অনেক অনেক বছর আগে একটা প্রচলিত গপ্পো শুনেছিলাম, কোনো একজন সাংঘাতিক কম্যুনাল ব্যক্তির কাছে। গল্পটা আমার মতো করে বলি।
একজন ছিল খাস মুমিন আল্লাহর বান্দা, ধরা যাক তার নাম রাশিদ। তার একবার ইচ্ছে হলো সে পয়গম্বরকে দেখবে। যেমন ভাবা তেমন কাজ। সে প্রথমে গেল নিজের মসজিদের ইমামের কাছে। ইমাম সব শুনে বললেন, এ আমার দ্বারা হবে না, তুমি হজ্বে যাও। রাশিদ অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে হজ্বে গেল। কিন্তু কাবাপাথরের সামনে দাঁড়িয়ে কাবাশরীফের বড়ো ইমাম বললেন, রাশিদ, এইসব দর্শনটর্সন আমরা করাতে পারি না। বলতে খুবই দুঃখ হচ্ছে, কিন্তু এসব সিদ্ধাইটিদ্ধাইএর ব্যাপার হিন্দু মালাউন সাধুরা পারে। তুমি নবী রশুলকে চাক্ষুষ দেখার বাসনা ছাড়ো। নয়ত হিন্দু সাধুদের কাছে যাও।
রাশিদ খুবই আতান্তরে পড়ল। কিন্তু পয়গম্বরকে দেখার আকাঙ্ক্ষা তার এতোই প্রবল, যে সে দেশে ফিরে এলো এবং খোঁজখবর করতে করতে কাশীতে এক সাধুর ডেরায় এসে হাজির হলো। সাধু তাকে প্রথমে দূরদূর ছেইছেই করে তাড়িয়ে দিলেন। কিন্তু নাছোড়বান্দা রাশিদের পীড়াপীড়িতে শেষ পর্যন্ত তার কথা শুনতে বাধ্য হলেন। নবীর দর্শন পেতে চায় শুনে সাধু বললেন, আরে ভাগ! তুই হচ্ছিস গোমাংস-ভক্ষক হিঙ্গু-পলাণ্ডুভোজী ম্লেচ্ছশাবক, নবীকে দেখতে হলে স্বর্গে যেতে হবে, তোকে সেখানে ঢুকতে কে দেবে! রাশিদ শুনে কেঁদে আকুল হলো। সাধুর পায়ে পড়ে বলল আপনি যা হয় করুন, যা বলবেন তাই করব, কিন্তু পয়গম্বরকে না দেখলে জীবন বৃথা।
সাধু বললেন, যা বলব, করবি? রাশিদ বলল জান কবুল। সাধু তখন বললেন ঠিক হ্যায়, এক বছর একাহারী থাকবি, শাকান্ন খাবি। গঙ্গাজল ছাড়া খাবি না, দিনে দুবার গঙ্গায় স্নান করবি। ব্রাহ্মমুহূর্তে উঠে গঙ্গাজলে দাঁড়িয়ে সূর্যের স্তব করবি --
রাশিদ আকুল হয়ে বলল, হুজৌর, ঐটে মুয়াফ করুন, সূর্য মালাউন দেবতা, ঐটে পারব না।
সাধু হেসে বললেন আচ্ছা, যা। তোদের নবীকেই স্মরণ করবি, নয়ত আল্লাহু আকব্বর বলবি একশো আট বার। রাশিদ শুনে খুশি হয়ে চলে গেল।
এক বছর পরে রাশিদ আবার এলো সাধুর কাছে। তাকে দেখে সাধু বললেন, বেশ বেশ। চল, যাওয়া যাক। এই বলে সাধু রাশিদকে সঙ্গে নিয়ে ধ্যানে বসলেন। যোগবলে তারা প্রথমে গেলেন ব্রহ্মলোকে। সেখানে গিয়ে রাশিদ দেখলো একজন চারমাথা-ওয়ালা অতি বৃদ্ধ লোক বসে আছে, তার চারপাশে আরো অজস্র বুড়ো বুড়ো লোকজন রয়েছে। কেউ বই পড়ছে, কেউ ধ্যানট্যান করছে, কেউ টুংটাং করে নানারকম বাদ্যযন্ত্র বাজাচ্ছে, স্তবপাঠ করছে। চারমাথার কাছেই একটি অতীব সুন্দরী মেয়ে বসে বসে বীণা বাজিয়ে মধুর কণ্ঠে গান গাইছে। সব শান্ত, সব সাদা। সাধুর সঙ্গে রাশিদকে দেখে চারমাথা বুড়োটা বলল আরে রাশিদ! ভালো আছো তো বাবা? এসো এসো। তা, এখানে কী মনে করে? সাধু বললেন, ঠাকুর, আমাদের রাশিদ পয়গম্বরকে দেখতে চায়। ব্রহ্মা সেই শুনে একটু ফাঁপরে পড়ে গিয়ে বললেন, ওহ! পয়গম্বরকে দেখবে? তা তা তা, ভালো কথা, ভালো কথা। হ্যাঁ বাবা রাশিদ, চা খাবে?
