ব্যথাপথের পথিক
New Post has been published on https://sentoornetwork.com/sunday-25082019-bathapotherpothik/
ব্যথাপথের পথিক
তন্ময় দাম
জীবনে নানা বিতর্কের জন্ম দিয়ে ১৯৮০-র এক শ্রাবণ দিনে (১৮ অগস্ট) যে-দিন তিনি ১৭৪ই রাসবিহারী অ্যাভিনিউয়ের বাসা খালি করে চলে গেলেন চিরদিনের মতো, সে দিন থেকেই তিনি আস্তানা গাড়লেন এপার বাংলা ওপার বাংলার কোটি মানুষের মনে। রবীন্দ্রসংগীতের জনপ্রিয় শিল্পী ছিলেন দেবব্রত বিশ্বাস। ছিলেন বলব কেন! উনি তো আছেনই। দেবব্রত বিশ্বাস সবার কাছে পরিচিত ছিলেন জর্জ বিশ্বাস বা জর্জদা হিসেবে। তাঁর ছোটবেলায় ব্রিটিশ রাজা পঞ্চম জর্জ একবার ভারতে এসেছিলেন। সেই থেকে তাঁর ডাক নাম হয়ে যায় জর্জ। দেবব্রত বিশ্বাসের জন্ম ১৯১১ সালের ২২শে অগস্ট।বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জ জেলার ইটনার নন্দিহাটি গ্রামে। তাঁর পিতা দেবেন্দ্রমোহন বিশ্বাস। পিতামহ কালীমোহন বিশ্বাস ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ করায় নিজগ্রাম ইটনা থেকে বিতাড়িত হন। শৈশবে কিশোরগঞ্জের বিদ্যালয়ে দেবব্রত সেই কারণে ‘ম্লেচ্ছ’ বলে বিবেচিত হতেন। শিশুবয়সেই মা অবলাদেবীর মাধ্যমে ব্রহ্মসংগীত, রবীন্দ্রসংগীত ও রবীন্দ্রনাথের নামের সঙ্গে পরিচিত হন। মহেন্দ্র রায়ের কাছে দেশাত্মবোধক গান শেখেন এবং কিশোরগঞ্জের স্বদেশী সভায় অল্পবয়স থেকেই গান গাইতেন। ১৯২৭ সালে ম্যাট্রিক পাস করে দেবব্রত বিশ্বাস কলকাতার সিটি কলেজে ভর্তি হন। এইসময় ব্রাহ্মসমাজ ও পরে শান্তিনিকেতনে গান গাওয়ার আমন্ত্রণ পান। জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির সঙ্গেও তখন ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। ১৯২৮ সালের ব্রাহ্ম ভাদ্রোৎসবে কলকাতার সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ মন্দিরে রবীন্দ্রনাথকে প্রথম দেখেন দেবব্রত। ১৯৩৩ সালে সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে এমএ পাশ করেন দেবব্রত বিশ্বাস। পরের বছর হিন্দুস্থান ইনসিওরেন্স কোম্পানিতে বিনা মাইনের চাকরিতে যোগ দেন। এক বছর পর ১৯৩৫ সালে চাকরি পাকা হয় ও বেতন ধার্য হয় ৫০ টাকা। এই চাকরিসূত্রে রবীন্দ্রনাথের ভ্রাতুষ্পুত্র সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও তাঁর পুত্র সুবীর ঠাকুরের সঙ্গে আলাপ হয় দেবব্রতের। মূলত এঁদেরই সূত্রে রবীন্দ্রসঙ্গীত জগতে পদার্পণ দেবব্রতর। ১৯৩৮ সালে কনক দাশের সঙ্গে দ্বৈতকণ্ঠে প্রথম তাঁর রবীন্দ্রসঙ্গীত রেকর্ড। এই সময় থেকে হিজ মাস্টার্স ভয়েস ও অন্যান্য রেকর্ড সংস্থা তাঁর গান রেকর্ড করতে শুরু করে। রবীন্দ্রসঙ্গীতের পাশাপাশি গণসঙ্গীত ও অন্যান্য গানও গাইতেন। তাঁর আত্মজীবনী থেকে জানা যায়, এই