সবকিছু ঠিক ছিল সকাল থেকে, এখনো ঠিক আছে। ফাল্গুনের হাওয়ায় বেশ কিছু হলুদ পাতা গাড়ীর জানালা গলে শরীরে আর মাথায় এসে পড়লে, তখনও ট্রাফিক জ্যাম-এ বাস দাড়িয়ে থাকে বিজয় সরণী মোড়ে; বাস থেকে নেমে যাওয়া ঠিক হবে কি না ভাবতে ভাবতে যখন আরো অনেকটা সময় পার হয়ে যাচ্ছিল এবং ফাল্গুনের হাওয়া আরো কিছু হলুদ পাতা গাড়ীর জানালা গলে শরীরে আর মাথায় এনে ফেললো তখন, সিদ্ধান্তহীনতার জন্য নিজেকে কুৎসিত মনে হল আর আচমকা বাসের সিট ছেড়ে দরজার দিকে হেটে গেলাম, বাসের দরজায় দাড়িয়েও সিদ্ধান্তহীনতার ভুগতে লাগলাম, ভাবনা সকল উপেক্ষা করে দরজা থেকে রাস্তায় পা বাড়ালাম আর অমনি বাস চলতে শুরু করলো, আমি কোনরকম টাল সামলে দরজার রড ধরে ফেললাম কিন্তু বাসের হেল্পার আমাকে ধাক্কা দিয়ে চলন্ত বাস থেকে এমন ভাবে রাস্তায় ফেলে দিল যেন দেখে মনে হয় আমি নিজেই নামতে পিয়ে পড়ে গেছি এবং এতো কম সময়ে ঘটনাটা ঘটলো এবং বাসের গতি এতটাই ছিল যে মুহূর্তের মধ্যে বাস আমাকে ফেলে অনেকটা সামনে এগিয়ে গেছে, ভরদুপুর বলেই হয়তো রাস্তা ফাঁকা, তাতে করে ঘটনাটা দেখে এমন মনে হচ্ছিল যেন, আমি কোন একটা জায়গা থেকে হেটে হেটে বিজয় সরণীর রাস্তায় এসে ক্লান্ত হয়ে বসে পড়েছি, বিশ্রাম নিচ্ছি এবং ট্রাফিক যাতায়াত ঠিক রাখতে যে কোন মুহূর্তে পুলিশ এসে আমাকে রাস্তা থেকে তুলে থানায় নিয়ে যেতে পারে রাজপথ দখল করার অপরাধে। সেই মুহূর্তে আমার মাঝ রাস্তায় এরকম একটা অবস্থান ছিল একেবারে বেমানান, হাস্যকর, অদ্ভুত এবং অযৌক্তিক।
আমি কিছু ভাবতে পারলাম না।
এমন হতেই পারে বাসের হেল্পার জেনে গেছে আমি একটা কুৎসিত মানুষ, কুৎসিত মানুষের মরে যাওয়া উচিৎ এইরকম যুক্তিতে সে আমাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছে। আবার এমনও হতে পারে দিনে দিনে বাস ভাড়ার ঊর্ধ্বগতির বিরোধিতা করে খানিক আগেই কনট্রাকটরের সাথে ঝগড়ার শেষ বাক্য এটা। আটাশ টাকার ভাড়া বাইশ টাকা দেয়ার ফলে কি ছয় টাকার শোধ এটা ! বাসের যাত্রী-গন কেহই বিষয়টা খেয়াল করে নাই আর দুপুরের এই সময়টা আমাদের লোকেদের ভাত ঘুমের অভ্যাস বলেই হয়তো অধিকাংশ যাত্রী ঐ সময়ে ঘুমিয়ে ছিল আর যারা ঘুমিয়ে ছিল না তারা তাদের প্রেমিকার সাথে কথা বলায় ব্যস্ত ছিল, কারণ ফাল্গুনের হাওয়ায় গাছের হলুদ পাতা গাড়ির জানালা গলে আমাদের শরীর কি মাথা ছুঁয়ে যাচ্ছিল এবং এটি একটি রোমান্টিক ঘটনা, এই রকম রোমান্টিক ঘটনা সবাই প্রেমিকার সাথে ভাগাভাগি করে নিতে চায়। শুধু বাস কনট্রাকটর আর হেল্পার দুজনেই ঘটনাটায় দারুণ মজা পায়, হাসা-হাসি করে আর বেকুব লোকটা বলে আফসোস করে। একটু ধাক্কা খেয়ে কেমনে এমনে কেউ পইড়া যাইতে পারে এইটা তারা বুঝতে পারতাছিল না তখনো।
আমি আর কিছুই ভাবতে পারলাম না।
সাদা শার্ট ততক্ষণে খুলি আর মগজের রক্ত বেয়ে নোংরা হয়ে গেছে। ভরদুপুর বলেই হয়তো রাস্তা পুরা ফাঁকা। কোথাও কোন গাড়ি নেই এবং মানুষও। এই এম এ জেন্টলম্যান, অল এলোন হেয়ার, হেয়ার অন দিস রোড; আর তাতে খুব অপমান হল। রাস্তায় পরে যাবার অপমান। রাস্তায় পরে থাকার অপমান। সাদা শার্ট নোংরা হবার অপমান। কুৎসিত মানুষ হবার অপমান। গরীব হবার অপমান। এবং সবশেষে সিদ্ধান্তহীনতার অপমান। এই সকল অপমান আমাকে চেপে ধরলো, মুহূর্তেই মরে যেতে ইচ্ছে করলো। ক্রমাগত সিদ্ধান্তহীনতায় নিজেকে বার বার কুৎসিত মনে হল।
