বাংলা ছবির একটা যুগ হলেন বিকাশ রায়
New Post has been published on https://sentoornetwork.com/bikash-roy-is-a-famous-actor-of-bengali-film-industry/
বাংলা ছবির একটা যুগ হলেন বিকাশ রায়
কমলেন্দু সরকার
পরদাজোড়া তেরঙা পতাকা মাড়িয়ে একটি বুট পরা পা হেঁটে এসে স্বদেশী নেতা অজয়কে ব্রিটিশ-ভক্ত পুলিশ অফিসার চিবিয়ে চিবিয়ে বলছে,
“দেখেছ? যাও হেঁটে এস।
Walk on it.”
ওই পুলিশ অফিসারের বলার ধরনের মধ্যে ছিল গা-জ্বলানো এক প্রকাশভঙ্গি। একেবারে যাত্রার ঢঙে নয়। কিংবা পূর্বতন বহু অভিনেতার মতো হাত মুখ নাড়িয়ে বাড়াবাড়ি রকমের শরীরী-অভিনয়ে নয়, একেবারে হলিউডি আদলে। ঠান্ডা মাথার খলনায়ক। ক্রূর হাসি। ইস্পাত-কঠিন কণ্ঠস্বর।
স্বদেশীনেতা অটল অজয় নির্বাক। নিস্পৃহ অজয়ের দিকে তাকিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে অত্যাচারী পুলিশ অফিসার বলে,
“You won’t! Alright! Then take it.”
পুলিশ অফিসারের কণ্ঠস্বরে প্রকাশ পায় এক চরম নৃশংসতা। দর্শক বুঝতে পারেন এবার কি ঘটতে চলেছে। কিন্তু তা কতটা চরম হতে পারে এ-ধারণা করতে পারেন না দর্শক। অজয়ের ওপর অত্যাচার শুরু করে পুলিশ অফিসার। বেধড়ক মারার পর অজয়কে নিয়ে যায় পতাকার কাছে। যে-পতাকা একজন স্বদেশীর কাছে প্রাণের চেয়েও দামি। মাতৃসমা। ব্রিটিশ-প্রেমের সঙ্গে স্বদেশীদের প্রতি ঘৃণা মেশানো অদ্ভুত এক ভঙ্গিতে অত্যাচারী পুলিশ অফিসার বলে,
“Spit on it. I say, spit!”
এতক্ষণে সকলেই বুঝে গেছেন ছবির নাম ’৪২’ । মুক্তি পেয়েছিল ১৯৫১-র অগস্টে। বিয়াল্লিশের ভারত ছাড়ো আন্দোলন নিয়ে এই ছবির পরিচালক হেমেন গুপ্ত। অত্যাচারী খল পুলিশ অফিসার বিকাশ রায়। পরদায় তাঁর ক্রূর অভিনয় দেখে দর্শকেরা নাকি ফুঁসে উঠতেন। এমনকী কেউ কেউ নাকি জুতো ছুড়েও মেরেছিলেন বলে শোনা যায়। বিকাশ রায়ের নির্মম অত্যাচারী পুলিশ অফিসারের অভিনয় দেখে রাগে এবং ঘৃণায় জ্বলে উঠতেন প্রেক্ষাগৃহে উপস্থিত দর্শকেরা। পরে দর্শকেরা ধাতস্থ হলে বিকাশ রায়ের অভিনয়ের প্রশংসা ফিরত মুখে মুখে। বাংলা ছবিতে অভিনেতার প্রতি ঘৃণা এবং প্রশংসা একইসঙ্গে খুব কমজনের ভাগ্যেই জুটেছে। বহু টানাপোড়েনের পর ‘৪২’ মুক্তি পায় ১৯৫১-তে। এ-বছরই বিকাশ রায় আরও দু’টি ছবিতে সমালোচক-দর্শকদের প্রশংসা পান। একটি পরিচালক দেবকী বসুর ‘রত্নদীপ’ অন্যটি পরিচালক অজয় করের ‘জিঘাংসা’। দু’টি ছবির দু’টি চরিত্রই একেবারে ভিন্ন। ‘রত্নদীপ’-এ বিকাশ রায়কে দেখা যায় সৎ, শান্ত, অন্তর্দ্বন্দ্বে জর্জরিত এক ভূমিকায়। ‘জিঘাংসা’ এক হত্যাকারী পাগল অধ্যাপকের চরিত্রে। বিকাশ রায়ের অভিনয়ের এই ধারা পছন্দ করেছিলেন দর্শক।
