কলকাতার অফিসপাড়ার খাবার
New Post has been published on https://sentoornetwork.com/street-food-of-kolkata-office-area/
কলকাতার অফিসপাড়ার খাবার
কমলেন্দু সরকার
অফিসপাড়া বলতে কোনটা? না, এর কোনও সীমারেখা নেই। হাইকোর্ট পাড়া থেকে শুরু করে বিবাদি বাগকে চক্কর মেরে মিশন রো, বেন্টিক স্ট্রিট, এলআইসি-র গলি সঙ্গে অবশ্যই ডেকার্স লেনকে নিয়েই এখন অফিস পাড়া। ‘অফিস পাড়া’ কথাটা শুরু সম্ভবত সেই রাইটার্স বিল্ডিংয়ের চালু হওয়ার পর থেকেই৷ ইংরেজ আমলে কেরনিদের বলা হত রাইটার। আর কেরানি বলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে ছাপোষা বাঙালির ছবি। আর দশজন বাঙালি একসঙ্গে মিললেই চা, আড্ডা, খাওয়াদাওয়া ইত্যাদির শুরু।
এইভাবেই হয়তো শুরু হয়েছিল অফিস পাড়ায় খাবারের দোকানগুলো। পরবর্তী সময়ে দোকানঘর অভাব হলে রাস্তার ফুটে দোকান গজিয়ে ওঠে। শোনা যায়, কলকাতার রাস্তার খাবার বা স্ট্রিট ফুড নাকি সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর। তার কারণ কলকাতার রাস্তায় কোনও বাসি খাবার পাওয়া যায় না। সবটাই টাটকা এবং হাতে গরম।
কলকাতার রাস্তায় কী পাওয়া যায় না! সমস্তরকম খাওয়ার পাওয়া যায়৷ চাইনিজ থেকে কন্টিনেন্টাল, বাঙালি খাবার থেকে লিট্টি-ধনিয়া পাতার চাটনি। এছাড়াও বাঙালির প্রিয় নানাধরনের মিষ্টি তো আছেই। হাইকোর্ট পাড়ায় এক বিক্রেতার কাছে পাওয়া যায় এই লিট্টি। সস্তায় এমন উপাদেয় খাবার আর আছে কী! হয়তো থাকতে পারে।
বহু আগে দেখা যেত মহাকরণ বা রাইটার্স বিল্ডিংয়ের ফুটে অজস্র খাবারের সমারোহ। একজন শুধু চাইনিজ খাবার বিক্রি করতেন। আর একজনের কাছে দেখতাম ডিমকারি আর ভাত৷ সঙ্গে তরকারি আর তেতোর একটা পদ। উচ্ছে-আলুর চচ্চড়ি আর শীতে নিম-বেগুন। রাইটার্সের দূরের যাঁরা কর্মী ছিলেন তাঁরা হাজিরাখাতায় স্বাক্ষর করেই হাপুসহুপুস করে খেতেন ওইসব। অন্য একজন চারা এবং কাটা মাছের ঝোল, ভাত, তরকারি বিক্রি করতেন। তাঁর কাছেও ভিড় লেগে থাকত। আর যিনি চাইনিজ বিক্রি করতেন তাঁর কাছে ভিড় জমতো দুপুরের দিকে। তিনি চাউমিন আর চিলি-চিকেন বিক্রি করতেন।
মিশন রো-য়ে আবার হাতরুটি, তন্দুরি, রুমালিরুটি সঙ্গে চিকেন বা মটন কষা বিক্রি করতেন। কালেভদ্রে ওদিকে গেলে তাঁকে অবশ্য এখন দেখা যায়। মিশন রো-য়ে বেঞ্চি-টেবিলে বসে খাওয়ার ব্যবস্থা আছে। জমিয়ে বসে সপাটে খাওয়া যায়। মিশন রো থেকে চিত্তরঞ্জন বা সেন্ট্রাল অ্যাভেনিউয়ের দিকে যাওয়ার পথে ডানহাতে একজন মিষ্টি নিয়ে বসেন। ভীষণ সুন্দর তাঁর মিষ্টি। তাঁর সঙ্গে কথা বলে জেনেছিলাম, পরিবারের সকলে মিলে মিষ্টি তৈরি করেন। একেবারে টাটকা মিষ্টি। দামেও সস্তা।
