ইসলাম দেশ গড়ার ক্ষেত্রে সততা, কর্মঠতা, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং দেশের শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনার নির্দেশ দেয়
https://www.youtube.com/watch?v=MWpPNm36OPs দেশ গড়া বিষয়ে ইসলাম কি বলে দেশ গড়া বা রাষ্ট্র গঠনে ইসলাম দেশের প্রতি ভালোবাসা, আনুগত্য এবং সক্রিয় অংশগ্রহণের ওপর জোর দেয়, যাকে ঈমানের অংশ হিসেবে গণ্য করা হয়। কুরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী, একটি টেকসই ও সমৃদ্ধ জাতি বা রাষ্ট্র (বলদাতান তৈয়্যিবাহ) গড়ে তুলতে শান্তি, ন্যায়বিচার, আইনের শাসন এবং সামাজিক কল্যাণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। দেশ গড়ায় ইসলামের মূল দৃষ্টিভঙ্গিগুলো নিচে দেওয়া হলো: • দেশপ্রেম ঈমানের অঙ্গ: স্বদেশের প্রতি ভালোবাসা ও দেশের উন্নতিতে অবদান রাখা ইসলামের দৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ। • ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন: একটি ন্যায়পরায়ণ ও সুশৃঙ্খল সমাজ প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে শরিয়াহ বা আইন অনুযায়ী সকলের অধিকার রক্ষিত হয়। • শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখা: দেশে অস্থিরতা বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। আইন নিজের হাতে না নিয়ে রাষ্ট্রীয় আইনের প্রতি অনুগত থাকা প্রয়োজন। • সমষ্টিগত উন্নয়ন: দারিদ্র্য বিমোচন, সামাজিক কল্যাণ এবং মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে কাজ করা। • দায়িত্বশীল নেতৃত্ব: এমন সরকার বা নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা, যারা জনগণের কল্যাণ ও আস্থার প্রতীক হিসেবে কাজ করবে। সংক্ষেপে, ইসলাম দেশ গড়ার ক্ষেত্রে সততা, কর্মঠতা, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং দেশের শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করার নির্দেশ দেয়।
ইসলামের দৃষ্টিতে দেশ গড়ার চ্যালেঞ্জ বর্তমান বাংলাদেশ নানামুখী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বেকারত্ব ও আয় বৈষম্য সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন করে তুলেছে। ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম ও ঋণখেলাপি সমস্যা অর্থনীতিকে চাপের মধ্যে ফেলছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, মানবাধিকার ও সুশাসনের প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এসব সংকট মোকাবিলায় রাজনৈতিক সহনশীলতা, অর্থনৈতিক সংস্কার ও জনগণের ঐক্য জরুরি। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে একটি নির্বাচনে বিজয় অর্জন কেবল ক্ষমতায় আসার সিঁড়ি নয়; বরং এটি একটি জাতির আমানত গ্রহণের শপথ। সমাজ ও দেশ পরিচালনায় দায়িত্বপ্রাপ্তদের সামনে রয়েছে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ-রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও নৈতিক। ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গিতে রাষ্ট্রক্ষমতা হলো আল্লাহ প্রদত্ত এক মহাদায়িত্ব, যার সঠিক ব্যবহারই শান্তি ও কল্যাণ বয়ে আনে, আর অপব্যবহার ডেকে আনে বিপর্যয়। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার চ্যালেঞ্জ : ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা যেকোনো সরকারের প্রধান দায়িত্ব। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় বিচারহীনতা, প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপ ও সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার প্রাপ্তির দুর্ভোগ একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন আমানত তার হকদারকে ফিরিয়ে দিতে এবং যখন মানুষের মাঝে বিচার করবে তখন ন্যায়ের সঙ্গে বিচার করবে।’ (সুরা নিসা : ৫৮) এই আয়াতের নির্দেশনা হিসেবে সরকারের করণীয় হলো-বিচার বিভাগকে প্রকৃত অর্থে স্বাধীন করা, দুর্নীতিমুক্ত ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা।
