তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব নিয়ে পড়ার সময় বিশ্বের প্রধান ধর্মগুলো নিয়ে পড়ার চেষ্টা করেছিলাম। ইসলামের বিরুদ্ধে প্যাসিফিক ক্রুসেডের আদলে প্রাচ্যবিদ্যা খ্রিস্টানরাই শুরু করে। সেই প্রাচ্যবিদদের থেকে ব্যাখ্যা ধার করে ইসলামের বিরোধীতা মুক্তমনা অ্যাক্টিভিস্টদের অন্যতম কর্ম। যাই হোক, আমি প্রথমের খ্রিস্টানধর্মের মূল নিয়ে পড়ার চেষ্টা করেছিলাম, মূলের কথা বললে প্রথমেই আসে বাইবেল। এ সংক্রান্ত নানা বইপত্র ঘাঁটতে গিয়ে দেখি, বাইবেলের মূল পাণ্ডুলিপির কোনো হদিস নেই। হাইড পার্কের এক ডিবেটে নামকরা খ্রিস্টান পলেমিক জে স্মিথ-কেও অকপটে এই বাস্তবতা স্বীকার করতে দেখেছি।
এখন আসা যাক বিরাজমান পাণ্ডুলিপির কথায়। বাইবেলের নতুন নিয়ম, যেটাকে New Testament বলা হয়, এর মূল গ্রিক পাণ্ডুলিপির ভিন্ন পাঠের (variants) সংখ্যাই ৫৭০ এর ওপরে। সব ভাষার পাণ্ডুলিপি মিলিয়ে কারও কারও মতে ভ্যারিয়েন্টের সংখ্যা চার লক্ষ বা তারও বেশি! নতুন বাইবেলের মোট শব্দের সংখ্যার চেয়েও ভিন্নপাঠের পাণ্ডুলিপির সংখ্যা বেশি! [১] বাইবেলের এমন দুটি পাণ্ডুলিপিও খুঁজে পাওয়া যাবে না যা হুবহু এক। তা ছাড়া এদের মাঝে বড় রকমের পার্থক্যের সংখ্যাও কম নয়। [২]
বাইবেল যে বিকৃত হয়ে গেছে, তা জানার জন্য অন্য গবেষকের বক্তব্য কেউ মানতে না চাইলেও সমস্যা নেই। বাইবেলের Revised Standard Version (RSV) অথবা New Revised Standard Version (NRSV) খুলে ভূমিকাটা পড়লেই এই স্বীকৃতি খুঁজে পাওয়া যাবে। যেমন, খ্রিষ্টান জগতে বহুল প্রচলিত, বাইবেলের RSV এর ভূমিকায় বলা হয়েছে :
মূল লিপিগুলো যুগে যুগে হস্তান্তরের ফলে যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, মাঝে মাঝেই সেটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তবে মূল লিপিগুলোর কোনো সংস্করণই অর্থের সন্তোষজনক পুনরুদ্ধার দেখাতে পারেনি। [ The Bible, Revised Standard Version; Preface, p. iv-v (2nd ed. 1971) ]
দ্য ক্যাথলিক এনসাইক্লোপিডিয়া জানায় :
প্রাচীন যুগের কোনো পুস্তক লেখকের হাত থেকে ছাড়া পাওয়ার পর ঠিক সেরূপেই আমাদের নিকট আসেনি, সবগুলোই কোনো-না-কোনোভাবে বদলে গেছে । হাল আমলের পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই-বাচাইয়ের মানসিকতার তুলনায় আগের অবস্থা ছিল অনেক ভিন্ন। প্রিন্টিং আবিষ্কার হওয়ার আগে কোনো পাণ্ডুলিপির প্রসারে নানা জটিলতা, পাণ্ডুলিপির প্রতি অনুলিপিকারী, সংশোধনকারী ও ব্যাখ্যাকারীদের নগণ্য যত্ন; এসব নিয়ামকই একই পুস্তকের নানা পাণ্ডুলিপির মাঝে পাওয়া বিকৃতি ব্যাখ্যার জন্য যথেষ্ট। [ Alfred Durand, The New Testament article in: The Catholic Encyclopedia; Vol. 14. (New York: Robert Appleton Company, 1912. 4 Jun. 2018) ]
