আমাদের চারপাশে এমন অনেক বয়স্ক মানুষ আছেন যাদের আমরা কেবল ‘ভুলোমনা’ বলে এড়িয়ে যাই। কিন্তু এই সাধারণ ভুলে যাওয়াটা যখন রোগের পর্যায়ে চলে যায়, তখন তাকেই চিকিৎসাবিজ্ঞানে বলা হয় ‘ডিমেনশিয়া’। সম্প্রতি মার্কিন চিকিৎসক ডঃ বিন গুপ্ত খোদ ডোনাল্ড ট্রাম্পের অসংলগ্ন আচরণ নিয়ে এই রোগের সতর্কবার্তা দিয়েছেন। আপনার আপনজন বা পরিচিত কেউ কি অকারণে বিভ্রান্ত হচ্ছেন? নাকি সাধারণ ভুলোমনই কাল হয়ে দাড়াচ্ছে? চলুন সহজ ভাষায় চিনে নিই ডিমেনশিয়ার ৮টি বিপদ সংকেত:
১. স্মৃতি যখন লুকোচুরি খেলে
ডিমেনশিয়ার সবচেয়ে বড় লক্ষণ হলো নাম-ধাম বা তারিখ ভুলে যাওয়া। বিশেষ করে সকালে কী খেলেন বা এইমাত্র কে ফোন করল এসব টাটকা খবর তারা একদমই মনে রাখতে পারেন না। একই প্রশ্ন ১০ বার করা কিংবা ছোটখাটো সব কাজের জন্য চিরকুট বা অন্যের ওপর নির্ভর করা এই রোগের শুরুর দিককার সংকেত।
২. সহজ কাজগুলোও যখন পাহাড়সম কঠিন
এক সময় যে মা নিখুঁতভাবে রান্নার রেসিপি মনে রাখতেন বা যে বাবা বাজারের পাইপাই হিসাব মেলাতেন, তারা যদি হুট করে দেখেন সামান্য চা বানানো কিংবা মাসের হিসাব মেলাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন, তবে বুঝতে হবে ভেতরে কোনো সমস্যা দানা বাঁধছে। কাজের সিরিয়াল ভুলে যাওয়া বা সামান্য কাজে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় নেওয়া মোটেও ভালো লক্ষণ নয়।
৩. কথা বলতে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলা
আড্ডার মাঝে হঠাৎ করে দেখবেন আক্রান্ত ব্যক্তিটি একদম চুপ হয়ে গেছেন। তিনি হয়তো কোনো একটি খুব সাধারণ শব্দ খুঁজছেন কিন্তু পাচ্ছেন না। অনেক সময় কলমকে হয়তো বলছেন ‘লেখার কাঠি’ বা চামচকে বলছেন ‘খাওয়ার হাতল’। কথা বলতে বলতে খেই হারিয়ে ফেলা বা একই কথা বারবার বলা ডিমেনশিয়ার অন্যতম কারণ।
৪. সময় আর পথের দিশা হারানো
বাড়ি থেকে কাছের দোকানে গিয়েও যদি কেউ পথ ভুলে যান কিংবা নিজের ড্রয়িংরুমে দাড়িয়ে বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন যে তিনি এখানে কীভাবে এলেন তবে এটি খুবই উদ্বেগের বিষয়। শুধু তা-ই নয়, ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা দিন-তারিখের হিসাব তো বটেই, এমনকি এখন দিন না রাত সেই বোধও হারিয়ে ফেলতে পারেন।
৫. বিচারবুদ্ধি লোপ পাওয়া
হুটহাট এমন সব সিদ্ধান্ত নেওয়া যা মানুষটির স্বভাবের সাথে একদমই যায় না। যেমন কাউকে অকারণে বা দরকারের চেয়ে অনেক বেশি টাকা দিয়ে দেওয়া, রোদের মধ্যে শীতের কাপড় পরা কিংবা নিজের শরীরের পরিচ্ছন্নতা বা গোসল করার কথা একদমই ভুলে যাওয়া। তাদের আচার-আচরণ তখন খামখেয়ালি বা শিশুর মতো মনে হতে পারে।
৬. অদ্ভুত সব জায়গায় জিনিসপত্র রাখা
চশমা কি ফ্রিজের ভেতরে? নাকি আলমারির চাবিটা ময়লার বালতিতে? ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা প্রায়ই জিনিসপত্র সব আজব সব জায়গায় রাখেন। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, তারা সেটি যে কোথায় রেখেছেন তা আর মনে করতে পারেন না। অনেক সময় খুঁজে না পেয়ে বাড়ির লোক বা কাজের মানুষের ওপর চুরির অপবাদও দিয়ে বসেন।
৭. মেজাজ যখন খিটখিটে ও অস্থির
হুটহাট রেগে যাওয়া বা হঠাৎ করে খুব মন খারাপ করা ডিমেনশিয়ার লক্ষণ। দেখা যায়, যে মানুষটি এক সময় সবার সাথে খুব হাসিখুশি কথা বলতেন, তিনি এখন সারাক্ষণ খিটখিট করছেন কিংবা অকারণ ভয়ে তটস্থ থাকছেন। ব্যক্তিত্বের এই হঠাৎ পরিবর্তন পরিবারের জন্য বেশ কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
৮. নিজেকে ঘরকুনো করে ফেলা
আগে হয়তো মানুষটি পাড়ার আড্ডায় বা দাওয়াতে সবার আগে যেতেন, কিন্তু এখন সব কিছু থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছেন। এর মূল কারণ হলো বিভ্রান্তি আর লোকলজ্জার ভয়। কথা বলতে গেলে ভুল হবে বা অন্যরা কিছু জিজ্ঞেস করলে উত্তর দিতে পারবেন না এই সংকোচ থেকে তারা একা থাকা শুরু করেন, যা তাদের মানসিক অবস্থাকে আরও খারাপ করে দেয়।
ডিমেনশিয়া মানেই কিন্তু পাগল হওয়া নয়, বরং এটি মস্তিষ্কের একটি রোগ। আপনার আশেপাশে কারো মধ্যে এমন লক্ষণ দেখলে তাকে অবহেলা করবেন না। বার্ধক্য মানেই সবকিছু ভুলে যাওয়া এই ধারণা ভুল। সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ নিলে আক্রান্ত মানুষটির জীবন অনেকখানি সহজ করা সম্ভব।