বেঞ্চিতে বসে মাছের ঝোল, ভাত, তরকারি খাওয়া যায় চিত্তরঞ্জন অ্যাভেনিউয়ের ভারত ভবনের পাশের গলিতে। সেই ফুটের দোকানটিতে মাথার ওপর ত্রিপলের ছাউনিও আছে। এর পিছনের কারণটি মনে হয়, আশপাশে গাছ রয়েছে সেখান থেকে কাকে বিষ্ঠাত্যাগ করলেই খাওয়াদাওয়ার দফারফা! যাইহোক, পাশেই বিক্রি হয় ফল। সেই ফলবিক্রেতা আগে থেকে কেটে রাখেন না, ক্রেতার অর্ডারমাফিক ফল কাটতেন। নইলে কাটাফল কলকাতার রাস্তায় প্রায় সর্বত্রই পাওয়া যায়।
ভারতভবনের উল্টো ফুটেই এলআইসি-র গলি সেখানেও সমস্তরকম খাবার মজুদ। তবে এখানে ডিম-পাউরুটি, অমলেট-পাউরুট কিংবা ফ্রেঞ্চ টোস্টের চাহিদা বেশি। আর আছে গরম গরম জিলাপি৷ অপূর্ব জিলাপি করেন তিনি। সেই জিলাপি কড়াই থেকেই একেবারে ক্রেতার শালপাতায় ওঠে। বেন্টিক স্ট্রিটে আনন্দবাজার পত্রিকা অফিসের গায়েও চমৎকার জিলাপি করেন আর একজন। তাঁর পাশেই একজন রুটি-তরকারি করেন এক খাবারবিক্রেতা। তরকারিটির অপূর্ব স্বাদ! মিশন রো-য়ে বিনি-র শোরুমের পাশেই একজন ভাজেন অমৃতি। দারুণ! হাতেগরম অমৃতির স্বাদই আলাদা!
তবে অফিস পাড়ায় রাজা খাবার পাওয়া যায় ডেকার্স লেনে। ‘চিত্তর দোকান’ তো বিখ্যাত। এখানকার চিকেন স্টু, কষা মাংস এবং চায়ের স্বাদ একই আছে দশ-কুড়ি বছর আগের মতোই। ডেকার্স লেনে আছে আরও অনেক খাবারের দোকান। ওয়াটারলু স্ট্রিট-ডেকার্স লেনের প্রায় মুখে একটি খাবারের দোকান আছে তার খাবারও অত্যন্ত সুস্বাদু। ওদের আলুর দমটি লা-জবাব। আমাদের এক কলিগ বলত, ‘ওয়র্ল্ড ফেমাস আলুর দম।’ আলুর দমের সঙ্গে একহাতা মাটনের ঝোল মিশিয়ে দিত। ওফ! দুটোর বদলে তিনটি রুটি খাওয়া হয়ে যেত। আনন্দবাজার পত্রিকায় কাজ করার সুবাদে প্রায় দিনই ওই দোকানে রুটি-আলুর দম খেতাম। পরে চিত্তর দোকানের চা। মাঝেমধ্যে জিভের স্বাদ বদলের চিত্তর দোকানের চিকেন স্টু আর সেকা টোস্ট থাকত খাদ্য তালিকায়। একটু এগিয়ে এসপ্ল্যানেড ইস্টের ওপর কয়েকটি ফলের রসের দোকান আছে। খারাপ নয়।
এখন অবশ্য কলকাতার অফিস পাড়া ছড়িয়ে পড়েছে চারিদিকে। বিশেষ করে, সল্ট লেকে। সল্ট লেক হয়ে উঠেছে এখন অফিস পাড়া। সেক্টর ফাইভ তো বটেই। তবে এখানে রাস্তার খাবারের চেয়ে বড় বড় রেস্তরাঁয় ভিড় বেশি। তবে ওয়েবল-এর ইলেকট্রনিকস গলির ফুটের খাবার অসাধারণ। ভিড়ও হয় খুব। সল্ট লেক সিজিও কমপ্লেক্স-এও বেশ কয়েকটি খাবার দোকান আছে। মন্দ নয় তাদের খাবার। দক্ষিণ কলকাতাতেও বেশ কয়েকটি মল-এর আশপাশে খাবারের দোকান গজিয়ে উঠেছে। তবে সেসব খাবারের দোকানে রকমারি খাবার থাকে না। জাস্ট খিদে মারানোর জন্য অমলেট-পাউরুটি, ঘুগনি-পাউরুটি, তরকা-রুটি ইত্যাদি৷ কলকাতার অফিস পাড়ার খাবারের তুলনা নেই। সারা দুনিয়া খুঁজলেও পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ! তাই দীর্ঘজীবী হউক কলকাতার অফিস পাড়ার ফুটের খাবার।
ছবি সৌজন্যে: গুগল
আরও খবর পড়ুন : কলকাতার পুরনো বইয়ের বাজার














