মাহিদের জন্যে ভালোবাসা
ঘুরেফিরে শুধু মাহিদের কথা মনে আসে। ওর ভালনারেবিলিটি, সততা, বিনয়, আগ্রহ, ইনোসেন্স, কথাবার্তা, একশোরকম না মেনে নেওয়াগুলোর সৌন্দর্য মাথা থেকে বের করা কঠিন। একটাসময় ভাবতাম ওর মতো কাউকে দেখে শুভ্র চরিত্র লেখা হয়েছে, আরেকক্ষণে ওর মিষ্টি হাসি দেখে ভাবতাম সে একদিন বিবিসি প্রেজেন্টার ব্রায়ান কক্সের মতো জগতের কঠিন সত্য নিমেষে বলতে জানা কেউ হবে।
একরাতে আমি, মাহিদ এবং আমাদের চেয়ে বয়সে ছোট একজন মিলে সুরমা পাড়ে মিলে দই খাচ্ছি আর গল্প করছি। মাহিদ একঘন্টা হতে চললো দইয়ের প্লাস্টিক পাত্র আর কোথাও ফেলতে পারেনা, তার ধারণা আশপাশে কোথায় ফেললে নদীতে যেয়ে পড়বেনা নিশ্চিত হবার জো নাই। তৃতীয়জন মাহিদের কান্ড দেখে হেসে খুন। এর কিছুদিন পরে জিজ্ঞেস করলাম, "মাহিদ, ভ্যালুজের(সবার ভালোর) জন্যে কমফোর্ট জোন থেকে বেরিয়ে স্যাক্রিফাইস করতে পারে এমন জুনিয়র তোমার সাস্ট পরিমণ্ডলে কি দুয়েকজন চোখে পড়ে?" সে এই কোশ্চেনের একলাইনের উত্তর দিলনা। বহুকথা বলে গেলো যার মূলকথা এরকম যে একেকজন একেকরকম ভালোবোধের জায়গায় স্যাক্রিফাইস করতে জানে এবং তার পরিধিতে এমন উদাহরণের শেষ নাই। ঐ যে দই খাবার ওখানে তৃতীয়জনের অট্টহাসি, বা সে যাদের কথা বলছে যারা অনেক স্যাক্রিফাইস জানে তাদের মধ্যে কতোজনা তার সাথে কতটুকু কাইন্ড ছিলো ব্যবহারে আপনি কক্ষনো তাদের নিয়ে মাহিদের কথা থেকে আন্দাজ করতে পারবেননা। সে সবার ভালোদিক টেনে তুলে ইতিবাচক সম্ভাবনাগুলো সামনে নিয়ে আসতে জানতো।
একদিন তারে পাঠিয়েছি আমার ডিপার্টমেন্টএ এক কাজে। ডিপার্টমেন্ট তাকে বলেছে এখন না, অমুক অফিসে যেয়ে খোজ করুন। সেও তর্ক করেছে এই তথ্য তাকে এখানে বসেই পাবার কথা। ফোন দিয়ে বলছে, "ভাই, এরা নায্য সার্ভিস দেয়া জানেনা। কথা শুনিয়েছি। আমার সাংবাদিক পরিচয় এরা এখনো জানেনা। কোন প্রশ্ন করতে আমার বাধে বলেন?" সাংবাদিক হলে প্রশ্ন করবার স্বাধীনতা মনে এমন উৎফুল্লতাসঞ্চারী হয় কে আজকের পত্রিকা পড়ে মনে করতে পারে? ব্রিটিশ সাহিত্যিক নিল গেম্যানের যখন প্রথম প্রবন্ধের বই বেরুলো সেখানে প্রশ্নের স্বাধীনতা নিয়ে পড়তে যেয়ে বারবার মাহিদের চেহারা ছাড়া আর কারো কথা মনে আসেনি।
আমার এক ফ্রেন্ডের সাথে তার ছোট্ট গ্যাঞ্জাম হলো একবার। সিলেট থেকে ঢাকায় আমাকে ফোন দিয়ে ঝামেলা কার সাথে কী না বলে বললো, "ভাই, সিনিয়রদের কাজের সমালোচনা চর্চা করা যাবেনা এমন কোড কি চলে আমাদের আড্ডার মধ্যে?" আমি বললাম, "মাহিদ, সামনে যা কিছু নিয়ে বলা দরকার মনে করবার দরকার মনে করো তাই নিয়ে বলবা। কোন মুরব্বি দেখার দরকার নাই।"
মাহিদ আর দশজনের মতো গতানুগতিক সিচুয়েশন বুঝা ছেলে না, সে সাদামাটা কোশ্চেন করবার, অচলায়তন ভাঙ্গবার স্বাধীনতাচর্চার ছেলে। কী কোশ্চেন করলে কার সাথে সম্পর্ক কই গিয়ে দাঁড়াবে, কার কতটুকু সমস্যা হবে, কতটুকু ড্রামা হবে কতটুকু হবেনা, কে তারে ননসেন্স ভাববে এসব ভাবনা তারে বিন্দুমাত্র বিচলিত করতোনা। মাহিদকে কোন ছিনতাইকারী আঘাত করতে পারে শুনবার পর থেকে আচ্ছন্ন হয়ে ছিলাম যে কী ধরনের কথোপকথন চলেছে তাদের মধ্যে— "ঐ মিয়া আমারে চেনেন? এতোবড় সাহস! আমার বাবা মুক্তিযোদ্ধা। এইটা কি মগেরমুলুক পেয়েছেন?" এই অবিচলতার গোড়ায় রয়েছে তার ভেতরে একধরনের বিল্টইন সততার প্রাচীর যার শক্তিতে ইভেন একটা সিগারেট মুখে নেয়ার মতো অপরাধ থেকে শুরু করে অন্য যেকোন বিচ্যুতিতে সহচর হিসেবে পাবার জন্যে তারে লাস্ট পার্সন হিসেবে বিবেচনা ছাড়া পথ নেই।
আজ মাহিদ নেই বলে নয়, তার মতো ছেলের নিয়ে ভাবা আনন্দের। দার্শনিক-সম্রাট মার্কাস অরেলিয়াস সুস্থ আবেগে তিন ধরণের আনন্দ নির্দেশ করতে প্রথম ধরণকে বলেছেন Chara যার অর্থ নিজেদের ও অন্যদের মাঝে শ্রেয় উপলব্ধির আনন্দ যার মধ্যে প্রফুল্লতা, শান্তি-সন্তুষ্টি একাকার থাকে। মাহিদ সেই গভীর আনন্দউৎস, সুন্দর উৎসাহের জায়গা। যদি মনে হতো একঘন্টা কারো সাথে গল্প করবো যে গসিপ গুরুত্ব না দিয়ে, নিজের স্বার্থ না চেয়ে শুধু ধ্যানধারণা নিয়ে দীর্ঘ আলাপে কার্পন্য করবেনা তবে নিশ্চিন্তায় তাকে ফোন দেয়া যেতো। মাহিদকে কারনে ভালোবাসা যায়, অকারনে ভালোবাসা যায়।