এসকল বিকৃতির পাশাপাশি সাধু পল কর্তৃক ব্যাখ্যামূলক বিকৃতি যিশুর প্রচারিত ধর্ম থেকে খ্রিষ্টধর্মকে বহু দূরে সরিয়ে নিয়ে গেছে। যেমন—ইতিহাস ঘাঁটলে এটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যিশুর একেবারে প্রথমদিকের অনুসারী যেমন, যিশুর ভাই জেমস, শিষ্য পিটার যিশু সম্পর্কে যে বিশ্বাস পোষণ করতেন, অনেকটা তেমন বিশ্বাস পোষণ করতেন যিশুর অনুসারী ইবিওনাইটস (Ebionites) গোষ্ঠী। তারা কেউই যিশুকে খোদার অংশ বা তিনের এক মনে করা (Trinity) বা ইয়াহূদি আইন মানতে হবে না—এমন বিশ্বাস পোষণ করতেন না। তাঁরা যিশুকে খোদাপ্রেরিত একজন নবি ও মাসীহ হিসেবে বিবেচনা করতেন। [৩]
অনেক গবেষকের মতে উপরি-উক্ত বিশ্বাসই ছিল যিশুর একেবারে প্রথমদিককার অনুসারীদের বিশ্বাস। [৪] ৩য় শতক পর্যন্ত অধিকাংশ খ্রিস্টানই স্রষ্টাকে একক হিসেবে মনে করতেন, ত্রিত্ববাদি ধারণা তাদের ছিল না। [৫] ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়—যিশু তাঁর মূল ভূমি মধ্যপ্রাচ্যে জীবদ্দশায় ও পরবর্তী প্রায় দু শ বছর নবি হিসেবেই বিবেচিত হয়েছেন। [৬] সময়ের সাথে সাথে তাকে ঘিরে নানারকম বিশ্বাসের উদ্ভব হয়। তাদের কেউ যিশুকে ঈশ্বর দাবি করে বসে (Marcionites), কেউ আবার স্ব স্ব ব্যাখ্যা অনুযায়ী ভাবতে শুরু করে যিশুর মানুষ ও ঈশ্বর দুই গুণই আছে (Subordinationist, Separationists, Proto-Trinitarians)।
আজকের খ্রিষ্টানদের যে ত্রিত্ববাদে বিশ্বাস তা প্রথম তিন শতাব্দী পার হওয়ার পরও সংখ্যাগরিষ্ঠ লোকের বিশ্বাস ছিল না। এত রকমের বিশ্বাসের মাঝে কোনটি ঠিক, তা নির্ধারণ করার জন্য রোমান সম্রাট কনস্টানটিন ৩২৫ খ্রিষ্টাব্দে নাইসিয়াতে (বর্তমানে তুরস্কের ইজনিক-এ) এক সম্মেলনের আয়োজন করেন (Council of Nicaea)। বিশুদ্ধ আকিদা রক্ষার জন্য কোনো মাথাব্যথা কনস্টানটিনের ছিল না, তিনি রাজ্যের স্থিতিশীলতা রক্ষায় এই পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। প্রটেস্টান্ট ঐতিহাসিক ফিলিপ স্কাফ স্বীকার করেছেন, সেই সম্মেলনে অংশ নেওয়া অধিকাংশ ধর্মবিদই প্রাক-ত্রিত্ববাদে বিশ্বাসী ছিলেন না। [৭]
তাদের একাংশ বিশ্বাস করতেন যিশু খোদার সমান নয়, উপাদানেও এক নয় বরং খোদা কর্তৃক সৃষ্ট, তবে ঐশ্বরিক গুণসম্পন্ন। এই গোষ্ঠীর নেতৃত্বে ছিলেন আরিয়াস। অন্য দলে ছিলেন এথেনাসিয়াস এর নেতৃত্বে প্রাক-ত্রিত্ববাদপন্থি গোষ্ঠী। আর বাদবাকি অধিকাংশই ছিলেন মধ্যম অবস্থানে। নাইসিয়ান সম্মেলন চলাকালে, মত এক পর্যায়ে প্রাক-ত্রিত্ববাদপন্থিদের দিকে ভিড়ে যায়। রাজা কনস্টানটিন নিজেও এথেনাসিয়াসের অবস্থানের পক্ষে মত দেন। তাই রাজার সাথে ঝামেলা না গিয়ে মধ্যম অবস্থানে থাকা ধর্মবিদদের অধিকাংশই এই মতেই ঝুঁকে যান। [৮] সম্মেলনের শেষে আকিদা বাক্য তৈরি করার পরও প্রায় আঠারো জন ধর্মগুরু তার বিরোধিতা করেন। সম্রাট কনস্টানটিন তাদের নির্বাসনে পাঠানোর হুমকি দেন। তারপরও আরিয়াস ও আরও দুজন ধর্মগুরু সাক্ষর করা থেকে বিরত থাকেন। তাদেরকে নির্বাসনে পাঠানো হয়, তাদের কিতাবাদি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। [৯]
নাইসিয়ার সম্মেলনের পর সকল খ্রিষ্টানদের প্রাক-ত্রিত্ববাদে বিশ্বাসে বাধ্য করা হয়। যারা বিরোধিতা করে তাদের নির্বাসনে পাঠানো হয়, হত্যা করা হয়। সাধু জিরোমের বিবরণে জানা যায়, প্রাণের ভয়ে যেসব ধর্মগুরু নাইসিন ক্রিডে সাক্ষর করেছিলেন তাদের মাঝে নিকোমেডিয়া শহরের ইউসেবিয়াস, ক্যালসেডন শহরের ম্যারিস ও নাইসিয়ার থিওগনেস প্রবল অনুশোচনায় ভুগে পরে এক চিঠিতে কনস্টানটিনকে বলেছিলেন,
