
seen from United States
seen from United States
seen from Malaysia

seen from United States

seen from United States

seen from United States
seen from Germany

seen from France
seen from South Africa
seen from United States
seen from United States

seen from Saudi Arabia
seen from Türkiye
seen from United States

seen from United States
seen from Sri Lanka

seen from France
seen from United States
seen from Mexico
seen from United States
Sudden
বড়ো হওয়া
“নীল নীল নীল!! কোথায় তুই” বলতে বলতে এঘর ওঘর হন্য হয়ে খুঁজছিল সুতপা। “দাঁড়া, তোকে পাই একবার আজকে, দেখ তোর কি করি” আজ সকালে নীল, মানে আমাদের সাত বছরের সোহম বাবুর ঘর পরিষ্কার করার পর থেকেই সুতপার মাথায় আগুণ জ্বলছে। এমনিতেই নীলের ঘর পরিষ্কার করবার কথা ভাবলে গায়ে জ্বর আসে সুতপার। তাদের ছোট কিন্তু ছিমছাম সাজানো গোছানো ফ্ল্যাটের প্রতিটা জিনিসের ওপর সুতপার নজর তীব্র। একটা জিনিস এধার ওধার হলেই নীল আর অভ্র, মানে নীলের বাবা, জানে যে এবার দুঃখ আছে তাদের কপালে, তাই সচরাচর এই ব্যাপারে তারা সুতপাকে ঘাঁটায় না। কিন্তু কোনও ভাবে যেন নীলের ঘরটার কাছে এসে সুতপা বার বার হার মেনে যায়। দুষ্টুটা জামা কাপড় পরে যেখানে সেখানে ফেলে রাখবে, মাটিতে অবধারিত ভাবে পড়ে থাকবে কিছু “Lego” pieces, বা আধখোলা বই, পেন্সিল ইত্যাদি, হয়েত কোথাও পড়ে থাকবে একজোড়া নোংরা মোজা বা ওর ক্যারাটের পোশাক, আর আরও এরকম কত কি। সুতপা বার বার বলে হাল ছেড়ে দিয়েছে। আর তাছাড়া যতই হোক ওই টুকু বাচ্চা, তাকে আর কতইবা নিয়ম শৃঙ্খলার গণ্ডিতে বেঁধে ফেলা যায়? সুতপা নিজেও বোঝে সেটা আর তাছাড়া অভ্রও মাঝে মাঝে মনে করিয়ে দেয় “দেখো ওর ঘরটা ওর কাছে ওর নিজের জগত, ওখানে ওকে একটু ওর নিজের মত করে থাকতে দাও। ভাবো আমরা যখন ছোট ছিলাম আমরা কি রকম ছিলাম” “ওই টুকু বাচ্চা, সে তো একটু আধটু ওরকম করবেই” তাই সুতপা কিছুটা বাধ্য হয়েই মেনে নিয়েছে যে নীলের অগোছালো ঘরটা তাদের বাড়ির একটা আপাত ব্যাতিক্রম হয়েই থাকবে, কিন্তু তবুও তার চেষ্টা থাকে যে মাঝে মাঝে ঘরটার একটু খানি গোছানো চেহারা দিতে। আর আজ সেটা করতে গিয়েই যত বিপত্তি!! আজ নীলের ঘর গোছাতে গিয়ে সুতপা দেখে নীলের অনেক গুলো খেলার সরঞ্জাম, যার মধ্যে কিছু বেশ দামি, বেপাত্তা। সুতপা সেই তখন থেকে খুঁজে চলেছে যদি সেগুলোর যদি হদিশ পাওয়া যায় কিন্তু ওর ঘর ওলট পালট করেও তার একটারও পাত্তা পায়নি। মাঝে একবার নীল বাবু ভুল করে করে মায়ের সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল। তখন সুতপা শুধিয়েছিল তাকে “নীল, তোর সেই ছোট্ট জাহাজের মডেলটা, ব্যাডমিন্টনের সেট বা অতগুলো বোর্ড গেমস গেল কোথায়?” “আর আগের বারে যে তোর জন্মদিনে শিপ্রা মাসি তোকে অত সুন্দর দেখতে কাঠের ঘোড়াটা এনে দিল সেটাই বা কোথায়?” নীল নিরুত্তর। তারপর, সুতপা তাকে আরও কিছু ভাল ভাবে জিজ্ঞেস করবার আগেই সে হাওয়া বেগতিক বুঝে মায়ের সামনে