Sunday, January 20, 2019 । রবিবার , ৬ই মাঘ, ১৪২৫
জীবন-মৃত্যু ও সময়ের মূল্য
কখনো নিজের চোখে শ্মশানে কোনো বডি পুড়তে দেখেছেন?
যে আপনি হালকা ধূপ বা সিগারেটের ছ্যাঁকায় পড়া একটি ছোট্ট ফোসকার যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাবার জন্য ওষুধ লাগিয়েছেন সেই শেষদিন আপনার অবচেতনে আগুনের তাপে আপনার শরীরে শত শত ফোসকা ফুলে উঠবে আর সশব্দে ফাটবে রক্ত ছিটিয়ে।
একটু মাথার ব্যাথায় যেদিন শত কাজ ফেলে রেখে ল্যাদ খেয়েছিলেন ঘন্টার পর ঘন্টা, শেষদিন মাথাটাও শেষে পুড়বে না; ডোম বাঁশ দিয়ে মেরে ফাটাবে নৃশংস শাস্ত্রমতে।
এতদিন এত সাজ পোশাক মেকআপের যত্ন। শেষদিন সবাই আপনার অলক্ষেই আপনার গা থেকে সবটুকু সাজসজ্জা টেনে খুলে নগ্ন করে চিতায় চাপাবে।
একদিন গরম খাবার খেতে পারতেন না বলে মা বা বাবা ফুঁ দিয়ে জুড়িয়ে দিতেন, শেষদিন সেই মাকেই বাবাকেই তার ছেলে জ্বলন্ত অগ্নি মুখে ঢুকিয়ে মুখাগ্নি করবে।
কখনো সচক্ষে কবরে কাউকে মাটির ভিতরে ঢুকিয়ে দিতে দেখেছেন?
লেপের মধ্যে পাঁচ মিনিট থাকলে যেখানে আপনার একদিন দম বন্ধ হয়ে যেতো, সেখানে শেষদিন চিরজীবনের জন্য আপনাকে মাটির ভিতরে চলে যেতে হবে। যেখানে একবিন্দু হাওয়া প্রবেশ করবে না। পোকায় ছিঁড়ে খাবে কুঁড়ে কুঁড়ে পচাগলা দেহটাকে।
ভাবলেই যখন গা শিউড়ে উঠবে, তখন এই পোস্টটিকে হয় লাইক নয় রিপোর্ট মারতে ইচ্ছে করবে।
কারণ আপনি আর কোনোদিন পারবেন না ফিরে আসতে, পারবেন না হেদুয়া বা মানিকতলার মোড়ে দাঁড়িয়ে ফুচকা খেতে, পারবেন না বিরাট কোহলির ব্যাটিং দেখতে, পারবেন না বয়ফ্রেন্ডের সাথে মন খুলে ঝগড়া করতে, পারবেন না দুর্গা পুজোর পাঁচটা দিন হৈ হৈ করে বাঁচতে। পারবেন না বরের বুকের উষ্ণ স্পর্শ পেতে, পারবেন না বউয়ের আদুরে ডাক শুনতে, পারবেন না ছেলেমেয়ের মা-বাবা বলে ডাকতে শুনতে। বন্ধুদের সাথে আড্ডা, মায়ের হাতের শাঁখা পলার আওয়াজ, মাছ-ভাত খাওয়া, বাবার চশমা লুকিয়ে মজা করা, বউয়ের লাজুক চাউনি - এসব আর আপনি উপভোগ করতে পারবেন না।
আজও মনে হয় সিগারেটটা ছেড়ে দিই, মদটা ছেড়ে দিই, যদি দুটো দিন বেশি বাঁচি।
আজও মনে হয় রাস্তার ফুটপাতটাই বেস্ট, হোক না ভীড়, কিংবা গাড়িটা পেরিয়ে যাক তারপরেই পার হবো, হোক না পাঁচ মিনিট লেট। আরো তো কটা বছর এক্সট্রা পাবো।
আজও মনে হয় বাইকের স্পিডটা কমাই, কি হবে মেয়েদের কেদ্দানি দেখিয়ে? আরো তো কটা মাস এক্সট্রা পাবো।
আজও ভয় হয় হাসপাতালে ভর্তি হলে যদি আর ফিরে না আসি?
রোজ রাতে ঘুমাতেও ভয় পাই, যদি সকালে না উঠি?