হে রাজপুত্র! আমরা এক অধার্মিকের কাজ করেছি । আপনার ভয়ে (যিশুকে স্রষ্টা বানানোর) এই ব্লাসফেমি মেনে নিয়েছি। [ Ian Wilson, Jesus The Evidence; p. 168 (New York: Harper and Row, 1984) ]
অথচ মজার ব্যাপার হলো প্রাক-ত্রিত্ববাদকে চাপিয়ে দেওয়া সম্রাট কনস্টানটিন মৃত্যুর আগে নিজেই ত্রিত্ববাদের বিশ্বাস থেকে সরে আসেন। নিকোমেডিয়া শহরের ইউসেবিয়াস তাকে আরিয়ানদের বিশ্বাসে তরিকাবন্দী করেন! [৯] অন্যতম দক্ষ বাইবেলবিদ ড. জোহানস ওয়েস Paul and Jesus গ্রন্থে বিস্তারিত আলোচনা শেষে বলেন :
যিশুর শিক্ষার সাথে তুলনা করলে, প্রথমদিককার চার্চগুলো এবং সাধু পল যিশু সম্পর্কে যে বিশ্বাস পোষণ করতো—তা ছিল নতুন কিছু; মূলত এটি ছিল এক নতুন ধর্ম। [ Johannes Weiss, Paul and Jesus; p. 130 (Translated By Rev. H. J. Chaytor; London: Herper & Brothers, 1909) ]
অর্থাৎ, খ্রিস্টধর্মকে প্রত্যাখ্যান করার বেশকিছু কারণের মাঝে একটি হল – বাইবেলের শব্দগত ও অর্থগত বিকৃতি। সামনে সুযোগ পেলে আরো কারণ উল্লেখ করা যাবে ইন শা আল্লাহ্।
রেফারেন্স:
১। Bart Ehrman, MISQUOTING JESUS:The Story Behind Who Changed the Bible and Why; p. 89-90 (HarperCollins Publishers, 1st Edition, 2005)
২। Bart Ehrman, Lost Christianities: The Battles for Scripture and the Faiths We Never Knew; p. 78 (Oxford: Oxford University Press, 2005)
৩। Bart Ehrman, Jesus, Interrupted: Revealing the Hidden Contradictions in the Bible (and Why We Don’t Know About Them); p.191-193 (HarperCollins e-books, 2009)
৪। Bart Ehrman, The Orthodox Corruption of Scripture: The Effect of Early Christological Controversies on the Text of the NT; p. 48 (Oxford: Oxford University Press, 1993)
৫। Encyclopedia Britannica, Vol. 23, p. 963 (11th edition)
৬। James D.J. Dunn, The Evidence for Jesus; p. 96 (The Westminster Press, 1985); Albert Schweitzer, The Quest of the History Jesus; p. 28-29 (Translated by W. Montgomery; London, Adam and Charles Black, 2nd English edition 1911)
৭। Philip Schaff, The Christian Church from the 1st to the 20th Century; Vol. III, chapter 9, section 120 (Ebook Edition, Delmarva Publications Inc., March 24, 2015)
৮। Encyclopedia Britannica, vol. 16, p. 410-411 (14th ed.)
৯। Richard E. Rubenstein, When Jesus Became God: The Epic Fight over Christ’s Divinity in the Last Days of Rome; p. 83 (Harcourt Brace & Company, 1st Edition 1999); Abu Zakariya, Jesus: Man, Messenger, Messiah; p. 17 (London: iERA, 1st Edition 2017)
১০। Hans A. Pohlsander, The Emperor Constantine; p. 83 (Routledge, 2nd Edition, 2004)