন্তর্ভুক্ত করে খসড়া সংবিধানের প্রস্তাব উপস্থাপন করবেন, এভাবে পূর্বাঞ্চল সংসদের নেতৃত্ব নিজেদের হাতে রাখবে। আর পশ্চিমাঞ্চলকে শুধু বিতর্ক এবং প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার সুযােগ। দেওয়া হবে। পূর্বাঞ্চলের সংখ্যাধিক্যের বলে সংবিধানটিকে সংসদে গ্রহণ বা অনুমােদন করানাের আগাম পরিকল্পনা করে রাখা হয়েছিল।
এ সময় আমাদের আলােচনায় কারও কারও মনে হয়েছে যে আমরা যেভাবে ছয় দফা ব্যাখ্যা করছি এবং এর যুক্তিসংগত পরিণতি হিসেবে যা ভাবছি, তার সঙ্গে খােন্দকার মােশতাক একমত নন। তিনি যেসব প্রশ্ন করতেন এবং যেসব বিষয়ের ব্যাখ্যা দাবি করতেন, তা আমাদের মধ্যে সন্দেহ জাগাত। আলােচনার একপর্যায়ে আমার মধ্যেই প্রশ্ন জাগে যে পরিচালনা কমিটির সবাই ছয় দফা দাবি পুরােপুরি বুঝতে পেরেছেন কি না এবং এর ফলে কেন্দ্রীয় সরকার যে একেবারে দুর্বল এবং খুবই সীমিত ক্ষমতার অধিকারী হবে, সেটি সঠিক অনুধাবন করতে পেরেছেন কি না। আমরা তাঁদের ছয় দফা বাস্তবায়নের সুদূরপ্রসারী ফলাফলের বিষয়ে অবগত করানাের জন্য প্রচুর পরিশ্রম করি। যখন আমাদের অনুশীলন শেষ হলাে, তখন জানা গেল যে ইতিমধ্যে তারা সবাই বিষয়টি সম্পর্কে ভালােভাবে অবগত হতে এবং তা উপলব্ধি করতে পেরেছেন। বঙ্গবন্ধু সবার আগে এবং খুব দ্রুত বিষয়টি বুঝতে পারেন। এর কারণ এই যে তিনি এ বিষয়ে অন্যদের চেয়ে বেশি ভেবেছেন এবং বেশি সময় ব্যয় করেছেন। বিশেষজ্ঞদের হাতে ছয় দফার সংক্ষিপ্ত বিস্তারিত হওয়ার পর অবশেষে যে রূপ লাভ করে, তা নিয়ে বঙ্গবন্ধু সন্তুষ্ট ছিলেন। পাকিস্তানের সঙ্গে অত্যন্ত
শিথিল এবং সীমিত সম্পর্ক রক্ষার তাঁর যে মূল উদ্দেশ্য, তার সঙ্গে এই পরিকল্পনা সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। পরিচালনা কমিটির অন্য সব সদস্য এ বিষয়ে বঙ্গবন্ধুর অনুগামী হতে রাজি ছিলেন। তাঁর ওপর তাদের পূর্ণ আস্থা ছিল। একমাত্র ব্যতিক্রম ছিলেন মােশতাক। আমাদের কয়েকজনের কাছে মনে হয়েছিল মােশতাক যেন বিষয়টির সঙ্গে নিজেকে পুরােপুরি মেলাতে পারছেন না। | ১৯৭১ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারির দিকে পাকিস্তানের লাহােরে একটি পত্রিকায় ছয় দফার মূল বিষয়গুলাে ছাপা হলে আমরা সবাই অবাক হই। খসড়ার অনুলিপির সংখ্যা নির্দিষ্ট ছিল এবং গােপনীয়তা বজায় রাখার জন্য হাতে গােনা কয়েকজনকে এটি সরবরাহ করা হয়। সব অনুলিপি কামাল হােসেনের তত্ত্বাবধানে থাকত। পরিচালনা কমিটির সদস্য রাজনীতিবিদেরা এই অনুলিপি শুধু নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ধার নিতে পারতেন। সবচেয়ে ঘন ঘন ধার নিতেন মােশতাক এবং যে সময় ছয় দফার বিস্তারিত বিষয়গুলাে ফাঁস হয়ে যায়, তখন মােশতাকের কাছে এর একটি অনুলিপি ছিল । আমাদের কেউ কেউ তাকে সন্দেহ করি।।
কিন্তু এ বিষয়ে কেউ নিশ্চিত ছিলাম না। তবে মােটামুটি ধারণা করি যে মােশতাকের মারফতই এটি বাইরে প্রকাশিত হয়েছে। আমাদের গ্রুপের একজন সদস্য, যার সঙ্গে পশ্চিম পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যমের লােকজনের ঘনিষ্ঠতা ছিল, তিনিই প্রথম সেখানকার সংবাদপত্রে ছয় দফা প্রকাশ হয়ে যাওয়ার কথা জানতে পারেন। আমরা ছয় দফার এই অগ্রিম প্রকাশে খুবই অখুশি হই। কেননা, পশ্চিম পাকিস্তান ছয় দফা প্রস্তাবের পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা আগেই জেনে যাওয়ার ফলে তারা সংঘবদ্ধ হয়ে বিরােধিতা করবে এবং তারা নিজেদের জবাব তৈরি করতে সক্ষম হবে। বঙ্গবন্ধু কর্তৃক সংসদে প্রস্তাব তােলার আগেই পশ্চিম পাকিস্তান সেটাকে ঠেকানাের পরিকল্পনা করার সুযােগ পাবে। কামাল হােসেন, রেহমান সােবহান ও আমি এ ব্যাপারে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। তাঁর কাছে অভিযােগ করি যে তার কোনাে সহযােগী সম্ভবত এই অনিষ্ট সাধন করেছেন। তিনি বিষয়টিকে রাজনৈতিক জীবনের ঝুঁকি হিসেবে গ্রহণ করলেন এবং আমাদের আশ্বাস দেন যে তিনি বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন। এভাবেই সে বিষয়টির পরিসমাপ্তি ঘটে।
আওয়ামী লীগের সব সদস্য ছয় দফা কর্মসূচির বিস্তারিত জেনে এর পক্ষে তাদের দৃঢ় অবস্থান বজায় রাখতে পারবেন কি না, সে বিষয়ে বঙ্গবন্ধু নিশ্চিত ছিলেন না। সংসদে যখন এ বিষয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে বিতর্ক
উঠবে, তখন তারা হয়তাে পিছপা হবেন, দোটানায় ভুগবেন। পশ্চিমের সংসদ সদস্যরাও নিঃসন্দেহে পূর্বের সংসদ সদস্যদের কাউকে কাউকে লােভ অথবা ভয় দেখিয়ে তাদের পক্ষে টানার জন্য চেষ্টা করবেন। সেই প্রতিপত্তি ও ক্ষমতা তাদের ছিল। এরই মধ্যে ১৯৭১ সালের ৩ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের নির্বাচনী বিজয় উপলক্ষে ঢাকায় বিশাল এক গণসমাবেশের আয়ােজন করা হয়। সেখানে সমবেত বিশাল জনতার সামনে সংসদ সদস্যদের দিয়ে এ মর্মে শপথবাক্য পাঠ করানাে হলাে যে ছয় দফা ও পূর্ব বাংলার অন্যান্য দাবি আদায় করার জন্য পূর্ব বাংলার মানুষ তাঁদের যে দায়িত্ব দিয়েছে, সে ব্যাপারে তারা জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করবেন ।
বঙ্গবন্ধু তার স্বভাবজাত অনুভূতি ও প্রজ্ঞার বলে জনগণের মনের প্রকৃত অবস্থা বুঝতে পেরেছিলেন। ১৯৬৬ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা সামরিক জান্তার হাতে অত্যাচারিত হয়েছেন। বঙ্গবন্ধুসহ অন্যান্য জাতীয় নেতা ও কর্মী জেলে আটক ছিলেন। দলটি এ। সময়ে দিকনির্দেশনাহীন হয়ে পড়ে। তাঁকে সেই দলীয় কাঠামাে পুনরায় গড়ে তুলতে হয়। দলকে অল্প সময়ের মধ্যে পুনর্গঠনের দায়িত্ব নিতে হয় এবং দলীয় নিয়মানুবর্তিতা ফিরিয়ে আনতে হয়। ১৯৭০ সাল নাগাদ দলের সদস্যসংখ্যা প্রচুর বৃদ্ধি পায়। এই নতুন সদস্যরা পাকিস্তান আমলের নিষ্পেষণের শিকার হননি। সাংসদদের অধিকাংশই ছিলেন নতুন। ছয় দফা সম্পর্কে তাদের বিস্তারিত জ্ঞান এবং এই দাবির প্রতি তাদের অঙ্গীকার সম্পর্কেও স্বচ্ছ ধারণা পাওয়া সম্ভব ছিল না। সাংসদদের জন্য খুব একটা খুশির বিষয় না হওয়া সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধু গণশপথের মাধ্যমে দলের প্রতি তাদের অবিচল আনুগত্য রক্ষার প্রতিশ্রুতি আদায় এবং তাদের সম্ভাব্য দলত্যাগের ঝুঁকি কমিয়ে আনার উদ্যোগ নিলেন।
সভায় গণশপথ নেওয়ার দিন রাতে আমি নবনির্বাচিত দুই সংসদ সদস্যের সঙ্গে একটা ডিনার পার্টিতে ছিলাম। তাদের একজন ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত আর্মি কর্নেল। বুঝতে পারলাম তারা ছয় দফা দাবির অন্তর্নিহিত বিষয় সম্পর্কে পুরােপুরি জ্ঞাত নন। ওপরের বর্ণনা থেকে বােঝা যাবে যে বিশেষজ্ঞ নন, এমন লােকের কাছে ছয় দফার বিষয়গুলাে পুরােপুরি ব্যাখ্যা করা না হলে তাদের পক্ষে তা বুঝতে পারা বেশ কঠিন হওয়াই স্বাভাবিক। তারা মােটামুটিভাবে জানতেন যে ছয় দফার বাস্তবায়ন হলে পূর্বাঞ্চল নিজস্ব সম্পদ ব্যবহারের ও নিয়ন্ত্রণের সুযােগ পাবে। অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বিনিময় খাত এই উভয় ক্ষেত্রে পূর্বাঞ্চলের জন্য অধিকতর সুযােগ তৈরি
হবে। ফলে পূর্বাঞ্চলের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন ঘটবে এবং অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়নের ক্ষমতাও বৃদ্ধি পাবে। এমনকি পূর্ব থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে যে সম্পদের পাচার ঘটত, তা বন্ধ হবে—এত দূরও বুঝতেন। কিন্তু তাঁরা বুঝতে পারেননি যে ছয় দফার বাস্তবায়ন হলে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের সম্পর্ক কতটা সীমিত ও শিথিল হয়ে পড়বে এবং এ কারণে পশ্চিম পাকিস্তান এই ছয় দফার কতটা বিরুদ্ধাচরণ করবে। তারা বুঝে উঠতে পারেননি যে এটি পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য সম্পদ ও ক্ষমতার ক্ষেত্রে কত বড় ত্যাগ বা ক্ষতির কারণ হবে। এ অবস্থায় পশ্চিম পাকিস্তান হয়তাে ছয় দফা মেনে নেওয়ার চেয়ে পাকিস্তানের বিভক্তিই মেনে নেবে। কথাচ্ছলে বুঝতে পারলাম যে এই দুই নব্য সংসদ সদস্য গণশপথের বিষয়েও অসন্তুষ্ট। সাংসদদের সঙ্গে স্কুলবালকের মতাে আচরণ তারা মেনে নিতে পারেননি। পূর্ব পাকিস্তানের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে বিশ্বাস ভঙ্গ করলে জনরােষের শিকার হবেন বলে প্রকাশ্য জনসমাবেশে বঙ্গবন্ধুর ঘােষণাটিকে তারা মেনে নিয়েছিলেন।
পরিচালনা কমিটির সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর মাঝেমধ্যে বিস্তারিত আলােচনা হতাে, তাতে ছয় দফার ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা রকম অনুমাননির্ভর মতামত দেওয়া হতাে। বঙ্গবন্ধু সব সময়ই বলতেন যে তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে চান না। যদি ছয় দফা আদায় করা যায়, তবে পূর্ব পাকিস্তান শাসন। করার দায়িত্ব পূর্ব পাকিস্তানের ওপরই পড়বে। তেমন হলে তিনি নজরুল ইসলাম অথবা তাজউদ্দীন আহমদকে কেন্দ্রে পাঠাবেন। যদি ছয় দফা আদায় করা সম্ভব না হয়, তাহলে তার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়া অর্থহীন। কেননা, তখন তিনি পূর্ব পাকিস্তানের স্বার্থে তাঁর প্রকৃত ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারবেন না। পশ্চিম পাকিস্তান তাদের রাজনীতিবিদ, আমলাতন্ত্র এবং সেনাবাহিনীর সহায়তা নিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে দাঁড়াবে অথবা তাকে নিষ্ক্রিয় করে রাখবে। আগেও যখনই পূর্ব পাকিস্তানের কোনাে নেতা প্রধানমন্ত্রীর পদে আসীন হয়েছেন, তখন এমনটাই ঘটেছে। এ ছাড়া পূর্বাঞ্চলের সদস্যরাও অতীতে ঐক্য টিকিয়ে রাখতে পারেননি। বিগত দুই দশকের রাজনৈতিক ইতিহাসই তার প্রমাণ। ছয় দফার মূল বক্তব্য ছিল অতীতের সাংবিধানিক ব্যবস্থা নাকচ করা। বঙ্গবন্ধু পুরােনাে ব্যবস্থার পুনরাবৃত্তিতে বিশ্বাসী ছিলেন না।
১. তত দিনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত।
হয়েছেন। এই দলটিই আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের সংগ্রামে নেতৃত্ব দিচ্ছিল। বঙ্গবন্ধু পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকার আদায়ে সবচেয়ে
সাহসী, উচ্চকণ্ঠ এবং প্রধান মুখপাত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। ২. ২১ দফা কর্মসূচির ১৯ নম্বর দফায় আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের একটা পরিষ্কার
রূপরেখা দেওয়া হয়েছিল। এই দফায় বলা হয় : লাহাের প্রস্তাবের ভিত্তিতে পূর্ব বাংলাকে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন ও সার্বভৌম করা হবে এবং দেশরক্ষা, পররাষ্ট্র ও মুদ্রা ব্যতীত আর সমস্ত বিষয় পূর্ব বাংলার সরকারের হাতে আনা হবে এবং দেশরক্ষা বিভাগের স্থলবাহিনীর হেডকোয়ার্টার পশ্চিম পাকিস্তানে ও নৌবাহিনীর হেডকোয়ার্টার পূর্ব পাকিস্তানে স্থাপন করা হবে এবং পূর্ব পাকিস্তানে অস্ত্র নির্মাণের কারখানা নির্মাণ করে পূর্ব পাকিস্তানকে আত্মরক্ষায়
স্বয়ংসম্পূর্ণ করা হবে। আনসার বাহিনীকে সশস্ত্র বাহিনীতে পরিণত করা হবে। ৩. স্বাধীনতার পর তাঁরা সবাই সরকারের মন্ত্রী হয়েছিলেন।
রাষ্ট্র গঠনে বহুবিধ সমস্যা এবং
১৯৭২ সালের শুরুর দিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পান। লন্ডন হয়ে তিনি স্বাধীন বাংলাদেশে আসেন। সে সময়েই তিনি নতুন দেশ গঠনের পথে যেসব সমস্যার সম্মুখীন হবেন, সেগুলাের সমাধান সম্পর্কে ভাবতে থাকেন। ঢাকায় আমি যেন তাঁর সঙ্গে দেখা করি—তেমন একটি বার্তা তিনি আমাকে পাঠানাের ব্যবস্থা করেন। ঢাকায় তার সঙ্গে সাক্ষাতেই তিনি বলেন আমি যেন পরিকল্পনা কমিশন গঠনের ব্যবস্থা করি এবং এই কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান পদের দায়িত্ব গ্রহণ করি । পাকিস্তানের শেষের দিকে যারা তার সঙ্গে অর্থনৈতিক বিষয়ে কাজ করেছিলেন, তাঁদের তিনি এই কমিশনের সদস্য করতে বলেন। সদস্যদের মধ্যে ছিলেন রেহমান সােবহান ও আনিসুর রহমান। মােশারফ হােসেনকে সদস্য করা হয়েছিল; কারণ, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন মুজিবনগর সরকারের পরিকল্পনা বিভাগে তিনি ছিলেন । | স্বাধীনতা-পূর্ববর্তী বাংলাদেশে যেসব অর্থনৈতিক সমস্যা ছিল, সে বিষয়ে এবং সেগুলাে সমাধানের ব্যাপারে তাঁর চিন্তাধারণার বিষয়ে বঙ্গবন্ধু বহু বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়েছিলেন। তঙ্কালীন পূর্ব পাকিস্তানের (বাংলাদেশ) ভবিষ্যৎ বিষয়ে বঙ্গবন্ধুর আশা-আকাঙ্ক্ষার অনেক কিছুই এসব বক্তৃতা-বিবৃতিতে ছিল। তিনি এমন এক দেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন, যেখানে দারিদ্র্য সম্পূর্ণ দূর করতে না পারলেও বহুলাংশে কমিয়ে আনা যাবে, সবার জন্য জীবন ধারণের পক্ষে প্রয়ােজনীয় খাদ্য ও বাসস্থানের ব্যবস্থা থাকবে এবং সবাই সচ্ছল জীবন যাপন করতে পারবে। তিনি ছিলেন সত্যিকারের জননেতা। জনগণের
