মৃন্ময়ী : পর্ব -৭(অন্তিম পর্ব)
" এমন করে কী দেখছো গো মিনুদি?"
" ঢেউগুলো। কেমন ভাবে আছড়ে পড়ছে , আবার ফিরে যাচ্ছে , আবার নিজের ক্ষমতা বাড়িয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছে সৈকতে,ঠিক তেমনই বিপদ গুলো যেন আছড়ে পড়েছে আমার জীবনে। জীবনে কখনও ভাবিনি এভাবে পালিয়ে বেড়াতে হবে। "
"পালিয়ে অনেককেই বেড়াতে হয় মিনুদি , এ তো শুধু শত্রুকে নিরীক্ষণ করার জন্য, নিজের শক্তি বৃদ্ধির জন্য। এই যে জীবনে এত ঘাত প্রতিঘাত, এরই মধ্যে আত্ম অন্বেষণ করি আমরা, নিজের প্লাস মাইনাস গুলো খুঁজে পাই। তারপর সুযোগ বুঝে মাস্টার স্ট্রোক,তাতেই দেখবে শত্রুর হবে বাজীমাত। "
"কিন্তু এভাবে পালিয়ে আমি তো আদপে সবার মনে সন্দেহ ঢুকিয়ে দিলাম। "
"ঠিক ততদিন সবাই তোমাকে সন্দেহ করবে যতদিন না তুমি সত্যিটা সবার সামনে তুলে ধরছো। "
"আচ্ছা আত্রেয়ী, তুমি তো বিজ্ঞদের মতো বিশ্লেষণ দিচ্ছো, জীবনের যেন অনেক ঘাত প্রতিঘাত পার করে এখানে এসে দাঁড়িয়েছো।
"এটা একদম ঠিক বলেছো মিনুদি। কত আলো আঁধারী রাস্তা পেরিয়ে কুন্তলকে নিয়ে গোছানো সংসার করার সুযোগ পেয়েছি। "
"কুন্তলকে তুমি কতদিন চেনো। "
"আমাদের সম্পর্কটা পাঁচ বছরের। আমার সাথে কুন্তলের দেখা একটা পাবে (pub)। আমাকে আর বাকি কয়েক জন সঙ্গীকে পুলিশ গাড়িতে যখন তুলছে, বুঝতে পারছিলাম না কি হতে চলেছে আমার ভবিষ্যৎ।হয়তো গোটা জীবনটাই হাজতে কাটাতে হবে, হয়তো আরো অন্ধকারে ডুবে যাবো, এমনটাই প্রত্যাশিত ছিল। এ ব্যবসায় আমি নতুন, বিশেষ পরিচিতি নেই, তাই বাকিরা ছাড় পেলেও আমি মুক্তি পেলাম না।"
" তিনদিন পর ছাড়া পেলাম। কুন্তলই বেল করিয়েছিল।হয়তো আমার অসহায়তা দেখে মায়া লেগেছিল।ছাড়া পেয়ে কোথায় যাব জানি না।নষ্ট মেয়ের যে সভ্য সমাজে জায়গা নেই। তার উপর তিন দিন হাজতবাস, এ তো গোদের উপর বিষ ফোঁড়া।কুন্তলের সাথে যোগাযোগ করলাম। কুন্তল আমায় একটা আয়া সেন্টারে কাজ পাইয়ে দেয়। ও একটা লেডিস মেসে আমার খাওয়া থাকার ব্যবস্থা করে দেয়। "
"এরপর বিয়েটা হলো কিভাবে?"
" ওর সাথে সময় কাটাতাম। কিভাবে আমাদের দুজনের ভালোলাগাগুলো এক হতে লাগলো।কুন্তল প্রোপজ করলো একদিন। আমি জানতে চেয়েছিলাম, আমার মত মেয়েকে কেন? কুন্তল বলেছিল, অভাবে অনেক ক্ষেত্রে স্বভাব নষ্ঠ হয়, কিন্তু অতীত থেকে ঠেকে যে নিজের অন্তরাত্মাকে শোধন করে, সেই ভালোর দলেই অন্তর্ভুক্ত। সে রকম একজনকে আজীবনের সাথী হিসেবে পেলে ওর সেই মানুষটিকে আপন করে নিতে আপত্তি নেই। আমার জীবনের এই কালো অধ্যায় কুন্তল নিজের ভালোবাসা দিয়ে মুছে দিয়েছে। আজ অনু আমি, কুন্তল , একে অপরের বেঁচে থাকার অবলম্বন। "
"তোমাদের জীবন সুখের হোক। এমনিতেও তোমরা আমার যা উপকার করলে, তার জন্য আমি যে কিভাবে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করবো, আমি তা বলে বোঝাতে পারবো না।"
"এ কী বলছো মিনুদি। তুমি না থাকলে তো আমি সেদিন..."