বিকাশ রায়ের শুরুটা কিন্তু এর কয়েক বছর আগেই। হেমেন গুপ্তের ছবিতেই বিকাশ রায়ের আত্মপ্রকাশ। ছবির নাম ‘অভিযাত্রী’ (১৯৪৭)। হেমেন গুপ্তের ‘ভুলি নাই’ (১৯৪৮) ছবিতে নায়ক প্রদীপকুমারকে ম্লান করে দিয়েছিলেন বিকাশ রায় তাঁর অভিনীত মহানন্দ নামের বিপ্লবী চরিত্রটি। অথচ ছবির শেষে মহানন্দ হয়ে ওঠে পুলিশের গুপ্তচর। বিকাশ রায়ের দু’রকম ভূমিকা ছিল ছবিতে। বাংলা ছবির দর্শকেরা পছন্দ করেছিলেন লম্বা, ছিপছিপে, ঋজু কাঠামো, শক্ত চোয়াল, তীক্ষ্ণ নাসিকার অধিকারী বিকাশ রায়কে। আর ছিল সপ্রতিভ চালচলন আর এক গভীর অন্তর্ভেদী দৃষ্টি৷ দর্শক পছন্দ করেছিলেন বিকাশ রায়ের কণ্ঠস্বরের জাদু। বহু অভিনেতা ম্লান হয়ে গেছিলেন তাঁর পাশে। সুচিত্রা সেনের মতো নায়িকাও!
ম্যাট্রিক পাশ করার পর ভর্তি হয়েছিলেন প্রেসিডেন্সি কলেজে। সেইসময় মাতামাতি করতেন সাহিত্য নিয়ে। তিনি কলেজ ম্যাগাজিনের নিয়মিত লেখক ছিলেন। ‘বেদুইন’ নামে একটি সাহিত্য পত্রিকাও বার করেছিলেন। যদিও আয়ু বেশিদিন ছিল না পত্রিকাটির। পরবর্তী সময়ে তাঁর এই সাহিত্যচর্চা কাজে এসেছিল। তিনি চমৎকার একটি আত্মজীবনী ‘মনে পড়ে’ লেখেন। প্রেসিডেন্সি থেকে গ্র্যাজুয়েশন করার পর আইন নিয়ে পড়লেন। ল’পাশ করার কিছুদিন আলিপুর কোর্টে প্র্যাকটিসও করেন। এখানে যাতায়াতের সুবাদে আলাপ হয় ড্রুকার সাহেবের সঙ্গে। তিনি ছিলেন আইসিএস। ড্রুকার সাহেবের জন্য সিভিল ডিফেন্স পাবলিসিটিতে যোগ দেন। এরপর এলেন অল ইন্ডিয়া রেডিয়োতে। এখানকার পরিবেশে নিজেকে মানাতে পারেননি বিকাশ রায়। তাই ছেড়ে এলেন ডি জে কিমার-এর বিজ্ঞাপন বিভাগে। তারপর সেখান থেকে আবার রেডিয়োতে। এই রেডিয়োর চাকরি তাঁকে অনেককিছু শিখিয়েছিল। বিকাশ রায় এক জায়গায় দাঁড়িয়ে নাকি পাঁচ-ছ’রকম ভঙ্গিতে কণ্ঠস্বরকে ব্যবহার করতে পারতেন। রেডিয়োয় চাকরি করার সময় আলাপ জ্যোতির্ময় রায়ের সঙ্গে। সেই সুবাদে আলাপ পরিচালক হেমেন গুপ্তের সঙ্গে। ঠিক এইসময় বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের একটি কথা ঘুরপাক খেত বিকাশ রায়ের। একদিন রেডিয়ো অফিসের করিডোরে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র বলেছিলেন, “বিকাশ তুমি বরং ফিল্মে যোগ দাও। তোমার হবে।”
