সবুজ হচ্ছে প্রকৃতির স্নিগ্ধতা, কোমলতা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজধানীর জনসংখ্যা ও আকাশচুম্বি ভবন বেড়েই চলছে, সেইসঙ্গে পাল্লা দিয়ে কমছে সবুজ রংটিও। ক্রমাগত সবুজ হারানো এই শহরে বুক ভরে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতেই ধানমন্ডি লেকের পাড়ে আসে মানুষ। আমিও এসেছি। শুক্রবার, সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়ায় মানুষের উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো। হাঁটার পথেই পেছন থেকে কেউ বলে উঠলো, “আপা, দুইটা চকলেট লন।” ঘুরে তাকাতেই দেখি এক ছেলে, বয়স ১০ কি ১২।
চকলেট বিক্রি করছে সে। গ্রীষ্মের ঠাঁটা পড়া রোদে, চেহারা লাল হয়ে আছে ছেলেটার। মায়া মায়া একটা ভাব পুরো চেহারা জুরে। ছায়ায় বসিয়ে প্রশ্ন করলাম “নাম কী তোমার?” উৎসাহী ছেলেটি এক নিঃশ্বাসে বলতে শুরু করলো- “আমর নাম শাকিল। উইযে, উই হাসপাতালের পাশে থাকি। আব্বায় মারা গেসে, থাকি মায়ের সঙ্গে। গেরামের বাড়ি বরিশাল, কেউ নাই। কামের জন্য ঢাকায় আইসি, এখন ভিক্কা করি আর চকলেট বেচি।”
কথা গুলো শুনে মনটা কেমন যেন আবেগী হয়ে উঠলো। প্রশ্ন করলাম, “গ্রাম থেকে ঢাকায় আসছ কেন?
শাকিলের উত্তর, “গেরামে কি সবাই কাম পায়? পায় না! কেউ কাম দেয় না।”
জীবন-জীবিকার জন্য মানুষ কত কিছুই না করে থাকে। সাধারণত পড়াশোনা শেষ করে প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার পর আমরা জীবিকার তাগিতে ছুঁটতে শুরু করি। কিন্তু কেউ কেউ আছে যাদের জন্মের পরই খুঁজতে হয় উপার্জনের পথ। নির্বিঘ্নে পড়াশোনার সুযোগও নেই তাদের। সুবিধাবঞ্চিত এমন শিশুদের দেখা মেলে রাজধানীর পথে, ট্রাফিক সিগ্নালে বা পার্কের সবুজের ভিড়ে।
এমনই আরও দুই শিন্নমূল শিশুর দেখা মিলল লেকের কিছুটা ভিতরে যেতেই। দুই শিশু ফুল বিক্রেতা পুতুলি আর রমজান। বয়স ১২ ও ১৪। তাদের দুজনেরই বাড়ি বরিশাল। ছোট বেলা থেকেই ঢাকায় থাকে পুতুলি। প্রশ্ন করলাম ঢাকায় কেন এসেছ? পুতুলি বলে, “কষ্টের কারণের ঢাকায় আইসি আপু। দ্যাশে ফুফু আছে, দেখে না আমাগোরে। দ্যাশে কাম নাই, ভাত পাইনা। তাই এইহানে আইসা আমি ফুল বিক্রি করি আর মা আর ছোট বৈনরে দেখি। বাপে অসুস্থ, কিডনি নষ্ট। মায়ে বোতল টুকায়।”
এভাবেই অল্পবয়স্ক এই শিশুরা ঢাকা শহরের বিভিন্নস্থানে ফুল বিক্রি করে থাকে। কারো বাবা-মায়ের আয় দিয়ে সংসার চলে না, তো কারো কারো বাবা নেই। এমন অবস্থায় এই শিশুরাই নিজে হাতে ধরে নিয়েছে সংসারের হাল।