জীবনের সমস্যা ও সমাধান নিয়ে তিনি চিন্তাভাবনা করতেন। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের দেওয়া ২১ দফা, ১৯৬৯-৭০ সময়ের ১১ দফা এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে মূল আর্থসামাজিক উদ্দেশ্য এবং ভবিষ্যতের বৃহৎ কাঠামাের যে রূপরেখা দেওয়া হয়েছিল, তিনি সেগুলাের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ১৯৭২ সালের শুরুর দিকে তাঁর নেতৃত্বে প্রণীত দেশের সংবিধানেও ভবিষ্যৎ আর্থসামাজিক দৃশ্যকল্প বিস্তৃত করা হয়েছিল। পাশাপাশি সেসব উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও নীতির কথাও বিবৃত ছিল সংবিধানে ।
পরিকল্পনা কমিশনের সামনে যেসব কাজ ছিল। ওপরের নির্দেশিকার আলােকে আমাদের সামনে দুটি কাজ ছিল : একটা ছিল ধ্বংস হওয়া অর্থনীতির জন্য ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মসূচি প্রস্তুত করা; দ্বিতীয়টি হলাে দেশের মধ্যমেয়াদি উন্নয়নের জন্য পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করা। নিম্নলিখিত বর্ণনা থেকে বােঝা যায় যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের আর্থিক অবস্থা কী রকম ছিল। ও ১৯৭২-৭৩ সালে যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের জাতীয় আয় (জিডিপি) ১৯৬৯
৭০ সালের তুলনায় ১৫ শতাংশ কমে গিয়েছিল। অর্থাৎ ১৯৭২-৭৩ সালের মূল্যের পরিমাপে ১৯৬৯-৭০ সালের ৫২০০ কোটি টাকার জাতীয় আয়ের সঙ্গে ১৯৭২-৭৩ সালের ৪৫০০ কোটি টাকার জাতীয় আয় তুলনা করলে এটাই দাঁড়ায়। বড় শিল্পকারখানার উৎপাদনক্ষমতার ৩ শতাংশ সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। ১৯৬৯-৭০ সালের তুলনায় ১৯৭২-৭৩ সালে শ্রমিকপ্রতি উৎপাদন পাটশিল্পে ৪৩ শতাংশ, সুতা ও বয়নশিল্পে ৬৩ শতাংশ, কাগজশিল্পে ৪২ শতাংশ, ইস্পাতশিল্পে ১৬ শতাংশ হ্রাস পেয়েছিল । যুদ্ধ শেষে ১৯৬৯-৭০ সালের তুলনায় বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং ব্যবহার
যথাক্রমে ৪৬ ও ৪৭ শতাংশে নেমে আসে। # গুদামজাত দ্রব্যাদি, যন্ত্রাংশ, রাসায়নিক দ্রব্য, আসবাব ও স্থাপনার বিপুল
ক্ষয়ক্ষতি, বিদ্যুৎ সরবরাহে বিশৃঙখলা—এসবের কারণে উৎপাদনক্ষমতার দ্রুত পুনরুদ্ধার সম্ভব ছিল না। ও উৎপাদন দ্রব্যাদির সরবরাহ বাড়ানাে সম্ভব ছিল না মূলত দুই
কারণে—বৈদেশিক মুদ্রার অভাব ও ধ্বংসপ্রাপ্ত যানবাহন এবং যােগাযােগব্যবস্থা। যেসব সম্পদ অক্ষত অবস্থায় পাওয়া গেছে,
সেগুলােকেও অপর্যাপ্ত বৈদেশিক সাহায্য, পরিবহন সমস্যা, যানবাহনের অভাব এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত রাস্তাঘাটের কারণে সঠিকভাবে কাজে লাগানাে সম্ভবপর হয়ে উঠছিল না। স্থল, জল ও রেলপথ—সবই ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিল। ৩০০-এর মতাে ছােট-বড় রেলসেতু, সিগন্যালিং ও যােগাযােগব্যবস্থা ধ্বংস হয়েছিল। সে কারণে প্রধান রেলপথের পাশাপাশি তার শাখাপ্রশাখাও বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ছিল। বন্দরগুলাে আংশিকভাবে বিধ্বস্ত হয়েছিল, ভাসমান বিস্ফোরক ও জাহাজের ধ্বংসাবশেষের দ্বারা পথ রুদ্ধ। হওয়ার কারণে তা ব্যবহারযােগ্য ছিল না। ১৯৭২ সালের মাঝামাঝির আগে ভাসমান বিস্ফোরক সরিয়ে এবং প্রয়ােজনীয় মেরামত সম্পন্ন করে চট্টগ্রাম ও চালনা বন্দরকে সম্পূর্ণ ব্যবহারযােগ্য করা সম্ভব হয়নি। এ কারণে কাঁচামাল ও অন্যান্য উৎপাদন দ্রব্যাদির আমদানি খুব সীমিত ছিল।
ভৌত অবকাঠামাে ধ্বংসের সঙ্গে সঙ্গে জনসংখ্যার বিপুল স্থানচ্যুতি ঘটেছিল। ১৯৭১ সালে ভারতে আশ্রিত বাংলাদেশি শরণার্থীর সংখ্যা ছিল প্রায় ১ কোটি। জনসংখ্যার এই পরিমাণ স্থানচ্যুতি পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। শরণার্থী ছাড়াও দেশের মধ্যেই অজস্র মানুষ স্থানচ্যুত হয়ে পড়েছিল। ১৯৭২ সাল থেকে তাদেরও পুনর্বাসন দরকার হয়ে পড়ে। শ্রমিক পুনর্বাসন ও সরবরাহের সমস্যাবলি অর্থনৈতিক কার্যক্রমের পুনরুদ্ধার ব্যাহত করে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগে শুধু খাদ্যশস্যই ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, তার সঙ্গে পাট চাষও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ১৯৭৩-৭৪ সালে পাট রপ্তানি করে ২৯৮ কোটি টাকা আয় হয়েছিল, যেখানে ১৯৬৯-৭০ সালে আয় হয়েছিল ৩৬৯ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা। অর্থাৎ পাট রপ্তানি থেকে আয় ২০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছিল । ১৯৭২-৭৩ ও ১৯৭৩-৭৪ আর্থিক বছর দুটোয় এত বেশি খাদ্যশস্য আমদানি করা হয়েছিল, যা বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতির পরিপ্রেক্ষিতে কৃষি ও শিল্প উৎপাদন দ্রব্যাদির আমদানি ব্যাহত করে। ১৯৭৩-৭৪ আর্থিক বছরে মােট ৭৩২ কোটি টাকার খাদ্যশস্য আমদানি করা হয়, যদিও তা প্রয়ােজনের তুলনায় অনেক কম ছিল।
১৯৭২ সালের শুরুর দিকেই অর্থনীতির পুনর্বাসনের বার্ষিক পরিকল্পনা সম্পন্ন হয়েছিল। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পথে বাধাগুলাে চিহ্নিত করা এবং সেগুলাে অপসারণে সাহায্য করা এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের অগ্রগতি নিরূপণ করার কাজে যুক্ত ছিল পরিকল্পনা কমিশন। এই কাজে পরিকল্পনা কমিশন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং বৈদেশিক সাহায্য বিষয়ে জাতিসংঘের ঢাকায় নিযুক্ত সমন্বয়কারীর সহযােগিতা নিয়েছিল। দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল
পঞ্চবার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন করা। ১৯৭৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে এই কাজ সম্পন্ন হয়েছিল। এখানে খাতভিত্তিক ও প্রবৃদ্ধির সামগ্রিক লক্ষ্যগুলাের পাশাপাশি সম্পদ সংগ্রহের কৌশল দেওয়া ছিল। এগুলাের বাস্তবায়নে প্রতিষ্ঠান, নীতিসহ যেসব কর্মসূচি ও প্রকল্প প্রয়ােজন ছিল, সেগুলােও অন্তর্ভুক্ত ছিল পঞ্চবার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনায়।
১৯৭২ সালের শুরুতেই বঙ্গবন্ধু প্রথম যে কাজটি করলেন, তা হলাে শিল্পের জাতীয়করণ। কারণ, এটা তার এবং তার দল আওয়ামী লীগের দলীয় প্রতিশ্রুতির অংশ ছিল। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা এবং ১৯৬৯ সালের এগারাে দফার সময় থেকেই এই প্রতিশ্রুতি ছিল। ষাটের দশকজুড়ে তার দলের এবং দেশের অন্যান্য অংশের বিবৃতি এবং ঘােষণায় অসংখ্যবার বলা হয়েছিল যে ভবিষ্যতে দেশের অর্থনীতি কিছু পরিবারের হাতে থাকবে না। এই পরিপ্রেক্ষিতে স্মরণ করা দরকার, পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়ন অথবা বাণিজ্য ও শিল্প বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের অন্যান্য বিশ্লেষণ বা সুপারিশের আগেই শিল্পের জাতীয়করণ করা হয়েছিল। যদিও জনমনে এমন একধরনের ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যে জাতীয়করণের নীতি নেওয়া হয়েছিল পরিকল্পনা কমিশনের পরামর্শ অনুযায়ী । ১৯৭২-৭৫ এবং পরবর্তীকালে প্রায়ই আমি এ রকম একটি ভুল ধারণা মানুষকে সাধারণভাবে পােষণ করতে দেখেছি।।
জাতীয়করণ করার কাজটি দ্রুত করার পেছনে কারণ ছিল । ১৯৭২ সালের শুরুর দিকে বাংলাদেশের শিল্পসম্পদের একটি বড় অংশ ছিল পাকিস্তানিদের পরিত্যক্ত সম্পত্তি। এসব সম্পদ সরকারি খাতে অন্তর্ভুক্ত করার ব্যাপারে দেশব্যাপী ঐকমত্য ছিল। এসব শিল্পের মালিকানার কাঠামাে এবং ব্যবস্থাপনার বিষয়ে অতিসত্বর সিদ্ধান্ত নিতে হতাে। তা ছাড়া বেশ কিছু বড় আকারের শিল্প আগেই সরকারি খাতভুক্ত ছিল। উদাহরণ হিসেবে পূর্ব পাকিস্তান শিল্প উন্নয়ন করপােরেশনের কথা বলা যায়। অতএব, সিদ্ধান্ত নিতে হতাে মােট শিল্পসম্পদের যে ২৫ শতাংশ বাংলাদেশি মালিকদের মালিকানায় ছিল, সে বিষয়ে। | স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ের প্রেক্ষাপটে ব্যক্তিগত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলাে। জাতীয়করণ করার ঐতিহাসিক প্রতিশ্রুতি আরও জোরদার হয়। এ ক্ষেত্রে ছাত্রলীগের সিরাজুল আলম খান প্রমুখ বাম মনােভাবাপন্ন ছাত্রনেতাদের এবং দেশের মধ্যে সাধারণ জনগণের প্রত্যাশার ভূমিকা ছিল। যদিও শিল্পমালিক এবং উচ্চাভিলাষী সম্ভাব্য উদ্যোক্তা শ্রেণি এই সিদ্ধান্ত পছন্দ করেনি। তবে বাকি জনগােষ্ঠীর কাছে জাতীয়করণ করার সিদ্ধান্ত তত দিন পর্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। গণমাধ্যমের প্রতিবেদন এবং দেশের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের বিবৃতি
থেকে তার প্রমাণ পাওয়া যায়। এই কাজের জনপ্রিয়তার প্রমাণ পাওয়া যায়। আরেকটি ঘটনা থেকে। যখন জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে পঁচাত্তর-পরবর্তী সামরিক সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে, তিনিও এসব শিল্পকে ব্যক্তি খাতে ছেড়ে দেননি। যদিও দেশের সংবিধান ও শাসনব্যবস্থায় খুব দ্রুতই বড় পরিবর্তন তিনি এনেছিলেন। জিয়াউর রহমান ব্যক্তি খাতের নতুন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য শিল্প খাত উন্মুক্ত করেছিলেন। জাতীয়করণ করা শিল্প খাতে ব্যক্তিগত বিনিয়ােগের সীমা বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু ইতিমধ্যে যেসব শিল্প জাতীয়করণ করা হয়েছিল, সেগুলােয় তিনি হাত দেননি। চাইলে সেটা করা খুব সহজ ছিল তাঁর জন্য। এটা শুধু একটা নির্বাহী আদেশের ব্যাপার ছিল। সম্ভবত তিনি হিসাব-নিকাশ করে দেখেন যে এ রকম ব্যাপক জনপ্রিয় একটি নীতি উল্টে দেওয়া থেকে তিনি যে রাজনৈতিক সুবিধা আদায় করতে পারবেন, তা বিশেষ ফল বয়ে আনবে না বা তা দিয়ে তার পােষাবে না।
যাহােক, বঙ্গবন্ধুর তরফ থেকে জাতীয়করণ নীতির বিস্তারিত ঘােষণা আসার পর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলাের সঙ্গে মিলে পরিকল্পনা কমিশনের দায়িত্ব ছিল এই নীতি বাস্তবায়নে সাহায্য করা। ব্যক্তিগত শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলাের জন্য বিনিয়ােগের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণের ব্যাপারে পরামর্শের ক্ষেত্রে মন্ত্রিপরিষদ উপকমিটির সদস্য হিসেবে পরিকল্পনা কমিশন কাজ করছিল। সিদ্ধান্ত ছিল এই ব্যক্তিগত বিনিয়ােগের সীমা সময়মতাে সংশােধন করা হবে। বস্তুত পরের বছরই এই সীমা বর্ধিত করা হয়। এই সময়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল বিভিন্ন জাতীয়করণ করা শিল্পের প্রশাসনিক এবং ব্যবস্থাগত শাসনকাঠামাে নির্ধারণ করা।
পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং তার প্রয়ােগে সমস্যা পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়ন যতই এগিয়ে যাচ্ছিল, সমস্যা ও প্রতিবন্ধকতাও হাজির হচ্ছিল। সে সময়ের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এসব সমস্যা অপ্রত্যাশিত ছিল না। বঙ্গবন্ধুর সামনে তখন এটা ছিল এক বিরাট দায়িত্ব বা কর্তব্য। কারণ, তিনি যে সরকারের উত্তরসূরি হয়েছিলেন, তা ছিল একটি প্রাদেশিক সরকার। সে সরকারকে অল্প সময়ে জাতীয় সরকারে পরিণত করতে হবে। কাজটা মােটেও সহজসাধ্য ছিল না। তা ছাড়া প্রাদেশিক সরকারের কাজ ছিল খুব সীমিত। জাতীয় সরকার চালানাের বা দরকার হলে নতুন মন্ত্রণালয় ও সংস্থা সৃষ্টি করে সেগুলাে পরিচালনার মতাে জ্ঞান বা অভিজ্ঞতা কোনােটাই এই প্রাদেশিক সরকারের নেতা, মন্ত্রী ও কর্মকর্তাদের
ছিল না। এমনকি একটি জাতীয় বা কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা কমিশন কীভাবে কাজ করে, সে ব্যাপারেও তাদের কোনাে ধারণা বা অভিজ্ঞতা ছিল না। পরিকল্পনা কমিশনের দায়িত্ব ছিল এগুলাের সমন্বয় করা। এক মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প বা বিনিয়ােগ নীতি অন্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত থাকে। পরিকল্পনা। কমিশনের দায়িত্ব ছিল প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের নীতি ও প্রকল্প ওই পারস্পরিক সম্পর্কের আলােকে বিচার করে দেশের সার্বিক বিনিয়ােগ ও নীতির সঙ্গে তাদের মিল আছে কি না, সেটা দেখা। এর বাইরে অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের কর্মসূচি ও নীতিগুলাের মূল্যায়নও কমিশনকে করতে হতাে। পরিকল্পনা কমিশনের এসব কাজের গুরুত্ব ছিল অনেক। বৈদেশিক সাহায্যের ওপর বাংলাদেশের পরম নির্ভরতার সেই দিনগুলােয় পরিকল্পনা কমিশনের কাজ ছিল এসব সাহায্য-সংক্রান্ত আলােচনা চালিয়ে নেওয়া। দাতাদের জন্যও এগুলাে প্রয়ােজনীয় ছিল। যদিও অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের কাছে কমিশনের এই কাজ মনে হতাে অন্যায় হস্তক্ষেপ বা খবরদারি। তাদের অসন্তুষ্টির আরও কারণ ছিল। এসব দায়িত্ব পালন করার জন্য সরকারের বাইরে থেকে আমাদের মতাে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নিয়ে আসা হয়েছিল, যাদের কিনা সরকার পরিচালনা বা প্রশাসনের কোনাে অভিজ্ঞতাই ছিল না। এই শিক্ষক বা বিশেষজ্ঞরা নির্বাচিত মন্ত্রী ছিলেন না। ফলে নিজেদের নির্বাচনী এলাকার জন্য কর্মসূচি বা নীতি প্রণয়নের কোনাে দায়বদ্ধতা তাদের ছিল না। আবার তারা আমলাও ছিলেন না।
