নীল আকাশে সাদা মেঘের আনাগোনা জানিয়ে দিচ্ছে দুর্গাপুজো এসে গেছে। পূর্ণিমা শেষ হয়ে শুরু হয়ে গেছে পিতৃপক্ষ। চলতি কৃষ্ণপক্ষের শেষদিনে মহালয়া। সারা দেশজুড়ে ওই দিন পিতৃপুরুষের উদ্দেশে তর্পণ করা হয়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে দুর্গা পূজার আগে অর্থাৎ দেবী পক্ষের ঠিক আগেই কেন এই আয়োজন। ত্রুপ শব্দের অর্থ তৃপ্তি। ত্রুপ শব্দ থেকেই তর্পণ শব্দটি এসেছে। এটি একটি বৈদিক পদ্ধতি। ঋষি বৌধায়নের ধর্মসূত্রে তর্পণের বিধি লিখিত আছে। এই মহালয়াকালীন তর্পণে শুধু পিতৃপুরুষ নয় দেবতা, বন্ধুবান্ধব, এমনকী যাঁরা অপুত্রক তাঁদের উদ্দেশেও তর্পণ করা হয়। তর্পণ সারা বছরই করা যায় তবে পিতৃপক্ষে তর্পণের বিশেষ গুরুত্ব। স্বর্গ এবং মর্তের মধ্যবর্তী স্থান পিতৃলোক হিসেবে বিবেচিত। হিন্দুশাস্ত্র অনুযায়ী কোনও মানুষ মারা যাওয়ার পর এক বছরের বাৎসরিক পারলৌকিক সম্পন্ন হওয়ার পর তিনি প্রেতলোক থেকে পিতৃলোকে গমন করেন। এই লোকের অধীশ্বর যম। যিনি মৃত ব্যক্তির আত্মা পিতৃলোকে নিয়ে যান। পুরাণ অনুসারে পিতৃপক্ষের সূচনায় সূর্য কন্যা রাশিতে প্রবেশ করে এবং বিশ্বাস করা হয় এই সময় পিতৃলোক অবস্থিত আত্মা তাঁর আপনজনের কাছে থাকতে পারে যতক্ষণ না সূর্য বৃশ্চিক রাশিতে প্রবেশ করছে। এখানেই পিতৃপক্ষের গুরুত্ব। এই প্রসঙ্গে মহাভারতে খুব সুন্দর একটি উপাখ্যান আছে। কর্ণ মারা গেলে দেবরাজ ইন্দ্র তাঁকে খাদ্য হিসেবে সোনা পরিবেশন করেন। কিন্তু কর্ণের প্রয়োজন ছিল প্রকৃত খাদ্য। তিনি আসল খাবার চাইলে ইন্দ্র তাঁকে জানান যে, তিনি সারা জীবন অন্যেকে সোনা দান করেছেন কিন্তু পিতৃপুরুষের উদ্দেশে খাদ্য বা জল দান করেননি। কর্ণ জানান যে, তিনি তাঁর পূর্বপুরুষের পরিচয় সম্পর্কে অজ্ঞাত। অতঃপর কর্ণ পুনরায় পনেরো দিনের জন্য মর্তে আসেন এবং পিতৃশ্রাদ্ধ সম্পন্ন করেন। সেই পনেরো দিন পিতৃপক্ষ নামে পরিচিত। মার্কণ্ডেয় পুরাণ অনুসারে তর্পণ করলে মানুষের সর্বাঙ্গীন কল্যাণ হয়। অনেকে বলেন মেয়েরা তর্পণ করতে পারে না, কিন্তু শাস্ত্রে এই ধরনের কোনও নির্দেশিকা নেই। এই প্রসঙ্গে বলে রাখি, সূর্য যেমন প্রণামে তুষ্ট হন, শিব যেমন অভিষেকে তুষ্ট হন, গণপতি তেমন তুষ্ট তর্পণে।