ঘড়ির কাটা বেজে সাতটা। কর্মব্যস্ত মানুষের রোজকার জীবনের অভ্যাস শুরুর সময়। কেউ কাজে যাবার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, কেউ আরেকটু আরাম করে ঘুমিয়ে নিচ্ছে। দেখতে দেখতে কার্তিক মাস শেষ হতে না হতেই অঘ্রাণ মাসটাও শেষ দিকে চলে এলো। তীব্র শীত পড়তে শুরু করেছে গ্রামে। সকাল সকাল গরু নিয়ে দৌড়ে ছুটছেন শমসের আলী তালুকদার। বাপের মুখে শুনেছে তালুকদার বংশ নাকি নামকরা বংশ ছিল একসময়। জমিজমার বিশাল অংশ এদের দখলে থাকত। তার জন্যই হয়ত বাপ-দাদার আমল থেকে এত জমিজায়গা পেয়েছে শমসের আলী। বংশপরম্পরায় কৃষি, চাষবাসের মাঝেই একজীবন কেটে যাচ্ছে তালুকদার বাড়ির৷ বয়স ষাট ছুঁই ছুঁই শমসের আলীর। মনে, দেহে কোথাও বার্ধক্যের ছাঁপ নেই। চোখমুখে একটা রাগান্বিত ভাব থাকে সব সময়। কিন্তু এই রাগ চোখের আড়ালে মনটা খুবই কোমল। যাকে জীবনে কিছু দেয় সেটা উজাড় করিয়াই দেয়৷ আমন ধানের ফলন ভালো হয়েছে এবার। আনন্দে আত্মহারা শমসের আলী তালুকদার। এবার কিছু টাকা কড়ি জমাইয়া জমজমাট করে মেয়েটার বিয়ে দিবে ভাবতে বসে তালুকদার। নিজেকে বড়ই সুখী মানুষ মনে হয় তার যখন জমিতে আশানুরূপ ফলন আসে। আঁকাবাঁকা ধান ক্ষেতের আইল ধরে সামনে এগুচ্ছে শমসের আলী। খালি চোখে বেশিদূর গন্তব্যের পথ দেখা যায় না। পুরোদমে কুয়াশা বিস্তার করছে। শীতের শিশির জমে আছে দূর্বা ঘাসে। খালি পায়ে সকালের শিশিরের গন্ধটা শরীরটাকে সতেজ করে তুলে। পূর্ব দিক থেকে সোনালী রোদের আলোর দেখা মেলতে শুরু করেছে। এমন সকালে রোদের আলোর তীব্রতা মনের সকল অলসতা, বিষন্নতা কে ছিন্নভিন্ন করে দিয়ে ত্রিশ বছরের যৌবনে ফিরিয়ে নিয়ে যায়৷ পূর্ব দিকের শেষ মাথার বাড়িটার সামনে একটা সবজি বাগান দেখা যাচ্ছে। বাহারি রকমের সবজি এখানে। শীতকালীন মৌসুমে যেন শাকসবজির রাণীরা নেমে আসে মাটিতে৷ লাউ গাছে দশ-বারোটা কচি লাউ ঝুলছে, বিশাল জায়গা জুড়ে শিম গছ, লাইন ধরে লাগানো পেঁয়াজ-রসুন, তার ফাঁকে ফাঁকে কাচাঁমরিচ গাছ। একপাশে নিম গাছ, লেবু গাছ, সুপারি গাছ, চালতা গাছ, পেঁপে গাছ। একদম শেষ পাশটাতে মিষ্টি কুমড়ো গাছ। ধানের চাষবাস ঠিক রেখেও এতকিছু একসাথে কেমন করে একটা মানুষ সামলাতে পারে হিসেব মেলাতে পারে না শমসের আলী তালুকদার।
কাশেম শেখের বাড়ি এটা। কাশেম শেখের পেশা আদৌ কি সেটা বুঝতে পারেনা গ্রামের কেউ। মৌসুমি ফসলের সময়ে জমিতে ফসল ফলানো, ভরা বর্ষায় কানহা নদীতে মাছ ধরা, তীব্র শীতে যাত্রা পালাতে যোগদান এমনকি মাঝেমাঝে গঞ্জের মেলাতে মানুষকে সার্কাস দেখিয়ে মাতিয়ে রাখে। চারপাশের এলাকাজুড়ে ভালোই নামডাক এই কাশেম শেখের। সার্কাস খুবই জনপ্রিয় আশেপাশের কয়েকশো গ্রাম জুড়ে। পোলা, মাইয়া, নববধূ, বুড়া-বুড়ি সবার সমাগম মেলে এখানে। সদ্য