ফলে মন্ত্রীদের কাছেও তাঁরা দায়বদ্ধ ছিলেন না। শুধু প্রধানমন্ত্রীর কাছে তাঁরা জবাবদিহি করতেন। ফলে মনে হতাে তারা ছিলেন বাইরের লােক, যারা মন্ত্রী ও আমলাদের প্রথাগত কাজে বাধা দিচ্ছেন ও হস্তক্ষেপ করছেন। ভারত ও পাকিস্তানের পরিকল্পনা কমিশনের ভূমিকা, কার্যাবলি এবং গঠনপ্রক্রিয়া মােটাদাগে এ রকমই ছিল। সেখানেও বাইরে থেকে শিক্ষক বা বিশেষজ্ঞদের নিয়ে আসা হতাে। কিন্তু এ বিষয়টি আমাদের মন্ত্রী ও আমলাদের জানা ছিল না।
এ অবস্থায় পরিকল্পনা কমিশন এবং সরকারের বাকি অংশের মধ্যে টানাপােড়েন বা রেষারেষির আশঙ্কা ছিল প্রচুর। আমরা তাদের জানাতাম যে বঙ্গবন্ধুর তরফ থেকে এবং তাঁর নির্দেশেই আমরা আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য করে যাচ্ছি। এর ফলে আমরা মন্ত্রী ও আমলাদের মােটেও প্রিয়ভাজন ছিলাম না। পরিকল্পনা কমিশনের অন্য সদস্যরা এবং আমি হয়তাে এই টানাপােড়েন কিছুটা প্রশমন করতে পারতাম যদি আমাদের ব্যক্তিগত সম্পর্কের বা যােগাযােগের উন্নতির চেষ্টা করতাম। সে জন্য দরকার ছিল
বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্থাপন এবং পৃথক আলােচনার মাধ্যমে বিভিন্ন সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করা। সব মন্ত্রণালয় সব বিষয়ে। একমত ছিল না। তাদের মধ্যে বিভিন্ন নীতি ও প্রকল্প নিয়ে মতবিরােধ হতাে। আমরা এক মন্ত্রণালয়কে অন্য মন্ত্রণালয়ের সম্মতি আদায়ের ব্যাপারে সাহায্য করতে পারতাম। এভাবে আমরা আমাদের গ্রহণযােগ্যতা বাড়াতে পারতাম। সরকারের বাকি অংশে আমাদের অনুরূপ দায়িত্বে যারা ছিলেন, তাঁদের সঙ্গে সন্তোষজনক সম্পর্ক স্থাপন করে আমাদের গ্রহণযােগ্যতা বাড়ানাে সম্ভব ছিল।
পরিকল্পনা কমিশন থেকে বিদায় নেওয়ার চিন্তাভাবনা ১৯৭৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ চূড়ান্ত হয়। এরপর আমি এবং আমার সহকর্মীরা একমত হই যে পরিকল্পনা কমিশনে আমরা আমাদের কাজে সাফল্য অর্জন করতে পারছি না। ফলে আমরা সন্তুষ্ট হতে পারছিলাম না। এর জন্য অংশত দায়ী ছিল ওপরে বর্ণিত বিভিন্ন কারণে অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আমাদের কাজের ক্ষেত্রে সন্তোষজনক সম্পর্কের অভাব। তা ছাড়া মন্ত্রিপরিষদে গৃহীত হওয়ার জন্য আমাদের অনেক নীতিবিষয়ক প্রস্তাব নিয়ে আমরা সংশ্লিষ্ট অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যেমন দ্বিপক্ষীয় আলােচনা করে তাদের সহযােগিতা অর্জন করতে পারিনি, তেমনি তারা সেগুলাে সমর্থনও করত না। এর অংশত কারণ ছিল আমাদের নির্দেশিত নীতি বা কর্মসূচি গৃহীত হওয়ার জন্য তদবির করা অথবা প্রস্তাব চূড়ান্ত করার আগে অন্যদের সঙ্গে সে সম্পর্কে আলােচনার ব্যাপারে। আমাদের অদক্ষতা বা অপারগতা।
| দেশের উন্নয়নের জন্য জরুরি ভিত্তিতে যা দরকার ছিল, সে বিষয়ে। রাজনীতিবিদ এবং সরকারি কর্মকর্তারা অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও ধ্যানধারণার সঙ্গে পুরােপুরি একমত পােষণ করতেন না। আমাদের এ রকম মনে হচ্ছিল যে আমাদের প্রচেষ্টা বা কাজকর্ম বেশি ফলপ্রসূ হচ্ছে না। তবু আমরা মনে করতাম আমরা স্বাধীনতার আগে একটি নতুন রাষ্ট্রের কল্পনা করেছিলাম, সেই রাষ্ট্র গঠনে যত দিন আমরা কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারি, তত দিন পরিকল্পনা কমিশনে কাজ চালিয়ে যাব। অতীতে ১৯৫০-এর দশকে পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে জনসমক্ষে এবং বিভিন্ন কমিটিতে পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে তাদের অর্থনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে অনেক তর্কবিতর্ক করেছি। ষাটের দশকের শেষ ভাগে ছয় দফা কর্মসূচি বাস্তবায়নে বঙ্গবন্ধুকে পরামর্শ
দেওয়ার ক্ষেত্রে আমরা বিশেষভাবে নিযুক্ত ছিলাম। সেই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই আমরা মনে করলাম যে আমাদের প্রধান কাজ হলাে একটি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করা। সেই পরিকল্পনায় আমরা বঙ্গবন্ধু এবং তাঁর রাজনৈতিক দলের ধ্যানধারণা বা আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানাের চেষ্টা করব।
এই সূত্রে একটা কথা বলা দরকার। এই পরিকল্পনা প্রকাশ করে গণমাধ্যমে, অর্থাৎ সংবাদপত্র ইত্যাদিতে প্রচার করা হয়নি। সমাজের বিভিন্ন অংশ যেমন ব্যবসায়ী মহল, কৃষক-শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধি, সাধারণ নাগরিক বা শিক্ষিত সম্প্রদায় পরিকল্পনা সম্পর্কে বিশেষ অবগত ছিল না। | এমনকি সংসদে যেখানে সমাজের বিভিন্ন অংশের প্রতিনিধিরা ছিলেন, তারাও পরিকল্পনা কমিশন নিয়ে আলােচনা করার সুযােগ পাননি। আমি বঙ্গবন্ধুকে প্রস্তাব দিয়েছিলাম যে পরিকল্পনার ব্যাপারে জনগণ ও সমাজের বিভিন্ন দল বা অংশকে আলােচনার সুযােগ দেওয়া হােক। তিনি বলেছিলেন, এতে শুধু সময় নষ্ট হবে। পরিকল্পনা প্রণয়নে আমাদের কিছু সাহায্য হবে না। যারা মিটিং বা আলােচনা করবেন, তাদের কাছ থেকে গ্রহণযােগ্য প্রস্তাব বা পরামর্শ পাওয়া। যাবে না। আমি বলেছিলাম, আমাদের উচিত সমাজের বিভিন্ন অংশের কাছে। পরিকল্পনার বিষয়বস্তুগুলাে ভালাে করে ব্যাখ্যা করা বা তাদের বুঝিয়ে বলা । এভাবে বিভিন্ন প্রস্তাব বা প্রকল্পের পক্ষে জনমত সৃষ্টি করা অথবা অন্তত তা ব্যাখ্যা করে বােঝানাে। তিনি আমার এই প্রস্তাবের কোনাে প্রয়ােজনীয়তা অনুভব করেননি এবং তাতে রাজি হননি। পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা নিয়ে যদিও মন্ত্রিসভায় বিস্তৃত আলােচনা হয়েছিল।
সার্বিক অর্থনৈতিক কাঠামাে ও নীতিগুলাের বিষয়ে বিস্তারিত আলােচনা ছাড়াও প্রতিটি মন্ত্রণালয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় যেসব বিনিয়ােগের কথা বলা ছিল, সেখানে তাদের প্রাপ্য অংশ এবং সংশ্লিষ্ট নীতি সম্পর্কে আলােচনা করেছিল। বহুদিন পর এ সম্পর্কে একটা কথা মনে পড়ে। ১৯৯৬ সালে যখন আওয়ামী লীগ পুনরায় সরকার গঠন করে, তখন আবদুস সামাদ আজাদ মন্ত্রিসভার একজন সদস্য ছিলেন। আমি তখন প্রবাসে। তিনি এক নৈশভােজে কয়েকজন অতিথির সামনে আমাকে উদ্দেশ করে বললেন, “প্রফেসর নুরুল ইসলাম সাহেব ১৯৭১ সালে একটা ডকুমেন্ট বা বই লিখেছিলেন। তা ছিল পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা। এটা মনােযােগ দিয়ে কেউ পড়ে নাই।’ তিনি হাস্যচ্ছলে কথাটা বললেও তাঁর কথা সত্য ছিল। এ ব্যাপারে আমার মনে কোনাে সন্দেহ ছিল না।
আগেই বলা হয়েছে যে পরিকল্পনা সমাপ্ত করার পর আমরা বিদায় নেওয়ার চিন্তা করছিলাম। পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রস্তুত হয়ে যাওয়ার পর
আমরা চিন্তা করেছিলাম যে এবার নতুন পেশাদার এবং উপযুক্ত অর্থনীতিবিদ ও অভিজ্ঞ আমলাদের ওপর এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার নির্দেশিকা ও অগ্রাধিকার অনুসরণ করে তাঁরা আন্তমন্ত্রণালয় পরামর্শ এবং বিচার-বিবেচনা ও আলােচনার মাধ্যমে প্রকল্প, কর্মসূচি ও নীতি প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নের দায়িত্ব নিতে পারতেন। মােটকথা, সেই পরিস্থিতিতে আমাদের মনে হয়নি যে পরিকল্পনা কমিশনের সঙ্গে আমাদের সক্রিয় ভূমিকার বা কোনাে বিশেষ সম্পৃক্ততার দরকার আছে। ব্যক্তিগতভাবে বা পেশাগতভাবে সে রকম সম্পৃক্ততা আমাদের জন্য সন্তোষজনকও ছিল না।
কমিশনের সদস্যদের নিয়ে আমি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করে এই প্রস্তাব পেশ করি। তবে, আমরা তাকে আশ্বস্ত করেছিলাম যে যদি কোনাে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে বা বিষয়ে আমাদের সাহায্য দরকার পড়ে, তাহলে আমরা তাঁকে অনানুষ্ঠানিকভাবে পরামর্শ দিতে সব সময় প্রস্তুত থাকব; কিন্তু কমিশনের সদস্য বা সরকারের কর্মকর্তা হিসেবে নয়। তিনি জানতেন যে সত্যিই অতীতে তাঁর যখনই প্রয়ােজন হয়েছে, আমরা বিনা দ্বিধায় ও ক্লান্তিহীনভাবে তাঁকে সাহায্য করেছি। এ অবস্থায় গবেষণা ও শিক্ষকতা পেশায় আমাদের ফিরে যেতে দেওয়া উচিত। কারণ, এটাই ছিল আমাদের স্বনির্বাচিত পেশা বা জীবনের উদ্দেশ্য ।।
বঙ্গবন্ধু আমাদের আপত্তি বা অস্বস্তির ব্যাপারটা সম্পূর্ণ বুঝতে পারলেন না। বা স্বীকার করলেন না। তিনি আমাদের আপত্তিও শুনতে চাইলেন না। তিনি খুবই অনড় ছিলেন। তিনি জোর দিয়ে বললেন যে আমরা কোনােভাবেই কমিশন থেকে বিদায় নিতে পারব না। তার যুক্তি ছিল, মাত্রই পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা সম্পন্ন করার কাজ আমরা সমাপ্ত করেছি। স্বাধীনতার আগেই তার নেতৃত্বে যে বাংলাদেশের চিন্তাভাবনা ও আশা-আকাঙ্ক্ষা ছিল, তা বাস্তবায়নের কাজ মাত্র শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারও মাত্রই ভালােভাবে সংগঠিত হতে শুরু করেছে। এ অবস্থায় আমাদের পরিকল্পনা কমিশন ছেড়ে যাওয়া ঠিক হবে না। তার নেতৃত্বের প্রতি ছিল আমাদের অগাধ শ্রদ্ধা। তার সঙ্গে আন্তরিক এই আলােচনার পর আমরা তার সিদ্ধান্তের প্রতি সম্মান জানিয়ে পরিকল্পনা কমিশনে আমাদের কাজ চালিয়ে যাই।
| ১৯৭৩ সালের নির্বাচনের আগে তিনি মন্ত্রিপরিষদ, দলের সদস্য ও সংসদ সদস্যদের সঙ্গে আলােচনা করেন কীভাবে কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যানের পদটিকে শক্তিশালী করা যায়। আমার সঙ্গে তিনি পরিকল্পনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যানের ভূমিকার কার্যকারিতার বিষয়টি নিয়ে আলােচনা করেন।
কীভাবে সরকারের সব স্তরে এই পদের গ্রহণযােগ্যতা বাড়ানাে ও শক্তিশালী করা যায়, সে ব্যাপারে তিনি চিন্তা করেছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন ডেপুটি চেয়ারম্যানেরও অন্য মন্ত্রীদের মতাে নির্বাচিত সংসদ সদস্য হওয়া উচিত। তাহলে আমি সংসদে এবং বাইরে পরিকল্পনা ও অর্থনৈতিক নীতি নিয়ে আলােচনা এবং ব্যাখ্যা করতে পারব। তখন সবাই সব ব্যাপারে জাতীয় পর্যায়ে নীতি ও পরিকল্পনার গুরুত্ব বুঝতে পারবে। সবার দৃষ্টিতে আমি অন্যান্য মন্ত্রীর মতাে রাজনীতিবিদ হিসেবে স্বীকৃত হব। আমি তাঁকে বুঝিয়ে বললাম যে তাঁর উদ্দেশ্য বা আশা আমি পূরণ করতে পারব না। রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার মানসিকতা এবং উৎসাহ বা প্রবণতা কোনােটাই আমার নেই। এ কথা শুনে তিনি কিছুটা হতাশ হলেন। তবে আমার যুক্তি বুঝতে পারলেন । তখনকার মতাে সে বিষয়ে তিনি আর কিছু বলেননি।
আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সংকট এবং দেশে দুর্ভিক্ষ ১৯৭৩ সালের শেষের দিকে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সংকট শুরু হলাে। বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর এই সংকটের গুরুতর প্রভাব পড়ে। খাদ্য ও জ্বালানির দাম বিশ্ববাজারে বেড়ে যাওয়ায় পৃথিবীজুড়ে ব্যাপক হারে মুদ্রাস্ফীতি দেখা দেয়। বড় আকারে বাজেট ঘাটতি এবং তার ফলে প্রচুর মুদ্রাস্ফীতি হওয়ার কারণে অভ্যন্তরীণ বাজারে জিনিসপত্রের দাম অনেক বেড়ে যায়। সঙ্গে ব্যালান্স অব পেমেন্ট বা আন্তর্জাতিক লেনদেনের ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং সংকটও দেখা দেয়। এদিকে বিশ্বব্যাপী মুদ্রাস্ফীতি আরও প্রকট হয়ে ওঠে। পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় দ্রব্যমূল্য ও প্রবৃদ্ধির মতাে বিষয়ে যেসব সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রক্ষেপণ ও প্রাক্কলন দেওয়া হয়েছিল, তার সবই প্রাসঙ্গিকতা হারায়। বিদ্যমান এই সামষ্টিক অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেই ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ শুরু হয়। ১৯৭২ ও ১৯৭৩ সালে পরপর দুই বছর ফসলহানি ঘটায় কৃষক ও ব্যবসায়ীদের মজুত গুরুতরভাবে কমে যায়। ১৯৭৪ সালে তারা বাধ্য হয়ে তাঁদের পরিবারের প্রয়ােজনে সর্বনিম্ন মজুত পুনরায় সংরক্ষণ করা শুরু করেন। ১৯৭৪ সালে আবারও ফসলহানি ঘটায় তাদের মধ্যে ভবিষ্যৎ খাদ্যসংকটের ব্যাপারে ভীতি আরও বেড়ে যায়। ফলে ভবিষ্যতের জন্য মজুত করার প্রবণতাও বৃদ্ধি পায়। কৃষক ও ব্যবসায়ীদের উদ্বৃত্ত শস্য থেকে কিছু বাধ্যতামূলক খাদ্য আহরণের চেষ্টা করা হয়েছিল। এর ফলে ভবিষ্যতে ঘাটতির ভয়ে মজুতের প্রবণতা আরও বেড়ে যায়। ফলে উদ্বৃত্ত খাদ্য যেটুকু ছিল, তা আহরণের চেষ্টা সফল হয়নি। তবে যদি এই চেষ্টা সফলও হতাে, তবু সরকারি বিতরণ সামান্যই বৃদ্ধি পেত।