"থাক! আমি ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি তোমরা তিনজন যেন আজীবন সুখী থেকো। আমার কি, হয়তো মিথ্যা অপবাদ নিয়েই আজীবন জেলে কাটাতে হবে।"
" তা আমরা হতে দেবো না । তোমার কিছু হতে দেবো না আমরা।"
আজ হঠাৎ প্রাবৃটকে খুব মনে পড়ছে মৃন্ময়ীর। আজ নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার চেয়ে প্রাবৃটের খুনি কে তা জানাটা বেশি দরকার। ফিরে যাবে সে, আজই ফিরে যেতে হবে শহরে, শেষটা দেখতে হলে শয়তানদের সামনে দাঁড়াতে হবে।
***************************************
"একা একা এভাবে কি থাকা যায়। বউ হঠাৎ ঘুরতে গেল , মেয়েটা এতো ছোট। তুমি আপত্তি জানালে না কুন্তল?"
" না স্যার, আমি আপত্তি জানাই নি। তা ছাড়া ও তো একা যায়নি।!ও তো..." বেফাঁস কথাটা বেরিয়ে আসতে থতমত খেয়ে চুপ করে গেল কুন্তল।
"কার সাথে গেছে? " সন্দেহের চোখে তাকায় বিক্রান্ত।
"ওর দূর সম্পর্কের এক দিদির সাথে।"
" আচ্ছা। শোনো, মৃন্ময়ী কয়েক দিন ধরে গা ঢাকা দিয়েছে। দেখো সোর্স লাগিয়ে কোথায় যেতে পারে।"
"শ্রীতমা ম্যাডাম কিছু জানে।"
"মৃন্ময়ীর টিকটিকি আগে ভাগে তাকে সব খবর দিয়ে রাখলে আমি আর কি করে আমার গোয়েন্দা সূত্রে খবর পাই বলো। তা তোমার বউ কোথায় ঘুরতে গেছে কুন্তল।"
"গেছে, আসে পাশে কোথাও। চলে আসবে তাড়াতাড়ি। "
"সে তো আসতেই হবে। তোমায় ছাড়া আর কতদিন থাকবে। আমি অবাক হচ্ছি এই ভেবেই যে বরকে না জানিয়ে বউ বেরাতে চলে গেল, আর বর কোন আপত্তি জানালো না। তোমাদের মতো বরদের জন্য বউগুলো মাথায় চড়ে নাচে। দেখো,হাতের নাগালটা পোক্ত করো, না হলে নিজের বউকে অন্য কোনো পুরুষের সাথে ভেসে বেড়াচ্ছে দেখবো। কামুক মন, মানে না কোন বাধা কুন্তল। সময় থাকতে ব্যবস্থা নাও।"
চোয়ালটা শক্ত করে কুন্তল বলে ওঠে, " চিন্তা করবেন না স্যার। এমন কিছু ঘটবে না। মৃন্ময়ী ম্যাডামের কোনো খবর পেলে আপনাকে অবশ্যই জানাবো, স্যার, আর বিশ্বাস একটা সম্পর্কের ভিত। আমি জানি, আমার স্ত্রী, তাকে দেওয়া স্বাধীনতার অপপ্রয়োগ করবে না। ভালোবাসাটা পারস্পরিক আবেগ আর অনুভুতি নির্ভর, কাউকে আটকে রাখলে সে পোষ্য হয়ে ওঠে প্রেয়সী হতে পারে না। তাই স্বাধীন আকাশে উড়িয়ে দিলেও যদি তার কাছে ভালোবাসা ফিরে আসে আবার তবেই না ভালোবাসার স্বার্থকতা। "
"বাহ। দেখা যাক। সময়ই শেষ কথা বলবে। "
"একদম স্যার। এবার আসি। অনেক কাজ পড়ে আছে।"
" দেখো মৃন্ময়ী কোথায় ঘাপটি মেরে পড়ে আছে! ", এমন সময় বিক্রান্তের ফোনটা বেজে উঠলো। কুন্তল বিক্রান্তের ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এলো।