সেই দিনই প্রথম ঘটনাটা ঘটলো, এমন কাহিনী আমার বারান্ধায় আগে আর দেখি নাই। আসলে আমার বারান্ধায় না তবে আমার বারান্ধা থাইকা পাশের যে ছয় তালা বিল্ডিং দেখা যায় সেইটায়; গত ছয় সপ্তায় এই বিল্ডিং আমার মুখস্থ হইয়া গেছে, প্রতি তালায় চারটা কইরা পরিবারের আবাসন ব্যবস্থা থাকায় পুরা ছয় তালায় চব্বিশ পরিবার থাকে আর ছয় তালার উপরে চিলেকোঠায় দুইটা পরিবার থাকতে পারলেও একটা পরিবার আছে আর একটা বাসা খালি পইড়া আছে, কোন তালায় কে থাকে আর কি করে এইটা এখন আমি চোখ বন্ধ কইরা বইলা দিতে পারি, যারা বি শিফট ডিউটি করে তারা রাইতে আইসা গরম পানি কি ঠাণ্ডা পানি দিয়া গোসল কইরা ঘুমায়। দিনের কোন প্রহরে কোথায় কি ঘটনা এইটা আমি জানি, আর কার বাড়িতে আজ কি সালুন সেইটা উত্তরের বাতাসে আমার ঘরে আসেই আসে, প্রতিদিন আসে। আর এই জন্যই বললাম এই রকম ঘটনা গত ছয় সপ্তাহে আর ঘটে নাই; ঘুম থেকে জাগরণ, আবার ঘুমে যাওয়া অবধি যেহেতু আমার আর কোন কাম-কাজ থাকে না ফলে আমি কখনো বারান্ধা এমনকি জানালায় দাড়িয়ে সময় পার করে দেই আর শারীরিক শ্রম একেবারে না থাকায় দিনে শুধু মাত্র একবার কার্বোহাইড্রেট গ্রহণের কারণে আমার দৈনন্দিন অবসর সময় আরো বেরে যায় এবং সেই অতিরিক্ত সময়, সবসময় বারান্ধায় কি জানালায় দাড়িয়ে থাকি। ছয় তালা দেখি, ছয় তালার দেয়ালে শ্যাওলা দেখি।
জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানের গা ঘেঁসে যেহেতু আমার বর্তমান আবাসন তাই ছয় তালা বাড়ির পাশে একাশিয়া গাছও দেখি, সাথে থাকে ছাতিম, ছাতার মতো দেখতে যে গাছটা। একটু দূরেই থাকে দেবদারু আর ইউক্যালিপটাস; অশোক, কৃষ্ণচূড়া, নাগেশ্বর আর বহেরা আরো দূরে সেগুন, মেহগনি তবে এর থেকে আর বেশী দূরে আমার বারান্ধা থেকে দেখা যায় না এবং যেহেতু আমি একাশিয়া আর ছাতিমের উচ্চতা সমান্তরালে আবাসন করেছি ফলে একাশিয়ার চূড়া দেখি আর বাতাসে তার দুলন দেখি, মার্চ মাসের ঝড় দেখি আর বৃষ্টির উলম্বন পতন দেখি আর এই সব করে করে পুরা সময়টা একাশিয়া কিংবা আকাশ মনির পাতা মুখস্থ হয়ে যায় আমার, কেমন যেন পাঁচ দিনের চাঁদের মতো চিকন আকৃতি, প্রকৃত সবুজ আর ঝরে পরে বাদামী হয় অথবা বাদামী হয়ে ঝরে পরে লাল মাটিতে। দিনের কোন সময়ে ছাতিম গাছ কি ভাবে আর একাশিয়ায় কেন কোনো পাখি বাসা বাঁধে না এই সব আমার জানা হয়ে গেছে গত সপ্তায়, জানালার পাশে দাড়িয়ে দাড়িয়ে। আর এই জন্যই বললাম; সেই দিনই প্রথম ঘটনাটা ঘটলো, এমন কাহিনী আমি আমার বারান্ধায় কখনোই দেখি নাই আগে।
উত্তর থেকে দক্ষিণে কা কা করে ঝাঁক বেঁধে কাক উড়ে গেলে কিম্বা মাথার উপর চক্রাকারে ঘুরপাক খাইলে, এটা যে বিপদ আগমন নির্দেশ করে তা জ্ঞান করতে কিঞ্চিত আক্কল যথেষ্ট; সেই রকম একটা আক্কল কাণ্ডে আবিষ্কার করলাম, পঁচিশ কি ছাব্বিশটা কাকা আমার মাথার উপর চক্রাকারে ঘুরতে লাগলো, শুরুতে মনে হলো ঘুম কাতুরে কাকের দল ঘর ছাড়তে বিলম্ব হেতু দিনের এই প্রহরে খাবার অন্বেষণে বাহির হইছে, কিন্তু খানিক পর ধারনা পাল্টে যায় যখন সেই কাকের দল আবার মাথার উপর পুনরায় ফিরে আসে, এইরূপ কয়েকবারের পর আমি নিশ্চিত হইলাম কাক পাল আমার মাথার উপর ঘুরতেছে, ওরা কোথাও যাইতেছে না, মাথার উপর চক্রাকারে ঘুরপাক খাইতেছে। আমি চিন্তায় পইড়া গেলাম। মহা চিন্তা। আগত বিপদ কি হতে পারে তা মনে মনে ভাবতে লাগলাম।
ঘটনা চক্রে কাকের দল আমার মাথা অতিক্রম করে পাশের ছয় তালার ছাদে বসে যখন কা কা করছিলো তখন নিজের বিপদের আশংকা একটু দ্রবীভূত হলেও নতুন আশংকা মগজ দখল করলো! তিল তালার বৃদ্ধা কি তাহলে আজ মারা যাবে? পাঁচ তালার লোকটা গার্মেন্ট থেকে হয়তো আর কোন দিন বাসায় ফিরে গোসল করবে না; গত সপ্তাহে জন্মানো বাচ্চাটার জন্ডিসের কি অগ্রগতি? আর চিলেকোঠার নতুন দম্পতি কি ঠিক আছে?