সরকারের কাছে এ অবস্থায় একটিমাত্র শেষ উপায় ছিল। আর তা হলাে কোনােভাবে জনমত গঠন করে মজুতের বিরুদ্ধে জনগণকে সংগঠিত করা। কৃষক এবং এমনকি ব্যবসায়ী ও মজুতকারীদেরও সমর্থন জোগাড় করা ও তাদের উদ্বুদ্ধ করা, যেন তারা জাতীয় সংকটের মুখে মজুত না করেন এবং উৎপাদিত ফসল বাজারে বিক্রি করেন বা ছেড়ে দেন। এ রকম আহ্বানে জনগণের সাড়া পাওয়ার জন্য সরকারের ওপর জনগণের ব্যাপক আস্থার প্রয়ােজন ছিল। এ রকম এক সময়ে আমি চিন্তাভাবনা করে নিজেই উদ্যোগী হয়ে বঙ্গবন্ধুর কাছে একটি প্রস্তাব নিয়ে গেলাম। জানালাম যে আমার মনে হয়, এখনাে জনগণের কাছে তাঁর জনপ্রিয়তা আছে। তার ওপর মানুষের প্রচুর বিশ্বাস আছে এবং তাঁর নেতৃত্বেরও যথেষ্ট গ্রহণযােগ্যতা আছে। সে জন্য তাঁর এ রকম আহ্বানে জনগণ সাড়া দেবে। আমি বললাম তিনি যেন নিজে দেশের বিভিন্ন এলাকায় যান এবং সব ব্যবসায়ী, মজুতকারী এবং কৃষকদের প্রতি খাদ্যশস্য মজুত না রাখার আবেদন করেন। হয় তারা বাজারে এসব খাদ্য বিক্রি করুক, অথবা সরকারি খাদ্য আহরণ সংস্থাগুলাের। কাছে তাদের মজুত ছেড়ে দিক, যেন তাদের মজুত করা খাদ্যশস্যে বৃহত্তর জনগণ উপকৃত হয়। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে তাঁর রাজনৈতিক সহকর্মীদেরও জনমত গঠন এবং সম্মিলিত এই প্রচেষ্টায় অংশগ্রহণ করা উচিত বলে মত দিই। আর যা-ই হােক, দেশের সব মানুষ জানে তিনিই পুরাে জাতিকে স্বাধীনতার লড়াইয়ে ও তার জন্য বিপুল ত্যাগ স্বীকারে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। যদিও বিদ্যমান খাদ্যসংকট স্বাধীনতার লড়াইয়ের সঙ্গে পুরােপুরি তুলনীয় নয়, তবু দেশের জনগণের ন্যূনতম খাদ্যের অভাব বা দুর্ভিক্ষ এক বিরাট সংকট। আর এই সংকট মােকাবিলা করার জন্য তাকে সর্বাত্মক চেষ্টা করতে হবে। তাই জনগণকে উদ্বুদ্ধ করার এই কাজে তাঁর নিজেকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য প্রস্তাব করি। | বহুদিন পর আমি আমার এই প্রস্তাব সম্পর্কে যখন চিন্তা করি, মনে হয় আমি সত্যিই রাজনীতিতে কত অনভিজ্ঞ বা অর্বাচীন ছিলাম। সর্বজনের স্বার্থের খাতিরে কিংবা জরিমানা বা হুমকি দিয়ে এই ধরনের ব্যক্তিস্বার্থপরতা বা নিজের ব্যক্তিগত প্রয়ােজন বিসর্জন করানাে অথবা লাভজনক মজুত করার প্রবণতা রােধ করতে পারে না। এ রকম উদাহরণ অত্যন্ত বিরল। উদ্দীপ্ত স্থানীয় নেতা-কর্মী এবং জনপ্রিয় সংগঠনগুলাের মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ে জনগণকে ব্যাপক আকারে উদ্বুদ্ধ করতে পারলে হয়তাে এই ধরনের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হতাে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ইতিহাসে এ রকম উদাহরণ আছে কি , আমার জানা নেই। সংগঠন বা অনুপ্রেরণার দিক থেকে বাংলাদেশের
আর্থসামাজিক বা রাজনৈতিক পরিস্থিতি যে রকম চলছিল, সেখানে এ রকম প্রচেষ্টা সফল হওয়ার সম্ভাবনা বিরল।
আমার স্পষ্ট মনে আছে, আমি এ রকম এক প্রস্তাব নিয়ে ১৯৭৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে বঙ্গবন্ধুর অফিসে একা হাজির হই। সেদিন ছিল প্রচণ্ড বৃষ্টি। বঙ্গবন্ধু খুবই চিন্তিত এবং বিষগ্ন ছিলেন। স্পষ্টতই বােঝা যাচ্ছিল যে তিনি ছিলেন প্রচণ্ড উদ্বিগ্ন। তিনি ঘরের ভেতরই একবার চেয়ারে উঠছিলেন, আবার বসছিলেন। হঠাৎ আমার দিকে তাকিয়ে ভারাক্রান্ত কণ্ঠে স্বগতােক্তির মতাে করে বলে উঠলেন, “আপনি বাংলাদেশের মানুষকে চিনেন না। বহু বছর ধরে আমি তাদের সঙ্গে থেকেছি, কাজ করেছি। সেটা সব স্তরের মানুষের সঙ্গেই। আমি এদের খুব ভালাে করেই চিনি। এরা ক্ষমা করে না । যদি আপনি একবার ভুল করেন বা ব্যর্থ হন, তাহলে আপনার সারা জীবন তাদের জন্য যা করেছেন, তা বৃথা হয়ে যাবে। আমি বুঝতে পারছিলাম, যে অসাধ্য আমি তাকে সাধন করতে বলেছিলাম, তিনি সেটা করতে পারবেন বলে ভাবেননি। আমি কখনােই বুঝতে পারিনি তিনি কী ভুল করেছেন, যার কথা তিনি উল্লেখ করলেন। কয়েকটা কথার পরই আমি দুঃখিত হয়ে বিষন্ন মনে বিদায় নিলাম।
এ অবস্থায় খাদ্যসংকট এড়ানাের সত্যিকারের কার্যকর নীতি ছিল ভিন্ন। আর তা ছিল উল্লেখযােগ্য পরিমাণে চাল ও গমের মতাে প্রচুর খাদ্য সরবরাহ বাড়িয়ে মুনাফার লােভে খাদ্য মজুতের উৎসাহ কমিয়ে দেওয়া। সরকারি মজুত বাড়ানাে এবং সরকারি বিতরণ ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রচুর পরিমাণে খাদ্য সরবরাহ বাজারে করতে পারলে এই পরিস্থিতি মােকাবিলা সম্ভব হতাে। তাহলে খাদ্য সরবরাহের ব্যাপারে সরকারের নিয়ন্ত্রণ সক্ষমতার ওপর ব্যবসায়ী ও মজুতকারীদের আস্থা ফেরত আসত। এ লক্ষ্যে, খাদ্য সাহায্য সরবরাহের সব সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক দাতা এবং সাহায্যকারীদের কাছে আমরা জোরেশােরে আবেদন করেছিলাম। বিশ্ববাজারে তখন খাদ্যমূল্যের ক্রমাগত ঊর্ধ্বগতি চলছিল। এ পরিস্থিতি ১৯৭৪ সালের বিশ্ব খাদ্যসংকট হিসেবে বহুল পরিচিত। চীন ও রাশিয়া বিশ্ববাজার থেকে প্রচুর পরিমাণে খাদ্য ক্রয় করেছিল। পর্যাপ্ত খাদ্য সহায়তা দেওয়ার মতাে একমাত্র উৎস ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আমাদের সব ধরনের চেষ্টা সত্ত্বেও এ সংকট মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র আমাদের সময়মতাে প্রয়ােজনীয় খাদ্যসহায়তা দিতে অনিচ্ছুক ছিল। ফলে দুর্ভিক্ষ ছিল অনিবার্য পরিণতি।
পরিকল্পনা কমিশন থেকে বিদায়
আগেই বিস্তৃতভাবে বলা হয়েছে যে ১৯৭৪ সালের মধ্যেই পরিকল্পনা কমিশনের কার্যকারিতায় তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন এসেছিল। মন্ত্রণালয়গুলাের মতামত ছিল যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির মাধ্যমে প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে বিনিয়ােগের পরিমাণ স্থির হয়ে যাওয়ার পর প্রতিটি মন্ত্রণালয় বা খাতের অগ্রাধিকার ও নীতিনির্ধারণের একমাত্র জিম্মাদার হবে তারাই। ক্রমশ মন্ত্রণালয়গুলাের যুক্তিই জয়ী হয়। এ অবস্থায় আন্তমন্ত্রণালয় কর্মসূচি ও নীতির সমন্বয় তখন আর পরিকল্পনা কমিশনের দায়িত্ব ছিল না। অন্য কথায় বলতে গেলে, পরিকল্পনা কমিশনের ভূমিকা যথেষ্ট পরিমাণে হ্রাস পেয়েছিল। পরিকল্পনা কমিশনে আমরা তখন এই সিদ্ধান্তে পৌছালাম যে আমাদের দায়িত্ব বা কাজকর্মের বিশেষ প্রয়ােজনীয়তা নেই। তা ছাড়া অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ছিল বেশ খারাপ। | সবচেয়ে উল্লেখযােগ্য ব্যাপার ছিল সরকারের আয় বা সম্পদের স্বল্পতা এবং উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি। ফলে তাৎক্ষণিক স্বল্পমেয়াদি নীতিই প্রাধান্য পাচ্ছিল । কোনাে প্রকল্প বা নীতির দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল নিয়ে ভাবনা দূরে থাক, মধ্যমেয়াদি ফল কী হবে, সে ব্যাপারেও কোনাে ভাবনাচিন্তা ছিল না। এর পরিবর্তে উপস্থিতবুদ্ধিতে তাৎক্ষণিকভাবে সমস্যার সমাধানের যা প্রয়ােজন, সেই রকম পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছিল। আর তা নির্ধারিত হতাে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং এর সঙ্গে জড়িত অর্থনৈতিক স্বার্থগােষ্ঠীর প্রয়ােজন বা চাপের দ্বারা। একই সঙ্গে, এটাও স্মরণ করা দরকার যে সে সময় সরকার বহুবিধ রাজনৈতিক সমস্যা মােকাবিলা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে অত্যন্ত ব্যতিব্যস্ত ছিল। রাজনৈতিক নেতৃত্ব, বিশেষ করে বঙ্গবন্ধুকে প্রচুর সময় ব্যয় করতে হতাে কীভাবে রাজনৈতিক অস্থিরতা বা সমস্যার সমাধান করা যায়, তা নিয়ে।
১৯৭৪ সালের দ্বিতীয় ভাগে পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য হিসেবে এ কে এম আহসানকে নিয়ােগ দেন বঙ্গবন্ধু। পাকিস্তানের শেষ বছর তিনি পাকিস্তান সরকারের কৃষিসচিব ছিলেন। তিনি বঙ্গবন্ধুর সুপরিচিত ছিলেন। স্বাধীনতার পর এ রকম অভিজ্ঞ আমলাদের পাকিস্তান থেকে প্রত্যাবর্তনের ব্যাপারে বঙ্গবন্ধু উদগ্রীব হয়ে থাকতেন। বঙ্গবন্ধুর আশা ছিল, তারা ফিরে এলে নতুন দেশ চালানাের সমস্যাগুলাে তিনি ভালােভাবে মােকাবিলা করতে পারবেন । তাঁর এ রকম উপলব্ধির পেছনে কারণও ছিল। আমার মনে হয়, মােটের ওপর স্বাধীনতার আগে তিনি যে কজন পাকিস্তানি সরকারি আমলার সঙ্গে পরিচিত
ছিলেন, তাঁরা প্রায় সবাই ছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানের লােক। তাঁরা পূর্ব পাকিস্তানে দায়িত্বরত ছিলেন এবং দক্ষতার জন্য তারা অনেকেই সুপরিচিত ছিলেন। তাঁদের কেউ কেউ সফল জেলা প্রশাসক ছিলেন। তবে শুরুর দিকে প্রতিযােগিতাপূর্ণ পরীক্ষায় কৃতিত্ব অর্জন করেছিলেন, এমন কিছু উচ্চপদাসীন বাঙালি আমলাও ছিলেন। এ কে এম আহসান ছিলেন তাঁদেরই একজন। বঙ্গবন্ধু তাদের কাউকে চিনতেন তাদের সুনামের জন্য আর কেউ কেউ ছিলেন। তার বন্ধু । যেমন শামসুর রহমান ছিলেন তার বন্ধু, যাকে তিনি তৎকালীন সােভিয়েত ইউনিয়নে প্রথম রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়ােগ দেন। তবে প্রশাসন বা নীতিনির্ধারণে তাঁদের প্রকৃত কার্যদক্ষতা সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু অবহিত ছিলেন না। তা ছাড়া পূর্ব পাকিস্তান থেকে তরুণ প্রজন্মের যারা সরকারি আমলা হয়েছিলেন, তাঁদের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ছিল না।।
১৯৭৩ সালের শেষের দিকে বঙ্গবন্ধুর দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে পরিবর্তন দেখা যায়। কারণ, তত দিনে সরকারি আমলাদের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা তাঁর হয়েছে। ইতিমধ্যে আমলাতান্ত্রিক অদক্ষতা, অভিজ্ঞতার অভাব, দীর্ঘসূত্রতা ইত্যাদির মুখােমুখি হয়েছেন তিনি। একটি ঘটনার কথা আমার মনে পড়ে। আমি পরিকল্পনা কমিশনের কোনাে এক কাজে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। গিয়ে দেখি, তিনি স্পষ্টতই বিরক্ত এবং হতাশ। তিনি সেদিন অত্যন্ত ক্রুদ্ধ ছিলেন; কারণ, কিছুদিন আগে তিনি যে নির্দেশ দিয়েছেন, তা সময়মতাে পালন করা হয়নি। এমনকি দক্ষ হিসেবে বিবেচিত আমলাদের দ্বারা গঠিত তাঁর ব্যক্তিগত সচিবেরাও সেই নির্দেশের খোঁজখবর রাখছেন না। আমি সেখানে বসে থাকা অবস্থায় তিনি তাঁদের একজনকে ডেকে পাঠান। তিনি পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসের সাবেক সদস্য ছিলেন। বঙ্গবন্ধু তাঁকে নির্দেশ পালনে বিলম্বের কারণ দ্রুত খুঁজে বের করতে বললেন। সেই কর্মকর্তা যখন ফিরে যাচ্ছিলেন, তখন বঙ্গবন্ধু আমার দিকে ফিরে বললেন :
ছােট লাঠি (ব্যাটন) হাতে শর্টপ্যান্ট পরা আর ইংরেজি বলা (পাকিস্তানি) সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেনদের আদেশ এই আমলারা অবিলম্বে পালন করত। পাঞ্জাবি-পায়জামার মতাে সাধারণ পােশাকের রাজনীতিবিদ, যারা বাংলায় কথা বলে আর মাঝে মাঝে পান চিবােয়, তাদের কথায় এরা মনােযােগ দিতে চায় না। সেনাবাহিনীর সেসব ক্যাপ্টেন আবার ক্ষমতা নিয়ে শাসন করলেই এরা খুশি হবে।
আমি প্রায়ই ভাবি, কী দুর্দান্ত ভবিষ্যদ্বাণীই না তিনি করেছিলেন। এই কথা বলার বছর দুই পরই ১৯৭৫ সালে সামরিক সরকার দেশের শাসন ক্ষমতায়
আসে। পূর্ববর্তী পাকিস্তান সরকারসহ বিশ্বের সব সামরিক সরকারের কাছে আমলারাই ছিল দেশ শাসনের মূল যন্ত্র ।
পরিকল্পনা কমিশনে আনিসুর রহমান ছিলেন তখন খণ্ডকালীন সদস্য। কিছুদিন পর তিনি কমিশনের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা ত্যাগ করেন। অন্য সদস্যরাও স্থির করলেন যে তারা একে একে বিদায় নেবেন। তবে সবাই একসঙ্গে যাবেন না বলে ঠিক করেন। এমনভাবে যেতে হবে যেন সবার বিশেষ নজরে না পড়ে। এ কে এম আহসান যােগদানের কিছুদিন পরই মােশারফ হােসেন চলে যান। তার কিছুদিন পরই রেহমান সােবহান কোনাে রকম দৃষ্টি আকর্ষণ ছাড়াই পরিকল্পনা কমিশন ত্যাগ করেন। আমার ধারণা, বঙ্গবন্ধু বুঝতে পেরেছিলেন যে পরিকল্পনা কমিশনের সদস্যরা চলে যাচ্ছেন, কারণ তারা অসন্তুষ্ট। আগের মতাে তারা কমিশনের কাজে সন্তুষ্ট নন। দেশের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তনের ব্যাপারে তাঁর যে পরিকল্পনা ছিল, সেটা নিয়েই বঙ্গবন্ধু তখন অত্যন্ত ব্যস্ত ছিলেন। সম্ভবত তিনি ভেবেছিলেন যে রাজনৈতিক ব্যবস্থা সম্পূর্ণ পরিবর্তন করার পর অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়নের প্রাতিষ্ঠানিক বিষয়গুলাের দিকে তিনি নজর দেবেন। এ সময়ে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক পরিবর্তনের সে প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে ছিল।
ইতিমধ্যে আমি শারীরিকভাবে সুস্থ বােধ করছিলাম না। সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত টানা কঠোর পরিশ্রম আমার স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলেছিল। এমনকি একদিন আমি অফিসেই কিছুক্ষণের জন্য জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলাম। একজন ডাক্তার সেদিন আমার অফিসে এসে চিকিৎসা দিয়ে গিয়েছিলেন। পরে সেই ডাক্তারের কাছে দ্বিতীয়বার আমার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে গেলে তিনি আমাকে বলেন যে আমার বিশ্রাম ও অবকাশ দরকার। তিনি আমাকে কিছুদিনের জন্য কাজ থেকে বিরতি বা ছুটি নেওয়ার পরামর্শ দেন। বস্তুত আমি বেশ অবসাদ ও ক্লান্তিতে ভুগছিলাম। চিকিৎসকের পরামর্শমতাে আমি বিদেশে যাওয়ার জন্য ছুটির অনুরােধ করি। আমি জানি না বঙ্গবন্ধু আমার মনের অবস্থাও বুঝতে পেরেছিলেন কি না। তিনি ১৯৭৫ সালের জানুয়ারি থেকে আমার জন্য এক বছরের ছুটি মঞ্জুর করেন। আমার মনে হয়েছিল যে তিনি ভেবেছিলেন তার প্রস্তাবিত বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগের (বাকশাল) আওতায় নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থা পরের বছর নাগাদ প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে। তখন তাঁর নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চালানাের জন্য আমাকেসহ যাকে যাকে তার দরকার, তাঁদের তিনি নিয়ে আসবেন।
| ১৯৭৫ সালের মার্চ মাসের ১৯ তারিখে বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে আমি একটি চিঠি পাই। সেখানে তিনি জানান যে তিনি চান আমি যেন যত দ্রুত সম্ভব
