'এক্সট্রাকশন' সিনেমায় বাংলা ভাষার ব্যবহার : হরিষে বিষাদ
ঢাকার শহর কেন্দ্রিক গল্পকে ঘিরে চলচ্চিত্রের সবচেয়ে অভিজাত অঙ্গন হলিউডে নির্মিত হয়েছে সিনেমা, নাম 'এক্সট্রাকশন'। চলচ্চিত্রটি নিয়ে এদেশের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষাও ছিলো উত্তুঙ্গে। কিন্তু সিনেমাটি মুক্তির পর আশা ও বাস্তবতার ফাঁরাকটা ছিলো আকাশ পাতাল। অনেক গুলো ত্রুটিপূর্ণ দিকের মধ্যে বাংলাভাষার (অপ)ব্যবহার ছিলো সবচেয়ে অগ্রহণযোগ্য দিক। সে দিকটির ভাষাগত বিশ্লেষণের প্রয়োজনীয়তার তাগিদ থেকেই এই লেখার জন্ম।
পেছনে ফিরে তাকালে দেখা যায়, 'এক্সট্রাকশন' চলচিত্রের মূল গল্প নেওয়া হয়েছে আন্ডে পার্কস ও রুশো ভ্রাতৃদ্বয়ের কমিক উপন্যাস সিউদাদ থেকে। স্প্যানিশ শব্দ সিউদাদ অর্থ শহর। উপন্যাসে স্থান পেয়েছিলো এক মাদক সম্রাটের মেয়েকে পৃথিবীর নিকৃষ্ট স্থান থেকে উদ্ধারের অভিযান। চলচ্চিত্রে সেই নিকৃষ্ট স্থান হিসেবে দেখানো হয়েছে ঢাকাকে। কিন্তু ঢাকার প্রকৃত রূপ ও সংস্কৃতির সাথে চলিচ্চিত্রে উপস্থাপিত ঢাকার অসঙ্গতি বিশেষ করে ভাষাগত বিকৃতির স্বরূপ ছিলো আরো নিকৃষ্ট। মাত্রা নির্ধারণ অবশ্যক।
চলচ্চিত্রটিতে বাংলা, ইংরেজি এবং হিন্দি এই তিনটি ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে। ১০৩ মিনিটের অ্যাকশন প্যাক্ট সিনেমাটিতে সর্বমোট ৪৯ মিনিট ১০ সেকেন্ড সময় জুড়ে বিভিন্ন ভাষার বিভিন্ন দৈর্ঘ্যের ডায়লগ ব্যবহার করা হয়েছে যার মধ্যে ১৮ মিনিট ২০ সেকেন্ড সময় বাংলা ভাষার উপস্থিতি ছিলো। অর্থাৎ মোট ডায়ালগ এর ৩৭.২৯ শতাংশ ছিলো বাংলা। চলচ্চিত্রটিতে ৬২ টি বাংলা ডায়লগে ১০১ টি বাক্য এবং ৪৮০ টি শব্দ প্রয়োগ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৭২ টি শব্দের মারাত্মক উচ্চারণগত অসঙ্গতি লক্ষ্য করা যায়। অর্থাৎ মোট বাংলা শব্দের ১৫ ভাগই ছিলো অগ্রহণযোগ্য উচ্চারণে। একটি চলচ্চিত্রের গল্প যে ভৌগোলিক সীমাকে কেন্দ্র করে, সেখানকার সংস্কৃতি ও ভাষাগত জ্ঞানের এই তীব্র অভাব হয় উদ্দেশ্য প্রনোদিত অথবা অবহেলা প্রসূত কিংবা ভৌগোলিক সংস্কৃতির সাথে চলচ্চিত্র শিল্পের যে মৌলিক সম্পর্ক আছে সে সম্পর্কে নির্মাতার জ্ঞানের অভাবকে দায়ী করা যেতে পারে। উল্লেখ্য, সিনেমাটির পরিচালক স্যাম হারগ্রেভ একজন স্ট্যান্টম্যান। অ্যাকশন বিনির্মানে সে মুন্সিয়ানা তিনি দেখিয়েছেন। কিন্তু চিত্রনাট্য, সঙ্গীত ও প্রপস এর ক্ষেত্রে তার দুর্বলতা বা উদাসীনতা ছিল লক্ষণীয়।