ইয়োহান সিভাস্টিয়ান বাখ্ জার্মান দেশে থাকতেন আজ সকালটা শুরু হয়েছিল তার পিয়ানোর সাথে আর এই ঘটনা আমার বাসায় ঘটে নাই কোন দিন এর আগে। তার পিয়ানো শুনতে শুনতে জানালায় দাঁড়াইয়া যখন একাশিয়া দেখতাছিলাম তখনই এই ঘটনাটা ঘটলো, এমন ঝাঁকে ঝাঁকে কাকা আমি দেখি নাই এর আগে। মাটিতে পিপড়ার লাইন দেইখা অবাক হলাম, এই উচ্চতায় পিপড়া কি করে আসে ভাবনা সরাইয়া, লাইন ধইরা ওরা কি খায় খোঁজ করতে যাইয়া দেখলাম গত রাতে যে সকল মশা আমার রক্ত খাইয়া আর উড়তে পারতাছিল না, পিপড়াগুলা সেই মশা খাইতেছে, আমার রক্ত খাইতেছে।
আমি সিভাস্টিয়ান বাখ্ বন্ধ করলাম। কাকগুলো যেন অস্থির হইয়া গেল, কাকের অস্থিরতা আমি কখনো দেখি নাই আগে; খানিক পরে আবার পিয়ানো বাজাইয়া দিলাম, বাখ্ শুরু হইলো পিপড়া লাইনে চলতে শুরু করলো আর কাকগুলা স্থির বইসা গেল।
সময়ের সাথে সাথে মিউজিক যখন আরো ঘনীভূত হইতে লাগলো, কাকগুলা আমার বারান্ধায় আইসা মাথা দুলাইতে লাগলো আর আমি সেই কখন বাখ্ শুনতে শুনতে আবার ঘুমাইয়া পরছি, মনে নাই। এইরকম ঘুম থেকে উইঠাই আবার ঘুমানের ঘটনা আগে আর ঘটে নাই কোন কালে।
আজকাল রিক্সা চালকদের সাথে আগের মতো আর সখ্যতা নাই; রিক্সায় চড়তে আর ইচ্ছে হয় না ফলে রাস্তায় হাটা শুরু করেছি, আর কয়েক সপ্তাহ পর আবিষ্কার করলাম গত ছয় সপ্তাহে আমার ওজন তিন কেজি সাতশো গ্রাম কমে গেছে আর সেই সাথে আমার মেদ আড়াই ইঞ্চি দেবে গেছে, তাই নীতুর দেয়া কমলা রঙের জামাটা এখন আমার গায়ে ঠিক ঠাক ফিট হয়।
গত বছর আমার জন্মদিনে, নীতু আমাকে একটা কমলা জামা উপহার দেয় আর সেই কারণেই হয়তো নীতুর সাথে এখনো সম্পর্ক টিকে আছে আর গত কাল যখন দেখা করতে নির্দেশ দেয়, তখন সকল মান- অভিমান ভুলে, সেই কমলা জামা পড়ে এই ভর দুপুরে রাস্তায় বের হলাম; রাস্তায় বেড়িয়েই একটা ব্যক্তিগত ঝামেলা দেখা দিল এবং গভীর এক সিদ্ধান্তহীনতায় পড়ে গেলাম। সমস্যা দুইটা এবং তার মধ্যে প্রধান এবং প্রথম সমস্যা, সময়; যে করেই হোক আমি আগামী পঞ্চাশ মিনিটের মধ্য নীতুর সামনে থাকতে চাই আর দ্বিতীয়ত রাস্তায় হেটে হেটে শরীরের ঘাম ঝড়িয়ে, সেই ঘামে ভেজা শার্ট নিয়ে নীতুর সামনে উপস্থিত হতে চাই না ফলে এই মুহূর্তে রাস্তায় দাড়িয়ে না থেকে একটা রিক্সায় উঠে পরার সিদ্ধান্ত নিলাম এবং আসে পাশে কোন রিক্সা না পেলে, অপেক্ষা করলাম এবং অপেক্ষা করতেই থাকলাম।
ডলফিন গলিতে কিছু রিক্সা পাইয়া গেলাম কিন্তু কেউই শামসুন নাহার হলে যাইতে রাজি হলো না; ফলে রিক্সা বিষয়ক পুরাতন বিরক্তি শুরু হইলো, রিক্সা বিষয়ক বিরক্তি সঙ্গে নিয়েই শামসুন নাহার হলে যাইতে চাওয়া রিক্সা খুঁজতে লাগলাম এবং অপেক্ষাকৃত একটা বোকা ও বৃদ্ধ রিক্সা চালক দেইখা, এক লাফে রিক্সায় উইঠাই কইলাম মামা ঘুরাও। বুদ্ধি খাটিয়ে, রিক্সা পেয়ে যাওয়ার এই কৌশল কাজে লাগাতে পেরে নিজের প্রতি নিজের কনফিডেন্স আরেকটু বেড়ে গেল।
মামা রিক্সা ঘুরাইলো এবং চলতে শুরু করলো; বহুদিন পর রিক্সায় উইঠা পুরানো অনেক রোমান্টিকতা এবং স্মৃতি কাতরতা দেখা দিলে তার ধারাবাহিকতায় সামিরা'র কথাও মাথায় আসলো, রিক্সায় বইসা সামিরা'রে লইয়া কত যে সবেদা খাইছি আর নায়ক মান্নারে নিয়া কথা কইছি তা প্রায় ভুইলাই গেছিলাম; সবেদা ফল সামিরা'র খুব প্রিয় ছিল, এখন আর ঢাকায় সবেদা কেন পাওয়া যায় না এইটা একটা গুরুত্বপূর্ণ জিজ্ঞাস হইতে পারে। তো, এইসব স্মৃতি, সুখ আর আবেগে যখন চোখ প্রায় বুজে আসছিল তখন আমি আমার নতুন কিনা লিবাইস এর পকেট থাইকা বন্ড স্ট্রিট সিগারেট বাইর কইরা, হানিফের বাসা থাইকা চুরি করা জিপ্পো দিয়া সিগারেটে আগুন ধরাইয়া, চোখ খুইলা টের পাইলাম আমি কচ্ছপ গতিতে সামনের দিকে আগাইতাছি; আর তখনই আমার মনে পড়লো নীতু মনে হয় রাস্তায় দাঁড়াইয়া আছে, আমি মামারে কইলাম, আরেকটু জোরে চালান।