আমার আগের দায়িত্বভার পুনরায় গ্রহণ করি। বিদেশে ছুটিতে থাকা অবস্থায় ১৯৭৫ সালের মে মাসের দিকে আমার পরিবারকে নিয়ে যাওয়ার জন্য আমি দেশে আসি। যখন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে যাই, তিনি বলেন যে আমি যেন ফিরে আসি এবং দ্রুত আগের কাজে যােগ দিই। আমি তাঁকে অনুরােধ করে বলি যে বিদেশে আমার গবেষণার কাজ অসমাপ্ত আছে। তা ছাড়া আমার চিকিৎসা তখনাে চলমান। ফলে আমার ফিরতে কিছুদিন বিলম্ব হবে বলে আমি তাকে জানাই। কিন্তু এরপর ১৯৭৫ সালের আগস্ট মাসে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ঘৃণ্য এবং শােকাবহ ঘটনাটি ঘটে। আর তার ফলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে যায়। এরপর আর বাংলাদেশের কোথাও আমি কাজে যােগদানের জন্য ফিরে আসিনি। এই সূত্রে ১৯৭৫ সালের জানুয়ারি মাসের প্রথম দিকে বিদেশে যাওয়ার সময়কালের একটি ঘটনা মনে পড়ে।
তত দিনে বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারের পাশাপাশি একদলীয় শাসনব্যবস্থা চালুর সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন। তাঁর যুক্তি ছিল স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের জন্য প্রণীত সংবিধান অনুযায়ী দেশে যে সংসদীয় গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা চালু ছিল, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তা তার কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলেছে। সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময়ে দেশে যে পরিস্থিতি বিরাজ করছিল, তার সঙ্গে সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সংগতিপূর্ণ নয়। অরাজকতা, আইনশৃঙ্খলার অভাব, চুরি, কালােবাজারি, ক্ষমতার অপব্যবহার—সব মিলে দেশের শাসনব্যবস্থা তখন অচল করে তুলেছিল। এ অবস্থায় বঙ্গবন্ধু মনে করলেন যে শাসনব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনা দরকার। এই বিবেচনা থেকে তিনি একদলীয় সরকার প্রবর্তন এবং সরকারপ্রধানের হাতে সমস্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার সিদ্ধান্ত নেন। যে নতুন দল গঠন করা হবে, সেখানে আমলাতন্ত্র, সেনাবাহিনীসহ সমাজের সব ক্ষেত্রের লােকজনই অন্তর্ভুক্ত থাকবে। শাসনের ক্ষেত্রে দেশে এ দলটিই হবে তার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। পরিকল্পিত এই সংবিধান সংশােধনের বিষয়ে তিনি তাঁর দলের মধ্যে ও মন্ত্রিসভার সহকর্মীদের সঙ্গে হয়তাে আলােচনা করে থাকতে পারেন, কিন্তু আমার সঙ্গে এ প্রসঙ্গে কখনাে কোনাে আলাপ-আলােচনা হয়নি বা আমি এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টও ছিলাম না। এই পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে প্রকাশ্যে না হলেও স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম দিক থেকে সমাজের কিছু লােক বা অংশ দেশের শাসনতন্ত্রে কিছু কিছু পরিবর্তনের ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করেছিল।
উদাহরণস্বরূপ আমার আর একটি ছােট অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। একজন তরুণ সেনা কর্মকর্তা রেঙ্গুনে বাংলাদেশ দূতাবাসে
অ্যাটাশে বা প্রতিরক্ষাসংক্রান্ত চাকরিতে যােগ দেওয়ার আগে আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। আমার এক আত্মীয়ের সঙ্গে তাঁর পরিচয়ের সুবাদে তাঁর উদ্দেশ্য ছিল আমার সঙ্গে কিছু বিষয় নিয়ে আলােচনা করা। তিনি তার আলােচনার বিষয়টিকে জাতীয় উন্নয়নের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করে আমার সঙ্গে এ নিয়ে মতবিনিময় করতে চেয়েছিলেন। সেই সেনা কর্মকর্তা স্বাধীনতাযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। স্বাধীনতা-পরবর্তী সমস্যাগুলাে মােকাবিলা করে দেশটিকে কীভাবে গড়ে তােলা যায়, সে ব্যাপারে তাঁর কিছু নিজস্ব চিন্তাভাবনা ছিল। তাঁর প্রস্তাব ছিল সব কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের জন্য সামরিক প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা। তাঁর ধারণা, এই প্রশিক্ষণ দেওয়া হলে ছাত্ররা দুটি জিনিস অর্জন করবেশৃঙ্খলা ও কর্তৃপক্ষের প্রতি আনুগত্য। বাংলাদেশের জনগণের এ দুটো জিনিসের অভাব রয়েছে, কিন্তু দেশের উন্নয়নের জন্য এ দুটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের প্রশিক্ষণ পাওয়ার পর যখন তরুণ-তরুণীরা তাদের পেশা বা কর্মজীবনে ঢুকবে, তখন তাদের নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা থাকবে। আর একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য যেহেতু তারা সামরিক বাহিনীর সঙ্গে জড়িত থাকবে, তাই দেশের প্রতিরক্ষার প্রয়ােজনেও তাদের কাজে লাগানাে যাবে। এই প্রক্রিয়া সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে রাজনৈতিক ও অন্যান্য সামাজিক শক্তিগুলাের সম্পর্ককে জোরদার করবে। সেনাবাহিনী ও দেশের অন্যান্য জনগােষ্ঠীর মধ্যে যে দূরত্ব আছে, তা-ও দূর হবে।
তিনি ভেবেছিলেন আমি যেহেতু দেশের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত, তাই বাংলাদেশের বিরাজমান পরিস্থিতিতে এই প্রস্তাবের গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারব। তার অনুরােধ হলাে, এই প্রস্তাবের ব্যাপারে যদি আমার সম্মতি থাকে, তাহলে আমার উচিত তা প্রধানমন্ত্রীকে জানানাে। প্রকৃতপক্ষে আমি এই প্রস্তাবকে কখনাে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করে দেখিনি বা প্রধানমন্ত্রীর কাছেও তুলিনি। আমার ধারণা হয়েছিল যে তার প্রস্তাবটি হচ্ছে এমন একটি শাসনব্যবস্থার সূচনা করা, যেখানে সেনাবাহিনীর একটা বড় ভূমিকা থাকবে। পাকিস্তানে সেনাবাহিনীর ভূমিকার যে অভিজ্ঞতা আমাদের হয়েছে, তাতে এ ধরনের প্রস্তাবের ব্যাপারে আমি উৎসাহী ছিলাম না। আমি অবশ্য নিজে শান্তিকালে সেনাবাহিনীকে দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে লাগানাের পক্ষে ছিলাম। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর অল্প সময়ের মধ্যে সামরিক সরকার ক্ষমতা দখল করে নেয়। পরবর্তীকালে সেই সরকারের এক গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়ােগ পেয়েছিলেন সেদিনের রেঙ্গুনে দূতাবাসে যােগ দিতে যাওয়া সেই সেনা কর্মকর্তা। তাঁর নাম নুরুল ইসলাম (শিশু)। তিনি জিয়াউর রহমানের
ক্ষমতাকালে মন্ত্রিসভার একজন সদস্য ছিলেন। আমার সঙ্গে তার আলােচনার কথা স্মরণ করলে এবং পরবর্তী ধারাবাহিক ইতিহাস বিবেচনায় নিলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বহু কর্মকর্তার রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা ও উচ্চাভিলাষের বিষয়টি বােঝা যায়। কিন্তু এর পরে যা ঘটেছে, তাতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। শৃঙ্খলা বা কর্তৃপক্ষের প্রতি আনুগত্যের কোনাে প্রমাণ রাখতে পারেনি।
জনশ্রুতি ছিল, প্রস্তাবিত সংবিধান সংশােধনীর ব্যাপারে বঙ্গবন্ধু বিভিন্ন ব্যক্তি-গােষ্ঠীর কাছ থেকে পরামর্শ পেয়েছিলেন। কিন্তু এ সম্পর্কে আমার প্রত্যক্ষ কোনাে জ্ঞান ছিল না। অনেকে মনে করত যে বঙ্গবন্ধু বিশেষ করে বাংলাদেশের কিছু বামপন্থী রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে আলাপ-আলােচনা করেছেন। হয়তাে তারা পূর্ব ইউরােপের একদলীয় রাষ্ট্র ও পরিকল্পিত সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যাপারে বঙ্গবন্ধুর মনােযােগ আকর্ষণ করেছিলেন। এ ক্ষেত্রে তারা পােল্যান্ড ও যুগােস্লাভিয়ার মতাে দেশের উদাহরণ তুলে ধরে থাকতে পারেন। সাধারণভাবে এই দেশগুলাে সােভিয়েত ব্যবস্থা থেকে তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ধারণাগুলাে নিয়েছিল। তারপর কিছুটা রদবদল করে তাদের দেশে তা কার্যকর করেছে। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা তাদের পুরােনাে অর্থনৈতিক কাঠামাে ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রথার সঙ্গে খাপ খাওয়ানাের জন্য পূর্ব ইউরােপীয় দেশগুলােতে সােভিয়েত ব্যবস্থার কিছু পরিবর্তন প্রয়ােজন ছিল। বঙ্গবন্ধু তাঁর প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বহুমুখী কৃষি সমবায় ও শিল্প ব্যবস্থাপনায় শ্রমিকদের অংশগ্রহণের যে বিষয়গুলাে রেখেছিলেন, তা পূর্ব ইউরােপীয় কয়েকটি দেশের অভিজ্ঞতার সঙ্গে তুলনীয়। এগুলাে সবই আমার ধারণা। এ ব্যাপারে আমি সরাসরি কোনাে খবর পাইনি অথবা বাম দলগুলাের সঙ্গেও আমার কোনাে আলােচনা হয়নি।
‘৭৪ সালের শেষের দিকে প্রস্তাবিত নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থা সম্পর্কে বঙ্গবন্ধুকে আমি জিজ্ঞাসা করার সুযােগ পাই। তখন আমি কুয়েতে তাঁর সফরসঙ্গী ছিলাম। এটাই ছিল তাঁর সঙ্গে আমার শেষ সরকারি বিদেশ সফর। কামাল হােসেনও সফরসঙ্গীদের দলে ছিলেন। আমরা দুজনই তাঁকে একা পাওয়ার সুযােগ নিয়ে বাকশাল গঠনের প্রসঙ্গটি তুললাম। আমরা এ ব্যাপারে আমাদের গভীর হতাশা প্রকাশ করলাম। বললাম, যে নেতা রাজনৈতিক অধিকার ও গণতন্ত্রের জন্য দীর্ঘ সংগ্রাম এবং চরম নির্যাতন ভােগ করেছেন, তিনিই এখন সে পথ থেকে সরে আসছেন। তিনি এতে বিরক্ত হলেন এবং রেগে গেলেন। পরিকল্পনা কমিশনে কাজ শুরু করার পর তিন বছরের মধ্যে আমি প্রথমবারের মতাে বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে এ ধরনের ব্যবহারের সম্মুখীন হলাম। অতীতে বিভিন্ন সময় তাঁকে অনেক অপ্রীতিকর প্রশ্ন করেছি এবং
অনেক কিছুরই সমালােচনা করেছি। তাঁকে কখনাে রাগান্বিত বা বিরক্ত হতে দেখিনি। তিনি সব সময়ই ধৈর্য ধরে শুনতেন এবং বােঝাতে চেষ্টা করতেন। | দেশের অর্থনৈতিক সংকট ও রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা সম্পর্কে তিনি ইতিমধ্যেই জনগণের উদ্দেশে যেসব বক্তব্য দিয়েছেন, তা অনুধাবন করতে আমাদের ব্যর্থতা বা অনাগ্রহ তাকে ক্ষুব্ধ করেছিল। তার মত অনুযায়ী দেশ তখন বহুবিধ সমস্যায় জর্জরিত। পরিস্থিতি যা দাঁড়িয়েছিল, তাতে চরম পদক্ষেপ গ্রহণের কোনাে বিকল্প নেই। এ ব্যাপারে গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করার পর তিনি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, দেশে সে সময় বিরাজমান গভীর সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকট মােকাবিলায় প্রস্তাবিত পদ্ধতিই একমাত্র কার্যকর পথ । তিনি আমাদের এটা স্পষ্ট করেই বললেন যে দেশের বিদ্যমান সমস্যা এবং এর সমাধান সম্পর্কে আমাদের যথাযথ চিন্তাভাবনা নেই।
১৯৭৫ সালের ৮ জানুয়ারি আমার উপরিউক্ত ছুটিতে যাওয়ার আগে আমি তাঁর সঙ্গে বিদায়ী সাক্ষাৎ করেছিলাম। পার্লামেন্টে নতুন সংবিধান (বাকশাল) পাস হওয়ার সামান্য কয়েক দিন আগে আমি তার সঙ্গে দেখা করতে যাই। তখন তাঁকে বেশ বিষন্ন দেখাচ্ছিল। আমি কিছু বিদায়ী কথাবার্তা বলতে শুরু করলাম। তিনি রুমের মধ্যে পায়চারি করছিলেন। এর মধ্যেই রবীন্দ্রনাথের সেই বিখ্যাত গানটি তিনি গেয়ে উঠলেন, ‘যদি তাের ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলাে রে…।’
তিনি বললেন, বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক বিভক্তি এবং অস্থিরতা থেকে মুক্ত করতে তিনি চূড়ান্ত উদ্যোগ নিতে যাচ্ছেন। একটি নতুন ব্যবস্থা চালু করার কাজটি অন্ধকার ঝােড়াে রাতে ঘন ঘন বজ্রপাতের মধ্য দিয়ে একটি গভীর বন অতিক্রম করার সঙ্গে তুলনীয়। এখানে বিপদ আছে, আছে অনিশ্চয়তা। তবে একই সঙ্গে একটি নতুন সকাল ও সূর্যের আলােয় ভরা নতুন গন্তব্যে গিয়ে পৌছানাের আশাও আছে। এই কঠিন যাত্রাকে বেছে নেওয়া ছাড়া তার সামনে আর কোনাে পথ ছিল না।
১৯৭৫ সালের ১৯ জুন অনুষ্ঠিত বাকশালের কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ সরাসরি তুলে দেওয়াই এখানে প্রাসঙ্গিক হবে :
আমি ফেরেশতা নই, শয়তানও নই। আমি মানুষ। আমি ভুল করতে পারি। আমি ভুল করলে সেটা শােধরাতে হবে। আমি যদি শােধরাতে পারি, সেখানেই আমার বাহাদুরি। যদি আমি গোঁ ধরে বসে থাকি যে না আমি যা করেছি সেটাই ভালাে, তাহলে সেটা মানুষের কাজ হলাে না। ফেরেশতা হইনি যে সবকিছু ভালাে হবে।
বিদেশ যাওয়ার প্রাক্কালে কিছু ঘটনা
বিভিন্ন সময়ে অপ্রত্যাশিতভাবে আমি কিছু ঘটনার মুখােমুখি হয়েছি। আবার এমনও কিছু ঘটনা আছে, কোনাে কারণে আমি যেগুলাের উপস্থিত সাক্ষী হয়ে গেছি। এ ঘটনাগুলাে দেশের সে সময়ের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে তুলে ধরে। পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গেও এগুলােকে মেলানাে যায়। এর কিছু কিছু বঙ্গবন্ধু এবং তিনি যে প্রক্রিয়ায় দেশ চালাতেন, তার সঙ্গে সম্পর্কিত। আর কিছু বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও অন্যদের সঙ্গে আমার আলাপ-আলােচনার বিবরণ বা বিশ্লেষণ। আমি দেশের বাইরে চলে যাচ্ছি—এ বিষয়টি যখন সব মহলেই জানাজানি হয়ে গেছে, তখন আমি কিছু অপ্রত্যাশিত সাক্ষাৎ বা পরিস্থিতির মুখােমুখি হই। এর মধ্যে একটি ছিল খােন্দকার মােশতাকের সঙ্গে। এর মাধ্যমে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় পাওয়া যায়। সে সময়ের বিবেচনায় এই আচরণ ছিল অভাবিত ও অপ্রত্যাশিত।
মােশতাকের ষড়যন্ত্রের কথা কি বঙ্গবন্ধু জানতেন?