হ্যাঁ হয়েছিল, ছবির জগতে বিকাশ রায় হয়ে উঠেছিলেন তিনি। ১৯৪৭ থেকে ১৯৮৭ চল্লিশ বছর দাপটে অভিনয় করে গেছেন। ২৫০টিরও বেশি ছবিতে অভিনয় করেছিলেন। তার মধ্যে ৫০টি ছবির নায়ক তিনি। পঞ্চাশের দশকে করেছিলেন বিকাশ রায় প্রোডাকশনস। প্রথম ছবি ছিল ‘সাজঘর’ (১৯৫৫)। বিকাশ রায়ের বিপরীতে ছিলেন সুচিত্রা সেন। তিনি গোটা আটেক ছবির পরিচালক। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘নতুন প্রভাত’ (১৯৫৭), ‘বসন্ত বাহার’ (১৯৫৭), ‘মরুতীর্থ হিংলাজ’ (১৯৫৯), ‘কেরী সাহেবের মুন্সী’ (১৯৬১), ‘কাজললতা’ (১৯৭৫)। তাঁর পরিচালিত ছবির মধ্যে ‘নতুন প্রভাত’ এবং ‘রাজাসাজা’ (১৯৬০) ছিল নিজের গল্প।
শুধু ছবি নয়, রঙ্গমঞ্চও ছিল বিকাশ রায়ের ভাল লাগার জায়গা। তিনি শিশিরকুমার ভাদুড়ি, অহীন্দ্র চৌধুরী, মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য প্রমুখের সঙ্গেও অভিনয় করেছেন মঞ্চে। ‘চিরকুমার সভা’য় পূর্ণ, ‘প্রফুল্ল’-এ সুরেশ, ‘দুই পুরুষ’-এ অরুণ চরিত্র আজও মনে রেখেছেন বর্ষীয়ান দর্শকেরা। বিশ্বরূপায় ‘চৌরঙ্গী’ নাটকে স্যাটা বোসের ভূমিকায় অসাধারণ অভিনয় করেছিলেন তিনি। তাঁর কাছে এটি চ্যালেঞ্জ ছিল। কেননা, ছবিতে এই চরিত্রটি করেছিলেন উত্তমকুমার। কিন্তু বিকাশ রায়ও অসাধারণ অভিনয় করেছিলেন এই নাটকে। ‘আসামী হাজির’-এও চমৎকার অভিনয় করেন বিকাশ রায়।
বিকাশ রায় বাংলা ছবিতে অন্য ঘরানার অভিনয় নিয়ে এসেছিলেন। অভিনয়ের মধ্যে ছিল তাঁর নিজস্বতা। প্রচুর হলিউডের ছবি দেখতেন। তাঁর অভিনয়ের মধ্যে হলিউডের প্রভাব থাকলেও সেটিকে কখনও মাথা তুলতে দেননি। চমৎকার একটা বাংলার মিশেল করে নিয়েছিলেন। তার সবচেয়ে ভাল উদাহরণ ‘স্মৃতিটুকু থাক’ (১৯৬০), ‘উত্তরফাল্গুনি’ (১৯৬৩), ‘ছদ্মবেশি’ (১৯৭১), ‘ওগো বধূ সুন্দরী’ (১৯৮১) ইত্যাদি। বিকাশ রায়ের অভিনয় স্টাইল একেবারেই ভিন্ন এবং নিজস্ব। তাই পরবর্তী কালে তাঁর ধারায় কাউকে অভিনয় করতে সেইভাবে দেখা যায়নি। বিকাশ রায় ছিলেন বাংলা ছবিতে একটি যুগ।

















