ডাকাতের দল এবং খামখেয়ালী সভা আড্ডাবাজ
New Post has been published on https://sentoornetwork.com/adda-dl-ray-thakurbari/
ডাকাতের দল এবং খামখেয়ালী সভা আড্ডাবাজ
‘আজ তোমার বাড়িতে ডাকাতি করা হবে।’ একেক সময় একেকজনকে রীতিমতো চিঠি দিয়ে জানাত ‘ডাকাতের দল’। এ সেই রঘু ডাকাত, বিশু ডাকাতদের মতো ডাকাতি করতে যাওয়ার আগে চিঠি দেওয়া। তবে এ-ডাকাতি হল সাঁটানোর ডাকাতি। ভূরিভোজন। অর্থাৎ চিঠি দিয়ে এ ডাকাতির মানে হচ্ছে— যাঁকে চিঠি দেওয়া হল, তাঁর বাড়িতে বসবে সাহিত্য আড্ডা ও খাওয়াদাওয়া। ‘ডাকাতের ক্লাব’-এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন দ্বিজেন্দ্রলাল রায়। ‘ডাকাতের ক্লাব’-এ আড্ডা চলত একটানা। এই সভার আসল উদ্দেশ্য ছিল সাহিত্য আর সংগীতচর্চা। ডাকাতের ক্লাবের ডাকাতের দলের প্রথম চিঠিটি গেছিল ঠাকুরবাড়ির গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে। আড্ডাও হয়েছিল, হয়েছিল ভূরিভোজও। সেই আড্ডায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বিনি পয়সার ভোজ’ নাটকটিও হয়। এই আড্ডার জন্য গানও লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তবে এই আড্ডা খুব বেশি দিন চলেনি।
ডাকাতের দল বিলুপ্তির পর ১৮৯৭ সালে কলকাতায় একই ধরনের আড্ডা চালু করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। নাম ‘খামখেয়ালী সভা’। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রস্তাবে এই সভা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এই সভার প্রথম অধিবেশন হয়েছিল ৫ ফেব্রুয়ারি ১৮৯৭। ধারণা করা হয়, প্রথম সভা অর্থাৎ আড্ডাটি হয়েছিল গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাড়ি। যাঁরা উপস্থিত ছিলেন– করুণাচন্দ্র সেন, অতুলপ্রসাদ সেন, চিত্তরঞ্জন দাশ, দ্বিজেন্দ্রলাল রায় প্রমুখ। পরবর্তী সময়ে আড্ডায় আসতেন প্রমথ চৌধুরী, জগদীশচন্দ্র বসু, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো বড় মানুষেরা।
‘খামখেয়ালী সভা’ পরবর্তী সময়ে ঘুরে ঘুরে এর বাড়ি, ওর বাড়িতে বসত। অনেকটা সেই ‘ডাকাত ক্লাব’-এর মতো। নিমন্ত্রণ বা আমন্ত্রণ পত্র লেখা হত শ্লেটে। এবং সেটি সভার সব সদস্যের বাড়ি বাড়ি ঘুরতে। রবীন্দ্রনাথ অনেকসময় কবিতা লিখে দিতেন। একবার সভাস্থান ঠিক হল কবি নবীনচন্দ্র সেনের পুত্র নির্মল সেনের বাড়ি। তাঁর লেখা আমন্ত্রণপত্রটিতে লেখা ছিল– এবার/খামখেয়ালী সভার/ অধিবেশন হবার/ স্থান কিছু দূরে/ সেই আলিপুরে/ নির্মল সেন/ সবে ডাকিছেন/ শনিবার রাত/ ঠিক সাড়ে সাত। খামখেয়ালী সভাও বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। রবীন্দ্রনাথ ব্যস্ত হয়ে পড়াতে।
অতুলপ্রসাদ সেনের লেখায় পাওয়া যায়—
“বছর দুয়েক পর অবশ্য ওই আড্ডা আর বসেনি। ১৮৯৬ সালে তাঁহার [রবীন্দ্রনাথ] নেতৃত্বে ‘খামখেয়ালী সভা’ নামে একটি সাহিত্য ও সংগীতমণ্ডলী স্থাপিত হয়। আমি এ সভার সর্বকনিষ্ঠ সভ্য ছিলাম। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, মহারাজা জগদীন্দ্রনারায়ণ রায়, বলেন্দ্রনাথ ঠাকুর, জ্ঞানেন্দ্রনাথ ঠাকুর, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, লোকেন্দ্রনাথ পালিত প্রমুখ অনেক সাহিত্যিক ও সুরসিক ‘খামখেয়ালী’র সদস্য ছিলেন। এ সভার কার্যপ্রণালী ছিল খামখেয়ালী, নিয়মের কোনো বাঁধাবাঁধি ছিল না। উদ্দেশ্য ছিল– হাস্যরসের উদ্দীপনা করা, সাহিত্যিকে আনন্দে সরস করা, নানাবিধ সংগীতের দ্বারা সভ্যদের চিত্ত আকৃষ্ট করা এবং সভান্তে জঠরের সম্যক তুষ্টি সাধন করা। এ খামখেয়ালীর মজলিশকে মসগুল রাখিতেন পরম হাস্যরসিক দ্বিজেন্দ্রলাল রায়। তিনি আমাদিগকে হাসির বন্যায় ভাসাইতেন তাঁহার হাসির গান গাহিয়া। আমারা সকলে তাঁহার হাসির গানের কোরাসে যোগ দিতাম, রবীন্দ্রনাথ ছিলেন কোরাসের নেতা। সকলের মুখে হাসি, কণ্ঠে গান, হাসির উচ্চরোলে সভাস্থল কম্পান্বিত হইত। দ্বিজেন্দ্রলাল গাহিতেন- ‘হোতে পাত্তেম আমি মস্ত বড় বীর’ আর রবীন্দ্রনাথ মাথা নাড়িয়া কোরাস ধরিতেন- ‘তা বটেইত, তা বটেইত’। দ্বিজেন্দ্র গাহিতেন– ‘নন্দলাল একদা করিল ভীষণ পণ’. রবীন্দ্র গাহিতেন– ‘বাহারে নন্দ বাহারে নন্দলাল’। দ্বিজেন্দ্রলাল আমাদের নাচাইতেন হাসির উদ্বেল তরঙ্গে, রবীন্দ্র আমাদের মুগ্ধ করিতেন তাঁহার অনুপম সূক্ষ্ম হাস্যরসের সৃষ্টি করিয়া। খামখেয়ালীর আসরে বিখ্যত গায়ক রাধিকানাথ গোস্বামী তাঁহার উচ্চাঙ্গের তান লয় মণ্ডিত গান’, গাহিয়া আমাদের মনোরঞ্জন করিতেন।”