সুশান্ত দা অনেকক্ষন একটা বোতলের দিকে তাকিয়ে আছে দেখে জিজ্ঞেস করলাম কি ভাবছে। বললো, বোতল ভাঙতে হবে বলে যে আইডিয়া গুলো বোতলের মধ্যে জন্ম নিয়ে বোতলের মধ্যেই থেকে যায়, সেই বোতলগুলোর আদৌ কি কোনো গুরুত্ব আছে!
আমি কিছু না বুঝে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছি দেখে ফিক করে হাসলো। বললাম, খিদে পেয়েছে? কিছু খাবে?
সুশান্ত দা আবার হেসে বললো, বোতল না, সেই আইডিয়াগুলোর কোনো গুরুত্ব আছে? আমি বললাম, আরবান এক্টিভিজম নিয়ে তুমি বলেছিলে বোতল-বিপ্লব, মনে পড়লো। তুমি কেন বলো যে আরবান এক্টিভিজম যে কোনো ভালো আইডিয়ালিস্টিক এক্টিভিজমের পোঙ্গা মেরে দেয়?
-দেয় তো। ভীষণ ভাবে দেয়। দুটো ইজমের নাম তো এক্ষুনি করতে পারি!
- হ্যাঁ আমি জানি কোন দুটো! ওসব থাক। আরবান এক্টিভিজম গুরুত্বপূর্ণ আইডিয়া গুলোকে ভ্যালিডেট করে, এস্টাব্লিশ করে, ন্যারেটিভ তৈরি করে আর বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আরবান এক্টিভিজম ই কিছু আইডিয়ার বেঁচে থাকার একমাত্র উপায়। কেন খারাপ বলছো?
- ওই যে শেষে যে লাইনটা বললি। ওটাই তো খারাপ। বোতল থেকে বেরোতে পারে না। এবং বোতল থেকে বেরোতে না পেরে যে ন্যারেটিভ টা তৈরি হয় সেটা বাস্তব থেকে বহু ক্রোশ দূরে। এই ড্রইংরুম এক্টিভিজম আসলে এক্টিভিজম এর আইডিয়ার একেবারে উল্টোদিকে কাজ করে। সেম সাইড গোল করার মতো।
-বুঝলাম না। তুমি বলতে চাইছো আরবান এক্টিভিজম যে ন্যারেটিভ গুলো তৈরি করে, এবং এস্টাব্লিশ করে মাস সাইকোলজি তে অথবা পাবলিক ডোমেন এ, সেগুলো একচোখা?
-এবং ফ্রিভোলাস! উল্টে এদের তৈরি করা ন্যারেটিভ দিয়ে এরা যাদের বিরুদ্ধে লড়ছে বলে যুদ্ধ করে তারাই আরো ভীষণ ভাবে ম্যানিপুলেট করার সুযোগ পায়। ধর ফেমিনিজম। ইতিহাস ঘেঁটে দেখ, ক্যাপিটালিজম কিভাবে বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে এই আজ, কনজ্যুমারিজম এর চরম যুগেও ফেমিনিজম কে ব্যবহার করেছে!
ঘাঁটলেই বুঝবি ফেমিনিজম নিয়ে শহুরে ন্যারেটিভ গুলোর জন্মদাতা কারা, কিভাবে সেগুলো যুগ যুগ ধরে একটা আদ্যোপান্ত শহর কেন্দ্রিক ফাঁপা প্রপাগান্ডা কায়েম রেখেছে, কিভাবে সেগুলো দিয়ে নারীবাদের কোনো লাভ না হয়ে পুঁজিবাদের হাত আরো শক্ত হয়।
- আচ্ছা। এতে মূল আইডিয়ার এথিক্স তো আর খর্ব হয়ে যাচ্ছে না। এত ম্যানিপুলেশনের মধ্যেও যদি কিছু পলিসি চেঞ্জ, কিছু পাবলিক এডুকেশন বাড়ে তাতে ক্ষতি কি?
- পলিসি চেঞ্জ নাকি! হ্যাঁ পলিসি চেঞ্জ, যেমন শহুরে নিয়মকানুন এ কিছু এদিক ওদিক মেকওভার, কাজের জায়গায় কিছু এক্সট্রা ছুটি, আরবান ফিমেল অন্ত্রপ্রনরদেরএর জন্য কিছু বিশেষ ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফান্ড এই সবই যদি তোর "মূল আইডিয়া" র গোল হয়ে থাকে তবে ঠিক আছে! কিন্তু তা তো না, তাই না? তোর ভাষায় যদি তোর আরবান বিপ্লব সত্যি গ্রাউন্ড লেভেল এ কিছু চেঞ্জ আনতে পেরেছে তবে এই আজ, 2018 তে ভারতে গ্রামাঞ্চলে ধর্ষণ, ফিমেল লিটারেসি, ম্যারিটাল রেপ, বাল্যবিবাহ, পাচার, শিশু শ্রমিক, সম্পত্তির অধিকার এই বিষয়গুলোতে চেঞ্জ দেখিয়ে দে! দেখিয়ে দে কিভাবে বলিউডের পেজ থ্রি কাঁপানো ফেমিনিস্ট অথবা যাদবপুরের ধ্যবড়া কাজল ফেমিনিস্ট দূর সম্পর্কে কোনো ইমপ্যাক্ট ফেলতে পেরেছে কিনা!