দুর্নীতি ও লুটপাটের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ : বাংলাদেশের অন্যতম গভীর সমস্যা হলো দুর্নীতি। ক্ষমতার পরিবর্তনে যদি কেবল লুটপাটের মুখ বদলায়, তবে তা জাতির জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়। রসুলুল্লাহ বলেছেন, ‘যাকে আমরা কোনো দায়িত্বে নিয়োজিত করি, সে যদি এর বাইরে কিছু গ্রহণ করে, তবে তা হবে আত্মসাৎ।’ (সহিহ মুসলিম) অতএব সরকারের জন্য জরুরি হলো-দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণ ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং নিজেদের থেকেই জবাবদিহি শুরু করা।
জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক ও আস্থার সংকট : নির্বাচনের পর অনেক সময় সরকার ও জনগণের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়। শাসক যদি জনগণের কথা না শোনে, তবে সেই শাসন টেকসই হয় না। হজরত ওমর (রা.) বলতেন, ‘ফোরাত নদীর তীরে একটি কুকুরও যদি না খেয়ে মারা যায়, আমি আশঙ্কা করি আল্লাহ আমাকে তার জন্য জিজ্ঞাসা করবেন।’ এই চেতনা থেকেই সরকারের করণীয়-জনগণের কথা শোনা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করা এবং ভিন্নমতকে শত্রুতা হিসেবে না দেখা।
অর্থনৈতিক বৈষম্য ও দারিদ্র্য : দেশের একটি বড় জনগোষ্ঠী এখনো দারিদ্র্যসীমার নিচে। মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব ও জীবনযাত্রার ব্যয় জনগণের জন্য বড় বোঝা। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘যাতে সম্পদ তোমাদের মধ্যে কেবল ধনীদের মাঝেই আবর্তিত না হয়।’ (সুরা হাশর : ৭) অতএব সরকারকে এমন অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ করতে হবে, যা দরিদ্র, শ্রমজীবী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নত করে। প্রশাসনে আমানতদারি ও যোগ্যতা : দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে নিয়োগ রাষ্ট্রকে দুর্বল করে। রসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানের দায়িত্ব গ্রহণ করে এবং যোগ্য থাকা সত্ত্বেও অযোগ্য কাউকে নিয়োগ দেয়, সে আল্লাহ ও তাঁর রসুলের সঙ্গে খিয়ানত করল।’ (মুসতাদরাকে হাকিম) সুতরাং সরকারের জন্য অপরিহার্য- যোগ্যতা, সততা ও দক্ষতার ভিত্তিতে প্রশাসন গড়ে তোলা। সামাজিক ঐক্য ও বিভাজন রোধ : রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, সহিংসতা ও বিভক্তি জাতিকে দুর্বল করে। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমরা সবাই আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ কর এবং বিভক্ত হইও না।’ (সুরা আলে ইমরান : ১০৩) অতএব সরকারের দায়িত্ব হলো-প্রতিহিংসার রাজনীতি পরিহার করে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা। ইসলামের দৃষ্টিতে রাষ্ট্রক্ষমতা কোনো ভোগের বস্তু নয়; এটি একটি কঠিন পরীক্ষা। সরকার যদি ন্যায়, আমানতদারি, জবাবদিহি ও জনগণের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেয়, তবে সেই সরকারই আল্লাহর সাহায্য ও জনগণের ভালোবাসা লাভ করবে। অন্যথায় ইতিহাস সাক্ষী-ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু জুলুমের পরিণতি চিরস্থায়ী লাঞ্ছনা। মহানবী (সা.) বলেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং তোমাদের প্রত্যেককে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ (সহিহ বুখারি) এই হাদিস একটি দেশের সব প্রতিনিধি ও সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা। এর সারমর্ম হলো, সমাজের প্রত্যেক স্তরের মানুষ নিজ নিজ দায়িত্বের জন্য জবাবদিহির অধীন। বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এর তাৎপর্য গভীর। রাষ্ট্রনায়ক থেকে জনপ্রতিনিধি, প্রশাসক, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, অভিভাবক-সবাই নিজ নিজ দায়িত্বে আমানতদার। দুর্নীতি, অবিচার ও দায়িত্বহীনতা যখন জাতীয় অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করে, তখন এই হাদিস স্মরণ করিয়ে দেয়-ক্ষমতা নয়, সেবা; কর্তৃত্ব নয়, জবাবদিহি মুখ্য। পরিবারে নৈতিক শিক্ষা, রাষ্ট্রে ন্যায়বিচার, প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও সমাজে পারস্পরিক দায়বদ্ধতা প্রতিষ্ঠা হলেই দেশ টেকসই উন্নতির পথে এগোবে। দেশ গড়া বা রাষ্ট্র গঠনে ইসলাম দেশের প্রতি ভালোবাসা, আনুগত্য এবং সক্রিয় অংশগ্রহণের ওপর জোর দেয়, ইসলাম দেশ গড়ার ক্ষেত্রে সততা, কর্মঠতা, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং দেশের শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করার নির্দেশ দেয়।
ইসলামের দৃষ্টিতে দেশ গড়ার চ্যালেঞ্জ

