রাশিদ ভাবল বুড়ো মর্কট ঠাট্টা করছে। তার খুব রাগ হলো। সে বলে এক বছর শাকপাতা ঘাসউস খেয়ে আছে, এক টুকরো গোস্ত তক মুখে দেয়নি, এখন নবীজীকে দেখতে এসে এই দেড়েল বুডঢা তাকে চা খাওয়াতে চাইছে! সে প্রচণ্ড ক্ষেপে গিয়ে সাধুকে বলল, আপনি কি আমার সঙ্গে মজাকি করছেন? এই কি চা খাওয়ার সময়? আমি কি চা খেতে এসেছি এখানে এতো কষ্ট করে? না, আমি চা খাবো না।
সাধু বললেন, আহা, চটো কেন রাশিদ! চলো আমরা শিবলোকে যাই। এই বলে সাধু ব্রহ্মাকে প্রণাম করে বিদায় নিয়ে রাশিদকে সঙ্গে করে শিবলোকে গেলেন।
শিবলোকে গিয়ে রাশিদ আরো ঘাবড়ে গেল। সেখানে দুর্গম পাহাড়ের মাথায় ছাই মাখা জটাজুটধারী এক ভীষণাকৃতি দশাসই চেহারার লোক গাঁজা খেয়ে বেদম নাচছে; সঙ্গে প্রচুর সাঙ্গপাঙ্গ। কাছে যেতে রাশিদের প্রাণ ওষ্ঠাগত! ইয়াহ আল্লাহ মেহেরবান! পাগলের মতো নাচছে যারা তারা সব ভূতপ্রেত দত্যি দানো পিশাচ পিশাচী! হাজার হাজার! গম্ভীর গালবাদ্য হচ্ছে, কাড়া-নাকাড়ার সঙ্গে ত্রিশূল ঝনঝনাচ্ছে, পোঁ পোঁ করে শিঙা ফুঁকছে আবার কয়েকটা জ্বিন। রাশিদ কাঁপতে কাঁপতে সাধুকে বললে, এ আপনি আমাকে কোথায় নিয়ে এলেন! আমার পয়গম্বর অতি সুশীল, শান্তিপুত্র! তার পক্ষে কি এই দোজখে থাকা সম্ভব! আপনি আমাকে ঠকাতে চাইছেন!
সাধু দেখলেন মহা ঝামেলা! তিনি বললেন, আহা ঠকাবো কেন রাশিদ! ছি ছি ছি! ঐ দেখো, দূরে মায়ের বাড়ি। আচ্ছা, চলো, এখানে তো বাবা গাঁজায় টঙ হয়ে আছেন, কিছু শুনতে পাবেন না। চলো ওখানে গিয়ে জিজ্ঞাসা করি।
ওরা ভূতের নৃত্য পাশ কাটিয়ে এক শান্ত স্নিগ্ধ আশ্রমে গিয়ে হাজির হলেন। সেখানে পার্বতী বসে বসে বঁটিতে এক ধামা পালং শাক কুটছিলেন, দুই সখী জয়া বিজয়া মৃদু মৃদু গান গাইতে গাইতে ঢেঁকিতে পাড় দিচ্ছিল, জাঁতা পিষছিল। উঠোনে চাট্টি ন্যাংটোপুটো ছেলেমেয়ে খেলে বেড়াচ্ছিল। রাশিদকে দেখে পার্বতী আঁচলে হাতটাত মুছে উঠে এসে মিষ্টি করে বললেন, তা বাছা রাশিদ, কেমন আছো? পথে তোমাদের বাবাকে দেখলে তো? এই কপাল আমার, সারা জীবন জ্বলে পুড়ে ম'লাম। এসো বাছা, বসো। ওরে জয়া, বাছাকে দুটো বাতাসা দিয়ে জল দে।
রাশিদের চোখে জল এলো। এই পরিপূর্ণাঙ্গী মাতৃরূপিণী শান্ত সুন্দরীকে তার বড়ো ভালো লাগল। সে বলল, মা, আপনিই পারবেন। আপনি আমাকে দয়া করুন। আমি পয়গম্বরকে দেখব বলে বড়ো কষ্ট করে এতোদূর এসেছি। আপনি আমাকে তার দর্শন করিয়ে দিন।
পার্বতীর হাসি মিলিয়ে গেলো। তিনি বিপন্ন মুখে বিজয়ার দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে বললেন, অ। পয়গম্বর। আচ্ছা, তাই হোক তবে। ওরে জয়া, জল থাক। রাশিদ চা খাবে।
এইবার রাশিদ কেঁদে ফেলে সাধুর দিকে ফিরে বলল, এখনো বলবেন এসব বুজরুকি নয়?