খােন্দকার মােশতাকের সঙ্গে আমার এক অপ্রত্যাশিত রকমের কথাবার্তার ঘটনা ঘটে ১৯৭৪ সালের শেষের দিকে। আমার চলে যাওয়ার আগে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার শেষ বৈঠকের পরের ঘটনা সেটা। বৈঠক শেষে মােশতাক আমাকে বললেন তার গাড়িতে আমাদের অফিসে ফিরে যেতে। সে সময়ই পথে গাড়িতে এই কথাবার্তা হয়। মন্ত্রিসভার ওই বৈঠকে বঙ্গবন্ধু আনুষ্ঠানিকভাবে জানান যে আমি চিকিৎসার প্রয়ােজনে ছুটিতে যাচ্ছি এবং তিনি আশা করেন যে আমি পুরােপুরি সুস্থ হয়ে আবার ফিরে আসব । আমরা গাড়িতে ওঠামাত্রই মােশতাক আমার প্রতি সমবেদনা জানাতে শুরু করেন। তিনি বলেন, আমি কেন দেশ ছেড়ে যাচ্ছি, তা তিনি বুঝতে পেরেছেন। এ ব্যাপারে আমার তরফ থেকে কোনাে জবাব ছিল না। তিনি আমার ব্যাপারে খুবই সহানুভূতি দেখালেন। জানালেন যে আমার হতাশা তিনি বুঝতে পারছেন।
| খােন্দকার মােশতাকের এসব কথাবার্তা আমার কাছে খুবই বিস্ময়কর মনে হয়েছিল। আমি তার ধারণার বিরােধিতা করে বললাম যে আমি শুরু থেকেই বলেছি যে আমি শুধু বিশ্রাম ও চিকিৎসার প্রয়ােজনে কয়েক মাসের ছুটি নিয়েছি। এর সঙ্গে হতাশার কোনাে সম্পর্ক নেই। আমার এই মন্তব্য মােশতাক পছন্দ করলেন না এবং বেশ হতাশ হন। আমি বুঝতে পারলাম না যে নিরাপত্তারক্ষী ও ড্রাইভারের উপস্থিতিতে মােশতাক কেন এ ধরনের
কথাবার্তা বলতে গেলেন। কিন্তু আমি এটা বুঝতে পারলাম যে তিনি খুবই অসন্তুষ্ট এবং এ অবস্থার কিছু একটা প্রতিকার করার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছেন। আমার ধারণা ছিল, বঙ্গবন্ধু নিশ্চয়ই এত দিনে তার প্রতি মােশতাকের আনুগত্যহীনতার বিষয়টি জেনে গেছেন। খােন্দকার মােশতাকের এসব কথাবার্তার মূল্যায়ন করতে গেলে আগের দুটি ঘটনার কথা স্মরণ করতে হয়। ১৯৭৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে আলােচনার জন্য বঙ্গবন্ধু এক রাষ্ট্রীয় সফরে দিল্লি যান। মােশতাক, কামাল হােসেন ও আমি তার সফরসঙ্গী ছিলাম। একদিন রাষ্ট্রীয় ভােজের সময় যখন ঠাট্টাচ্ছলে নানা কথাবার্তা চলছিল, তখন বঙ্গবন্ধু খােন্দকার মােশতাকের নাম উল্লেখ করে ইন্দিরা গান্ধীর উদ্দেশে বললেন, মােশতাকের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক সবচেয়ে মধুর। কারণ, মােশতাক হচ্ছেন তার শ্যালক (বিষয়টি বােঝাতে বঙ্গবন্ধু বাংলায় ‘শালা’ শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন)। বঙ্গবন্ধু ব্যাখ্যা করে বােঝান, বাংলাদেশে শ্যালক-ভগ্নিপতির সম্পর্কটি কতটা মধুর। | ইন্দিরা গান্ধীসহ আমরা সবাই জানতাম যে মােশতাকের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর আত্মীয়তার কোনাে সম্পর্ক নেই। আমি পাশেই বসেছিলাম এবং আমার সামনেই ঘটনাটি ঘটে। মােশতাক এ সময় একটি কথাও বলেননি। তবে বিষয়টিকে তিনি নির্দোষ কৌতুক হিসেবে গ্রহণ করলেন বলেও মনে হয়নি; বরং তাকে বেশ বিব্রতই মনে হলাে। ব্যাপারটায় আমি কিছুটা হতভম্ব হয়ে পড়ি এবং আমার ধারণা হয়, ভেতরে-ভেতরে দুজনের মধ্যে হয়তাে সম্পর্কের টানাপােড়েন চলছে অথবা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কটি আর নেই।
দিল্লি থেকে ঢাকায় বিমানে ফেরার পথে আরও একটি ঘটনা ঘটে। বঙ্গবন্ধু তার কেবিনে দৃশ্যত চোখ বন্ধ করে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। পর্দার আড়ালে একই কেবিনে বসে আমি আর খােন্দকার মােশতাক দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলাপ করছিলাম। সে সময় দেশে প্রচুর মূল্যস্ফীতি ও বৈদেশিক মুদ্রার অভাবে লেনদেনের ভারসাম্যে তীব্র সংকট দেখা দিয়েছিল । এর শেষ পরিণতি কী হতে পারে, তা নিয়ে আমরা পরিকল্পনা কমিশনের সবাই খুবই দুশ্চিন্তায় ছিলাম। আমি মােশতাককে বললাম, সরকার যদি এ ব্যাপারে কোনাে কার্যকর ও জোরালাে পদক্ষেপ নিতে না পারে, তবে সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ব্যাপক অসন্তোষ বা অশান্তি দেখা দিতে পারে । ইতিহাসের শিক্ষা হলাে, কোনাে দেশের মূল্যস্ফীতি দুই অঙ্ক ছাড়িয়ে গেলে সাধারণত সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারে না। এমন সময় হঠাৎ করেই পর্দার ওপার থেকে বঙ্গবন্ধু এসে মােশতাকের পাশে বসলেন। মনে হলাে তিনি আমাদের আলােচনার পুরােটাই শুনেছেন। তিনি মােশতাককে
আমার মন্তব্যগুলাের প্রতি মনােযােগ দিতে ও গুরুত্বের সঙ্গে চিন্তা করতে বললেন। কারণ, আমি যা বলেছি তার সঙ্গে তিনি পুরােপুরি একমত। এর পরপরই একটি অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। বঙ্গবন্ধু বললেন যে গত রাতে তিনি একটি অদ্ভুত স্বপ্ন দেখেছেন। স্বপ্নে সর্বশক্তিমান আল্লাহ হজরত ইব্রাহিমের (আ.) মতাে বঙ্গবন্ধুকে তাঁর সবচেয়ে প্রিয় লােককে কোরবানি দিতে বলেছেন। সবচেয়ে প্রিয় কাকে তিনি কোরবানি দেবেন, এ নিয়ে অনেক চিন্তাভাবনার পর তিনি সিদ্ধান্ত পৌঁছেছেন যে সেই ব্যক্তিটি অবশ্যই খােন্দকার মােশতাক। আমি হতবুদ্ধি হয়ে গেলাম এবং যা শুনলাম, তা আমার বিশ্বাস হচ্ছিল না। মােশতাক কোনাে মন্তব্য না করে নীরবে তা শুনে গেলেন। তাঁকে তখন খুবই বিমর্ষ লাগছিল।
পরবর্তী সময়ে ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বর মাসে মােশতাকের সঙ্গে আমার আরেকটি অপ্রত্যাশিত আলাপ-আলােচনা হয়েছিল। বাংলাদেশ সফরকারী অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী গগ হুইটলেমের সম্মানে তখন একটি নৌভ্রমণের আয়ােজন করা হয়েছিল। মন্ত্রীদের মধ্যে খােন্দকার মােশতাক ও তাহের উদ্দিন ঠাকুর অস্ট্রেলীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গী হয়েছিলেন। আমি একটা সময়ে জাহাজের ডেকের ওপর হাঁটছিলাম। তখন দুজনের সঙ্গে আমার দেখা হয়ে গেল। দেখা হতেই তাঁরা দুজন আমার প্রতি অনেক সহানুভূতি প্রকাশ করলেন; পরিকল্পনা কমিশনে আমার কাজের অভিজ্ঞতা যে কত কষ্টদায়ক ছিল, সে ব্যাপারে কথাবার্তা বলতে শুরু করলেন। কমিশন ছেড়ে যাওয়াটা যে আমার জন্য এক বিরাট মুক্তির বা সন্তুষ্টির ব্যাপার হবে, সেটাও তারা বললেন। জাহাজের ডেক ছেড়ে যাওয়ার সময় আমাদের তিনজনকে একসঙ্গে দেখে বঙ্গবন্ধু এগিয়ে এলেন। তাঁদের দুজনকে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তাঁদের ব্যাপারটা কী। সব সময় তারা একসঙ্গে কী বিষয় নিয়ে ফিসফাস বা গােপনে কথাবার্তা বলেন। তিনি তাদের উদ্দেশ করে যা বললেন তার অর্থ দাঁড়ায় অনেকটা এ রকম—তােমাদের আচার-আচরণ লক্ষ করে মনে হচ্ছে, তােমরা কোনাে চক্রান্তের সঙ্গে জড়িত। কিন্তু মনে রেখাে, তােমাদের সব কর্মকাণ্ডের ওপর নজর রাখা হচ্ছে।
এখানে আরও একটা বিষয় উল্লেখ করা যেতে পারে যে সে সময় সারা দেশে রাজনৈতিক মহলে অনেক রকম গুজব শােনা যাচ্ছিল। আমি এ ঘটনাগুলাে নিয়ে পরে অনেক চিন্তাভাবনা করেছি এবং বন্ধুদের সঙ্গে আলাপআলােচনা করেছি। এটা নিশ্চিত করেই বলা যায় যে খােন্দকার মােশতাক বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে একধরনের প্রচারণায় যুক্ত ছিলেন। পরবর্তী সময়ে ‘৭৫-এর আগস্ট মাসের ঘটনাটি ঘটল। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের মােশতাক
বাংলাদেশের ‘সূর্যসন্তান’ বলে অভিহিত করে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করলেন। তখন আমার আর সন্দেহ রইল না যে মােশতাক ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। মােশতাক যে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন, সেটা কি বঙ্গবন্ধু জানতেন? তিনি কি এ বিষয়টি নিয়ে মােশতাককে কখনাে জিজ্ঞেস বা সওয়াল করেছিলেন? সে সময় মােশতাক ও বঙ্গবন্ধুর মধ্যে কী সম্পর্ক ছিল বা তাঁদের মধ্যে কী ধরনের আলাপ-আলােচনা চলছিল, তা কেউই হয়তাে জানত না। আমার ধারণা, তারা একধরনের সংঘাতের মধ্যে ছিলেন। বঙ্গবন্ধু সম্ভবত বিভিন্নভাবে মােশতাককে এটা বােঝাতে চেয়েছিলেন যে মােশতাক যে ষড়যন্ত্র বা দুরভিসন্ধির সঙ্গেই জড়িত থাকুন না কেন, তার মতাে ভিতু ও দুর্বল চরিত্রের লােকের পক্ষে বঙ্গবন্ধুর ক্ষমতা ও দক্ষতার কারণে কোনাে রকম ষড়যন্ত্র করে সফল হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তবে দুঃখজনকভাবে পরের ইতিহাস প্রমাণ করেছে বঙ্গবন্ধুর ওই ধারণা ভুল ছিল।
অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী গগ হুইটলামের জন্য যে রাষ্ট্রীয় ভােজসভার আয়ােজন করা হয়েছিল, সে সময়ে সেটা ছিল আমার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা। ভােজসভা শুরু হওয়ার জন্য যখন আমরা অপেক্ষা করছিলাম, তখন কামারুজ্জামান ও ফণীভূষণ মজুমদারকে দেখে আমি তাদের সঙ্গে মিলিত হতে গেলাম। মন্ত্রিসভার খুব পরিশ্রমী সদস্য হিসেবে কামারুজ্জামানের পরিচিতি ছিল না। মন্ত্রিসভার দীর্ঘ বৈঠকের সময় তিনি প্রায়ই অন্যমনস্ক হয়ে পড়তেন। তবে তিনি ছিলেন যােগ্য, স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী ও বুদ্ধিমান ব্যক্তি। কোনাে বিষয়ে তিনি যদি গভীরভাবে মনােযােগ দিতেন, তবে তার এই গুণগুলাের প্রমাণ পাওয়া যেত।
কামারুজ্জামান সেদিন যে মন্তব্যটি করলেন, তা বিচলিত হওয়ার মতাে। তিনি বললেন, আমরা তিনজন হয়তাে আর কখনাে একসঙ্গে কোনাে ভােজসভায় মিলিত হওয়ার সুযােগ পাব না। এটাই একসঙ্গে আমাদের লাস্ট সাপার’ বা অন্তিম ভােজন । আমি যখন বিদেশ থেকে আবার ফিরে আসব, তখন তারা আর জীবিত থাকবেন না। তিনি তখন আওয়ামী লীগের সভাপতি নিযুক্ত হয়েছেন এবং বাকশাল গঠন করার কয়েক মাস আগে তিনি আর মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন না। তাঁর এই দুঃখজনক ভবিষ্যদ্বাণী পরে সত্য হয়ে দেখা দিয়েছিল।
দেশের বিরাজমান পরিস্থিতির ব্যাপারে জিয়াউর রহমানের গভীর আগ্রহ
জিয়াউর রহমানের সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাৎ হয়েছিল ১৯৭২ সালে। তখন তিনি সেনাবাহিনীর উপপ্রধান। কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রামের কাছাকাছি সীমান্ত এলাকায় সড়ক তৈরির জন্য অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের ব্যাপারে তিনি আমার সঙ্গে আলােচনা করতে এসেছিলেন। সাধারণত সশস্ত্র বাহিনীর জন্য বাজেট বরাদ্দের ব্যাপারটি পরিকল্পনা কমিশনের যাচাই-বাছাইয়ের বাইরে থাকে। অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে আলােচনা করে প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেন। সেনাবাহিনীর জন্য অর্থ বরাদ্দের এ কাজটি ইতিমধ্যে হয়ে গিয়েছিল। এর বাইরে কোনাে অর্থ বরাদ্দের সিদ্ধান্ত বঙ্গবন্ধু নিজে নিতে চাননি বা এ ব্যাপারে তাজউদ্দীনকেও জড়াতে চাননি। বঙ্গবন্ধুর মতে, সীমান্ত এলাকায় এসব রাস্তাঘাট নির্মাণ উন্নয়ন খাতের অন্তর্ভুক্ত হলে যৌক্তিক হয় এবং সে ক্ষেত্রে এটা পর্যালােচনা করার দায়িত্ব পরিকল্পনা কমিশনের ওপর বর্তায়। তিনি জিয়াউর রহমানকে আমার কাছে পাঠিয়েছিলেন উন্নয়ন খাত থেকে এ ক্ষেত্রে বরাদ্দ দেওয়ার ব্যাপারে কমিশনকে রাজি করাতে। জিয়াউর রহমান যথেষ্ট যৌক্তিকভাবে ম্যাপ ও চার্টের সাহায্যে এর পক্ষে বক্তব্য উপস্থাপন করলেন। তিনি বােঝালেন যে নির্ধারিত বাজেটের বাইরে অন্য খাত থেকে এনে সেনাবাহিনীর জন্য অতিরিক্ত বরাদ্দের ক্ষেত্রে কোনাে সমস্যা নেই এবং তা যৌক্তিকও। সীমান্ত এলাকায় রাস্তাঘাট নির্মিত হলে তা শুধু প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকেই শক্তিশালী করবে না, বরং তা সীমান্ত এলাকায় অবকাঠামােগত উন্নয়নও ঘটাবে। অর্থের অভাবের কারণে এবং অন্য কোনাে খাত থেকেও অর্থ বরাদ্দের সুযােগ না থাকায় আমি তাঁকে বিষয়টি পরবর্তী বছরগুলাের জন্য স্থগিত রাখতে অনুরােধ করি। জিয়াউর রহমান শেষ পর্যন্ত বিষয়টি মেনে নিয়েছিলেন।
ওই সাক্ষাৎপৰ্ব ছাড়াও বিভিন্ন পার্টি-অনুষ্ঠানে তার সঙ্গে আমার অনানুষ্ঠানিক দেখা-সাক্ষাৎ হয়েছে। জিয়াউর রহমান খুবই সামাজিক জীবন যাপন করতেন। সেনাবাহিনীর সীমিত গণ্ডির বাইরেও সরকারি কর্মকর্তা, রাজনীতিবিদ, পেশাজীবীসহ বিভিন্ন স্তরের লােকজনের সঙ্গে তার যােগাযােগ ছিল।।
১৯৭৪ সালে যখন ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকায় চোরাচালানবিরােধী অভিযান চালানাের জন্য সেনাবাহিনী মােতায়েন করা হয়, তখন আমাদের মধ্যে আলােচনা হয়েছিল। ভারতে চোরাচালানের পরিমাণ কি এতটাই বেশি ছিল যে তার জন্য এ রকম একটি খাদ্য ঘাটতি সৃষ্টি হতে পারে? ১৯৭৩-৭৪
সালে দুর্ভিক্ষের ঠিক আগে ভারতে খাদ্যশস্য পাচার হচ্ছে বলে ব্যাপক গুজব ছড়ায় এবং এ নিয়ে সংবাদপত্রেও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৭৪ সালের এপ্রিল থেকে সরকার চোরাচালান ঠেকাতে সীমান্তে সেনা মােতায়েন করে। প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে কারও পক্ষে খাদ্যশস্য পাচারের পরিমাণ নির্ধারণ সম্ভব ছিল না। সেনাবাহিনীর বাজেয়াপ্ত করা পণ্যসমূহের তালিকা থেকে প্রতীয়মান হয় যে চোরাচালানের ক্ষেত্রে চালের গুরুত্ব তেমন একটা নেই। চোরাচালানকৃত দ্রব্যসামগ্রীর মধ্যে এর স্থান ছিল ছয় কি সাত নম্বরে। এ সময় বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজে আসা ইংল্যান্ডের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্রায়ান রেডাওয়েকে বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করতে অনুরােধ করা হয়। চোরাচালানের ক্ষেত্রে সীমান্ত এলাকায় চালের দাম অনেক বেশি হওয়ার কথা; কেননা, অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে সংগ্রহ করেই তা সীমান্ত এলাকায় পাঠাতে হবে। কিন্তু বিভিন্ন বাজারে চালের মূল্য পরিস্থিতি (Price behavior) পর্যবেক্ষণের পর ব্রায়ান রেডাওয়ে এই সিদ্ধান্তে আসেন যে সীমান্তে চালের চোরাচালান পরিমাণগত দিক থেকে তেমন বেশি কিছু নয়।