" একটা মেয়ে এভাবে গায়েব হয়ে গেল তোমরা খবরও পেলে না। এ জন্য কি তোমাকে আমি পুলিশের চাকরি পেতে সাহায্য করেছি। নির্মলটা বেয়াদব ছেলে। আমার কোন কথা ও আজকাল শোনে না। তুমিও দিনে দিনে অপদার্থ হয়ে যাচ্ছো। আমার একটা কাজও ঠিক মত করতে পারো না, বিক্রান্ত। ভরসা করে কাজটা পাইয়ে দিয়েছিলাম। এতদিনের প্রতিশোধ নেয়ার সুযোগ যদি হাতছাড়া হয় ,বিক্রান্ত, আমি কিন্তু কাউকে ছেড়ে কথা বলবো না। "
"গুরুজী, আমি ঠিক খুঁজে বের করবো। বিশ্বাস রাখুন।" "দশদিন দিলাম, তার মধ্যে কাজটা করে দিতেই হবে। মৃন্ময়ীর খোজ আমার চাই। অনেক অঙ্কের হিসেব মেলানো বাকি আছে। সামনের রবিবার আশ্রমে এসো। আলোচনা আছে। নির্মলকেও ডেকেছি।"
"আচ্ছা, রাখো। রবিবার পাঁচটায় তোমার অপেক্ষা করবো।"
*************************************
আশ্রমে ঢুকতেই নির্মল অবিকল নিজের যৌবনের কালের মুখমণ্ডল দেখতে পেয়ে চমকে গেল। কে এই ছেলেটা। পিছন থেকে ফ্যাকাসে গলা ভেসে এলো কানে," এসেছো নির্মল। ভিতরে এসো। "
"ও, আমার প্রিয়তম শিষ্য। তোমায় দেখে বুঝতে পারছি তুমি বেশ অবাক হয়েছো। অবিকল তোমার মত দেখতে, তাইতো। সন্তান যে বহুক্ষেত্রে নিজের পিতার রূপ অবিকল নিজে ধারণ করে থাকে। এ ক্ষেত্রে ও তার অন্যথা হয়নি। তোমার সন্তানকে হুবহু তোমার মতো দেখতে বানিয়েছে ঈশ্বর। তোমার নাম যতই নির্মল হোক, অন্তরটা বেজায় পঙ্কিল। দেখলে ঈশ্বরের এ কেমন লীলা,এমনই সব ঘটনা ঘটালো, যাতে তোমার মনের সমস্ত দ্বন্দ্ব নিমেষে মুছে যায়। "
" ও আমার উজ্জ্বল গুরুজী!"
" হ্যা, তোমার সন্তান। ভাবো তো ও যদি আজ সুচেতনার মত দেখতে হতো, তুমি কি ওর জন্য এত ব্যাকুল হতে?"
"হতে না। সন্দেহ একটা রোগ। এই সন্দেহের বশে কত পরিবার ছারখার হয়ে গেল । একটা ভুল শেষ করে দেয় কত মানুষের জীবন। তুমি ও ব্যতিক্রম নয়। সুচেতনা কিন্তু শেষমেশ জানতে পেরেছিলো ওর সন্তান জীবিত। এই আঘাত ও নিতে পারলো না। যাকে ভালোবেসে ঘর বাঁধলো, সেই এত বড় আঘাত দেবে ভাবেনি। নিজে দুশ্চিন্তার আগুনে দগ্ধ হতে হতে শেষ হয়ে গেল। এবার আসি উজ্জ্বলের কথায়। মা বাপ থাকতেও ও অনাথের মত জীবনযাপন করছিলো। আমি তখন এক নিঃসন্তান শিষ্যকে ওর হদিশ দিই, বলি ঈশ্বরের ইচ্ছে ওরা যেন ওকে সন্তানের মত মানুষ করে।ওরা আমার কথা রেখেছে , আর ওদের আশ্রয়ে উজ্জ্বল স্নেহ ভালবাসায় যত্নে বেড়ে ওঠে, মা বাবার অভাব আর অনুভব করতে হয়নি। তবে, তোমাকে এর শাস্তি পেতে হবে। তোমাকে শাস্তি দেবে তোমার সন্তান। তুই ওর কাছে দোষী, তাই এই পাপে ভরা জীবন থেকে তোকে মুক্তি দেবে উজ্জ্বল। "
" দয়া করুন গুরুজী। উজ্জ্বল, আমি তোর বাবা। এত বড় পাপ করিস না। গুরুজী সম্পর্কে আমি আপনার বোনের... "
" দাঁড়াও, তুমি আমার কেউ নও, তুমি একজন পাপী, আর আজ আমার ভাগ্নের হাতে তোমার মুক্তি। এতদিন তোমাকে বাঁচিয়ে রাখতে হয়েছিল, আমার আরেক শত্রুকে জব্দ করতে।কী হলো উজ্জ্বল, নিজের বাবাকে মারতে কষ্ট হচ্ছে?"