'এক্সট্রাকশন' সিনেমাতে ব্যবহৃত বাংলা ভাষার তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, সিংহভাগ দৃশ্যায়ন ঢাকা কেন্দ্রিক হলেও একমাত্র 'পোলাটারে' শব্দটিতেই ঢাকা ও তার পাশবর্তী অঞ্চলের প্রভাব লক্ষণীয়। সিনেমাটিতে ব্যবহৃত আঞ্চলিক শব্দগুলোতে বাংলাদেশের চেয়ে পশ্চিম বঙ্গের উচ্চারণের বাহুল্য ছিলো।
হিন্দি ঢঙে বাংলা উচ্চারণে কলকাতার স্থানীয় বাচনভঙ্গির একটি সাধারণ বৈশিষ্ঠ্য। এক্সট্রাকশন সিনেমায় ব্যবহৃত মেসিন (মেশিন), আছো (আসো), আছছি (আসছি), ছেতো (সেতো), ছেতু (সেতু), সহর (শহর) প্রভৃতি শব্দে এই ধরণের আঞ্চলিক টান লক্ষণীয়। 'স্যার' শব্দটিও কলকাতার মতো 'সের' উচ্চারিত হয়েছে কিন্তু বাংলাদেশ এর উচ্চারণ 'সার' ।
'ছিড়ছি' বাঁকুড়া জেলার সঁওতাল সমাজে প্রচলিত শব্দ। 'গুলা' শব্দটি বীরভূমের। 'তকে' (প্রমিত বাংলায় 'তোকে') বর্ধমান জেলার শব্দ এবং 'চালু মাল' ঝাড়খন্ডী উপভাষা থেকে আগত তবে এগুলো কলকাতায়ও বহুল ব্যবহৃত। 'হোয়' অহমিয়া শব্দটি কর্ণাটক 'হোয়' শব্দের অপভ্রংশ; ব্রজবুলি সাহিত্যেও শব্দটির উপস্থিতি দেখা যায়। 'বাঁড়া' হাওড়া গ্রামীণ অঞ্চলের কথ্য ভাষার শব্দ। কিন্তু কলকাতায় এটিই লিঙ্গ অর্থে গালিবাচক শব্দ হিসেবে প্রচলিত। মুর্শিদাবাদের স্থানীয় শব্দ 'দুটা' , 'গুটা' এবং 'সালা' ও কলকাতায় জনপ্রিয়। 'হয়িছে' পশ্চিম ত্রিপুরার আঞ্চলিক উপভাষার এবং 'সোবাই' (প্রমিত বাংলায় 'সবাই') পশ্চিম বাংলার হাওড়া জেলার উদয়নারায়ণপুর এলাকার শব্দ।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমার মধ্যে ব্যবহৃত বিভিন্ন আঞ্চলিক শব্দের মধ্যে বরিশাল এবং তৎসংলগ্ন অঞ্চলের সর্বাদিক তিনটি শব্দ স্থান পেয়েছে। শব্দ তিনটি হলো- মুই , করমু, ফালামু। এছাড়াও কুষ্টিয়া, ঝিনাইদাহ এবং মেহেরপুরের 'দেবে', 'মইরে' এবং 'দেবো'; রংপুর অঞ্চলের 'কাইটা' প্রভৃতি এই সিনেমায় ব্যবহৃত বাংলাদেশ ভূখণ্ডের অভ্যন্তরের কথ্যভাষার শব্দ। তাছাড়া 'দেখ' শব্দটি 'দেক' উচ্চারণ করেছে চলচ্চিত্রটির খলনায়ক আমির। যশোর, খুলনা ও কিশোরগঞ্জ জেলায় এই 'দেক' উচ্চারিত হয়। এছাড়া, রাজশাহী ও দিনাজপুর অঞ্চলে নকশিকাঁথর সুঁচ চালানোর কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত 'ফোঁড়' শব্দটি পশ্চিম বাংলায় 'কেটে পড়া' অর্থে প্রযোজ্য।