এ সময়টাতে জিয়াউর রহমানের সঙ্গে আমার একবার সাক্ষাৎ ঘটে। তিনি তখন সেনাবাহিনীর ডেপুটি চিফ অব স্টাফ এবং সীমান্তে চোরাচালানবিরােধী কার্যক্রমের তদারক করছিলেন। আমি যেহেতু তখন পরিকল্পনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান ছিলাম, তিনি নিজ উদ্যোগে আমার সঙ্গে দেখা করতে আসেন। তার হিসাবমতে, সীমান্ত থেকে ০.৫ মিলিয়ন থেকে ১ মিলিয়ন টনের মতাে, অর্থাৎ বিপুল পরিমাণের চোরাচালান ঘটেছে। তিনি সে বিষয়ে আমার সঙ্গে মতবিনিময় করতে আসেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকর্মী ও কর্মচারীরা চোরাকারবারের ব্যাপকতার সঠিক তথ্য তাঁকে দিচ্ছেন না। এ অবস্থায় আমার উচিত হবে প্রধানমন্ত্রীকে ঘটনার গুরুত্ব বােঝাতে চেষ্টা করা।
সেনাবাহিনীর কাছে থাকা বিপুল পরিমাণে চাল চোরাচালানের তথ্যপ্রমাণ নিয়ে আমাদের মধ্যে কিছু আলাপ-আলােচনা হয়। চোরাচালান কী পরিমাণ হয়েছে, তার কোনাে হিসাব না থাকায় আমি চোরাচালানের মাত্রা সম্বন্ধে ব্যাখ্যা দিয়ে তার বিভিন্ন পরােক্ষ নির্দেশক নিয়ে তাঁর সঙ্গে আলােচনা করি। যেমন, আমি জানতে চেয়েছিলাম, কীভাবে, তাঁর মতে, শতসহস্র টন চাল এত কম সময়ে (এপ্রিল-জুনের মধ্যে) পাচার করা সম্ভব। এ আলােচনাটি হয়েছিল জুলাই-আগস্ট ১৯৭৪ সালের বন্যার সময়, যখন দ্রুত চালের দাম বাড়তে থাকে। যদি চোরাচালান দামের এমন আকস্মিক বৃদ্ধির কারণে হয়, তাহলে
আমন ও বােরাে ফসল কাটার ঠিক পরের মাসগুলােতে চোরাচালান খুবই বড় আকারে দেখা যাওয়ার কথা। প্রশ্ন হলাে, কীভাবে এত বেশি পরিমাণ চাল এত কম সময়ে সীমান্তের ওপারে পাচার বা সেখানে বহন করে নেওয়া যায়? যদি এত বেশি পরিমাণে চাল পাচার করতে হয়, তবে তা ভিন্ন ভিন্ন চোরাকারবারির দ্বারা ছােট লটে বা অল্প পরিমাণে করা সম্ভব নয়। যদি সেটাই অবস্থা হতাে, তাহলে বিপুলসংখ্যক মানুষ বা চোরাকারবারিকে এক মাস বা এ রকম সময় ধরে লাগাতার সীমান্ত পারাপার করতে দেখা যেত। কিন্তু সেনাবাহিনী জানিয়েছে যে এই মাত্রায় লােকের ক্রমাগত যাওয়া-আসার ঘটনা ঘটেনি। ফলে স্বভাবতই আশঙ্কাটা যুক্তিযুক্ত নয়। পক্ষান্তরে, চাল যদি বড় ট্রাক বা বজরায় করে স্থানান্তর করা হয়, তবে সীমান্তের অল্প কিছুসংখ্যক স্থান বা পয়েন্ট দিয়েই কেবল তা করা সম্ভব। যদি বাস্তবেই ব্যাপক হারে চোরাচালান হতাে, স্বাভাবিকভাবেই তা জনসাধারণ, বাংলাদেশ রাইফেলস (বিডিআর) এবং সেনাবাহিনীর চোখ এড়াতে পারত না। তবে সেনাবাহিনীর যুক্তি হলাে, সীমান্ত থেকে ট্রাক বা বজরা দিয়ে বড় ধরনের পাচার তারা যদি দেখেও থাকে, তবে এটা তাদের ব্যর্থতা যে তারা তা ধরতে পারেনি। স্থানীয় নেতা-কর্মীরা স্থানীয় সরকারি কর্মচারীদের সহযােগিতায় চোরাচালানের সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে তারা কোনাে প্রতিরােধমূলক পদক্ষেপও নিতে পারেনি। সে সময় সংবাদপত্রগুলাে এমনিতেই দেশের খাদ্য পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রচুর গুজব ছাপত। কিন্তু তারাও এত স্বল্প সময়ের মধ্যে ট্রাক ও নৌযানের এত ব্যাপক চলাচলের কোনাে প্রতিবেদন ছাপেনি।
চোরাচালান হয়নি, তা কিন্তু নয়। সীমান্ত রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি সত্ত্বেও ১৯৭১ সাল থেকে নিয়মিতভাবে চোরাচালান হয়ে আসছে। এ ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক বিষয়টি ছিল, চালের এই চোরাচালান কতটা ব্যাপক হয়েছিল, যাতে এত অল্প সময়ের মধ্যে চালের মূল্য এমন আকাশছোঁয়া হতে পারে? সীমিত সময় এবং সে সময়ের সীমান্ত ও আশপাশের এলাকার রাস্তা ও পরিবহনব্যবস্থাকে বিবেচনায় নিলে জিয়াউর রহমানের উত্থাপিত ব্যাপক চোরাচালানের ব্যাপারটি দৃশ্যত অসম্ভব বলেই ধরে নেওয়া যায়।
আমাদের দীর্ঘ আলােচনার ফলাফল নিয়ে জিয়াউর রহমান সন্তুষ্ট হননি। অনেক পরে, যখন তিনি ডেপুটি মার্শাল ল অ্যাডমিনিস্ট্রেটর এবং অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন, তখন তার কর্মচারীদের মধ্যে আমার সঙ্গে আগে কাজ করা একজন ছিলেন। জিয়াউর রহমান তাঁর ভালাে স্মরণশক্তির কারণে তাঁকে চিনতে পারেন এবং স্মৃতিচারণা করে বলেন যে ভারতে চাল পাচারের ব্যাপকতা ও তাৎপর্য তিনি আমাকে বােঝাতে
পারেননি। আজ অতীতের সেই ঘটনা স্মরণ করলে মনে হয়, তখন দেশ ছিল চরম অশান্ত এবং ভাবাবেগে আপ্লুত আর কঠিন সমস্যায় জর্জরিত। সেই অবস্থায় যুক্তিসংগত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত আমার মতভিন্নতা হয়তাে রাজনৈতিক কারণে জিয়াউর রহমানের কাছে সাফাই বলে মনে হয়েছে, যেহেতু আমি সরকারের দায়িত্বপূর্ণ পদে ছিলাম।
বাংলাদেশে এটা সবাই জানত যে জিয়াউর রহমান ১৯৭১ সালের প্রথম দিকে বঙ্গবন্ধুর নামে বা তরফ থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘােষণা করেছিলেন। তা ছাড়া স্বাধীনতাসংগ্রামে নিয়ােজিত সেক্টর কমান্ডারদের মধ্যেও তিনি একজন ছিলেন। স্বাধীন বাংলাদেশে তাঁকে ডেপুটি আর্মি চিফ করা হয়। তারা একই ব্যাচের হলেও আর্মি চিফ কে এম সফিউল্লাহর চেয়ে তিনি সিনিয়র ছিলেন। এ নিয়ে জিয়াউর রহমানের অসন্তুষ্টির কথা বিদিত ছিল। | তাঁর সামাজিক জীবন ক্যান্টনমেন্টের বাইরেও বিশেষ বিস্তৃত ছিল। অন্য সেনা কর্মকর্তাদের থেকে তিনি এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ছিলেন। বেসামরিক সমাজের সঙ্গেও তিনি সম্পর্ক রাখতেন। এই সময় বঙ্গবন্ধু একটা জাতীয় বেতন কমিশন করেন। এই কমিশনের দায়িত্ব ছিল বেসামরিক ও সামরিক বিভিন্ন বিভাগের সব পর্যায়ের বেতন সম্পর্কে নির্দেশ দেওয়া। এই কমিশনে সামরিক বাহিনীর প্রতিনিধি ছিলেন জিয়াউর রহমান। পরিকল্পনা কমিশন থেকে দুজন অর্থনীতিবিদ কমিটির সদস্য ছিলেন। অ্যাকাউনট্যান্ট সাইফুর রহমান ছিলেন বেসরকারি বিশেষজ্ঞ। জিয়াউর রহমান কমিশনের বেসামরিক সদস্যদের সঙ্গে নিজ উদ্যোগে যােগাযােগ রাখতেন। কমিশনের অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমস্যা ও তার সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে উৎসাহের সঙ্গে আলােচনা করতেন। এসব আলােচনার সময় তিনি বেশির ভাগ ক্ষেত্রে প্রশ্ন করতেন, জিজ্ঞাসা তুলে ধরতেন। নিজ থেকে কোনাে মন্তব্য করতেন না বা তার নিজস্ব মত দিতেন না। সাইফুর রহমানের সঙ্গে তিনি বিশেষভাবে সম্পর্ক রক্ষা করতেন।
এসব সামাজিক মেলামেশার সময় জিয়াউর রহমান দেশের সার্বিক অবস্থা নিয়ে আলােচনা করতেন। পরবর্তীকালে তিনি যখন বাংলাদেশের সরকারপ্রধান হন, তখন সাইফুর রহমানকে প্রথমে বাণিজ্যমন্ত্রী এবং পরে অর্থমন্ত্রী নিযুক্ত করেন। অন্যান্য অর্থনীতিবিদের সঙ্গেও তিনি সম্পর্ক রাখতেন এবং বিভিন্ন ব্যাপারে তাদের পরামর্শ চাইতেন।
বাংলাদেশ সফররত যুগােস্লাভিয়ার একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহ নিয়ে সমঝােতার সময়ও তাঁর সঙ্গে আমার
আলাপ-আলােচনা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু আমাকে এ আলােচনায় অংশগ্রহণ করতে বলেছিলেন। সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল কে এম সফিউল্লাহর নেতৃত্বে সশস্ত্র বাহিনীর যে দলটি এ আলােচনায় অংশ নিয়েছিল, তাতে জিয়াউর রহমানও ছিলেন। জিয়াউর রহমান আর্মির প্রয়ােজন আমাকে বিস্তারিত বুঝিয়ে দিতেন। আন্তর্জাতিক বাজারে যুদ্ধের অস্ত্রশস্ত্রের কোনাে প্রতিযােগিতামূলক মূল্য ছিল না।
এসবের মূল্য ঠিক হতাে দ্বিপক্ষীয় আলােচনার মাধ্যমে। সাধারণত ধারণা ছিল যে উভয় দেশের সামরিক কর্মকর্তারা মূল্য নির্ধারণ করার সময় তাদের নিজেদের ব্যক্তিগত কিছু লাভের অংশ রাখত। বঙ্গবন্ধু মনে করেছিলেন যে আমার উপস্থিতিতে সামরিক কর্মকর্তাদের সেই ব্যক্তিগত লাভের বন্দোবস্তের সম্ভাবনা হয়তাে কম হবে। অবশ্য তখন বাংলাদেশের সামরিক কর্মকর্তাদের সততা নিয়ে প্রশ্ন ওঠেনি। তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আমাদের জানিয়েছিল যে তখন যুগােস্লাভিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত নৌবাহিনীর কিছু কেনাকাটার ব্যাপারে দুর্নীতিতে জড়িত ছিলেন। সে কারণে রাষ্ট্রদূতকে আমাদের আলােচনার সময় উপস্থিত হতে বা যােগ দিতে দেওয়া হয়নি।
তবে জিয়াউর রহমানের সঙ্গে আমার সবচেয়ে উল্লেখযােগ্য ও মনে রাখার মতাে সাক্ষাৎটি অনুষ্ঠিত হয় আমার পরিকল্পনা কমিশন ছেড়ে আসার সামান্য আগে। তখনাে আমার ছেড়ে আসার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি, কিন্তু এ নিয়ে নানা খবর ছড়িয়ে পড়েছিল। এমনই একসময় জিয়াউর রহমান আমাদের দুজনেরই বন্ধু জিয়াউল হকের মাধ্যমে আমার সঙ্গে দেখা করার প্রস্তাব পাঠালেন। জিয়াউল হক আমাকে জানালেন যে জিয়াউর রহমান অনানুষ্ঠানিকভাবে দেশের সাধারণ স্বার্থসংশ্লিষ্ট কিছু বিষয় নিয়ে আমার সঙ্গে আলােচনা করতে আগ্রহী। জিয়াউর রহমান আমার পরিকল্পনা কমিশন ছেড়ে যাওয়ার দৃঢ় ইচ্ছার কথা শুনেছেন এবং যত দ্রুত সম্ভব আমার সঙ্গে একটি সাক্ষাতের ব্যবস্থা করার জন্য জিয়াউল হককে অনুরােধ করেছেন। যদিও জিয়াউর রহমানের সঙ্গে আমার আলাপ-পরিচয় ছিল এবং তিনি আমার অফিসেও এসেছেন এবং দেখা করেছেন, তারপরও তিনি একটি পরােক্ষ মাধ্যমে আমার সঙ্গে দেখা করার প্রস্তাবটি রাখেন। আমি এতে বেশ অবাক হয়েছিলাম এবং নিশ্চিত ছিলাম না যে কীভাবে আমি এই অনুরােধে সাড়া দেব। জিয়াউল হক আমাকে এটা বােঝানাের চেষ্টা করলেন যে আমার উচিত এ ধরনের একটি অনানুষ্ঠানিক বৈঠকের ব্যাপারে সম্মত হওয়া এবং এ ধরনের সাক্ষাতে সমস্যার কিছু নেই।
জিয়াউল হক তার বাসাতেই এই সাক্ষাতের ব্যবস্থা করেছিলেন, যেখানে আমার এমনিতেই নিয়মিত যাতায়াত ছিল। রাজনীতির জগতে প্রকাশ্যে ও
গােপনে কী হচ্ছে, সে ব্যাপারে আমার চেয়ে জিয়াউল হক অনেক বেশি খোজখবর রাখতেন। জিয়াউর রহমান কী বলতে চান, সে ব্যাপারে আমি খুবই কৌতূহলী ছিলাম । দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যাপারে জিয়াউর রহমানের যে গভীর ও ব্যাপক আগ্রহ ছিল, তার প্রমাণ আগেও পেয়েছি। এমনকি পরিকল্পনা কমিশনে কী হচ্ছে বা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যানের চলে যাওয়ার খবর—এসবও যে তার জানার বা আগ্রহের বাইরে নয়, তা-ও বুঝতে পারলাম। | জিয়াউল হকের বাড়িতে আমার সঙ্গে জিয়াউর রহমানের সংক্ষিপ্ত বৈঠকের মূল আলােচ্য ছিল আমার পরিকল্পনা কমিশন ছেড়ে চলে যাওয়া। জিয়াউর রহমান আমার পরিকল্পনা কমিশন ছেড়ে যাওয়ার কথা শুনেছেন এবং আমি যাতে এটা না করি, সেই অনুরােধ করাই ছিল এই সাক্ষাতের উদ্দেশ্য। তিনি স্বীকার করলেন, আমি যথাযথভাবে আমার দায়িত্ব পালন, ভালাে কাজ অথবা দেশের অর্থনীতির স্বার্থে যা করা প্রয়ােজন, সেটা করার সুযােগ পাইনি। তিনি বুঝতে পেরেছেন, দেশের অর্থনীতি এবং অন্যান্য ক্ষেত্র নিয়ে বিশেষ চিন্তার কারণ রয়েছে। তবে তিনি আস্থাবান ছিলেন যে অদূর ভবিষ্যতেই। পরিস্থিতির অনেক উন্নতি ঘটবে এবং বিরাজমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা দূর হবে। বাংলাদেশ সমৃদ্ধির পথেই এগােবে এবং দেশের স্বাধীনতার জন্য আত্মত্যাগ বিফল হবে না। ফলে আমার হতাশ হওয়ার কিছু নেই এবং আমার উচিত পুরাে দায়িত্ব ও শীর্ষ নেতৃত্বের জোরালাে সমর্থন নিয়ে দেশের পরিকল্পনা ও উন্নয়নের কাজ চালিয়ে যাওয়া। পরিকল্পনা কমিশনে দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখা এবং আমার চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার জন্য তিনি বেশ জোরালােভাবে আমাকে অনুরােধ করলেন।
জিয়াউর রহমান যে আস্থা নিয়ে দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধারের আশা প্রকাশ করলেন, তাতে আমি বিস্মিত হয়েছিলাম। খুব শিগগির আমি বাধাহীনভাবে আমার কাজে মনােযােগ দিতে ও দেশের কল্যাণে আমার নির্ধারিত কাজ করার সুযােগ পাব—তাঁর এ ধরনের দৃঢ় আস্থাপূর্ণ বক্তব্যেও আমি বেশ অবাক হয়েছিলাম। তবে এর জবাবে আমাকে আমার নির্ধারিত উত্তরটিই দিতে হলাে। বললাম, আমি কয়েক মাসের ছুটিতে যাচ্ছি, ক্লান্তি কেটে গেলে ও আমার চিকিৎসা শেষ হলে ফিরে এসে আবার কাজে যােগ দেব।
দেশের রাজনীতি ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিয়ে সেনাবাহিনীর একজন জেনারেলের এই মাত্রার আগ্রহ পরিষ্কারভাবেই একটি অস্বাভাবিক পরিস্থিতির ইঙ্গিত দেয়। পাশাপাশি এটা দেশের বিরাজমান পরিস্থিতির ব্যাপারে জিয়াউর
রহমানের গভীর আগ্রহের বিষয়টিকেও তুলে ধরে। এই আগ্রহের কারণেই তিনি পরিকল্পনা কমিশনের প্রধানের সঙ্গে আলােচনায় বসেছিলেন। যে রকম দৃঢ়তার সঙ্গে তিনি অদূর ভবিষ্যতে রাজনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি সম্পর্কে আমাকে আশ্বাস দিতে পেরেছিলেন এবং একই সঙ্গে আমার সম্ভাবনাময় ভূমিকার কথা বলেছিলেন, তাতে আমার মনে হয়েছিল শিগগিরই যে একটি পরিবর্তন ঘটতে যাচ্ছে, সে সম্পর্কে তিনি অবহিত ছিলেন। ১৯৭৫-পরবর্তী সময়ে যখন তিনি সামরিক সরকারপ্রধান হলেন, তখন মনে হলাে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত জ্ঞান আহরণ এবং সমাজের বিভিন্ন অংশের ও স্তরের লােকজনের সঙ্গে তাঁর ওই মেলামেশা ছিল হয়তাে ভবিষ্যতে কোনাে দিন যদি তাঁর ওপর দেশ শাসনের দায়িত্ব পড়ে, তার জন্য প্রস্তুতি।