বিয়ে হওয়া নারীর সোনালী চুড়ির শব্দে আশপাশের পরিবেশ ভরা বর্ষার জোয়ারে ভেসে আসা পানির মতোই পুর্ণতা পায়। জমে উঠে হরেক রকমের মেলার আয়োজনও। শীত বাড়ার সাথে সাথে কাশেম শেখের জীবনের ব্যস্ততাও বেড়ে যায়৷ কখনো কখনো দেখা যায় ম্যালা দিন, মাস আর দেখা মেলে না তার। বড়ই অদ্ভুত মানুষ এই কাশেম শেখ। ঠোঁটের কোণে হাসি লেগে থাকে না এমন মুহূর্ত গ্রামের খুব কম মানুষেই দেখেছে তাকে। শমসের আলী তালুকদারকে দেখেই এগিয়ে এসে সালাম দিল কাশেম শেখ।
কাশেম শেখঃ সালাম বাইজান। শইলডা কেমন আপ্নের? এই বেইন্নালা দুইডা ভাত মুখে দিয়া যাইতেন যদি এই গরীবের ঘরে। আপনার বউমা পুটি মাছের ভর্তা বানাচ্ছে ক্ষেত থেকে তুলে আনা টাটকা হজেরপাতা দিয়া। গরম ভাতের মার ফেলেছে হবাই।
শমসের আলী তালুকদারঃ ওয়ালাইকুম আস সালাম। তোমরার দোয়ায় ভালোই আছি। না আজ না মিয়া। ঘরে অনেক কাজ৷ ক্ষেতে লোক নিয়েছি। এদের তদারকি করে একবার গঞ্জে যাইতে হবে। দিন যা ছোট চোখের পলকেই ফুরিয়ে যায়। তোমার বাড়িটা ঘুরে দেখতে ভালো লাগছে।
কাশেম শেখঃ আইসেন বাইজান। লতাপাতা, শাকসবজি নিয়া যাইতে পারেন না আইসা। কে খাবে এত কিছু? মাইয়াডারে পাঠাইয়া দিবেন যখন যা লাগে৷
শমসের আলী তালুকদারঃ আইচ্ছা মিয়া। তুমি কি গঞ্জে যাত্রাপালা শুরু করছো? শীত তো চলে এলো যে!
কাশেম শেখঃ না বাইজান। গতরে জোর পাই না। মনডাও চায় না আজকাল। আগের মতো কিছুই করতে পারি না। মনে হয় যেন মইরা যাবো অকালেই!
কি যেন ভাবতে ভাবতে কাশেম শেখকে বিদায় দিয়ে সামনের দিকে পা বাড়াল শমসের আলী তালুকদার। ছেলেটার কথাবার্তা, আপ্যায়ন বড়ই ভালো লাগে। মা হারিয়েছে জন্মের ক’দিন পরেই। জীবনের দুঃখ, যন্ত্রণা তাকে স্পর্শ করলেও স্থবির করে রাখতে পারে নি। মনের জোরের দিক থেকে সে ভেঙে পড়ে যাওয়া পুরুষও না। এ-সব ভাবতে ভাবতে কাশেম শেখের বাড়ির শেষ সীমানায় এসে দাঁড়াল শমসের আলী। বাহারি রকমের ফুল ফুটেছে আজ বাড়িতে। শীতের আগমনী সময়টাতে ফুল, রোদ আর বাতাস-এই তিন জিনিসের খুব মিল থাকে। মিষ্টি রোদ, শীতল বাতাস আর মন ছুঁয়ে যাওয়া ফুলের গন্ধ মনকে মাতাল করে দেয়। দুইটা বিশাল বাঁশ ঝাড় বাড়ির শেষ দিকটাতে। একটা সংস্কার বিহীন বড় পুকুর। আলগাতরার ন্যায় কপাল পুড়ে যাওয়া কালো হয়ে আছে পুকুরের জল। পুকুরের চারপাশে এত গাছপালা যে আলো আসার কোনো উপায় নাই এখানে। বড় বড় কতগুলো আম, তেতুল আর গাবগাছ। একটা মাটির উঁচু টিলা। এখানটাতে কাশেম শেখের মায়ের কবর। কবরের দিকে তাকিয়ে আনমনে কি যেন ভাবছিল শমসের আলী। একদিন সবাইকেই চলে যেতে হয় মায়ামায় পৃথিবী ছেড়ে৷ এই প্রকৃতি, এই সংসার, এই জমিজামা, এই আমাকে যার জন্য এত ভালোবাসা এত ত্যাগ সব রেখেই চলে যেতে হবে। যেতে হবে অজানার পথে, অচিন পথে। ভাবতেই