যে ন্যারেটিভ গুলো তৈরি হয় শহুরে বিপ্লব দিয়ে তা শুধুমাত্রই শহর কেন্দ্রিক। ফেমিনিজম কে কেন্দ্র করে টিভি এড অথবা সিনেমা, গান গুলো দেখলেই বুঝবি কারা টার্গেট অডিয়েন্স। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ফেমিনিজম=মেল আবিউজ,হেট্রেড আর মিস ইউজ ..এই ন্যারেটিভ তৈরি হয়েছে, হচ্ছে। ঠিক যেন একটা পজিশন অফ পাওয়ারকে রিপ্লেস করে তার জায়গায় অন্য একটা কাউন্টার পজিশন তৈরি করা। কিন্তু যদ্দুর জানি ফেমিনিজম ইজ অল অবাউট ডেস্ট্রইং দ্য ভেরি কনসেপ্ট অফ পাওয়ার, তাই না?
- হ্যাঁ, তাই তো। পজিশন অফ পাওয়ার না থাকলেই তো অপ্রেসন বা ম্যানিপুলেশনের সম্ভাবনা তৈরি হয় না।
-ঠিক। কিন্তু ন্যারেটিভটা উল্টো তৈরি হচ্ছে। এর কারন কি বলে মনে হয়? এই যে ভুল ন্যারেটিভ অথবা ভুল ডেফিনিশন তৈরি হচ্ছে ফেমিনিজম এর মতো একটা ভালো আইডিয়ার, তার দায় কার অথবা কাদের ওপর বর্তায়? কেন একটা আইকন দেখাতে পারিস না যে সারাক্ষন কমপ্লেন না করে, এটা দাও, ওটা আমার বলে চেঁচানোর পাশাপাশি সত্যিই ইনক্লুসিভ সলিউশনের কথা বলছে, রেস্পন্সিবিলিটি নিচ্ছে নিজের, নিজেদের ভুলগুলোর। ওটা আসল ইজম না, এটা আসল এইসব বলে বিশ্ব জুড়ে কমিউনিজম আজ নিজের পেছন বাবুঘাট করে ফেলেছে। তোমার ইডিওলজি এতো মহান যে দায়িত্ব নিয়ে ঠিক বার্তাটা ঠিক ভাবে পৌঁছে দেবার উদারতা তোমার মধ্যে নেই, কিন্তু এলিটিজম আছে! রন্ধ্রে রন্ধ্রে আছে!
-আচ্ছা মুশকিল তো! ধরে নিচ্ছ কেন "শহুরে" আইকনরা সর্বজনীন
ডেভেলপমেন্ট এর ঠেকা নিয়ে রেখেছে! শহরে মেয়েদের সমস্যা নেই নাকি? এখানে ম্যারিটাল রেপ হয় না নাকি ওয়ার্কপ্লেস হ্যাজার্ড নেই নাকি ইক্যুয়াল অপরচুনিটির বৃষ্টি হয়, কোনটা?
-আরে উদ্গান্ডু, এতক্ষন সেটাই তো বললাম। নগরকেন্দ্রিক সভ্যতার নগরকেন্দ্রিক উন্নয়নে আমার সমস্যা নেই। ভালোই তো। আসানসোলে রাস্তা মেরামত সাত বছর আটকে থাকলে শহুরে বুদ্ধিজীবীদের বাল ছেঁড়া যায়। তাদের জন্য পার্কস্ট্রিটে ত্রিফলা আলো লাগিয়ে দিলেই তারা ফেসবুকে ফ্যাসিবাদকে রুখে দিয়েছে বলে পোস্ট দেবে। তোর বালের নগরকেন্দ্রিক সভ্যতার নগর কেন্দ্রিক বিপ্লবের ব্যাপ্তি নেই। এটাই বলছি তখন থেকে। এবং এই ব্যাপ্তিহীনতা গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলনগুলির প্রসার আর প্রতিষ্ঠা দুটোকেই নষ্ট করে, মূল আদর্শ গুলোকে ডিসটর্ট করে। এটাই সমস্যা।
সুশান্ত সমগ্র : নগর বিপ্লব (অংশ বিশেষ)