জোড়ে চালান বইলাই ভাবলাম কথাটা বলা ঠিক হয় নাই, এই বুড়া বেটা আর কত জোড়ে চালাইতে পারবো, ততক্ষণে রিক্সার গতি খানিকটা বাইরা গেলেও নিজের মধ্যে একরকম অপরাধ বোধ কাজ করতে শুরু করলো এবং আমি খানিক পরে কইলাম, মামা জোরে চালানের কাম নাই, আপনি যেমনে পারেন তেমনেই চালান। এই কথা শুইনা সে একটু হাসলো, খানিকটা গতি বাড়াইয়া, আত্মবিশ্বাস নিয়া কইলো, কয়েক মাস আগেও তার কি পরিমাণ শরীরের জোর আর রিক্সার গতি ছিল; অথচ চোখে ছানি পইড়া আর কি কি যেন হইয়া তার জীবনীশক্তি কইমা গেছে, এখন আর আগের মতো জোর নাই।
এই একটা ঝামেলা, রিক্সাওয়ালা রিক্সা চালাইতে চালাইতে যখন কথা বলে তখন আমি কিছু শুনি না কিংবা বুঝি না; কোন রকম হু হা বইলা চালাইয়া দেই, বিরক্ত লাগে। তো রিক্সা মামার জীবনীশক্তি কইমা যাবার গল্প শুনতে শুনতে দেখলাম তার রিক্সা কয়েক বার ডানে-বামে অনিয়ন্ত্রিত টলে যাচ্ছে এবং পরক্ষনেই অভিজ্ঞতা আর রিক্সা-চালনা জ্ঞান কাজে লাগিয়ে তিনি রিক্সার নিয়ন্ত্রণ আনলেও শেষ পর্যন্ত বিপরীত দিক থেকে আসা একটা রিক্সার সাথে পাশাপাশি মৃদু সংঘর্ষ হলে সংঘর্ষে জড়িত অপর রিক্সার অপেক্ষাকৃত তরুণ ড্রাইভার আমার রিক্সা ওলারে বললো, ঐ ব্যাটা তুই কানা নিকি? চোখে দেখছ না? প্রতিউত্তরে আমার ড্রাইভার কইলো; হ, আমি তো কানা ! কিন্তু তুইও কি কানা? তুই দেখস না!
আমি সম্বিৎ ফিরে পাইলাম, ঢাকা শহরে কেন আগের মতো আর সবেদা পাওয়া যায় না, এই ভাবনার ইতি দিয়ে আমার রিক্সা চালকের জবাবে খানিক হাসলাম আর রিক্সায় উঠার আগে তাকে যে বোকা ভাবছিলাম সেইটার জন্য অনুতাপ করলাম, আমার রিক্সাওয়ালা রীতিমত স্মার্ট এবং চটপটে শুধু বয়েসটাই ষাট এর ঘরে। এইসব হাবিজাবি ভাবতে ভাবতে বললাম মামা আস্তে আস্তে যান, তারাহুরা নাই; আর তখন আবার আমার রিক্সাওয়ালা, এইতো কয়েক মাস আগেও তার কি পরিমাণ শরীরের জোর আর রিক্সার গতি ছিল; সেই বিষয়ে স্মৃতিচারণ করতে লাগলো এবং চোখের কোনো এক অপারেশনের কারণে জীবনীশক্তি ক্ষয় হয়ে যাবার গল্প শুরু করলো। সাতশো টাকা লাগবো কিনতে, টাকা পাইবো কই, এইসব সাত সতেরো!
এই একটা ঝামেলা, রিক্সাওয়ালারা রিক্সা চালাইতে চালাইতে যখন কথা বলে তখন আমি কিছু শুনি না কিংবা বুঝি না; কোন রকম হু হা বইলা চালাইয়া দেই। তো আমার রিক্সা মামার জীবনীশক্তি কমে যাবার গল্প শুনতে শুনতে দেখলাম তার রিক্সা আবারো ধীরে ধীরে অনিয়ন্ত্রিত টলে যাচ্ছে এদিক-ওদিক আর এইবার কোন রকম সংঘর্ষ ছাড়াই তিনি রিক্সা ঠিকঠাক নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেও, টানা পঁয়ত্রিশ মিনিট রিক্সা চালানোর কারণে এবং তার জীবনীশক্তি অতীতের তুলনায় হ্রাস পাচ্ছে ভেবে আমি শামসুন নাহার হলে পৌঁছানোর আগেই রিক্সা থেকে নেমে যাবার সিদ্ধান্ত নিলাম এবং মামাকে বললাম রিক্সা থামান।
রিক্সা থামাতে বইলাই ভাবলাম কথাটা বলা বোধহয় ঠিক হয় নাই, লোকটারে অক্ষম হিসাবে বিবেচনা করতেছি কি না এই রকম একটা ভাবনা ভাবতে লাগলাম এবং নিজের মধ্যে এক ধরনের অপরাধ বোধ কাজ করতে শুরু করলো; তিনি আরো কিছুক্ষণ চালাইয়া একটা নির্জন রাস্তায়, এক আম গাছের ছায়ায় রিক্সা থামাইলো, তখন বসন্ত কাল আর আমের মুকুলের গন্ধ কড়া রোদে স্থির হয়েই ছিল যেন সেই গাছ তলায়। চল্লিশ টাকা বাইর কইরা লোকটার হাতে দিলাম আর পরক্ষনেই আমি খেয়াল করলাম আমি কোনো এক অপরিচিত রাস্তায়, কোথাও দূরে আযান হচ্ছিল, আযানের শব্দ চাপা পরে যাচ্ছিল অহেতুক কাকের কোলাহলে, আবার কাকের কর্কশ ছেপে আযান শুনছিলাম চারিদিকে হাজার হাজার! হটাত মনে হলো মাগরিবের আযান, চারিদিকে সন্ধ্যা নেমে এলো অকস্মাৎ। আমি সময় জ্ঞান হারালাম।
অন্ধকারে খুব ভালো দেখা যাচ্ছিল না বলেই, হাতের সবগুলো আঙ্গুল ব্যবহার করে চোখের খুব কাছাকাছি নিয়ে ধরলো টাকাগুলো, বুক ভরে গন্ধটাও নিলো আর তখন প্রথম বারের মত লোকটার মুখ দেখতে পেলাম আমি, হয়তো দেখার সুযোগ হলো।