"উনি আমার বাবা নও, আমার সবচেয়ে বড় শত্রু উনি। ওকে শাস্তি দিতে কষ্ট কীসের!", এই বলে উজ্জ্বল একটা ছুড়ি হাতে তুলে নির্মলের গলার উপর চেপে ধরলো, তারপর আস্তে আস্তে নির্মলের গলায় চালিয়ে দিতেই ফিনকি দিয়ে রক্ত ঝরে পড়তে লাগলো। ধীরে ধীরে মাটিতে নেতিয়ে পড়ল নির্মল।
বিক্রান্ত আশ্রমে ঢুকতেই মাটিতে পড়ে থাকা নির্মলের নিথর দেহটা দেখে চমকে ওঠে। গুরুজী (মলয়) ভিতরে ডাকে বিক্রান্তকে।
" বুঝলে, কর্ম বলে একটা বস্তু আছে বিক্রান্ত। যা করবে তাই ভোগ করবে। "
"সে তো ঠিক, তবে ওনাকে এভাবে মরতে হলো কেন সেটা যে বুঝতে পারছি না।"
" সব বলবো, আজ তোমায় সব বলব, বলে একটু হালকা হবো। "
" এক বন্ধু র দয়ায় আমি চাকরি পেয়ে বেশ ভালোই ছিলাম। বন্ধুটির বাড়িতে আমরা ভাড়াটে হিসাবে উঠেছিলাম। বাল্য বয়সে বিশেষ বন্ধু ছিল না,একটু পাগল গোছের ছিলাম, ঠাকুর ধর্মতত্বে অদ্ভুত মাদকতা, কিন্তু তা দিয়ে তো পেট চলবে না। বাবার অবর্তমানে আমার বেকার অবস্থা পূর্বের বাসস্থান ত্যাগ করে তুলনামূলক কম ভাড়ায় এই বন্ধুর আবাসে ভাড়া নিই। বন্ধুটি সম্ভ্রান্ত, বন্ধুটির বখবার নীচ তলাটা ফাঁকা ফেলে রাখার চেয়ে অল্প কিছু অর্থ আয় হওয়ার সুযোগ হাতছাড়া করেননি। বড়লোকদের যে কেন এত লোভ। তারপর সেই বন্ধুটি আমায় ওদের কারখানায় চাকরি দেয়, জীবন বদলে যায় আমার।বাড়ির সবাই ওকে ভগবান ভেবে বসি, কিন্তু ওর মতলব যে কতটা ঘৃন্য কী বলবো। ও ব্যাটা সুযোগ বুঝে আমার বোনকে মাদক খাইয়ে ওর সাথে", এই আব্দি বলে একটু থামে মলয়। বিক্রান্ত বাকিটা শোনার অনুরোধ করলে ও বলে ওঠে, " ব্যাপারটা জানাজানি হওয়ার ভয় ওর বাবা গুন্ডা লাগায় আমাদের শেষ করতে। এসব ঘটনা চক্রে মা অসুস্থ হয়ে পড়ে। বিপন্ন বোন, অসুস্থ মাকে নিয়ে আমি পালিয়ে বেড়াচ্ছি। মনে আশঙ্কা, শত্রুর হাতে পড়ে গেলে কি হবে। কোনমতে এক সহমর্মীর সহযোগিতায় আমরা এক আশ্রমের খবর পাই, ও বলে ওটি আমাদের জন্য নিরাপদ আস্তানা। এক সন্ধ্যায়, গোপনীয়তা অবলম্বন করে আমরা হাওড়া থেকে মেদিনীপুর লোকালে উঠে পড়ি। কি ভাবে , খবর পৌছে যায় শত্রু শিবিরে। ভগবানের অনেক কৃপা আমি মা বোনকে নিয়ে বীরশিবপুর স্টেশনে নেমে কোনমতে পড়ি। সারা রাত স্টেশনে কাটাবো ঠিক করেছি, তখনই, স্টেশনে নেমেই আমার সেই আশ্রমের গুরুদেবের সাথে সাক্ষাৎ। ওনাকে আমাদের সেই হিতাকাঙ্খী আমাদের আসার সংবাদ টেলিগ্রাম করে দিয়েছিলো। উনি অভয় দিয়ে আমাদের ওনার আশ্রমে নিয়ে যায়।