তাছাড়াও সিনেমাটিতে ব্যবহৃত 'হইতে', 'খাইতেছি' ও 'চালাইতে' সাধু ভাষার শব্দ হলেও চলিত বাংলায় এদের প্রয়োগ লক্ষ্যণীয়। মধ্যযোগীয় উপভাষা হতে গৃহীত 'আছিলো' এবং 'আপনে' শব্দদ্বয়ও বিভিন্ন স্থানে আঞ্চলিক শব্দ হিসাবে ব্যবহার করে। তবে, ওয় (সে), টেকা (টাকা), কিসু (কিছু), কেডা (কে) ব্যাকরণসিদ্ধ না কিন্তু বাংলা কথ্য ভাষায় এগুলোর প্রচলন আছে এমন শব্দ। এই সব শব্দগুলো দুই বাংলাতেই ব্যবহৃত হয়।
'এক্সট্রাকশন' সিনেমায় ব্যবহৃত আরো যেসব আঞ্চলিক শব্দ দুই বাংলাতেই ব্যবহৃত হয় সেগুলো হলো - তরে (তোকে অর্থে), ওরে (তাকে), ওগোরে (তাদেরকে), এরে (তাকে)। 'ওটা' নীলফামারী জেলার ডোমার অধিবাসীদের মুল ভাষা থেকে আগত হলেও কলকাতায় এর প্রয়োগ দেখা যায়। এছাড়া, 'কাইটে' মানভুইঁয়া উপভাষিক শব্দ হলেও কামরূপী, আসামী এবং ঐসব অঞ্চল সংলগ্ন বাংলাদেশের কিছু স্থানে এটি উচ্চারিত হয়। এ থেকে এটাই স্পষ্ট হয় যে পাণ্ডুলিপিতে কথ্য ভাষা হিসেবে পশ্চিম বাংলার শব্দের ছড়াছড়ি ছিলো।
এখানে 'জলদি' শব্দটির উচ্চারণের ক্ষেত্রে হিন্দি ও উর্দু বাচনভঙ্গি 'জালদি' ব্যবহৃত হয়েছে। এমন আরও যেসব হিন্দি ও উর্দু উচ্চারণ বাংলা হিসেবে ব্যবহারের প্রয়াস ছিলো সিনেমাটিতে সেগুলো হলো -ছবক, বহুত, সিখ (শিখ),দে দো, সুয়ার, কারা দো, সাব (সব), সাতরু (শত্রু), সাক্তি(শক্তি)।
চলচ্চিত্রটি হলিউডে মুক্তি পেয়েছে এবং কেন্দ্রীয় চরিত্র (রেক টাইলর) উপমহাদেশীয় না বলে উপনিবেশিক বাংলা উচ্চারণের আধিক্যই অনুমেয় ছিলো। কিন্তু গেসে (গিয়েছে), হোলে (হলে), তমারে (তোমারে), সাম্ভব (সম্ভব), হুইতে পারে (হতে পারে), ছুরি (চুরি), ক্যামনে (কেমনে) এবং প্রমাণ এই কয়টা মাত্র শব্দের উচ্চারণে উপনিবেশিক টান লক্ষ্য করা গেছে। যার অধিকাংশই আবার বাংলাদেশী হিসেবে দেখানো আমিরের জবানিতে! টাইলর চরিত্রে অভিনয় করা ক্রিস হেমসওর্থ এর কন্ঠ থেকে 'প্রমাণ' এবং 'দাও' এই দুইটি বাংলা শব্দ উচারিত হয়। এই দুইটি উচ্চারণ সিনেমাটিতে দেখানো বাংলাদেশী মাদক ব্যবসায়ী আমির আসিফ চরিত্রে অভিনয়কারী প্রিয়াংশু এর চেয়ে অনেকগুনে বেশি সঠিক ছিলো। হিন্দির আদলে উচ্চারিত বাংলা ধ্বনির সিংহভাগই প্রিয়াংশুর কণ্ঠ থেকে নির্গত। তার উচ্চারিত 'ফরহাদ' শব্দের 'ফরাত' উচ্চারণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য