সময় কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গেও তাঁর পরিচয় হয়েছিল এবং নজরুল তাঁর গান শুনে তাঁকে দু’টি শিখিয়ে সেগুলি রেকর্ড করিয়েছিলেন। একটি গান ‘মোর ভুলিবার সাধনায় কেন সাধো বাদ’ অপরটি আত্মজীবনীতে তিনি স্মরণ করতে পারেননি। যদিও এই রেকর্ড দু’টি প্রকাশিত হয়নি। দেবব্রত বিশ্বাস হিন্দুস্তান রেকর্ড কোম্পানি থেকে অনেকগুলি গান রেকর্ড করেন। হিজ মাস্টার্স ভয়েস প্রথম দিকে তাঁর কিছু গান রেকর্ড করলেও পরে আর তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। হিজ মাস্টার্স ভয়েস-এ প্রথম দিকের তাঁর কয়েকটি গান হল– আকাশ জুড়ে শুনিনু, এখন আমার সময় হল, ওই আসনতলের মাটির পরে, ওগো পথের সাথী, তুমি রবে নীরবে হৃদয়ে মম এবং এই তো ভাল লেগেছিল। হিন্দুস্থান মিউজিক্যাল প্রোডাক্টস্-এ প্রকাশিত গানগুলিতে তাঁর প্রতিভার বিকাশ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য– আকাশভরা সূর্য্যতারা, যেতে যেতে একলা পথে, গায়ে আমার পুলক লাগে, পুরানো সেই দিনের কথা, এ মণিহার আমায়, আমি যখন তাঁর দুয়ারে, তোমার দ্বারে কেন আসি, পুরানো জানিয়া চেয়ো না, অনেক দিনের আমার যে গান ইত্যাদি ইত্যাদি। হিন্দুস্থানে তাঁর কয়েকটি রবীন্দ্রসঙ্গীত ইংরাজী অনুবাদ সহ (সম্ভবত শিবদাস ভট্টাচার্যকৃত) প্রকাশিত হয়েছে– বড়ো আশা করে ও With a high hope, ক্লান্তি আমার ক্ষমা করো প্রভু ও This weariness forgive me এবং তোমার হল শুরু আমার হল সারা ও Thine is this a beginning বিশেষ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। এছাড়া দুর্লভ কয়েকটি রবীন্দ্রসংগীতও তিনি গেয়েছেন, যেগুলির স্বরলিপি এখনও প্রকাশিত হয়নি– এ যে মোর আবরণ ঘুচাতে কতক্ষণ, তোমার রঙিন পাতায় লিখব প্রাণের কোন বারতা, আমার হারিয়ে যাওয়া দিন, মেঘেরা চলে চলে যায়, যার মধ্যে প্রথম দু’টি গান সত্তরের দশকে আকাশবাণী কলকাতায় কয়েকবার সম্প্রব্যথাপথের পথিক
তন্ময় দাম
জীবনে নানা বিতর্কের জন্ম দিয়ে ১৯৮০-র এক শ্রাবণ দিনে (১৮ অগস্ট) যে-দিন তিনি ১৭৪ই রাসবিহারী অ্যাভিনিউয়ের বাসা খালি করে চলে গেলেন চিরদিনের মতো, সে দিন থেকেই তিনি আস্তানা গাড়লেন এপার বাংলা ওপার বাংলার কোটি মানুষের মনে। রবীন্দ্রসংগীতের জনপ্রিয় শিল্পী ছিলেন দেবব্রত বিশ্বাস। ছিলেন বলব কেন! উনি তো আছেনই। দেবব্রত বিশ্বাস সবার কাছে পরিচিত ছিলেন জর্জ বিশ্বাস বা জর্জদা হিসেবে। তাঁর ছোটবেলায় ব্রিটিশ রাজা পঞ্চম জর্জ একবার ভারতে এসেছিলেন। সেই থেকে তাঁর ডাক নাম হয়ে যায় জর্জ। দেবব্রত বিশ্বাসের জন্ম ১৯১১ সালের ২২শে অগস্ট।বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জ জেলার ইটনার নন্দিহাটি গ্রামে। তাঁর পিতা দেবেন্দ্রমোহন বিশ্বাস। পিতামহ কালীমোহন বিশ্বাস ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ করায় নিজগ্রাম ইটনা থেকে বিতাড়িত হন। শৈশবে কিশোরগঞ্জের বিদ্যালয়ে দেবব্রত সেই কারণে ‘ম্লেচ্ছ’ বলে বিবেচিত হতেন। শিশুবয়সেই মা অবলাদেবীর মাধ্যমে ব্রহ্মসংগীত, রবীন্দ্রসংগীত ও রবীন্দ্রনাথের নামের সঙ্গে পরিচিত হন। মহেন্দ্র রায়ের কাছে দেশাত্মবোধক গান শেখেন এবং কিশোরগঞ্জের স্বদেশী সভায় অল্পবয়স থেকেই গান গাইতেন। ১৯২৭ সালে ম্যাট্রিক পাস করে দেবব্রত বিশ্বাস কলকাতার সিটি কলেজে ভর্তি হন। এইসময় ব্রাহ্মসমাজ ও পরে শান্তিনিকেতনে গান গাওয়ার আমন্ত্রণ পান। জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির সঙ্গেও তখন ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। ১৯২৮ সালের ব্রাহ্ম ভাদ্রোৎসবে কলকাতার সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ মন্দিরে রবীন্দ্রনাথকে প্রথম দেখেন দেবব্রত। ১৯৩৩ সালে সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে এমএ পাশ করেন দেবব্রত বিশ্বাস। পরের বছর হিন্দুস্থান ইনসিওরেন্স কোম্পানিতে বিনা মাইনের চাকরিতে যোগ দেন। এক বছর পর ১৯৩৫ সালে চাকরি পাকা হয় ও বেতন ধার্য হয় ৫০ টাকা। এই চাকরিসূত্রে রবীন্দ্রনাথের ভ্রাতুষ্পুত্র সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও তাঁর পুত্র সুবীর ঠাকুরের সঙ্গে আলাপ হয় দেবব্রতের। মূলত এঁদেরই সূত্রে রবীন্দ্রসঙ্গীত জগতে পদার্পণ দেবব্রতর। ১৯৩৮ সালে কনক দাশের সঙ্গে দ্বৈতকণ্ঠে প্রথম তাঁর রবীন্দ্রসঙ্গীত রেকর্ড। এই সময় থেকে হিজ মাস্টার্স ভয়েস ও অন্যান্য রেকর্ড সংস্থা তাঁর গান রেকর্ড করতে শুরু করে। রবীন্দ্রসঙ্গীতের পাশাপাশি গণসঙ্গীত ও অন্যান্য গানও গাইতেন। তাঁর আত্মজীবনী থেকে জানা যায়, এই সময় কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গেও তাঁর পরিচয় হয়েছিল এবং নজরুল তাঁর গান শুনে তাঁকে দু’টি শিখিয়ে সেগুলি রেকর্ড করিয়েছিলেন। একটি গান ‘মোর ভুলিবার সাধনায় কেন সাধো বাদ’ অপরটি আত্মজীবনীতে তিনি স্মরণ করতে পারেননি। যদিও এই রেকর্ড দু’টি প্রকাশিত হয়নি। দেবব্রত বিশ্বাস হিন্দুস্তান রেকর্ড কোম্পানি থেকে অনেকগুলি গান রেকর্ড করেন। হিজ মাস্টার্স ভয়েস প্রথম দিকে তাঁর কিছু গান রেকর্ড করলেও পরে আর তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। হিজ মাস্টার্স ভয়েস-এ প্রথম দিকের তাঁর কয়েকটি গান হল– আকাশ জুড়ে শুনিনু, এখন আমার সময় হল, ওই আসনতলের মাটির পরে, ওগো পথের সাথী, তুমি রবে নীরবে হৃদয়ে মম এবং এই তো ভাল লেগেছিল। হিন্দুস্থান মিউজিক্যাল প্রোডাক্টস্-এ প্রকাশিত গানগুলিতে তাঁর প্রতিভার বিকাশ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য– আকাশভরা সূর্য্যতারা, যেতে যেতে একলা