মানুষের প্রতি কতখানি গভীর দরদ থাকলে একজন শিল্পী এমন গান গাইতে পারেন! কেবল তা-ই নয়, সব গানেই আমজনতার কথা তুলে ধরার জন্য তাঁর গানের মধ্যে সাধারণ মানুষ বার বার নিজেদের খুঁজে পেত। পবিত্র নদী গঙ্গার কাছে তিনি ফরিয়াদ জানিয়েছিলেন, প্রশ্ন রেখেছিলেন গানের ভাষায়, ‘বিস্তীর্ণ দু-পাড়ে অসংখ্য মানুষের হাহাকার শুনেও নিঃশব্দে-নীরবে ও গঙ্গা তুমি ও গঙ্গা বইছো কেন?’
১৯২৬-এর ৮ সেপ্টেম্বর অসমের সদিয়ায় ভূপেন হাজারিকার জন্ম। পিতা নীলকান্ত হাজারিকা, মা শান্তিপ্রিয়া হাজারিকা। পিতা-মাতার দশ সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন সকলের বড়। মাত্র ১০ বছর বয়স থেকেই গান গাওয়া এবং লেখার শুরু। শিশুশিল্পী হিসেবে অসমের চলচ্চিত্রেও কাজ করেছেন বহুদিন। ১৯৩৯-এ মাত্র ১২ বছর বয়সে তিনি অসমীয়া ভাষায় নির্মিত দ্বিতীয় চলচ্চিত্র জ্যোতিপ্রসাদ আগরওয়ালা পরিচালিত ইন্দুমালতী ছবিতে ‘বিশ্ববিজয় নওজোয়ান’ শিরোনামের একটি গান গেয়েছিলেন। পরবর্তীতে তিনি হয়ে ওঠেন অসমিয়া চলচ্চিত্রের একজন নামী পরিচালক। বাংলাদেশ,অসম ও তার প্রতিবেশী পশ্চিমবঙ্গে ভূপেন হাজারিকার জনপ্রিয়তা ছিল ব্যাপক ও বিশাল। অসমীয়া ভাষা ছাড়াও বাংলা ও হিন্দি ভাষাতেও তিনি ছিলেন সমান পারদর্শী এবং অনেক গানও গেয়েছেন। অবশ্য এসব গানের অনেকগুলোই মূল অসমিয়া থেকে বাংলায় অনূদিত।
বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৪৪ সালে বি এ পাস এবং ১৯৪৬ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এমএ পাস করেন ভূপেন হাজারিকা । ১৯৫৬ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি।ব্যক্তিগত জীবনে ভূপেন হাজারিকা কানাডায় বসবাসরত প্রিয়ম্বদা প্যাটেলকে বিয়ে করেন।
অসমিয়া চলচ্চিত্রে সঙ্গীত পরিবেশনের মাধ্যমে গানের জগতে প্রবেশকারী ড. ভূপেন হাজারিকা বাংলা ও হিন্দি ভাষায় গান গেয়ে ভারত এবং বাংলাদেশে খুবই জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন। ড. ভূপেন হাজারিকা তাঁর ব্যারিটোন কণ্ঠস্বর ও কোমলভঙ্গির জন্য বিখ্যাত ছিলেন। অত্যন্ত দরাজ গলার অধিকারী এই কণ্ঠশিল্পীর জনপ্রিয়তা ছিল আকাশচুম্বী। তাঁর গান মানুষকে অধিকার আদায়ের সংগ্রামে উদ্দীপ্ত করেছে। তাঁর রচিত গানগুলি ছিল কাব্যময়। গানের উপমাগুলো তিনি প্রণয়-সংক্রান্ত, সামাজিক বা রাজনৈতিক বিষয় থেকে তুলে আনতেন। তিনি আধুনিকতার ছোঁয়া দিয়ে লোকসঙ্গীত গাইতেন।ভূপেনের জনপ্রিয় কিছু গানের তালিকায় রয়েছে—
আজ জীবন খুঁজে পাবি,
এ কেমন রঙ্গযাদু,
আমি এক যাযাবর,
আমায় ভুল বুঝিস না,
একটি রঙিন চাদর,
ও মালিক সারা জীবন,
গঙ্গা আমার মা,
প্রতিধ্বনি শুনি,
বিস্তীর্ণ দুপারে,
মানুষ মানুষের জন্যে,
সাগর সঙ্গমে,
হে দোলা হে দোলা,
মোরা যাত্রী একই তরণীর,
সবার হৃদয়ে রবীন্দ্রনাথ, চেতনাতে নজরুল, ইত্যাদি।
গানের সঙ্গে সঙ্গেই তিনি ছবি প্রযোজনা আর পরিচালনার কাজও করেছেন– অসমিয়া আর বাংলায়। গান লেখা, সুর করা, ছবি পরিচালনা করা– এসবের জন্য ভূপেন হাজারিকা পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার।
২৩তম জাতীয় চলচ্চিত্র উৎসবে শ্রেষ্ঠ আঞ্চলিক চলচ্চিত্র ‘চামেলী মেমসাহেব’ ছবির সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন (১৯৭৫), পদ্মশ্ৰী (১৯৭৭) , শ্রেষ্ঠ লোকসঙ্গীত শিল্পী হিসেবে অল ইন্ডিয়া ক্রিটিক অ্যাসোসিয়েশন পুরস্কার (১৯৭৯), অসম সরকারের শঙ্করদেব পুরস্কার (১৯৮৭), দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার (১৯৯২), জাপানে এশিয়া প্যাসিফিক আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ‘রুদালি’ ছবির শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত পরিচালকের পুরস্কার অর্জন। তিনিই প্রথম ভারতীয় হিসেবে এই পুরস্কার পান (১৯৯৩), পদ্মভূষণ (২০০১), অসম রত্ন (২০০৯),
সঙ্গীত নাটক অকাদেমি পুরস্কার (২০০৯)।
তিনি ২০১৯ সালে মরণোত্তর ভারতরত্ন সম্মানে ভূষিত হলেও তাঁর পরিবার তা নিতে অস্বীকার করে ।
১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ সালে অল আসাম স্টুডেন্টস ইউনিয়নের উদ্যোগে গুয়াহাটির ডিঘালিফুখুহুরি হ্রদের তীরবর্তী জিএসবি রোডে একটি স্মারক ভাস্কর্য তৈরি করে। বাংলাদেশের ‘সীমানা পেরিয়ে’ ছবিতেও সঙ্গীত পরিচালনা করেন ভূপেন হাজারিকা।
২০১১-র ৫ নভেম্বর কিডনির অসুখে মুম্বাইতে এই জনপ্রিয় সঙ্গীতশিল্পী পরলোকগমন করেন।
সমাজ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ নিয়ে লেখা গানগুলো তাঁকে গায়ক হিসেবে বেশি জনপ্রিয় করে। এক্ষেত্রে গণসংগীতের পুরোধা ব্যক্তিত্ব হবিগঞ্জের কৃতী সন্তান হেমাঙ্গ বিশ্বাসের সান্নিধ্য ও উৎসাহ তাঁকে অনুপ্রাণিত করে। তাঁরই উৎসাহে ভূপেন হাজারিকা ভারতীয় গণনাট্য সংঘে যোগদান করেন। অসমীয় বিলু ভাটিয়ালির সুর গণজাগরণের গানে সার্থক প্রয়োগ করে তিনি হয়ে ওঠেন জনপ্রিয়। নিজ গুণে এ অসমীয় শিল্পী দক্ষিণ এশিয়ার সাংস্কৃতিক জগতের অগ্রদূত হয়ে উঠেছিলেন।