পাগল কইলো, 'আমারে ফাগল ফাইসো?' : পার্ট -৩
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে থাকাকালে একবার আমার ভীষণ ঠান্ডা লাগলো। নাক বন্ধ -মুখ দিয়ে নিশ্বাস নিতে হচ্ছে। কাশির শাসনে রা বেরুচ্ছে না গলা দিয়ে। যা খাই সবই একই রকম লাগে - দুনিয়া এতো বিস্বাদ আগে বুঝিনি। মনে মনে ভাবতাম - শত্রুর ও যেন কখনো এমন দুরাবস্থা না হয়। যাই হোক, এক সহপাঠীর পরামর্শে ওকে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় চিকিৎসা কেন্দ্রে গেলাম।বলা রাখা ভালো, ওর অম্বল হয়েছে। সেখানে গিয়ে হলের এক ছোট ভাই কে পেলাম, তার হাত কেটে গড়গড়িয়ে রক্ত ঝড়ছে। সেও ডাক্তার দেখাবে।
প্রথমে গেলাম আমি। যাওয়ার সাথে সাথেই চিকিৎসক মশাই আমার কি সমস্যা জিজ্ঞেস করে কোনো উত্তরের অপেক্ষা না করেই প্রেসক্রিপশন লিখতে শুরু করে দিলেন। কিছুটা অবাক বিরক্তি নিয়েও অনেক কসরত করেই তার সামনে আমার নরক যন্ত্রণা সবিস্তরে বর্ণনা করতে লাগলাম। কিন্তু কথা বলতে থাকা অবস্থায়ই হটাৎ প্রেসক্রিশন এগিয়ে দিয়ে দেবতুল্য ডাক্তার সাহেব বললেন, "এই ওষুধগুলো তিন বেলা খাবেন"। আমি প্রশ্ন করতে গেলে মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে তিনি বললেন, "এর চেয়ে বেটার ট্রিটমেন্ট পেতে হলে ডিএমসিতে যান নয়তো প্রাইভেট চেম্বার এ যান"। আমি বিষমটি খেয়ে চেয়ার ছাড়তে না ছাড়তেই তিনি জোরে হাঁক ছাড়লেন - next!
ঢুকলো আমার বন্ধু এবং অনুর্ধ এক মিনিটের মধ্যেই তার প্রস্থান এবং সেই ছোট ভাইয়ের এক মিনিট ৩০ সেকেন্ড লেগেছিলো বোধ হয়। মহামান্য ডাক্তার মশাইর তুলো ছিড়তে হয়েছে, তাতে স্যাভলন লাগিয়ে ক্ষতস্থানে ওই তুলো প্রতিস্থাপনের পর তিনি প্রেসক্রিশন লেখায় মনোযোগী হয়েছিলেন। এই বিশাল কর্মযজ্ঞতো আর কম সময় সাপেক্ষ ব্যাপার না ! ছোট ভাই বের হবার পর তিন জনের প্রেস্ক্রিপশনেই দেখলাম দুটো করে ঔষধের নাম লেখা। এবং ঔষধ গুলো একই।
আমাদের গ্রামের 'পাঁচ কেলাশ পাশ' খুরশিদ মিঞা ডাক্তারের কথা খুব মনে পড়ছিলো সে দিন। খুশি ডাক্তারের কাছে যে যেই রোগের জন্যই যেতো তাকেই তিনি প্যারাসিটামল আর কুইনাইন ধরিয়ে দিতেন। তবে, আমি তার কাছে কৃতজ্ঞ। কারণ, আমার শৈশবের বদহজমের রোগটা তিনিই সাড়িয়েছিলেন।
এই দুই মহান চিকিৎসকের নাম মেমোরিতে হঠাৎ হানা দেওয়ার কারণ হলো - যে বিষয়টা সবাই জানে অথচ আমি জানতাম না এমন একটা তত্ত্ব কোভিড রোগের কল্যাণে আবিষ্কারের উত্তেজনা কোনোমতেই সামলাতে পারছিলাম না। আর সেই আবিষ্কার হলো -যে কোনো মহামারী বা অসুখ-বিসুখের বিস্তরণের সময় সব রোগের মহৌষধের বটিকা ও পত্ত নিয়ে তৎক্ষণাৎ ধরাধামে আবির্ভুত হন এমন মহামবের সংখ্যা এই বঙ্গদেশে অপ্রতুল।