থেকে পালিয়েছে, যখন সুতপা খুঁজতে ব্যস্ত ছিল। আর তখন থেকেই সুতপা ওকে ডেকে যাচ্ছে। এঘর ওঘর করতে করতে সুতপার আরও বিরক্তি বাড়ছিল। তার সংসারের সব কাজ পড়ে আছে। আজ রবিবার, কাজের মাসি এসে সকালে যথারীতি ঘরদোর সাফ করে দিয়ে গেছে। অভ্র একটু আগে বাজার করে ফিরেছে। ওদের তিনজনের রান্নাটা সাধারণত সুতপা নিজেই সেরে নেয়। তাই সব বাজার তুলে রাখা, কাটাকুটি, রান্নার জোগাড়যন্ত্র সব বাকি। এমনিতেই শনি রবিবার অভ্রও বাড়ি থাকে বলে সুতপা একটু আধটু বাহারি রান্না করবার চেষ্টা করে। “আরে এত চেঁচাচ্ছ কেন? কি করেছে নীল?” অভ্র সুধালো “আরও কিনে দাও ওকে নানা রকম জিনিস, যা চাইছে তাই দিয়ে দিয়ে ওর মাথাটা খেয়েছ তুমি” সুতপা রেগে প্রত্যুত্তর দিল। “সব হারিয়ে বসে আছে, ভেবেছেটা কি? আমাদের পয়সার গাছ আছে?” বলতে বলতে সুতপা তখনও খুঁজে যাচ্ছিলো বিচ্ছুটাকে। “এই যে এই খানে ঢুকে বসে আছো তুমি। বের বের বলছি” বলতে বলতে কান ধরে টানতে টানতে নীলকে নিয়ে বেরল সুতপা, ওদের শোওয়ার ঘরের লাগোয়া বাথরুম থেকে। “এতক্ষন ধরে ডাকছি উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন মনে করোনা” বলতে বলতে দু এক ঘা লাগিয়ে দিল সুতপা ওর পিঠে। “বল বল কি করেছিস অতগুলো জিনিসের?” “আরে করছ কি? ওই ভাবে বাচ্চাকে কেউ মারে নাকি?” হাঁ হাঁ করে এগিয়ে এলো অভ্র “তুমি যাও রান্নাবান্না দেখ আমি ওকে ভাল করে জিজ্ঞেস করছি” বলে অভ্র একপ্রকার জোর করেই নীলকে সুতপার হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে ঢুকে গেল নীলের ঘরে। “ওই করো আরও লাই দাও ওকে” গজগজ করতে করতে সুতপা ঢুকে গেল রান্নাঘরের ভেতর। নীল বাবু তখন ওর ফর্সা রাঙ্গা গাল দুটো আর ঠোঁট ফুলিয়ে ফোঁপাচ্ছে থরথর করে আর দুচোখে বয়ে যাচ্ছে জলের ধারা। ওর চোখের জল আবার সহ্য করতে পারেনা অভ্র একেবারেই। এমনিতে বাবা মা দুজনেরই আদরের মনি নীল। ছোটবেলা থেকেই বেশ ডাগরডোগর দেখতে ওকে। হাসলে আবার এক গালে টোলও পরে। ওর দাদু দিদারা বলে সাক্ষাত গোপাল ঠাকুর। মাঝে মাঝে আবার সুতপার বেঁধে দেয়া মাথায় একটা ঝুঁটি নিয়ে যখন ও খেলে বেড়ায় নিজের মনে, তখন সত্যি যেন ওর দিক থেকে চোখ ফেরানো দায় হয়ে ওঠে। তাই ওর চোখে জল দেখলে অভ্র বা সুতপা দুজনেই একটু দুর্বল হয়ে যায়, যদিও তারই মধ্যে সুতপা, ছেলেকে অত্যাধিক প্রশ্রয় দিয়ে মাথায় তুলবে না বলে একটু কড়া হওয়ার চেষ্টা করে। “আচ্ছা কাঁদেনা ওরকম করে, তুমি বল আমাকে কি করেছ তোমার খেলনাগুলো নিয়ে” অভ্র নরম স্বরে জিজ্ঞেস করল নীলকে চুপ করে রইল নীল। “দেখ তুমি না বললে কিন্তু মা আরও রেগে যাবে” অভ্রের কথা শুনে কিছুক্ষুন কি একটা ভেবে নীল অভ্রকে হাত ধরে নিয়ে গেল ওর ঘরের জানলাটার দিকে। “ওই ওদেরকে সব দিয়ে দিয়েছি” বলে দিক নির্দেশ করলো নীল, ওদের বাড়ির বাইরে বড়ো রাস্তার পাশের ফুটপাতের দিকে। অভ্র দেখলো দুটো বাচ্চা ছেলে আর একটি মেয়ে, বড়োজোর পাঁচ থেকে সাত বছর বয়স, প্রায় আদুড় গায়ে, ধুলোবালি মেখে সেখানে লুটোপুটি করছে তখন। ওই মুখ গুলো ওর চেনা। ওদের