শরীরটা কেঁপে উঠল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাঁটা ধরে শমসের আলী। জমিতে ধানমাড়াই চলছে। লোক নিয়েছে কিছু। তাদের আবার দুপুরে খাবার বন্দোবস্ত করতে হবে৷ অনেক কাজ আজ তার মাথায়। ধানের কাজ শেষ করেই তাকে আবার বোরো ধানের বীজ করার জন্য জমিতে লাঙ্গল দিতে হবে। নয়ত রোদের পরিমাণ কমে গেলে, শীতের তীব্রতা বেড়ে গেলে সমস্যা হয়ে যাবে। এ-সব ভাবতে ভাবতে একটা বিড়ি ধরায় শমসের আলী। আজকের বিড়ির ধোঁয়াটা তার ভালো লাগছে। অপার্থিব সুখ টাইপ ভালো লাগা।
গ্রামের মধ্যে পৈতৃকসূত্রে বসবাসকারী লোকজন ছাড়া অন্যান্য জায়গা থেকে খুব কম মানুষেই এখানে বাস করতে এসেছে৷ কয়েক দশক আগেও এই গ্রামে হাতেগোনা কয়েকটা ঘর ছাড়া আর কোনো কিছুই ছিল না। বন, নদী, খোলা জমিজমা ছিল৷ মানুষের জন্মহার বাড়ছে রোজ। আধুনিকতার কোনো ছাঁপ নেই তেমনভাবে এখানে। কিছু কিছু ঘরে এখনো বিদ্যুৎ এর আলো পর্যন্ত যায় নি৷ সন্ধ্যায় কেরোসিনের কুপি বা হ্যারিকেন-এর আলো জ্বলে। দক্ষিণে কানহা নদীর পাশে কিছু জেলে পরিবারের বসবাস। ওদের দিক তাকালে প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন মেলানো যায় আজো। আবছা সন্ধ্যার নদী যখন শান্ত হয়ে আসে তখনি প্রদীপ জ্বলতে শুরু করে জেলেপাড়ার ঘরগুলিতে। এই গ্রামে মারামারি খুব একটা দেখা যায় না। মুরুব্বীদের প্রতি শ্রদ্ধা ভক্তি আজো বিরাজমান। সংখ্যাগরিষ্ঠ লোক ধার্মিক। স্রষ্টার প্রতি অগাধ বিশ্বাসের নিদর্শন দেখা যায় দৈনন্দিন চলাফেরায়। শমসের আলী তালুকদারের দিল নরম। পিছিয়ে পরে যাওয়া জনগোষ্ঠীদের উন্নয়ন নিয়েও ভাবেন। সে বিশ্বাস করে সবার জীবনে সুখ, শান্তির ছোঁয়া দরকার। ভাবতে ভাবতে মসজিদ হইতে মুয়াজ্জিনের সুরে “হাইয়া আলাস সালাহ” ডাকের আহ্বান চলে আসে। মাগরিবের জমাতে লোকজন একটু বেশিই হয়। নামাজের সাথে গ্রামের সবার সাথে দেখা করা, কথা বলার সুযোগ মেলে। রাত বাড়ছে। হাজার বছরের সেই পুরনো রাত। শমসের আলী তালুকদার এই বাড়ির মুরুব্বি এখন। যেকোনো সিদ্ধান্তে তার কথার দাম থাকে। সেই ছোট শিশু থেকে কেমন করে সে তালুকদার বাড়ির বড় কর্তা হয়ে গেল টেরই পেল না। এইত সেদিন বাবার সাথে মাষকলাই ক্ষেতে গরু নিয়ে ছুটে বেড়াত! বাবার কথা মনে পড়ছে ভীষণ আজ। ঘন কুয়াশা পড়ছে বাইরে। মেয়েটা চকির ধারে কতগুলি কয়লা দিয়ে গেল এনে। বাবার শূন্যস্থানটা শমসের আলী তালুকদার আজো পূর্ণ করতে পারে নি। শীতের তীব্রতা আর বাবা হারানোর নির্মম বেদনা যেন আজকের রাতটাকে দুর্বিষহ করে তুলছে তাকে।