সাধু তার হাত ধরে টানতে টানতে পার্বতীকে বললেন মা, একটু সামলে নিয়ে ফিরে আসছি, দুটি শাকভাত যেন পাই। তারপর রাশিদকে বললেন তুই কাঁদিস না বাছা, চল আমরা বিষ্ণুলোকে যাই। উনি নিশ্চয়ই পারবেন।
চোখের জল মুছে রাশিদ বিষ্ণুলোকে গেল। সেখানে গিয়ে তো তার চক্ষু চড়কগাছ! সে কী শোভা সেই জায়গার! আকাশে রামধনুর মেলা বসেছে, মাটিতে মখমলি ঘাসে অজস্র ফুল, রুপোর গাছে সোনার পাখি, দুধের ঝরনা বইছে, ঝরনার পাশে রাজঐশ্বর্য হেলায় ছড়ানো রয়েছে। হাজারে হাজারে সুন্দরীশ্রেষ্ঠা হুরীপরীরা নাচছে, গাইছে। রূপে দিক আলো করা দেবতারা ঘুরে বেড়াচ্ছে। এই সবই আবার ম্লান হয়ে যাচ্ছে সবার মাঝে কমলবনে সোনার পদ্মে আসীন পদ্মবর্ণ এক দেবতার জ্যোতির সামনে। তিনি আধশোওয়া হয়ে রয়েছেন, পাশে ততোধিক সুন্দরী একজন সর্বাঙ্গশোভিতা মহিলা বসে বসে গল্পটল্প করছেন। বিশালাকার এক সাপ ফণা বিস্তার করে তাদের মাথার ওপর ছাতা ধরেছে, সখীরা হাওয়া করছে, ফুল এনে দিচ্ছে, স্বর্গসুধার ভৃঙ্গার ধরছে সামনে। এতো ঐশ্বর্য, এতো জাঁকজমক দেখে রাশিদের বড়ো শ্রদ্ধা হলো। সে গুটিগুটি বিষ্ণুর কাছে গিয়ে সেলাম করল। বিষ্ণু লক্ষ্মীকে বললেন, ওগো, একটু ঘুরে বোসো তো। তারপর সহাস্যে রাশিদকে বললেন, কী রাশিদ, পয়গম্বরকে দেখবে? রাশিদ আপ্লুত হয়ে বললে, আপনি অন্তর্যামী! আমাকে দয়া করুন, পয়গম্বরকে দর্শন করিয়ে আমার দ্বীন জীবন ধন্য করুন।
বিষ্ণু বললেন, তা বেশ তো। রাশিদ, চা খাবে?
রাশিদ হতভম্ব হয়ে গেল। সাধু তাকে বললেন, সবাই যখন এতো করে বলছেন, খাওনা বাছা একটু চা?
রাশিদ তখন ঘাড় নেড়ে নীরবে জানালো, সে চা খাবে।
তখন বিষ্ণু সহর্ষে বললেন, হ্যাঁ হ্যাঁ, বিকেলবেলা দিব্যি বাগানে হাওয়াটাওয়া দিচ্ছে, চা খাবার এই তো ভালো সময়। তারপর একটু উঠে বসে গলা তুলে চেঁচিয়ে বললেন,
এ মহম্মদ, চার চায় লানা।
#
#
#
#
ইসে, যাদবপুরের ইফতারিতে চা পরিবেশন হয়েছিল?
যোগাড়িত