দেশে করোনা রোগের নাম চাউর হওয়া মাত্রই লক্ষ করলাম বাজার থেকে স্যানিটাইজার, হেক্সিসল, স্যাভলন,ডেটল,ব্লিচিং সব উবে গেলো মুহূর্তে! রোগ-গোত্রের এই নবীন সদস্যের এখনো কোনো শত্রু (কেতাবি নাম-প্রতিষেধক) পয়দা হয় নি। একে প্রতিহত করতে যেখানে বিশ্বের বাঘাবাঘা বৈজ্ঞানিকগণ ঘোলাজলে হাবুডুবু খাচ্ছেন, সেখানে মুহূর্তেই এই উপমহাদেশে একেরপর এক থেরাপি চলে আসলো। এই তালিকায় সর্বাগ্রে আসে থানকুনি পাতার নাম। থানকুনি পাতা হলো করোনা রোগের মহৌষধ- এই তত্ত্ব কেউ একজন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করার পর রাতারাতি থানকুনি'র বন উজাড়! আরো যাদের উপর করোনার গজব পড়েছিলো সেগুলো হলো -নিশিন্দার রস, অড়বড়ই,কালিজিরা, মধু প্রভৃতি।
চট্টগ্রামের হাটহাজারীর এবং নেত্রকোনার কলমাকান্দায় চিকনদন্ডী শৈল্য, ষান্ডার তেল বা কলিকাতা হারবাল জাতীয় ঔষধ বিক্রেতাগণ তো বেশ ঘটা করেই করোনা বটিকা বিক্রি করতে গিয়ে শ্রীঘরে ঢুকলেন। দুআ-দুরুদ আর যন্ত্রমন্ত্র থেরাপিস্টের সংখ্যাটা না হয় অনুল্লেখিতই থাকলো।
আরেকদল গেঁজেল তাত্ত্বিকের কথা না বললে অমার্জনীয় অপরাধ হবে। তাদের মতে, যেহেতু সকল জীবাণুনাশকের মূল উপাদান উচ্চমাত্রার এলকোহল, তাই মাদক সেবনকারীরা কোনোমতেই করোনার দ্বারা আক্রান্ত হবে না। যুক্তিটা যুৎসই বটে !
এদিকে মোদি জী'র ভারত তো করোনা চিকিৎসায় মহাবিপ্লব ঘটিয়ে দিলো ! জনৈক ধর্মগুরু ও গোমাতা রক্ষক ঘোষণা করে বসলেন 'পবিত্র গোমূত্রই হলো করোনার একক ও অদ্বিতীয় দাওয়াই'। আর যায় কই ? রাতারাতি মহাভারতের সব বাজার ছেয়ে গেলো বোতলজাত গোমূত্রে এবং অতি উচ্চদামে বিক্রি হতে থাকলো এই জৈব ঔষধ। মানুষ ও সংগ্রহ করে পান করতে থাকলো লিটার কে লিটার। শ্রুত আছে কোনো এক গোমূত্র প্রিচার নিজেই গোমূত্র খেয়ে হস্পিটালাইজড হয়েছিলেন !
বর্জ্য - কাহিনী এখানেই ক্ষান্ত হলো না। ধর্মীয় উশৃক্ষলতা ও প্রতিযোগিতা প্রবণ মানুষকে করোনা মলমূত্র পর্যায়ে নামিয়ে ছাড়লো। হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা ভারতে গোমূত্রের প্রসার ঘটলে মুসলমান আরব ফতোয়াবাজগণ থেমে থাকবেন কেন! কোনো এক ইরানী মহাজ্ঞ জানালেন উঁটমূত্রের করোনা নিরাময় করার সক্ষমতার কথা। আমাদের দেশের মানুষের উপর গুজবের গজব তবু ভালো ননভেজ না হয়ে লতাপাতার উপর দিয়ে গেছে।
এই ঔষধ সমাচার শেষ করার আগে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করতে চাই বাংলা রম্য সাহিত্যের মুকুটহীন সম্রাট সৈয়দ মুজতবা আলীকে। তিনি তার 'বেঁচে থাকো সর্দিকাশি' গল্পে লিখেছিলেন- "যে ব্যামোর দেখবেন সাতান্ন রকমের ওষুধ, বুঝে নেবেন, সে ব্যামো ওষুধে সারে না"। করোনার ক্ষেত্রেও হলো তাই। চৈনিক favilavi, জাপানী avigan, ফরাসী hydroxychloroquine কিংবা কলকাতা হোমিওপ্যাথির arsenicum album-30 সবাইকে কাঁচকলা দেখিয়ে কোভিড-১৯ তার সাম্রাজ্য বিস্তার করেই চলেছে; উত্তর থেকে দক্ষিণ মেরু অব্দি বিস্তার লাভ করেছে তার প্রতিপত্তি। এখন অপেক্ষা সত্যি সত্যি তার কোনো হন্তারকের আবির্ভাবের।