আশ্রমের পরিবেশে মনের শঙ্কা দূর হয়ে পরম শান্তি বিরাজ করতে লাগলো। আশ্রমের আরাধনা কক্ষে এক দিকে দক্ষিণা কালির মূর্তি,মধ্যে শিব লিঙ্গ আর আরেক পাশে রাধা মাধবের মূর্তি। বুঝলাম সব ধারার বিশ্বাসী এখানে মিলে মিশে একই লক্ষ্যে অগ্রসর করছে; পরম প্রাপ্তির উদ্দেশ্যে। পরদিন ভোরে গুরুদেব আমাদের আরাধনা কক্ষে আসতে বললেন। এমন অপরূপ দৃশ্য আমি আগে দেখিনি। সমস্ত ঈশ্বর এখানে মিলে মিশে একাকার। শৈব, শাক্ত , বৈষ্ণব আদপে তো মানুষের তৈরি বেড়াজাল। উপলক্ষ্য তো আত্ম অন্বেষণ, যার মাধ্যমে পরম শক্তির সান্নিধ্য লাভ। তার জন্য সাধনা করে তো আমরা অবশেষে আমরা হয়ে উঠি আপ্তকাম, করি মোক্ষলাভ। এখানেই বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেব ঠিক করলাম। "
"গুরুজী, আপনি কি হতে পেরেছেন মোহমুক্ত আপ্তকাম সাধক?"
"এমন প্রশ্ন কেন মনে এলো?"
"আপনি যে এখনো প্রতিহিংসা পরায়ন। প্রতিশোধের স্পৃহায় আপনার সর্বাঙ্গ জ্বলছে যে গুরুজী।"
"আমি আমার গল্প শেষ করিনি, তাছাড়া প্রতিহিংসা পরায়ন মন্তব্যটা করার তাৎপর্য কি? খুনটা কিন্তু আমি করিনি।"
"খুন করেননি হয়তো, তবে আপনি ইন্ধন দিয়ে খুনটা করিয়েছেন । উস্কানি প্রেরক ও কর্মকর্তা দুজনেই সমান দোষী। ঠিক যেমন দুর্যোধন ও শকুনি দুজনেই সমান দোষী ছিল, শকুনির উস্কানিতেই তো দুর্যোধন রাজ্য মোহে অন্ধ হয়ে এত বড় যুদ্ধ বাঁধালো।"
"মহাভারত কতখানি জানো তুমি। একজন চরিত্রকে জানতে হলে তার ভূত ভবিষ্যত জানতে হয়। শকুনির ও উদ্দেশ্য ছিলো, নিজের পরিবারের উপর অত্যাচারের প্রতিশোধ নেয়ার। সে কথা থাক। বাকিটা বলি শোনো। আমরা ওই আশ্রমের স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে গেলাম। ঈশ্বর আরাধনা, আশ্রমে আসা মানুষের সেবা। গুরুদেবের কাছে একান্তে বসে আধ্যাত্মিক চর্চা। এ ভাবে বেশ কাটছিল, আমার বোন ও মানসিক আঘাত থেকে মুক্ত হচ্ছিল। সকাল বিকেল রাধা মাধবের বিগ্রহের কাছে বসে আরতি ,যপ করে দিন কাটাতো। গুরুদেব একটা সম্বন্ধ আনলো বোনের জন্য। ভালো পরিবার, সকলে গুরুদেবের শিষ্য। বিয়ের পর বোনটা একটুকুও শান্তি পেলো না। বিয়ের আগে সতীত্ব হরনের অপবাদে চলতো অকথ্য নির্যাতন। সবাই ওর চরিত্রের দিকে আঙুল তুলছিলো। খবর পেয়ে, আমি ঠিক থাকতে পারছিলাম না। এক রাত্রে আমি ওকে আমারই গুরু ভাইএর সাথে বৃন্দাবনে পাঠিয়ে দিলাম, ওর ইচ্ছেতেই। ওখানে গিয়ে শুরু হলো নতুন অভিযান।"
"বাকিটা আমি বোধহয় অনুমান করতে পারছি, কিন্তু নির্মল বাবুর এমন করুণ পরিণতির কারণ আমি ঠাওর করতে পারলাম না।"