ঢাকা শহরে কোনোদিন যায় নি শমসের আলী। তার দাদা ব্রিটিশ পিরিয়ডে কয়েকবার গিয়েছে শুনেছিল বাবার মুখে। শীতকালের এই সময়টাতে সে ঢাকা শহরটার নাম বেশি শুনে থাকে। লোকমুখে শুনে এমনটা না। শুনে মসজিদের মাইকের আওয়াজে। রোজ ঘুম ভাঙ্গে আশেপাশের সবগুলো গ্রামের মাইকের ডাকে। মাইকের আওয়াজ শুনলেই আন্দাজ হয়ে যায় এই বুঝি নতুন কোনো মৃত্যুর খবর ভেসে আসছে বাতাসে। বুকটা কেঁপে উঠে মাইকের শব্দের আওয়াজে শমসের আলী তালুকদারের। আজকাল রোজ মানুষ মারা যাচ্ছে এখানে। গ্রামের পশ্চিমের কবরস্থানে রোজ মাটির উঁচু টিলা বাড়ছে। আধুনিক সভ্যতার সাথে যারা তাল মিলাইয়া উঠতে পেরেছে তাদের বংশের কেউ না কেউ এখন শহরে থাকে। ওখানে যারা একবার গিয়েছে তারা যেন ব্যস্ত জীবনের মাঝেই আটকে গেছে। কারো কারো অনেক বছর আর গ্রামে ফেরা হয় না। ইচ্ছে থাকলেও ফেরার সুযোগ থাকে না। কিন্তু একদিন ফেরা লাগে। সেদিন না চাইলেও ফিরতে হয়। পরিবারের কেহ শহরে মারা গেলে তার লাশটা বয়ে নিয়ে আসে কাছের মানুষজন। সন্তান জন্ম দেয়ার পর সন্তানের উপর পিতা-মাতাকে দাফন করার একটা বড় কর্তব্য থেকে যায় সমাজের চোখে, সন্তানের মনে। শহরের জীবন ব্যস্ততায় মানুষজন নিজেকে হারিয়ে ফেললেও শেষ সমাধিস্থল হিসেবে শৈশবের মাটিতেই ফিরে আসতে চায়। এই মাটি, এই গাছ, এই সূর্যের আলো, এই বাতাস, এই পুকুর, এই নদী যেন যুগ যুগ ধরে চেনা। গ্রামের বটবৃক্ষ তার ছায়াতে অগণিত মানুষকে মাটিতে আগলে রেখেছে। এ-সব ভাবতে ভাবতেই কল্পনায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখতে পায় শমসের আলী তালুকদার। বয়স তো কম হয় নি তারও। কোনদিন না সবাইকে ফাঁকি দিয়ে সেও চলে যায় এই পৃথিবী ছেড়ে! মরে গেলে মেয়েটার বিয়ে দিবে কে? কে দেখবে তালুকদার বাড়ি? কে দেখবে তার সুবিস্তীর্ণ ফসলের মাঠঘাট? কে আগলে রাখবে তার বাড়ির আঙিনা। কেমন করে তার জীবনের ষাটটি বছর কেটে গেল যেন টেরই পেল না। যৌবনকালকে খুব মনে পড়ছে তার। পাবে কি আর সেই রঙিন আঠারো বছরে ফেলে আসা যৌবনের ছোঁয়া? কতকিছুই তো করার ছিল জীবনে। কি আর করতে পেরেছে? ভাবতে ভাবতে তার চোখ থেকে ঘুম চলে যায়। মুয়াজ্জিনের গলায় ভেসে আসছে, “আসসালাতু খাইরুম মিনান নাউম”। বেদনার রাত পার হয়ে আরেকটি সকালের আগমন। কুয়াশার জন্য এখনো রোদের দেখা মেলে নি। পাখির কিচিরমিচির শব্দ ভেসে আসছে তালুকদারের কানে। গ্রামের দক্ষিণের কানহা নদীটার কথা মনে পড়ল তার। ওখানে অনেক অতিথি পাখির আগমন হয় এই সময়টাতে। কেমন হতো যদি সে পাখির মতো উড়ে নীল নদের দেশে যেয়ে জীবনের শেষ সময়টা কাটিয়ে আসত পারত! দুইটা কুকুর চেঁচাচ্ছে পাশে এসে। একঝাঁক কাক মাথার উপর দিয়ে ভয়ানক সুরে ডাকতে ডাকতে উড়ে গেল। হঠাৎ উত্তরের বাতাসে মাইকের আওয়াজ কানে ভেসে আসে, পূর্ব পাড়ার কাশেম শেখ আর দুনিয়াতে নেই!
কী নিদারুণ এইসব মৃত্যুর খবর! এই তো একটু আগেই তীব্র শীতের অনুভূতি তাহারো ছিলো!
২২ শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৯।