পথে, গায়ে আমার পুলক লাগে, পুরানো সেই দিনের কথা, এ মণিহার আমায়, আমি যখন তাঁর দুয়ারে, তোমার দ্বারে কেন আসি, পুরানো জানিয়া চেয়ো না, অনেক দিনের আমার যে গান ইত্যাদি ইত্যাদি। হিন্দুস্থানে তাঁর কয়েকটি রবীন্দ্রসঙ্গীত ইংরাজী অনুবাদ সহ (সম্ভবত শিবদাস ভট্টাচার্যকৃত) প্রকাশিত হয়েছে– বড়ো আশা করে ও With a high hope, ক্লান্তি আমার ক্ষমা করো প্রভু ও This weariness forgive me এবং তোমার হল শুরু আমার হল সারা ও Thine is this a beginning বিশেষ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। এছাড়া দুর্লভ কয়েকটি রবীন্দ্রসংগীতও তিনি গেয়েছেন, যেগুলির স্বরলিপি এখনও প্রকাশিত হয়নি– এ যে মোর আবরণ ঘুচাতে কতক্ষণ, তোমার রঙিন পাতায় লিখব প্রাণের কোন বারতা, আমার হারিয়ে যাওয়া দিন, মেঘেরা চলে চলে যায়, যার মধ্যে প্রথম দু’টি গান সত্তরের দশকে আকাশবাণী কলকাতায় কয়েকবার সম্প্রচারিত হয়েছিল, কিন্তু হয়তো সংরক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়ে গিয়েছে। পরের দু’টি গান একটি সিডি-তে প্রকাশিত হয়েছে। দেবব্রত বিশ্বাস যখন সঙ্গীতজগতে প্রবেশ করেন তখন মিহি কণ্ঠই সঙ্গীতের জন্য আদর্শ ও জনপ্রিয় বলে বিবেচিত হত। কিন্তু পঙ্কজ মল্লিক ও হেমন্তকুমার মুখোপাধ্যায়-সহ তিনি গুরুগম্ভীর ও উদাত্ত কণ্ঠকে গানের গলা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ও জনপ্রিয় করেন। এ তিন শিল্পী মিলে রবীন্দ্রসঙ্গীতকে শহরের শিক্ষিতদের বৈঠকখানা থেকে মুক্ত করে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেন। ১৯৬৪ সাল থেকে বিশ্বভারতী সঙ্গীত সমিতির সঙ্গে রবীন্দ্রসঙ্গীতের গায়ন বিষয়ে তাঁর মতভেদ শুরু হয়। মতভেদ তীব্র হলে তিনি রবীন্দ্রসঙ্গীত গাওয়াই বন্ধ করে দেন। ১৯৭১ সালের পর থেকে আর তিনি রবীন্দ্রসঙ্গীত রেকর্ড করেননি। এই কারণে শিক্ষিত মহলে বিশ্বভারতীও কম সমালোচিত হয়নি। ২০০১ সালে ভারতে রবীন্দ্ররচনার কপিরাইট বিলুপ্ত হলে তাঁর বহু অপ্রকাশিত ও অননুমোদিত গান প্রকাশিত হয়। প্রচলিত রীতি অগ্রাহ্য করে দেবব্রত বিশ্বাস গাইতেন নিজস্ব ভঙ্গিতে। তাঁর আত্মজীবনী ‘ব্রাত্যজনের রুদ্ধ সঙ্গীত’ (১৯৭৮) গ্রন্থে দেখা যায়, তিনি দেশিবিদেশি বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করতেন বলে রক্ষণশীল সঙ্গীত শিল্পীরা তাঁর কঠোর সমালোচনা করেন। ফলে বিশ্বভারতীর সঙ্গীত পর্ষদ থেকে তাঁর রেকর্ড অনুমোদন বন্ধ হয়ে যায়। এর প্রতিবাদে তিনি রবীন্দ্রসঙ্গীত রেকর্ড করা থেকে বিরত থাকেন। আক্ষেপ করে দেবব্রত বিশ্বাস গেয়েছিলেন, ‘হ্যারা আমারে গান গাইতে দিল না, আমি গাইতাম পারলাম না’। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে দেবব্রত বিশ্বাস শরণার্থীদের নানাভাবে সহায়তা করেন। এমনকী মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক তাঁর গানের রয়্যাল্টির পুরো অর্থ তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে তুলে দেন। দেবব্রত বিশ্বাস আজীবন মগ্ন থেকেছেন নিজের গানে৷ তাঁর বিরোধিতা হয়েছে, তাঁকে ভাঙিয়ে ব্যবসা হয়েছে, কিন্তু সেই দীনতা তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি৷ তাই আজও তিনি অমলীন, ভাস্বর, এই গানের ভুবনে৷চারিত হয়েছিল, কিন্তু হয়তো সংরক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়ে গিয়েছে। পরের দু’টি গান একটি সিডি-তে প্রকাশিত হয়েছে। দেবব্রত বিশ্বাস যখন সঙ্গীতজগতে প্রবেশ করেন তখন মিহি কণ্ঠই সঙ্গীতের জন্য আদর্শ ও জনপ্রিয় বলে বিবেচিত হত। কিন্তু পঙ্কজ মল্লিক ও হেমন্তকুমার মুখোপাধ্যায়-সহ তিনি গুরুগম্ভীর ও উদাত্ত কণ্ঠকে গানের গলা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ও জনপ্রিয় করেন। এ তিন শিল্পী মিলে রবীন্দ্রসঙ্গীতকে শহরের শিক্ষিতদের বৈঠকখানা থেকে মুক্ত করে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেন। ১৯৬৪ সাল থেকে বিশ্বভারতী সঙ্গীত সমিতির সঙ্গে রবীন্দ্রসঙ্গীতের গায়ন বিষয়ে তাঁর মতভেদ শুরু হয়। মতভেদ তীব্র হলে তিনি রবীন্দ্রসঙ্গীত গাওয়াই বন্ধ করে দেন। ১৯৭১ সালের পর থেকে আর তিনি রবীন্দ্রসঙ্গীত রেকর্ড করেননি। এই কারণে শিক্ষিত মহলে বিশ্বভারতীও কম সমালোচিত হয়নি। ২০০১ সালে ভারতে রবীন্দ্ররচনার কপিরাইট বিলুপ্ত হলে তাঁর বহু অপ্রকাশিত ও অননুমোদিত গান প্রকাশিত হয়। প্রচলিত রীতি অগ্রাহ্য করে দেবব্রত বিশ্বাস গাইতেন নিজস্ব ভঙ্গিতে। তাঁর আত্মজীবনী ‘ব্রাত্যজনের রুদ্ধ সঙ্গীত’ (১৯৭৮) গ্রন্থে দেখা যায়, তিনি দেশিবিদেশি বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করতেন বলে রক্ষণশীল সঙ্গীত শিল্পীরা তাঁর কঠোর সমালোচনা করেন। ফলে বিশ্বভারতীর সঙ্গীত পর্ষদ থেকে তাঁর রেকর্ড অনুমোদন বন্ধ হয়ে যায়। এর প্রতিবাদে তিনি রবীন্দ্রসঙ্গীত রেকর্ড করা থেকে বিরত থাকেন। আক্ষেপ করে দেবব্রত বিশ্বাস গেয়েছিলেন, ‘হ্যারা আমারে গান গাইতে দিল না, আমি গাইতাম পারলাম না’। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে দেবব্রত বিশ্বাস শরণার্থীদের নানাভাবে সহায়তা করেন। এমনকী মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক তাঁর গানের রয়্যাল্টির পুরো অর্থ তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে তুলে দেন। দেবব্রত বিশ্বাস আজীবন মগ্ন থেকেছেন নিজের গানে৷ তাঁর বিরোধিতা হয়েছে, তাঁকে ভাঙিয়ে ব্যবসা হয়েছে, কিন্তু সেই দীনতা তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি৷ তাই আজও তিনি অমলীন, ভাস্বর, এই গানের ভুবনে৷