১. যদিও সম্পূর্ণ তুলনা হয় না, তবু ১৯৫২ সালে চীন সফরকালে সে দেশের অর্থনৈতিক বিবর্তন সম্পর্কে বঙ্গবন্ধুর কিছু মন্তব্য এখানে উদ্ধৃত করা হলাে :
কমিউনিস্ট সরকার জমিদারি বাজেয়াপ্ত করে চাষিদের মধ্যে জমি বিলি বন্দোবস্ত করে দিয়েছে। ফলে ভূমিহীন কৃষক জমির মালিক হয়েছে। চেষ্টা করে ফসল উৎপাদন করছে, সরকার সাহায্য করছে। ফসল উৎপাদন করে এখন আর অকর্মণ্য জমিদারদের ভাগ দিতে হয় না। কৃষকরা জীবনপণ করে পরিশ্রম করছে। এককথায় তারা বলে, আজ চীন দেশ কৃষক মজুরদের দেশ, শােষক শ্রেণি শেষ হয়ে গেছে। | আর চীনের সরকার জনগণকে ব্যবহার করছে তাদের দেশের। উন্নয়নমূলক কাজে। তাদের সাথে আমাদের পার্থক্য হলাে, তাদের জনগণ জানতে পারল ও অনুভব করতে পারল এই দেশ এবং এ দেশের সম্পদ তাদের । আর আমাদের জনগণ বুঝতে আরম্ভ করল, জাতীয় সম্পদ বিশেষ গােষ্ঠীর আর তারা যেন কেউই নয়। ফলে দেশের জনগণের মধ্যে ও রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে। | আমি নিজে কমিউনিস্ট নই। তবে সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করি এবং পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে বিশ্বাস করি না। একে আমি শােষণের যন্ত্র হিসাবে মনে করি। এই পুঁজিপতি সৃষ্টির অর্থনীতি যত দিন দুনিয়ায় থাকবে তত দিন। দুনিয়ার মানুষের উপর থেকে শােষণ বন্ধ হতে পারে না। পুঁজিপতিরা নিজেদের স্বার্থে বিশ্বযুদ্ধ লাগাতে বদ্ধপরিকর। নতুন স্বাধীনতাপ্রাপ্ত
জনগণের কর্তব্য বিশ্বশান্তির জন্য সংঘবদ্ধভাবে চেষ্টা করা। যুগ যুগ ধরে পরাধীনতার শৃঙ্খলে যারা আবদ্ধ ছিল, সাম্রাজ্যবাদী শক্তি যাদের সর্বস্ব লুট করেছে—তাদের প্রয়ােজন নিজের দেশকে গড়া ও জনগণের অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক মুক্তির দিকে সর্বশক্তি নিয়ােগ করা। বিশ্বশান্তির জন্য জনমত সৃষ্টি করা তাই প্রয়ােজন হয়ে পড়েছে। (শেখ মুজিবুর রহমান,
অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃষ্ঠা ২৩০-২৩৪) ২. এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলােচনা আছে আমার দুটো বইয়ে :
১. মেকিং অব আ নেশন বাংলাদেশ : অ্যান ইকোনমিস্টস টেল, ইউপিএল, | ২০০৩, ঢাকা এবং ২. অ্যান ওডেসি: দ্য জার্নি অব মাই লাইফ, প্রথমা প্রকাশন, ২০১৭, ঢাকা।
বাংলাদেশের প্রথম সরকার পরিচালনা
স্বাধীন বাংলাদেশের শুরুর পর্বটা ছিল বহুবিধ সমস্যায় জর্জরিত। এর মধ্যে রাজনৈতিক, আর্থসামাজিক, শাসনতান্ত্রিক সমস্যাগুলাে সম্পর্কে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং তার সমাধান প্রয়ােজনীয় ছিল। অন্যদিকে মন্ত্রিসভার সদস্যদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা ছিল সীমিত। কোনাে বিষয়ে বিচার-বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা কোনাে সমস্যা সমাধান করা তাঁদের জন্য ছিল সময়সাপেক্ষ। এমনকি সব সময় তাঁদের পক্ষে সেটা সম্ভবও ছিল না।
সরকারের সাফল্য বা ব্যর্থতার জন্য জনগণের কাছে দায়ী প্রধানমন্ত্রী। তাঁকেই তারা নির্বাচন করে এই দায়িত্ব এবং ক্ষমতা দুটোই দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সেই দায়িত্বের ভার নেওয়ার জন্য তার যথেষ্টসংখ্যক সহকর্মীর অভাব ছিল। ফলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মনে করতেন অনেক ব্যাপারে তার নিজেরই বিচার-বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। অনেক সময় সরকার পরিচালনার ব্যাপারে তাঁকেই উদ্যোগী হয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হতাে। যদিও উচিত ছিল মন্ত্রীদের নিজেদের উদ্যোগে এসব বিষয় বিচার-বিবেচনা করে প্রধানমন্ত্রীকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও তা কার্যকর করার আদেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে সাহায্য করা। ওপরে বর্ণিত একাধিক কারণে স্বাধীন বাংলাদেশের একেবারে শুরু থেকেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব কেন্দ্রীভূত ছিল প্রধানমন্ত্রীর হাতে। | সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় মন্ত্রীদের যথেষ্ট অংশগ্রহণ না থাকায় মন্ত্রীরা ‘কাজ করে শেখার সুযােগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। একই সঙ্গে তাঁরা
তাঁদের কাজের দায়দায়িত্বও নেননি। যেকোনাে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বেলায়ই কিছু ঝুঁকি থাকে। তারা অনেক ক্ষেত্রেই এ ধরনের ঝুঁকি নিতে অক্ষম বা অনিচ্ছুক ছিলেন। আমার ধারণা, কোনাে সিদ্ধান্ত ভুল প্রমাণিত হলে প্রধানমন্ত্রী বিরক্ত হবেন—এই আশঙ্কা থেকে অথবা যােগ্যতা ও নিজেদের ওপর আস্থার অভাবেই তারা এই ঝুঁকি নিতে রাজি ছিলেন না। | মন্ত্রীদের উচিত ছিল তাঁদের নির্দেশনায় ও নেতৃত্বে সচিব ও অন্যান্য সরকারি কর্মকর্তাকে দিয়ে কাজ করিয়ে নেওয়া। এই প্রক্রিয়ায় কাজ হলে বিভিন্ন স্তরে জবাবদিহি থাকে এবং জবাবদিহির বিষয়টি নিশ্চিত করাও সম্ভব হয়। কিন্তু প্রশাসন এভাবে কাজ করেনি। সচিবদের সরাসরি নির্দেশনা দিয়ে বঙ্গবন্ধু দ্রুত ফলাফল বা কাজের অগ্রগতি প্রত্যাশা করতেন। আমার ধারণা, এসব কারণে মন্ত্রীরা অনেক ক্ষেত্রেই নিজেদের দায়দায়িত্বহীন ও জবাবদিহির বাইরে বলে মনে করতেন। তবে সব মন্ত্রীর বেলায় এ কথা প্রযােজ্য ছিল না। মন্ত্রীদের যােগ্যতা ও তাদের সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষমতা সম্পর্কে বঙ্গবন্ধুর নিজস্ব মূল্যায়ন ছিল। এটা ছিল একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রকম। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তিনি সেসব সিনিয়র মন্ত্রীর ওপর আস্থা রাখতেন, যারা নিজেরাই সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম ছিলেন। সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য মন্ত্রিপরিষদে অনেক বিষয় উত্থাপিত হতাে এবং অনেক ক্ষেত্রেই সেসব বিষয়ে বিস্তারিত পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়ােজন পড়ত। এ ধরনের ক্ষেত্রে তিনি ওই বিষয়টির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত মন্ত্রীদের নিয়ে একটি উপকমিটি গঠন করতেন। অধিকাংশ গণতান্ত্রিক দেশে এই প্রথা প্রচলিত আছে। উপকমিটির সদস্যরা বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত পর্যালােচনা শেষে মন্ত্রিপরিষদে তাদের সুপারিশগুলাে তুলে ধরতেন। | এ ধরনের ঘটনা নিয়মিতই ঘটত। দ্বিতীয়ত, প্রায় সব ক্ষেত্রেই বঙ্গবন্ধু তাঁর সিনিয়র রাজনৈতিক সহকর্মীদের সঙ্গে বিস্তারিত আলােচনা করতেন এবং তাঁদের ওপর তার সম্পূর্ণ আস্থা ছিল। মন্ত্রিসভার সিনিয়র সদস্যদের সঙ্গে আলােচনা না করে সচরাচর তিনি কোনাে জটিল সিদ্ধান্ত নিতেন না। এ ক্ষেত্রে সিনিয়র মন্ত্রীদের মধ্যে যারা তাঁর উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করতেন বলে আমি জেনেছি ও দেখেছি তারা হলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, কামারুজ্জামান ও বিস্ময়করভাবে খােন্দকার মােশতাক। আইন ও পররাষ্ট্রসংক্রান্ত বিষয়ে তিনি পুরােপুরি কামাল হােসেনের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী বিষয়ে তিনি কারও সঙ্গে আলােচনা না করে নিজেই সিদ্ধান্ত নিতেন বলে যে সাধারণ ধারণা প্রচলিত আছে, তা সত্য নয়। অন্তত আমি
তাকে যেভাবে কাজ করতে দেখেছি বা আমি যতটুকু জড়িত ছিলাম, তাতে আমার এমন মনে হয়নি।
রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে একটা চালু মত ছিল। সেটা হলাে ১৯৭২১৯৭৫ সালের সে সময়ে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যেসব ভুলত্রুটি হয়েছিল, তার প্রধান কারণ ছিল ভুল অর্থনৈতিক নীতি ও কর্মসূচি। আর এসব নীতি ও কর্মসূচি গ্রহণে বঙ্গবন্ধুকে পরামর্শ দিয়েছিল পরিকল্পনা কমিশন। আশা করব, ভবিষ্যৎ গবেষকেরা পুরােনাে দলিলপত্র ঘেঁটে বিস্তারিত দেখবে কীভাবে সে সময়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হতাে। আমি অবাক হই ভেবে যে সমালােচকেরা কি বুঝতে পারেন না যে পরিকল্পনা কমিশন যা ইচ্ছা, অর্থাৎ তাঁদের বিবেচনায় যা উচিত বা প্রয়ােজনীয়, তেমন নীতি বা সিদ্ধান্ত গ্রহণে বঙ্গবন্ধুকে রাজি করিয়েছিলেন বলা মানে হলাে বঙ্গবন্ধুর বিচারবুদ্ধি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণক্ষমতায় একরকম অনাস্থা প্রকাশ করা? বঙ্গবন্ধুর স্তরের কোনাে রাজনৈতিক নেতার এ রকমটি করার কথা নয়। তারা সাধারণত তাদের অর্থনৈতিক নীতি ও সিদ্ধান্তের প্রভাব এবং ফলাফল মূল্যায়ন করেই সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। যেকোনাে নীতির রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া এবং বাস্তবায়নের সম্ভাবনা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুও ছিলেন সিদ্ধহস্ত। তা ছাড়া তিনি ছিলেন জনগণের নেতা। সারা দেশের বিভিন্ন স্তরের মানুষের সঙ্গে তাঁর অবিরত যােগাযােগ ছিল। তাঁর বিবেচনায় থাকা যেকোনাে বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে তিনি বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষের সঙ্গে আলাপআলােচনা করতেন—হােক সেটা রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক বিষয়ে। অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ হিসেবে তিনি সব সময়ই তার দেশব্যাপী বিস্তৃত সম্পর্কসূত্রের মাধ্যমে খোঁজখবর নিতেন। তিনি সব সময়ই তার এই নেটওয়ার্ক বা সংযােগগুলােকে তথ্য সংগ্রহের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতেন। | সব শ্রেণির লােকজনের সঙ্গে চিন্তাভাবনা বা নীতি বিষয়ে তাঁর আলােচনার সাক্ষী আমি মাঝেমধ্যে হয়েছি। একবার তিনি আমাকে বলেছিলেন যে আমি অর্থনীতিতে পিএইচডি ডিগ্রি নিলেও, তিনি রাজনীতি ও অর্থনৈতিক নীতি বাস্তবায়নের ওপর পিএইচডি । তিনি শুধু আমাদের পরামর্শ নিয়েই কাজ করতেন এবং তাঁর মন্ত্রী ও অন্য উপদেষ্টাদের সঙ্গে আলােচনা করতেন না—এ রকম কোনাে ভুল ধারণা অন্তত আমার ছিল না। সব ধরনের নীতিবিষয়ক প্রস্তাব নিয়ে তিনি মন্ত্রিপরিষদে ব্যাপকভাবে আলােচনার সুযােগ দিতেন। প্রায়ই তিনি মন্ত্রিপরিষদ কমিটি গঠন করতেন। এগুলাের কাজ ছিল আরও বেশি আলােচনা করে উপসংহারে
পৌছানাের আগেই পূর্ণ মন্ত্রিসভায় তাদের সুপারিশ উপস্থাপন করা।
বঙ্গবন্ধুর কাজ করার এই যে ধরন ছিল তাতে কিছু পরিবর্তন আসে ১৯৭৪ সালের শেষের দিকে। এ সময়টায় তার মন্ত্রী ও সিনিয়র রাজনৈতিক সহকর্মীদের সঙ্গে আলাপ-আলােচনা ও পরামর্শ করার বিষয়টি কমে যায়। আমি যতটুকু বুঝতে পেরেছি তাতে আমার ধারণা যে একদলীয় রাষ্ট্রপতি শাসনব্যবস্থা (বাকশাল) কায়েম করার ব্যাপারে তিনি তাঁর রাজনৈতিক সহকর্মীদের সঙ্গে খুব বিস্তারিত আলাপ-আলােচনা কিংবা তার। প্রয়ােজনীয়তা ও বাস্তবায়ন বিষয়ে পরামর্শ করেননি। সে রকম পরিবেশও ছিল না।
নীতি বাস্তবায়ন : আমলাতন্ত্রের ভূমিকা দেশের নানা কিছু পরিচালনায় যােগ্যতার জন্য সরকারি কর্মকর্তাদের ওপর বঙ্গবন্ধুর বেশি আস্থা ছিল। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রের যে বিশেষজ্ঞরা কাজ করতেন, তাঁদের যাচাই-বাছাই করার অবস্থাও সে সময় ছিল না।
১৯৭২-৭৩ সময়টায় তিনি উদ্বিগ্ন ছিলেন যে পাকিস্তানে আটকে পড়া প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের যাতে তাড়াতাড়ি ফিরিয়ে আনা যায়। তিনি প্রত্যাশা করতেন, তারা ফিরে এলে প্রশাসনের সমস্যা অনেকটাই কমে যাবে। ব্রিটিশ ধারার প্রশাসনের সঙ্গে যাদের পরিচয় নেই, এমন দেশ থেকে যারা আসতেন, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লােকজন, তারা এই ধারণায় খুবই বিস্মিত হতেন। তাঁরা প্রায়ই প্রশ্ন করতেন, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থা চালানাের জন্য বঙ্গবন্ধু কেন সরকারের বাইরে থেকে বিভিন্ন পেশাজীবীকে বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা ব্যবসায় সেক্টর থেকে লােকজনকে নিয়ােগ দিচ্ছেন না। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, মার্কিন সরকার পরিচালিত হয় মূলত প্রচুরসংখ্যক আইনজীবী দ্বারা। সেদিক থেকে বিবেচনা করলে বাংলাদেশেও অনেক ভালাে ও প্রশিক্ষিত আইনজীবী রয়েছেন। সে সময়ে সীমিত পর্যায়ে এ রকম কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছিল। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও গণপূর্ত—এ ধরনের মন্ত্রণালয়গুলােতে সরকারের বাইরে থেকে সচিব নিয়ােগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তারা আমলাতন্ত্রের লােকজনদের কাছ থেকে সাহায্য-সহযােগিতা কমই পেয়েছেন। অধিকাংশ মন্ত্রীই সরকারি কর্মকর্তাদের ওপর নির্ভর করতেন। কোনাে নীতির প্রস্তাবনা তৈরির ক্ষেত্রে সব চিন্তাভাবনা প্রশাসনের কর্মকর্তারাই করতেন।
মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে মন্ত্রীরা নিয়মিতই তাদের মন্ত্রণালয়ের অবস্থান তুলে ধরতে বা ব্যাখ্যা করতে কর্মকর্তাদের ডেকে আনতেন। একই সঙ্গে আমলাদের প্রতি সন্দেহ ও অবিশ্বাসের ব্যাপারটিও মন্ত্রীদের…