ঢাকায় থাকতে কেমন লাগে জানতে চাওয়ায় পুতুলি বলে, “আপু, ঢাকা বড়লোকদের জায়গা, এইখানে আমগো মতন গরিবেরা থাকতে পারেনা। সারাদিনে ফুল বেইচা ১০০-২০০ টাকা কামাই। এই দিয়া চলি কেমনে? বাসা বাড়িতে কেউ কাম দেয় না। যদি কেউ দেয়, তো মাইরও দেয়। তাই বাসা বাড়িতে কাম করিনা। কিন্তু রাস্তায় ভালো আছি। কেউ মারে না।” এতো কষ্টের মাঝেও এসব শিশুদের অদম্য ইচ্ছা কিছু করার, ইচ্ছা বেঁচে থাকার।
পড়াশোনা কর নাকি এমন প্রশ্নের উত্তরে পুতুলি বলে, “হ আপু। ক্লাস ফাইভে পড়ি, অপরাজেয় বাংলাদেশ। ইচ্ছা আছে পড়াশোনা কইরা বড় হইয়া ডাক্তার হব।”
সকালে স্কুলে যায়, স্কুল শেষ করে দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত তারা ফুল বিক্রি করে। যেদিন স্কুল বন্ধ থাকে সেদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলে ফুল বিক্রি করে।
মূলত গাছ থেকে বকুল ফুল সংগ্রহ করে মানুষের কাছে বিক্রি করে। কেউ ফুল কিনছেন প্রিয় মানুষকে উপহার দেওয়ার জন্য, কেউবা নিজ ঘর ফুলের গন্ধে মোহনীয় করার জন্য।
রমজান চকলেটও বেঁচে আবার টাকা চেয়ে ভিক্ষা করে বলা চলে। পড়াশোনার কথা জানতে চাওয়ায় রমজান বলে, “আমি ক্লাস ওয়ানে পড়ি, পুষ্প কলি ইস্কুলে। বড় হয়ে ‘পেলেন’ চালাবো, তাই পড়াশোনা করি। বাপের অসুখ আছিল, তাই ঢাকায় আইসি। মায়ে ভিক্কা করে। বড় আপায় বিয়া করি আলাদা, এক ভাই বিয়া করি আলাদা থাহে। দেহে না আমগোরে। বাপের অসুখ নাইলে আইতাম না। এইহানে ভালা লাগে না।”
আলেয়া, বয়স ৪ কি ৫ হবে। এই ছোট্ট শিশুটি বলে, “আমি ১০টা ফুলের মালা নিয়া বাইর হইসি। এহন আছে ৫টা। আপু, একটা মালা লন না, ১০টাকা।” আলেয়ার বাবা ডিম বিক্রি করে। আরো ৩ বোন আছে আলেয়ার। তাদের বিয়ের জন্য টাকা জমাতে হবে বলে বাবা মেয়ে মিলেই পথে নেমেছে কাজ করতে। বাকি বোনরাও এমনই ফুল, চকলেট এবং নুসনি বিক্রি করে বলে জানায় আলিয়া।
ঢাকায় থাকতে কেমন লাগে জানতে চাওয়ায় আলিয়া বলে, “ভালো লাগে না। মায়ের কথা মনে পরে।”
২ ঘণ্টা সময় নিয়ে পার্কে হাটতে যেয়ে জীবনের এমন কিছু গল্প জানা যাবে ভাবিনি। নিজের সীমিত জ্ঞান নিয়ে এই শিশুরা তাদের জীবনের কথা যেটুকু বলেছে তা শুনে মুগ্ধ হয়তো কেউ হবেন না। জীবন যুদ্ধ যাঁদের সবচেয়ে বেশি কঠিন করে, তাঁরা তো নিতান্তই সহজ কথার সাধারণ মানুষ। তাঁদের কথা খুব একটা শোনা বা শোনানোও হয়না। অবহেলিত হয়েও তারা বেঁচে থাকার স্পৃহা আর জীবন যুদ্ধে জয়ী হওয়ার ইচ্ছা নিয়ে এভাবেই প্রতিদিন লড়ে যাচ্ছে।
A weekly feature by Rezwana Sarker published in a national online news portal named Bangla Insider
like my work and want me to do some work for you? get in touch with me here- -iamrezwanaa