না। বাংলাদেশি ড্রাগ ডিলার বাংলা উচ্চারণ করতে না পারাটা চিত্রনাট্যে গবেষণার দৈন্য, ডাবিংয়ের ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গের বাচিক শিল্পীর উপস্থিতি এবং এক্টিং মাস্টারের দুর্বলতা স্পষ্ট করে তুলেছে। চিত্রনাট্য পরামর্শক হতে শুরু করে সিনেমাটির বাংলা ভাষাভাষী সবগুলো চরিত্রে ভারতীয়দের সয়লাবই ভাষাগত এই বিপর্যয়ের প্রধান কারণ।
এবার দৃষ্টিপাত করা যাক বাংলা ভাষাবিধি ব্যতিরেখে বিকৃত করা হয়েছে এমন শব্দের দিকে। ব্যঞ্জন বিকৃতি ঘটানো হয়েছে এমন শব্দগুলো হলো - আছো (আসো), আছছি (আসছি), মেসিন (মেশিন),বাচ্ছা (বাচ্চা ), ছুরি (চুরি), থন্নথন্ন (তন্নতন্ন), ভাল্লাকসে (ভালো লেগেছে> ভাল্লাগসে), নিস্চয় (নিশ্চই), কৈতেসি (কহিতেছি>কইতেছি)। স্বরসঙ্গতি আনার চেষ্টা হয়েছে এমন শব্দগুলো হলো-সোবাই (সবাই), হোলে (হলে), হোয় (হয়), হয়িছে (হয়েছে), বাঁচায়া (বাঁচিয়ে), যায়তে (যাইতে), সুয়ার (শুয়োর), ক্যামনে (কেমনে) ইত্যাদি। 'উপরে' শব্দের সঠিক উচ্চারণ 'ওপোরে' কিন্তু উচ্চারিত হয়েছে 'ওপ্রে' অর্থাৎ স্বরলোপ করা হয়েছে। দুটা (দুইটা), তকে(তোকে), তরে(তোরে) প্রভৃতি ক্ষেত্রেও স্বরলোপ লক্ষণীয়। করিয়া থেকে অপিনিহিতির ফলে 'কইরিয়া' শব্দের বিপর্যয়ের ফলে 'কইরা' এর উৎপত্তি। এক্সট্রাকশন চলচ্চিত্রটিতে ব্যবহৃত হয়েছে এমন অন্যান্য অপিনিহিতি প্রসূত শব্দ হলো- কাইটা (<কেটে<কাটিয়া), কাইটে (<কেটে<কাটিয়া), কইরা (<করে<করিয়া), মাইরা (<মেরে<মারিয়া), খুঁইজা (<খুঁজে<খুঁজিয়া), থেইকা (<থেকে<থাকিয়া), মইরা (<মরে<মরিয়া) প্রভৃতি। এছাড়াও একটি করে ব্যঞ্জনদ্বিত্ব (গুল্লি) এবং অন্তর্হতি (তাতাড়ি) রয়েছে সিনেমাটিতে। এতো শব্দ বিকৃতির ফলে বাংলা ভাষাভাষী দর্শকদের কাছে সিনেমার সংলাপগুলো শ্রুতিকটূ থেকেছে। প্রকৃতপক্ষে চিত্রনাট্যে আঞ্চলিক শব্দ প্রয়োগ সিনেমার স্থানিক আবেদন তৈরিতে ব্যর্থ হয়েছে। বাংলাদেশ এবং পশ্চিম বাংলা দুই বাংলার কোনটারই আঞ্চলিক প্রভাব সঠিকভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারেননি চিত্রনাট্যকার।