"পুরোটা শেষ হয়নি। এই নির্মলের সাথে আলাপ হয় বোনের বৃন্দাবনে। সময়ের সাথে সম্পর্ক গড়ে ওঠে , বিয়ে হয়। ওদের সন্তান পৃথিবীতে আসে, আর তার কিছুকাল থেকেই ওদের মধ্যে ঝামেলা শুরু হয়। আমি খবর পাই আমারই এক গুরুভাই এর থেকে। বোন কখন কি করছে, কি ঘটছে ওর জীবনে সব খবর আসত আমার সেই গুরুভাই এর মারফত। একদিন জানতে পারি আমার ভাগ্নেটা মারা গেছে। সময়ের সাথে আমার শক্তি বৃদ্ধি পায়, আমার লোকবল বাড়তে থাকে, প্রতাপশালী লোকেদের সাথে যোগাযোগ বাড়ে। আমি ধীরে ধীরে গুরুর পদে অধিষ্ঠিত হই। ততদিনে বোন ও স্বাভাবিক হয়ে গেছে। হঠাৎ একদিন আমি জানতে পারি, বোনের ছেলে জীবিত আছে। "
"মানে, কি বলতে চাইছেন বুঝতে পারলাম না।"
"আমার ভাগ্নে এক রেল দুর্ঘটনায় মারা যায়, এমন একটা খবর আসে। ব্যাপারটা তখন তলিয়ে দেখিনি। পরে ধীরে ধীরে যখন বিভিন্ন নেতাদের সাথে আমার যোগাযোগ বাড়ে, তখনই আমার এক শিষ্য সুবিমলের থেকে জানতে পারি ও জীবিত,ও এক অনাথ আশ্রমে আছে, তার পিছনে আছে আমার সেই পরম মিত্র যার আঁচড়ে আমার বোনের জীবনটা ক্ষত বিক্ষত হয়ে গেছিলো।"
"অরুণোদয়, তোমার আসামী - মৃন্ময়ী, ওর বাবা। নির্মল সম্পর্কে অরুণোদয় এর শ্যালক। এই অরুণকেই আমি আমার বন্ধু ভাবতাম। ও আমার , আমার পরিবারের অসাহয়তার সুযোগ নিয়ে আমার বোনকে..."
"তারপর? আপনার ভাগ্নের সন্ধান পেলেন?"
"জানতে পারি, বারাসাতে এক অনাথ আশ্রমে ও রয়েছে। আমার মাথায় বুদ্ধি খেলে গেল। একজন নিঃসন্তান শিষ্যকে ধীরে ধীরে রাজি করাই উজ্জ্বলকে দত্তক নিতে, গুরুবাক্য ফেলবার জো নেই। অবশেষে অসাধ্য সাধন, উজ্জ্বলের ভবিষ্যত সুনিশ্চিত করে শান্তি পেলাম।"
" আপনার বোনের সাথে দেখা করেছিলেন? আর অরুন বাবুর রহস্যটা কি? "
" ও ব্যাটা লম্পট। আমার বোনের শ্লীলতাহানি করে পয়সার জোরে বেঁচে যায়। ওর জন্য আমার বোনটা তিলে তিলে শেষ হয়ে গেল। ওর পাপের বিচার দেওয়া বাকি আছে।"
"সবাইকে বিচার দেওয়ার ঠেকা কি আপনি নিয়েছেন?", মৃন্ময়ী বলে ওঠে।
বিক্রান্ত তাকিয়ে দেখলো মৃন্ময়ী, অরুণ এসে দাঁড়িয়েছে ওদের অলক্ষ্যে। বলে রাখি, কুন্তল আঁড়ি পেতে বিক্রান্তের কথা শুনেছিল সেদিন, ও প্ল্যান মাফিক বিক্রান্তকে অনুসরণ করে আশ্রম অব্দি মৃন্ময়ী আর অরুণকে নিয়ে আসে।
মৃন্ময়ী বলে চললো," আমার বাবা ভুল করেছে, তার শাস্তিও তাকে ভোগ করতে হবে, কিন্তু তার জন্য তার পরিবারের সবাইকে বিপদে ফেলা কোথাকার বিচার। আমায় বিনা দোষে হেনস্থা! আচ্ছা প্রাবৃটকে কেন মারলেন আপনি। ? " কিছুক্ষণ বাদে মামাকে না দেখতে পেয়ে মৃন্ময়ী বলে ওঠে," আপনার পরম ভক্তকে দেখতে পাচ্ছি না। কই তিনি?"