রোদে পোড়া মুখ আর ঘামে ভেজা কালো কুচকুচে কপাল। মুখ বেয়ে ঘাম ঝরছে, সেই ঘামে চশমার কাঁচ ঝাপসা হয়ে আছে বলে মনে হলো, ঝাপসা চশমার কাঁচ ভেদ করে দেখতে পেলাম লোকটার একটি চোখ নেই; চোখের পাতা বন্ধ এবং বুজে আছে, সেই বুজে থাকা চোখের পাপড়ি কদাচিৎ নড়ে উঠে এবং মনে হয় এখনি চোখ খুলে পৃথিবী দেখবেন কোনো এক ধ্যানরত সন্ন্যাসী, যতটা দেখা যায় তাতে মনে হয় ভীতরে অন্ধকার, গভীর অন্ধকার।
চোখের কোঠর একটি গোল ফাকা শূন্য স্থান; অসীম শূন্যতা নিয়ে পিং পং বল গুজে দেবার মত এটি জায়গা তৈরি হয়ে আছে।
লোকটার প্রতি এক রকমের মমতা তৈরি হল; কোথাও এক ধরনের অসঙ্গতি ঝুলে ছিল ততক্ষণ, যতক্ষণ আমি লোকটার ভালো চোখটাকে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছিলাম, তাই সেই সুস্থ চোখে চোখ রাখতেই দেখলাম যেন, এই চোখটি অপেক্ষাকৃত বড়, স্থির, নির্জীব এবং পাথরের তৈরি একটি সাদা কালো চোখ।
মাঝে মাঝে মনে হয় আজকেই জীবনের শেষ দিন, আর তখনই ডাক্তারের দেয়া সময়ের হুশিয়ারি মনে পরে, বড়জোর আর তিরিশ দিন! তবে এইটা বলা মুশকিল, সবার শরীর একরকমের না, সবাই একরকমের রেসপন্স করে না! এরপরও ডাক্তার বললো হয়তো পাচ্চল্লিশ দিন।
আমি বাসায় কাউকে কিছু বলি নাই, বরং অহেতুক ঝগড়া কইরা চইলা আসছি! সেই ঝগড়ায় মা অসুস্থ শরীর নিয়া অনেক কান্না-কাটি করছে আর বাবা ছিল নিঃশ্চুপ পরবর্তী কয়েক দিন। বান্ধবীরে হটাৎ কইরা কল করা বন্ধ করাতে সে ধইরা নিছে আমি নতুন প্রেমিকা পাইছি, এবং এই ফেসবুক জমানায় সে আজকাল প্রেম বিষয়ক স্ট্যাটাস দিয়া নতুন প্রেমিক জুটানের ধান্ধায় আছে। কাছের বন্ধুদের কাছ থাইকা টাকা লোন করা শুরু করছি ফলে ওরা এখন আমারে এড়াইয়া চলে! আমি রাস্তায় হাঁটা শুরু করি। মিরপুর থেকে সাভার তারপর শ্রীপুর।
আজ রাতে গল্পটার বাকিটুকু লিখবো বলে ভেবে রেখেছি তবে ব্যাপক উত্তেজনায় উপরের লাইন কয়টা প্রকাশ কইরা দিলেই আমার পরিচিত লোকজন, বন্ধু-বান্ধবী, প্রাক্তন প্রেমিকা, স্কুলের সহপাঠী আর আমাদের পারার চা ব্যবসায়ী বাচ্চু সিরিয়াস হইয়া যায়, ওরা সিরিয়াস হইয়া আমাকে বারে বার ফোন দিতে শুরু করে, লোকজনের ফোনের জ্বালায় সুইচ অফ
করে দিলাম ফোন, তাতে নতুন বিপদ হলো, যেহেতু আমি গত সপ্তায় বাসা পাল্টাইছি ফলে সবাই এখনো আমার ঠিকানা জানে না শুধু জানে আমি নতুন বাসায় উঠছি এবং আমার এই ঠিকানা না জানা যেন আমাকে চিরতরে হারিয়ে ফেলার সামিল কারণ তখন তাদের আর আমার সাথে যোগাযোগের কোন উপায় থাকে না, বিষয়টা আরো সিরিয়াস হয়ে গেলে আমার বান্ধবী, বন্ধু, এবং প্রেমিকা একটা সভা করে আমাকে খুঁজে বের করার সিদ্ধান্ত নিয়ে আমার বান্ধবীর যে মামা পুলিশে চাকরি করে তার দ্বারস্থ হয় এবং পুলিশ মামাই এই মুহূর্তের বিপদে তাদের সাহায্য করতে পারবে ভেবে আমার বান্ধবী তার মামার সাথে যোগাযোগ কইরা, ফোন ট্রেক কইরা, আমার বাসার ঠিকানা বাইর কইরা, বাসার নীচে দারোয়ানরে আমার বর্ণনা দিয়া আমার ফ্ল্যাট এ আইসা আমার দরজায় ধাক্কা দিতেই দরজা খুইলা গেলে সোজা আমার রুমে আইসা পরে, আর পরে দেখে আমি এই গল্পের বাকি অংশ লিখতেছি, যেহেতু এইটাই আমার আসন্ন মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে যাবার পর আমার বান্ধবীর সাথে প্রথম দেখা ফলে সে দুর থেকে দৌড়ে এসে আমাকে বুকে জড়িয়ে নিতে চায় এবং আমাকে বুকে জড়িয়ে নেবার আগেই আমার টেবিলে আমার পুরাতন প্রেমিকার ফটো দেখে আমার প্রেমিকা থমকে দাড়ায় আর আমাকে ছোট লোক বলে গালি দিয়ে চলে যেতে চায়, আর তখনই আমি গল্পের পরের অংশ পালটাইয়া ফেলি; এতদূর থাইকা পেরেশান হইয়া যে মানুষটা আমারে দেখতে আসছে তারে আমি লেমন-এইড অফার করি।