ব্যবহৃত শব্দের তাৎপর্যগত দিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলচ্চিত্রটিতে 'আমার' শব্দটি সর্বাধিক ৯ বার ব্যবহৃত হয়েছে। এছাড়ার 'আমি' ৮ বার, আমারে এবং আমায় ৫ বার প্রয়োগ করা হয়েছে। উত্তমপুরুষের এই আধিক্য চলচ্চিত্রটির আগ্রাসী বৈশিষ্ট্য বহন করে যা একটি একশনধর্মী চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্যের অন্যতম নিয়ামক। এটা এই সিনেমার ভালো দিক। এখানে, প্রশ্নবাচক 'কি' ৮ বার, গতি বোঝাতে 'চলো' ৮ বার, অনুসন্ধ্যান জ্ঞাপক 'প্রমাণ' ৬ বার এবং 'খুইজা' ৮ বার প্রয়োগ করা হয়েছে। এ শব্দ গুলোও অ্যাকশন উপযোগী।এছাড়াও 'দুইটা', 'তুই', 'মাল' ৪ বার করে এবং 'খুন', 'বন্দুক', 'কম', 'ওটা', 'সব', 'কাইটা', 'আঙ্গুল' প্রভৃতি শব্দ ৩ বার করে ব্যবহৃত হয়েছে। এ গুলোও অ্যাকশন এর জন্য কার্যকর শব্দ। উল্লেখ্য, 'মাল' শব্দটি ২বার বস্তু অর্থে এবং ২ বার মানুষ (তাচ্ছিল্য) অর্থে প্রয়োগ করা হয়েছে।
বাংলা Phrase হিসেবে 'বাল ছিড়ছি', 'সুয়ারের বাচ্ছা', 'বালের কাম', 'বানাইছে তো', 'জীবনের ছবক', 'ছাদ থেইকা' প্রভৃতি যুগ্ন শব্দের প্রয়োগ হয়েছে যার অর্ধেকই গালি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ বাংলা শব্দ চয়নের ক্ষেত্রে উত্তেজক এবং অমার্জিত শব্দকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয় বাক্যের পুনরাবৃত্তি ও সেগুলোতে গালির ব্যবহার পর্যালোচনায়। 'সুয়ারের বাচ্ছা' ৪ বার, 'খুন কইরা ফালামু', 'তাড়াতাড়ি চলো' ইত্যাদি ৩ বার করে এবং 'প্রমাণ দাও', 'বোকা চোদা', খানকির পোলা', 'কুত্তার বাচ্ছা' এবং 'গুলি মেরে উড়িয়ে দেবো' বাক্যাংশগুলো উচ্চারিত হয়েছে ২ বার করে। এছাড়াও যে সব গালি বা অশ্লীলতা প্রকাশক শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে সেগুলো হলো - বাঁড়া, ফোঁড়, সালা, বালের কাম, মাদারচোদ প্রভৃতি।
অর্থাৎ আক্রমণাত্মক, অশ্লীল ও অনুসন্ধিৎসু শব্দের অপ্রতুল ব্যবহার চলচ্চিত্রটির একশনধর্মী বৈশিষ্ট্যকে যতোটা ত্বরান্বিত করেছে, ভুল উচ্চারণে সেগুলোর প্রয়োগ স্থানীয় মানুষকে ততোটাই হতাশ করেছে।
সংলাপ থেকে প্রপসের দিকে চোখ ঘুরালে দেখা যাবে সেখানকার ভাষাগত অসঙ্গতি আরো দৃষ্টিকটু। পুরান ঢাকার গলির ইলেকট্রিক সাইনবোর্ডে "এই দোকান বিক্রির হবে" লেখা। এই বাক্যটির সঠিক রূপ হয় "এই দোকান বিক্রি হবে" অথবা "এই দোকান বিক্রির জন্য" হওয়ার কথা। সিএনজির গায়ে লিখা "আল্লাহ সার্ভ শক্তিমান" এবং "নাসিব পরিবহন" । বাংলায় উচ্চারিত 'সর্বশক্তিমান' শব্দের হিন্দি উচ্চারণ 'সার্ভ শক্তিমান' সেটাই লিখে দেওয়া হয়েছিল, যা বাংলাদেশের কোনো পরিবহণে লিখা থাকার কথা না। তাছাড়া 'নসিব' শব্দটিও হিন্দিতে 'নাসিব' উচ্চারিত হয়। বাংলাদেশের কোনো পরিবহনে লেখা বাক্যটি হতো "নসিব পরিবহন" অথবা "নাসির পরিবহন"।