আজও মনে হয় মানুষ নয় কচ্ছপ হয়ে জন্মালে পৃথিবীটা ৩০০ বছর এক্সট্রা দেখতে পেতাম।
প্রত্যেকটা দিনের সূর্যাস্ত মানে কি জানেন? আপনার জীবনের মোট দিন সংখ্যা থেকে একটি দিন শেষ হয়ে গেল।
ঘড়ির টিক টিক মানে কি জানেন? আপনার মৃত্যুর সেই টাইমার যা ক্রমশ এগোচ্ছে। এবার আপনার ভাগ্যে বেঁচে থাকার কতটা সময় বেঁধে দেওয়া আছে সেটা আপনি জানেন না, হয়তো একশো বছর অথবা আগামী একমাস, একদিন অথবা মাত্র এক ঘন্টা! এর থেকে বড় সাসপেন্স আর কিছুই হয় না।
মৃত্যু আসছেই, তবে কতটা স্পীডে সেটাই কৌতুহল। আসল কথা হল আমরা সবাই স্বর্গ সুখ চাই, কিন্তু কেউ স্বর্গে যেতে চাই না। তাই বেঁচে থাকার লড়াই।
সুইসাইড যে করে সে কাপুরুষ নয় বাবুমশাই, অন্তত আমি মনে করি। মরতেও সাহসের প্রয়োজন। দম না থাকলে মৃত্যুভয়কে আয়ত্তে আনা যায় না। আপনি করে দেখান তো দেখি, পারবেন না বাবুমশাই, পারবেন না। "সুইসাইড যারা করে তারা কাপুরুষ", বা "নরকে জায়গা হয়", কিংবা "এটা পাপ" এই প্রবাদগুলো সৃষ্ট শুধুমাত্র একটি মানুষকে সুইসাইড থেকে বিরত রাখার জন্য আর কিছুই না। কারণ গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলে পড়ার পর সেই অন্তিম দুমিনিটে আপনি বুঝে যাবেন জীবন আসলে কি, কতটা কষ্ট হয় প্রাণ বেরোতে। সেই দু মিনিট আমি হলফ করে বলতে পারি আপনার গার্লফ্রেন্ড, আপনার বউ, আপনার মা-বাবা, আপনার ছেলেমেয়ে, আপনার ফেল করা মার্কশিট কিংবা যার জন্যই সুইসাইড করতে যাচ্ছিলেন কোনওকিছুই আপনার মাথায় আসবে না। পা ছুঁড়তে থাকবেন শুধু নিজেকে বাঁচাতে।
তাই যতটুকু সময় আমরা বেঁচে আছি একটু ভালোভাবে বাঁচতে পারি না? মা-বাবার সাথে তর্কবিতর্ক ঝগড়াটা একটু বন্ধ করতে পারি না? বয়ফ্রেন্ডের সাথে ব্রেক-আপ করব কি না, আর একবার ভেবে দেখতে পারি না? স্বামীর সাথে মানিয়ে চলবার সামান্য সমস্যা হলেই তাকে ডিভোর্স দেওয়ার আগে, আর একবার ভেবে দেখতে পারি না? জীবনটা তো একটু, তাই না বলুন? হাতে সময় খুব কম, একটু মিলেমিশে থাকতে পারি না সবাই? পারি না পৃথিবীটাকে একটু সুন্দর করে গুছিয়ে তুলতে?
লেখাটা লিখতে লিখতে লোমহর্ষক অনুভূতি হচ্ছে। যদি এই লেখার মর্ম কেউ বুঝতে পারেন, জানাবেন, ভালো লাগবে। আপনার এই পোস্টটির ব্যাপারে সচেতন আলোচনা হয়তো কিছু মানুষকে জীবন সম্পর্কে সচেতনতা দিতে পারে, রাজনৈতিক হিংসা খুনোখুনি কিছুটা হলেও বন্ধ করতে পারে, হয়তো কিছু বিয়ে ভেঙে যাওয়া আটকাতে পারে, চিকিৎসার উন্নতি কিছু হলেও ঘটাতে পারে।
জীবনের মূল্য তো সবার বোঝা উচিৎ। তাই নয় কি?
***************************************
ফেসবুকে প্রথম প্রকাশ - 12 August 2018
ছবির প্রাপ্তিস্বীকার: Firstpost, মণিকর্ণিকা ঘাট, বারাণসী।