গল্পের বাকি অংশটুকু লিখতে পারতেছিনা কারণ এই মুহূর্তে আমার বান্ধবী আমারে ফোন দিয়া জ্বালাইতাছে, কাল বাদে পরশু নাকি ওর জন্মদিন, এই কথা বার বার স্মরণ করাইয়া দিতাছে আর ঢাকা শহরে তার প্রিয় রেস্টুরেন্টের তালিকা শুনাইতেছে, বলতেছে এই সকল রেস্টুরেন্টে সে কোনদিন যায় নাই, আমি বললাম; জন্মদিন উপলক্ষে আমি তোমারে নিয়া একটা গল্প লিখতাছি, দেখবা এই গল্পটাও দারুণ হিট হইবো বাংলা নিউজের সাহিত্য পাতায়! বান্ধবী এইসব বুঝলো না তবে শুধু বললো, এমদাদুল গেট রিড অফ ইউর ফ্যান্টাসি, ইউ আর রুইং ইউর লাইফ, ফ্যান্টাসি আর রিয়েল লাইফ এক না ! হটাৎ ক্ষেপে চিৎকার শুরু করলো আর বললো তুমি আমাকে নিয়া কিছু লিখবা না প্লিজ, আই ওয়ানা গেট রিড অফ ইউ; অনেক সহ্য করছি এতদিন। এই সব গল্প ফেসবুকে ছড়াইয়া গেলে কি হবে বুঝতাছ? শত হোক ওর একটা ইমেজ আছে ফেসবুকে! অথচ আমার বুক খালি কইরা সে জন্মদিনের দিন তার পছন্দের পোলার সাথে ঘুইরা বেড়াইছে, সিনেপ্লেক্সে সিনেমা দেখছে আর গেজেট এন্ড গিয়ার থাইকা একটা স্মার্ট ফোন কিনছে এবং এইটা আমি যখন জানতে পারলাম তখন আমি আবার আমার গল্প পালটাইতে চাইলাম।
বান্ধবী আমার ঠিকানা সবাইরে জানাইয়া দেয় ফলে ওরা প্রতিনিয়ত আমার বাসায় হানা দেয় এবং শরীরের খোঁজ খবর করতে থাকে, কোথায় ব্যথা? কেমন ব্যথা? কবে থেকে ব্যথা? এখন ব্যথা আছে কি না এই সব প্রশ্ন শুনতে শুনতে যখন আমার মাথা ব্যথা শুরু হয় তখন আমি আর বাসায় থাকি না, আমি নয় নাম্বার রোডে হাঁটা শুরু করলাম, হাঁটতে হাঁটতে পার্ক ক্রস করে যেতে থাকলাম কালশী ব্রিজের দিকে তখন দেখলাম সাগুফতা রোডে প্রচুর প্রেমিক প্রেমিকা প্রেম করছে, একসাথে বসে আছে, গল্প করছে আর শুধু ঝাল মুড়ি নয়তো বাদাম খাচ্ছে, এইসব দেখতে দেখতে আমি এক ঝাল মুড়ি ওলার সামনে আইসা মুড়ি খাব বলায় সে আমারে কইলো মামা কাউয়া বিরানির গন্ধ আইতাছে না? আপরে টের পান? আমি কইলাম কাউয়া বিরানি? মানে? কাউয়ার আবার বিরানি হয় নাকি? মুড়ি ওয়ালা কইলো কন কি?! পোল্ট্রি বিরানি পঁয়ত্রিশ টাকা আর কাউয়া বিরানি পঞ্চাশ টাকা মামা, এই আমার সামনের জায়গাটাতেই তো বেচতো কিন্তু এখন অনেকদিন হইছে বেচা বন্ধ, নতুন কোন জায়গায় ব্যবসা খুলছে মনে হয়, এই সব সাত-পাঁচ কইতে কইতে দেখি আমার মুড়ি বানাইয়া হাতে ধরাইয়া দিয়া দিল; আমি কইলাম ছোলা দিছ মুড়িতে? কয় না দেই নাই, আপনেরে দেইখাই মনে হইছে আপনে মুড়িতে ছোলা খান না। আমি দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। আবার হাঁটা শুরু করলাম। বিদায় হবার সময় মুড়ি ওয়ালা কইলো কাউয়া বিরানি কিন্তু শরীরের বল বৃদ্ধি করে, সে মুচকি হইসা কইলো আরো অনেক উপকারও আছে।
বাসায় আইসা প্রচণ্ড মাথা ব্যথা নিয়া লিখতে বসলাম। আর একদিন পর তিশার জন্মদিন! তিশাকে আমি পছন্দ করি, ভালোবাসি কি না জানি না; তবে এইটুকু বুঝি ভালবাসা জন্ম নিতে টাইম লাগে। তিশার কথা মনে হতেই সব উল্টা পাল্টা হইয়া গেল কিন্তু তখন আমি মনোনিবেশ করলাম আবার গল্পে। তিশা আসলে আমার মাথায় বাস করে, আমি যে তিশাকে চিনি সেই তিশার সাথে লালমাটিয়ার তিশার কোন সম্পর্ক নেই ফলে লালমাটিয়ার তিশা যখন আমার সামনে আসে আমি এলোমেলো হয়ে যাই। যেহেতু এই মুহূর্তে তিশার ভাবনায় পরে গেলাম ফলে আমি মুড়ি ওয়ালার কাউয়া বিরানির গল্প শুনে আর বাসায় আসলাম না, পার্কে চলে গেলাম।
আজ তিশার জন্মদিন। পার্কে যেয়ে দেখা হয় মুনিমের সাথে, মুনিম আমার ছোট বেলার বন্ধু। হারিয়ে গেছে অনেক আগে, যাবার সময় বলে গেছে আমি যেন কখনোই ওর সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা না করি। পার্কে যখন একটা খালি বেঞ্চ খুজছিলাম বসার জন্য তখন দেখলাম মুনিম একটা বেঞ্চের এক কোনায় বইসা আছে, আমি আরো কাছে এসে যখন নিশ্চিত হলাম এটাই মুনিম তখন পাশে বইসা পড়লাম আর কথা বলতে চাইলাম ওর সাথে কিন্তু মুনিম কোন কথা বললো না, আমি মুনিমের পাশে বসেই রইলাম, আমি অনেক কথা বলার চেষ্টা কেরও যখন দেখলাম মুনিমের কথা বলার কোন আগ্রহ নেই আমরা চুপচাপ বসে রইলাম আর পার্কে যে পুকুরটা আছে সেইটার দিকে তাকাইয়া রইলাম।