এলিট ফোর্স হিসেবে র্যাব এর বিকৃত আদলে যে বাহিনীকে দেখানো হয়েছে সেই বাহিনীর একজন কর্মকর্তা বজলুর রাশীদ যে আমিরের পক্ষে কাজ করছিলো। তার পরিহিত উর্দিতে 'পুলিশ', 'আর্মি' এবং 'এলিট' তিনটি পৃথক বাহিনীর ব্যাজ ছিলো। এর চেয়েও ভয়াবহ ছিলো সেই বাহিনীগুলোর নামের ভুল বানান। পুলিশ শব্দটি ঠিক থাকলেও "আর্মি ফোস" এবং "ইএলযাইটিই" শব্দদ্বয়ের কোন বাংলা অর্থবাচকতা নেই।
সিনেমাটিতে ব্যবহৃত বাংলা বাক্যের ইংরেজি সাবটাইটেল এর অর্থগত ব্যত্তয়ও ছিলো চোখে পড়ার মতো। "সাম্ভব না হোলে তোমারে দিয়া আমার কি বালের কাম?" এবং "Make it possible, Colonel" কোনো ভাবেই পরস্পরের সমার্থক হতে পারে না। ঠিক তেমনি "কুত্তার বাচ্চারে আমি আটকাইছিলাম" বাক্যের ইংরেজিও "I lost him…" হতে পারেনা। একজন সেনা কর্মকর্তাকে দেখা গেলো অভি মহাজনকে ধাওয়া করতে করতে উচ্চারণ করছেন "সুয়ারের বাচ্ছা" এবং তার সাবটাইটেল উঠলো "come here"।
ভাষাগত এই প্রহসন অথবা নৃতাত্ত্বিক গবেষণার অভাব নেটফ্লিক্সের এই ব্যাবসা-সফল সিনেমাটি বাংলা ভাসাভাসা মানুষের কাছে সমাদৃত হয় নি। সিনেমাটিতে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট কয়েকজন সনামধন্য মানুষের সম্পৃক্ততার কথা শুনতে পাওয়া যায়। প্রশ্ন হলো, তাদের কি আদৌ কোনো ভূমিকা ছিলো? নাকি তারা কি নাম সর্বস্ব ছিলেন? যদি তাদের কোনো ভূমিকা থেকেই থাকে তাহলে সেটা কি? বাংলাদেশের একজন ভাষা উপদেষ্টা এবং একজন উচ্চারণের প্রশিক্ষকের উপস্থিতিতে বাংলা ভাষার এই হাল হলো কি করে? এই প্রশ্নের সদুত্তর আর সবার মতোই লেখকেরও অজানা।
কোনো একটি জাতি বা সংস্কৃতিকে চিত্রায়নের ক্ষেত্রে স্থানীয় বিশেষজ্ঞ, কুশীলব ও উপাদানের যথাযথ উপস্থাপন একটি চলচ্চিত্রের বড় অলঙ্কার। যা এক্সট্রাকশনে সর্বোতভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে। 'ভিডিও গেম' তুল্য এই সিনেমাটি শুধু মাত্র তাদের কাছেই গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে, যারা কাট-কাট মারামারি আর টানটান উত্তেজনা পছন্দ করে। এদের কাছে অন্য কোনো শৈল্পিক দিক মুখ্য নয়।
