মেঝেতে পড়ে থাকা নিথর দেহটা দেখে চমকে ওঠে মৃন্ময়ী। বিকট ভাবে হাসির শব্দে বুকটা কেঁপে উঠলো মৃন্ময়ীর।
"পাপের শাস্তি পেয়েছে। তোদেরও পেতে হবে। ভালো হয়েছে তোরাও এসে গেছিস। আজ সব অধ্যায়ের সমাপ্তি চাই। উজ্জ্বল এ দুটোকে নিজের হাতে শাস্তি দে", মলয় বলে ওঠে।
" মলয় তুই ভুল করছিস। আমি দোষ করলে আমায় শাস্তি দে। আমার মেয়েকে কেন?"
"তুই কি ছেড়ে দিয়েছিলি আমার ভাগ্নেকে? দাঁড়িয়ে আছিস কেন, শেষ করে দে এই দুটোকে!"
"না মামা, পিসে মশাই কোন দোষ করেনি, উপরন্তু আমার প্রাণ বাঁচায়। সেদিন আমায় অনাথালয়ে না রেখে আমায় মেরে ফেলতে চেয়েছিল ওই শয়তানটা। উনি কিন্তু আমায় মারেনি। আমি ওনাকে মারতে পারবো না।"
"তুই তবে ওকে শেষ করতে পারবি না ? বেশ। আমিই শেষ করছি এই শয়তানগুলোকে। "
এই বলে এগিয়ে গিয়ে অরুণের গলাটা টিপে ধরলো মলয়। মৃন্ময়ী বাবাকে বাঁচাতে গেলে ওকে এক ঠেলা মারে মলয়, বেগতিক হয়ে পড়ে যায় দালানে যে কুঁয়োটা আছে তার ভিতরে। উজ্জ্বল আর বিক্রান্ত কোনো মতে মলয়কে আটকায় অরুণকে হত্যা করার থেকে। এমন সময় বাইরে অপেক্ষমাণ পুলিশ বাহিনী নিয়ে ভেতরে ঢুকে আসে কুন্তল। কুন্তল ঢোকার মুহূর্তে মৃন্ময়ীকে পড়ে যেতে দেখে কুঁয়োয় ঝাঁপিয়ে পড়ে মৃন্ময়ীকে উদ্ধার করতে উদ্যত হয়। অনেক কষ্টে মৃন্ময়ীকে আর কুন্তলকে উপরে তোলা হয়, কুন্তলের পুলিশ বন্ধুদের সাহায্যে। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে মামীর কথাটা মনে পড়ে মৃন্ময়ীর। জল আর দু চাকার বাহন থেকে সাবধান। মামীর ভবিষ্যত বাণী কতটা নির্ভুল আজ আবার টের পেলো মৃন্ময়ী।
গ্রেফতার হয় মলয়, নির্মলকে হত্যা করা আর অরুণকে খুন করতে যাওয়ার অপরাধে। উজ্জ্বলকে বাঁচাতে মলয় দোষটা নিজের উপর নেয়, যদিও পরোক্ষ ভাবে দোষী
সেই। উজ্জ্বলকে মৃন্ময়ী নিজের কাছে নিয়ে আসে। উজ্জ্বলও মৃন্ময়ীকে দিদি হিসাবে পেয়ে বেশ খুশি। উজ্জ্বলকে যারা দত্তক নেয় তারা দুজনেই গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা যায়।
মৃন্ময়ী নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ায়, ওর শ্বশুর বাড়ি ওকে বাড়িতে ফিরে যেতে অনুরোধ করে, মৃন্ময়ী বাবা আর ফিরে পাওয়া ভাইকে ছেড়ে যেতে রাজি হয়নি। বিক্রান্ত, মৃন্ময়ীকে নির্দোষ প্রমাণিত করতে অনেক সহযোগিতা করে। মিথাইল ফেনিডেটের যে অ্যাক্সিডেন্টের সাথে কোন ভূমিকা নেই, তাছাড়া এটি নিছকই এক দুর্ঘটনায তা প্রমাণ করতে কিছু প্রত্যক্ষদর্শীকে সাজিয়ে কোর্টে আনে বিক্রান্ত। বিক্রান্ত এখন আর কারো হাতের পুতুল নয়, ফলে নিরপেক্ষ থেকে নিজের কেসের সত্যি মিথ্যে বিচার করতে পারে । মৃন্ময়ীও ধীরে ধীরে খুবই ভালো বন্ধু হয়ে উঠেছে বিক্রান্তের, আর মৃন্ময়ীর উদ্যোগেই শ্রীতমার সাথে সাত পাঁকে বাঁধা পড়তে চলেছে।
