যোগ- সংযোগ - ২
পর্ব -১
____________
" ফেলে আসা সময়
ফিরে পাওয়ার প্রত্যাশায়,
কত প্রার্থনা, কত মানত
হাওয়ায় ভেসে যায়,
ঈশ্বরের ঠিকানায়।"
কত দিন ধরে কিছু একটা লিখবো ভাবছি। ডাইরির ছেঁড়া পাতা মাটিতে স্তূপ হচ্ছে। কিছুতেই কিছু ভালো লেখা আসছে না। পাতাটা ছিঁড়তেই যাবো, কিন্তু তখনই মোবাইল ফোনটা বেজে উঠলো।
গলাটা চেনা শোনালো। অনেক দিন যোগাযোগ হীন, তবুও এমন আন্তরিক কন্ঠস্বর খুব কম মানুষেরই হয়।
"কেমন আছো দাদা?"
অরিন ফোন করেছে। বুঝলাম ফেসবুক-এ খবরটা পেয়ে নিজেকে আটকে রাখতে পারেনি। ফোনটা করতে বাধ্য হয়েছে।
"কেমন আর থাকতে পারি?"
"জানি, তোমার কষ্টটা আমি অনুভব করতে পারছি। জানো বছর খানেক আগে আমিও মাকে হারালাম। একটা অণুজীব আমাকে হারিয়ে দিল। "
"ও! জানতাম না, তবে এই ভাইরাস অনেককেই সর্বস্বান্ত করেছে। "
"না জানাটাই স্বাভাবিক। এত গুছিয়ে তোমার মত শোক জ্ঞাপনে আমি সিদ্ধহস্ত নই।"
"বিদ্রুপ করছিস?"
"ছি ছি তোমার শিল্পের আমি কদর করি। তোমার লেখার আমি একজন অনুরাগী। কাকিমার কি হয়েছিল? এই মারণ রোগ কি তাকেও ছোবল মারলো? "
"হার্ট এ্যাটাক। "
"আচ্ছা । তবে আমরা নিশ্চিহ্নর পথে হাঁটছি, যে ভাবে তাণ্ডব চলছে মনে হচ্ছে নির্মূল হতে আর কয়েক বছরের অপেক্ষা। কাকিমা খুব প্রাণবন্ত ছিল। এমন একটা খবর পাবো ভাবতেই পারছি না। "
" এখনো মেনে নিতে পারছি না। কি থেকে কি হয়ে গেল। মানুষ চলে যায়, ফেলে যায় স্মৃতি, যা মনকে তাড়িত করে বিষন্নতার দ্বারে, গ্রাস করে অবসাদ। এ যন্ত্রনা থেকে মুক্তি নেই।"
"জানি। জানো দাদা, আমরা জন্ম থেকে জীবনপুরিতে নিজেদের আপনার জনকে নিয়ে চলতে শুরু করে ধীরে ধীরে প্রত্যাশিত মহাশূন্যের পথে এগোতে থাকি। প্রান্তিক স্টেশনে পৌঁছে গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য দীর্ঘ প্রতীক্ষা। সবারই আসার সময়েই রিটার্ন টিকেট কাটা। শুধু জানিনা, কার ট্রেন কখন আসবে। ধরো, তোমরা সবাই অপেক্ষা করছো, হঠাৎ ই দেখবে ঠাকুরদার ট্রেনটা এসে পড়েছে, তাকে বিদায় জানাতে জানাতেই হুইসেল বাজিয়ে ঠাম্মার ট্রেনটাও এসে পড়েছে। তারপর দীর্ঘ প্রতীক্ষা, হঠাৎ তোমার দাদুর ট্রেন এসে হাজির, দাদু উঠে মাকে ডাক দিল উঠে পড়তে। কিছু লাগেজ পিছনে ফেলে এসেছে, তবে নিয়তির নিয়মে ট্রেন এসে গেলে তো উঠে পড়তেই হবে। মা উঠে পড়তেই যারা রয়ে যাবে পিছনে, একে একে তারা লাগেজগুলো সামলে নেবে। এরকমই এরপর দিদা, কাকা ,মাসি কার কখন যে ট্রেন আসবে কে বলতে পারে। তাই ট্রেনে ওঠার আগে অব্দি যতক্ষণ সবাইকে কাছে পাচ্ছো, সবাই কে ভালোবেসে যাও।"
"আমার ট্রেনটা যেন আগে আসে। "
"সে তো ট্রেনের চালক নির্ধারণ করবে। এই ট্রেনের চালক কে জানো তো? স্বয়ং ভগবান। তোমার কর্ম ট্রেনের গতিবেগ নিয়ন্ত্রন করবে, যত ভালো কাজ করবে, যত ভালোবাসা বিলিয়ে দেবে, ততই তোমার ট্রেনের গতি ত্বরান্বিত হবে। দেখোনা, গার্গীটা এত সবাইকে ভালোবাসা দিলো, তাইতো ওর ট্রেনটা ও কত তাড়াতাড়ি চলে এসে ওকে নিয়ে গেল।"
কথাটা বলার সময় অরিনের গলাটা কেঁপে উঠল। তারপর দীর্ঘ নীরবতা।
"ভালো থেকো দাদা। জানি, কঠিন সময় দিয়ে যাওয়ার কত কষ্ট। তবে, বেঁচে থাকতে, সবাইকে আগলে রাখতে নিজেকে শক্ত করতে হবে। বুঝে নিও দ্বায়িত্ব অনেক বেশি। কাকিমার ইচ্ছেগুলো তোমাকে পূরণ করতে হবে। কে বলতে পারে, হয়তো কাকিমা নতুন বেশে তোমার কাছে ফিরে আসবে। গার্গীর ফেলে রাখা কাজ গোছাতে আমি এতটাই ব্যস্ত ছিলাম যে তোমার সাথে সে ভাবে যোগাযোগ করে উঠতে পারিনি। বৌদি ভালো আছে তো। কাকুর যত্ন নিও। "
ফোনটা কেটে দিলো অরিন। সত্যি মানুষের বেঁচে থাকা আজকাল যেন বিশাল বড় অভিশাপ। চারিদিকে বিশৃঙ্খলা, স্মশানে চিতার আগুন নিভছে না, আপনজন হারানোর আর্তনাদ থামছেনা। এ যেন এক প্রকার বিশ্বযুদ্ধ।
অরিনের জন্যও মনটা বেশ খারাপ হয়ে গেল। অরিন জীবনটা যখনই গোছাতে থাকে, কোন ঝড়ের ধাক্কায় সব গুড়িয়ে যায়। গার্গী হারানোর ব্যথা সামলাতে পারার আগে, আবার মাতৃ বিয়োগ। সত্যিই ভগবান কখনো কখনো ভীষণ নিষ্ঠুর হয়ে ওঠে। আমরা কী সত্যিই কখনো এই দুঃখ কাটিয়ে উঠতে পারবো?