গল্পটা হচ্ছে না, গল্পের কাঠামো হারিয়ে ফেলেছি, বোরিং লাগতেছে তাই একটা সিগারেট ধরিয়ে বারান্ধায় দাড়িয়ে দাড়িয়ে ভাবছি কি লিখবো! তিশাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে ফোন করলাম, বললাম হ্যাপি বার্থ ডে তিশা। তিশা বললো, আই এম ইন এ রিলেশন এমদাদুল।
আমি চুপ হয়ে গেলাম। তিশার সাথে আমার এগারো মাস পরিচয়ের পর এটাই তিশার প্রথম জন্মদিন! আমি কখনো বলি নি আমি তিশাকে পছন্দ করি বরং বলতাম তোমাকে আমি পছন্দ করি না, ভাবতাম কাউকে পছন্দ করি বলাটা এক রকমের মিথ্যে বলা হয়, মানুষ আসলে কেউ কাউকে পছন্দ করে না, করে নাই কোন সময়ে, সবাই সবার, কেউ কারো না অথচ তিশা বুঝলো না প্রতিদিন ফোন করে তোমাকে পছন্দ করি না বলার পিছনে অনেক এফোর্ট থাকে, ভালোবাসা থাকে। তিশা আমার কথাটাই শুনলো কিন্তু আমার আচরণটা বুঝলো না; হয়তো বুঝলো শুধু আমাকে বুঝলো না কিংবা এমনও হতে পারে আমাকে বুঝলো কিন্তু আমাকে চাইলো না। আমাকে বুঝলো বলেই হয়তো চাইলো না!
আমার ঘর প্রায় রাতে কেঁপে কেঁপে উঠে, মাঝে মাঝে ভূমিকম্প বলে মনে হয়, টেলিভিশন চালু করি, খবর দেখি কিন্তু ভূমিকম্পের কোন খবর নাই আর তখন মনে হয় এই বুঝি শেষ, আজকেই হয়তো শেষ দিন, আজকেই জীবনের শেষ দিন! কিন্তু না, আসলে না পরক্ষনেই আশা জাগে এই ভেবে, ডাক্তারের কথা মতো আরো আঠারো দিন আছে আমার হাতে ! যখন সব এলোমেলো হয়ে যেতে থাকে সকল এলোমেলো চিন্তায় তখন মনে পরে "নাথিং লাস্ট ফর এভার" সম্পর্ক বিষয়ক আলোচনায় প্রতীক আমাকে একদিন বলছিলো।
স্থবিরতা তোমায় নীরব করে দিলে, আমাদের বিচ্ছেদ হয় !
দৃশ্যত পৃথিবীতে ফিরে এসে বুঝেছি তুমি আর কেউ নয়।
তোমাকে ঘুমে একা ফেলে যাই, আর দরজা খোলাই থাকে।
আমি কখনো জানতে পারি না, জেগে উঠে আমার প্রয়োজন ছিল কি না !
কারণে অকারণে তোমার স্থবিরতা বৃদ্ধি পেতে থাকলে তুমি আরও নীরব হয়ে যাও
তবুও তোমার নীরবতা আমাকে স্থবির করার আগেই তোমার হাত ধরতে চাই।
উপযুক্ততার অভাবে আমি কৃত্রিম হয়ে থাকি তোমার আশপাশে; চারপাশে।
পুনরায় স্থবিরতা তোমায় নীরব করে দিলে, আজ কবিতা লিখতে বসি !
তোমার স্থবিরতা আমায় নীরব করে দিলে,আমার নীরবতা তোমায় স্থবির করে দেয় ।
আজ দুপুরে ঘুমাইয়া অনেক দিন পরে স্বপ্ন দেখলাম। দেখলাম আমি মৃত মানুষের সাথে কথা বলার একটা প্রক্রিয়া পাইয়া গেছি এবং আমি মুত মানুষের ইন্টার্ভিউ নিতাছি। আরো দেখলাম আমার সামনে অস্থির অবস্থায় বইসা আছে তারেক মাসুদ। তিনি যেন আমার সাথে কথা কইতে চাইতেছেন না।
আমি জিগাইলাম: এমন কি জিনিষ আছে, বিষয় আছে, যা কিনা আজ পর্যন্ত আপনাকে তাড়া করে। আপনি যেই বিষয়ে এখনো ফিল্ম বানান নাই কিন্তু চান্স পাইলে সেই বিষয়ে একটা ফিল্ম বানাবেন?
তিনি আমারে পাশ কাটাইয়া, অন্য কথা কইলেন। কেন যেন আমার কাছে বিষয়টা গোপন করলেন।
ঘুম থেকে উঠার পর থেকে, এই অস্থিরতা আমার এখনো কাটে নাই।
জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক।
আলপিন চিবিয়ে, তবেই; লোহার স্বাদ পেয়েছি।
বৃষ্টি থেমে গেলেও, বৃক্ষপত্র জল ধারণ করে; ফলে
বৃষ্টি অস্তিত্বপূর্ন।
যেহেতু, মানুষ লোহা কিংবা বৃষ্টি না; তাই
মানুষের মনে মানুষ চিরজীবী।
সম্পর্ক ছেদ হয় না; ভেদ হইতে পারে।
০৩জুলাই২০১২
নিরিক্ষা করে তবেই সিদ্ধান্ত পেয়েিছ যে,
আমার উপস্থিতি-অনুপস্থিতি তোমাকে বিচলিত করে নি কখনো।
ফলে ভ্রান্তি দূর হয়ে গেল,
তবুও ত্রিভুজের সকল কোন ১৮০ ডিগ্রী হয় না।
আমার মুখে বলা প্রেম ততটা বিশুদ্ধ নয়
যা তোমার না বলায় সুরক্ষিত
আজ এক বৈড়ালব্রতী, নিজেকে প্রেমিক বলে
আর তুমি আমার-ছলে, দিয়াছ ডুব-সেই কবে!