অন্ধ মা, বড়োজোর উনিশ কি কুড়ি বছরের একটি মেয়ে, প্রায়ে প্রতিদিন বসে থাকে অভ্রদের বাড়ির কিছু পরেই যে রাস্তার ওপর এক সারি দোকান ঘর আছে তারই একটার কোনে। অভ্র কানাঘুষো এইটুকুই শুনেছিল যে মেয়েটীর জীবনে নাকি বিয়ের বেশ কিছু বছর পর হঠাৎ করে অন্ধত্বের আঁধার নেমে আসে আর তার পর পরই ওর মাতাল স্বামী ওকে ঘর থেকে তাড়িয়ে দিয়ে আবার আর একটা নতুন বউ ঘরে এনে তোলে। সেই থেকেই মেয়েটি ওর বৃদ্ধা মায়ের কাছে এসে আছে। ভাগ্যহীনা মেয়েটির ওই বুড়ি মা আর তিন পড়ে পাওয়া ছেলে মেয়ে ছাড়া এই বিশ্ব সংসারে আর কেউ যে আছে তা অভ্র কোনদিনই খুব একটা ঠাহর করতে পারেনি রাস্তা দিয়ে আসতে যেতে। হ্যাঁ এটুকু লক্ষ্য করেছে যে মেয়েটির মা প্রতিদিন সকালে ওকে ওই দোকানের বাইরের এক কোনে একটা শতচ্ছিন্ন মাদুরের ওপর বসিয়ে, এক মুঠো মুড়ি আর একটা নোংরা বোতলে একটু জল ধরিয়ে দিয়ে বেরিয়ে যায় নানা কাজে। তারপর দিনের বাকি সময়টা, এক টুকরো পরিত্যক্ত ফেলে দেয়া আবর্জনার মত, মেয়েটি, খানিক জবুথবু মেরে আর খানিক নিজেকে শামুকের মত গুটিয়ে বসে থাকে দোকানের ওই এক কোনায়। আর অন্ধ মায়ের থেকে একটু দুরে তার নিতান্তই শীর্ণ জীর্ণ আর অবহেলিত ওই বাচ্চা তিনটের সম্বল বলতে তখন রাস্তার ধুলো, কাটফাটা রোদ্দুর বা বৃষ্টির জমে থাকা জলকাদা। মাঝে মাঝে কোনও পথচারী বা আসে পাশের দোকানের কেউ নেহাতই দয়াপরবশ হয়ে ওদের হাতে কিছু গুঁজে না দিলে ওদের প্রতিদিন সেভাবে কিছু পেটে পড়ে কিনা তাও নিতান্ত সন্দেহের, যদিনা বেলা শেষে, ওদের দিদিমা, নিজের শ্রান্ত দেহটা কোনও রকমে হিঁচড়ে টেনে এনে, মেয়ে আর নাতি নাতনীদের হাতে তুলে দেয়, হয়তবা তাদের দিনের একমাত্র আহার। নীল তখনও বলে চলেছিল “আমি কত কিছু নিয়ে খেলি বাবাই কিন্তু দেখ ওদের কিছুই নেই, তাই আমি ওদেরকে ওগুলো দিয়ে দিয়েছি।” “জানোতো বাবাই ওই খেলার জিনিসগুলো পেয়ে ওরা কি খুশি। আমি দেখি ওরা ওগুলো নিয়ে প্রায়ই খেলে। আবার মাঝে মাঝে ওপরে, আমার জানলার দিকে তাকায়, আমাকে দেখতে পেলে হাতও নাড়ে।” “আচ্ছা ওদের এত কষ্ট কেন? ওদের কি ভালবাসার কেউ নেই?” “কিগো বাবাই কিছু বলছ না কেন?” “তুমি কি রাগ করেছ?” বলে অভ্রর হাত ধরে টান মারে নীল। দৈনন্দিন জীবনের অবশ্যম্ভাবী রূঢ়তা দেখতে দেখতে হয়তবা কিছুটা ভোঁতা হয়ে যাওয়া অভ্রের মনুষ্যত্ব বোধের হঠাৎই যেন ঘোর ভাঙ্গে তার সাত বছরের ছেলের কথায়। কিছুক্ষণ এক দৃষ্টে চেয়ে থাকে নীলের নিষ্পাপ মুখটার দিকে, তারপর আস্তে আস্তে ওর মুখটা নিজের বুকের দিকে টেনে নিয়ে বলে “না বাবু রাগ করবো কেন। খালি তুই যে কবে এতটা বড়ো হয়ে গেছিস বুঝতে পারিনি আমি।” বলতে বলতে ঝাপসা হয়ে ওঠে অভ্রর চোখটা। কখন জানিনা সুতপাও ঘরের দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়ে বাপ-ছেলের কথোপকথন শুনছিল এতক্ষন। ওরও চোখের কোনটা যেন চিকচিক করে ওঠে এবার। সত্যি তো হবে নাই বা কেন!! খেয়ালি করেনি ওরা দুজন যে হঠাৎ কত বড়ো হয়ে গেছে ওদের নীল সোনা, ওদের সবার থেকে অনেক বড়ো অনেক বড়ো!