কুন্তল আর আত্রেয়ীও সুখে শান্তিতে নিজেদের সংসার করছে, অতীতের সমস্ত মলিনতা মুছে ফেলে নিজের মেয়ের জন্য সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত।
**************************************
মামীর চিঠিটা এতদিনে হাতে পেল মৃন্ময়ী। প্রাবৃটের ঘর থেকে নিজের সমস্ত জিনিস পত্র গুছিয়ে নিয়ে আসতে, চিঠিটা ও সাথে করে নিয়ে এলো। না, আর পড়তে ইচ্ছে হলো না মৃন্ময়ীর।কি আর জানার বাকি আছে , শুধু প্রাবৃটের খুনি অধরা রইলো। বিক্রান্ত জানায় মলয়কে জেরা করে জানা যায়, প্রাবৃটকে মারার পরিকল্পনা করেছিল, কিন্তু তার আগেই অন্য কেউ সেই অসাধ্য সাধন করে। প্রত্যক্ষদর্শীরা এক কাপালিককে কালো একটা কুকুরকে লেলিয়ে দিতে দেখেছে।
"আচ্ছা মৃন্ময়ী, তোমার গাড়ির সামনে একটা কুকুর এসে যেতেই অ্যাক্সিডেন্টটা ঘটে তাইতো!"
" জানতে হবে এ কে? কি তার ইতিহাস। প্রাবৃটকেই কেন সে মারতে গেল।"
"আবার আরেক রহস্য। আচ্ছা ওই গাড়িতে যে মিথাইল ফেনিডেটের বোতল পেয়েছিলে, ওটা কি ছিল"
" তোমার বর য়াজ সাফারিং ফ্রম এ ডি এইচ ডি । অ্যাটেন্সন ডেফিসিট হাইপার অ্যাক্টিভিটি ডিসর্ডর। এতে রোগী অস্থির হয়ে ওঠে, কাজে মনোনিবেশ করতে অক্ষম হয়ে ওঠে। প্রচন্ড আবেগপ্রবণ হয়ে ওঠে। ইনভেস্টিগেট করে এই তথ্য যোগাড় করেছি। তুমি জানতে না।"
" না। এটুকু বুঝতাম কিছু একটা টেনসন করতো।"
" দ্যাটস দ্য ক্লু। সামথিং ইজ ফিশি।"
"আমার পাবির খুনিকে ধরতেই হবে বিক্রান্ত।"
"অবশ্যই। খুব জলদি এর রহস্যভেদ করবো।"
এ সব কথা ভাবতে ভাবতেই ড্রয়ারে সযত্নে চিঠিটা রেখে চুপিসারে বাবার ঘরে ঢুকলো, দেখলো এক দৃষ্টিতে উজ্জ্বল ওর বাবার দিকে তাকিয়ে বসে আছে।
"দিভাই, পিসেমশাইকে অনেকক্ষণ ডাকছি, সারা দিচ্ছে না।"
মৃন্ময়ী দেখলো অরুণ গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।
"মানে! সর। বাবা! বাবা!", অনেক বার ডাকতেও সারা দিচ্ছে না অরুণ। মৃন্ময়ী ডাক্তারকে ডেকে আনতে জানতে পারা যায়, কয়েক ঘণ্টা আগেই অরুণ দেহত্যাগ করেছে। ঘুমের মধ্যেই হৃৎযন্ত্র বিকল হয়ে মারা যায়। সবাই মৃত্যুটা স্বাভাবিক জানলেও উজ্জ্বল শুধু জানে মৃত্যুর কারণ কি। উজ্জ্বল মৃদু হেসে সুচেতনার উদ্দেশ্যে বললো, " মা, তোমার দোষীকে শাস্তি দিলাম শেষমেশ।মামা বলেছিল ভালোর মুখোশে খারাপ কাজ করা যায় নির্বিঘ্নে। সেই উপদেশ কি করে ভুলি বলো, তাই সেদিন ওনাকে আরো কিছুটা আয়ু উপহার দিয়েছিলাম। দিভাই ভালো, আমি ওর কোনো ক্ষতি করবো না, কাউকে করতেও দেব না।"
************** (।সমাপ্ত।)********************