আজ তাই কনফেশনে খাদ যুক্ত হলে
বিশুদ্ধতা হারায়। মুখো-মুখি নিজের মুখে
বৈড়ালব্রতী ক্রন্দন ঘটে।
১৭ডিসেম্বর২০১১
তুমি একটা পিয়ানো হয়ে যাও বালিকা,
আমার বিছানায় শুয়ে পড়লে
সাদা যে সিলিং চোখে পড়ে
সেখানে ঝুলে থেকো প্রতি রাতে,
আমি ঘুমালেই তবে ফিরে যেও;
তোমার আবাসনে, অন্ধকার, হিম আর আত্মার বয়মে।তুমি একটা পিয়ানো হও প্রেমিকা।
আমি প্রতি রাতে শুনতে চাই তোমাকে।
২.
আমাদের অন্ধকার এই গলিতে
প্রতিরাতে পিয়ানো বাদক আসে তার যন্ত্র হাতে,
আমাদের সিলিং এ ঝুলে থাকে, আর সুর তুলে
সুর আমাদের ঘুম পাড়ায়,
আমাদের সাথে শ্রবণ'এ যুক্ত হয় এতিম ভুতগুলো।ভোর হতেই যন্ত্র বাদক পাড়ি জমায় অন্য পাড়ায়
যেখানে কেবল সন্ধ্যা নামছিল, হয়তো আমেরিকা।
আমাদের তা কখনো জানায় না।
৩.
এই পিয়ানো এই,
এই দিকে এসো, দেখ আমার মুখেটা দেখ;
কি দেখলে ?
এটাকেই মৃত্যু বলে।
১.
বিশ্বাস কর প্রিয়তম,
অামি যাতায়াতে বাদাম খাচ্ছি
তাতে করে অামার শিল্পকলা অারো উন্নত হচ্ছে
বাদামের নরম খোসা ছাড়ানো ততটাই সহজ নয়
যতটা তোমার কোমল চুল ছুয়ে থাকা
ফলে প্রিয়তম, আমার শিল্পগুন গতকাল থেকে বহুগুন বেড়েছে।
২.
অথচ অামার পিতামহ তোমাকে ভালোবেসেছিল,
সেই ভালোবাসার জের ধরেই আমি এসেছি;
আমাকেও তুমি ফিরিয়ে দিতে পার, কিন্তু সাবধান মেয়ে,
আমার উত্তরাধিকার,
পরবর্তীকালে তোমার নিকটে, আবার আসতে পারে!
আজও পায়ে হাটার রাত হোক ,
আজও বাড়ি ফেরার পথে কুকুর ডাকুক;
তুমি সারা রাত উপযুক্ত রোজগারের পর,
তবেই ফিরে এসো প্রিয়তমা
তোমার শরীর এখন আর ভালবাসি না।
অথবা কালকিনীর কাছেই
নেশা করে লুটিয়ে দিও নিজেকে
ফিরে এসো ভোর হলে, দুজনে
পদ্মা যাব, নদ ভ্রমনে। তবু ভালবাসবো না।
এতোদিন পরে, সব ঠিকঠাক হয়ে যাবার পথেই
আমার অজ্ঞানতা, তোমাকে করে প্রতিদিন দিশেহারা
তুমি তাকে প্রেম বল না, প্রেম বল না।
আমি তোমাকে ভালবাসি, যদিও বলি ভালবাসি না।
আজ আমার পায়ে হাটার দিন, রিক্সা চড়বো না।
সকালে রিক্সায় উঠেই মনে হলও কোথাও একটা গণ্ডগোল আছে ! রিকশাওয়ালা ঝড়ের বেগে এবং রীতি মত রাস্তার মানুষজন এবং সকল রিক্সা এবং যানবাহন পাশ কাটাইয়া এমনকি পিছনে ফালাইয়া সবার আগে আমারে নিয়া ছুটলও, তার গতি এমনই ছিল যে, সেইদিন সকালে, সেই রাস্তার, প্রথম রিক্সার যাত্রী আমি হইয়া গেলাম, স্বভাবতই রাস্তা পুরা ফাঁকা আর একদমই নিঃশ্চুপ হইয়া পরলও; কারণ ততক্ষণে আমি সকল কোলাহল এবং মানুষজনরে পিছনে ফেইলা সামনে অগ্রসর হইতেছিলাম, এবং আমি, এই রাস্তায়, একা এবং প্রথম ! আরও কিছুক্ষণ পর দেখলাম ঢাকা শহরের সকল পথচারীর হাতে একটা করে গোলাপ ফুল ! আমি চমকে উঠলাম, ভাবলাম এইটা কোন বাস্তব ঘটনা না, এইটা হইতে পারে না; একটা দুইটা মানুষ কিংবা সকাল বেলার কোন প্রেমিক প্রেমিকার হাতে কদাচিৎ গোলাপ দেখা যাইতে পারে তাই বইলা এই রাস্তার সকল শ্রেণীর, সকল বয়সের এবং সকল লিঙ্গের হাতে একটা করে গোলাপ থাকার মানে কি? এই বিষয়টা যখন আর ভাবতেই পারছিলাম না তখন আমি রিক্সা চালকরে কইলাম, মামা এই রাস্তায় বিয়া লাগছে নাকি? নাকি কোন অফিস পার্টি? ওগো সবার হাতে গোলাপ কেন?
রিক্সা চালক পিছনে ফিরা দাতে দাঁত চাইপা কোন রকম কইলও, আমিতো কইতে পারি না, মামা ! আমি খেয়াল করলাম, তিনি একটি গোলাপ তার দাঁতে কামরে ধরে আছেন।