জয়ী
মনে পড়লো তার সেই রবিবারের কথা। জয়ীর জন্মদিন ছিলো। ওর মনে পড়লো জয়ী বই ভালবাসে। একটা বই রুমমেটের টেবিল থেকে তুলে প্যাক করে ফেললো দ্রুতহাতে।
সে সেদিন ভার্সিটি গেলো শুধু উইশ করবে বলে। পড়াশুনো নিয়ে মাথাব্যাথা ছিলো না কোনকালে। আমগাছ তলায় বাঁধাই করা বসার জায়গা। ও দাঁড়িয়ে ছিলো কিছুক্ষণ। ও জানে জয়ী ক্লাসে। ওর নিজেও ওই ক্লাসেই, কিন্তু ঢুকেনি। অযথা ঝামেলা!
জয়ী বের হলো ক্লাস শেষে। এখন দুপুর দু’টো। ও জানে জয়ী এসময়টা এই আমগাছের নিচে বসে। মাঝেমাঝে দু’একটা বই বের করে পড়ে। গাছের নিচে বসে মৃদু বাতাস আর হালকা রোদে উপন্যাস পড়তে ভালো লাগে হয়তো তার। আচ্ছা জয়ী সম্পর্কে এত কিছু ও কবে জরিপ করে ফেলেছে!
- “আরেহ তুমি?” রোদ ঠেকাতে বাম হাত কপালের উপর ধরে চোখ কুঁচতে জয়ী প্রশ্ন করলো। “তুমি এখানে?”
- “শুভ জন্মদিন। আপনি এটা নিলে খুশি হবো।” ও বাড়িয়ে ধরলো প্যাকেটটা।
বই হতে পারে ভেবেই যেন খুশি হয়ে গেলো জয়ী। হাতে নিলো সে উপহারটা। ”চলো গাছতলাটায় বসি”, বললো জয়ী।
বসে প্যাকেটটা ছিঁড়লো সে। “এটা লাইব্রেরীর বই”, উল্টে সে সীল টা দেখে বললো।
”এই রে..”, মনে মনে ভাবলো ও। চট করে বললো, “ওরা এত খেয়াল করে না, কত বছর আগেই ভুলে গেছে দেখো”।
”এই যে, রাহাত কে ইস্যু করা, শাহবাগ সেন্ট্রাল লাইব্রেরী। রিটার্নিং ডেডলাইন আগামীকাল।”, জয়ী দু-একটা পাতা উল্টে সব বের করে ফেললো। ও কত চট করে সব কিভাবে যেন বের করতে পারে। এত ব্রিলিয়ান্ট মানুষ দেখলে রাগ লাগে! “তোমার রুমমেটের বই?” চশমার পেছনে হাসি হাসি দু’টো চোখ।
আমতা আমতা করেছিলো ও সেদিন। জয়ী অবশ্য কিছু মনে করেনি। কিন্তু বইটা নেয়নি। ফিরিয়ে দিতে বলেছিলো। আর ওর বইয়ের ব্যাপারে দুর্বলতাটা কেউ মনে রেখেছে আর জন্মদিনে উপহার দিয়ে চেয়েছে, এটা ভেবেই ও অনেক খুশি হয়েছিলো।
জয়ী বললো, “বই ভালো লাগে তোমার?”
না বলার প্রশ্নই আসে না। “হ্যাঁ, পড়ি মাঝে মাঝে।”
”এসো আমার সাথে।” জয়ী উঠে দাঁড়ালো।
ওকে দুপুরে কোন এক চা-সিগারেটের আড্ডায় যাওয়ার কথা। কিন্তু কেন যেন আর না করতে পারলো না। আজ তার জন্মদিন, আজকের দিন তাকে না বলা কি ঠিক?
জয়ী আর ও হাঁটছিলো। জয়ী দু’হাতে ওর বাঁ পাশে ঝোলানো ব্যাগের একটা স্ট্র্যাপ ধরে সোজা হয়ে হাঁটছে। এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। মাঝে মাঝে দু’একটা মন্তব্য কিছু ব্যাপারে।
ও মোটেও এত ফিট ফাট ছিলো না। একহাত পকেটে তো আরেক হাত মাথায়। যখন উপরে তাকায়, কাঁদায় পা পড়ে। নিচে তাকালে গাছের ডালে মাথা বাড়ি খায়। জয়ী কিছু না বলে হাসে। আর চশমাটা ঠিক করে।
নীলক্ষেত এসে গেলো ওরা। একটা লাইব্রেরী তে পুরাতন অনেক বই। মামা টা জয়ীকে চেনে তাদের কথা শুনেই বোঝা গেলো।
”এটা পড়েছ তুমি?” সমরেশ মজুমদারের একটা বই দেখিয়ে বললো জয়ী। ও জীবনে প্রথম নামই শুনলো এটার। বললো, “হুম দু-এক পাতা মনে হয় পড়েছিলাম”।
জয়ী মুচকি হেসে দোকানদারকে বললো এটা প্যাক করতে। সেবা প্রকাশনীর কিছু বই। একটা খুব পুরাতন ক্লাসিকের অনুবাদ বই। সব প্যাক হলো।
”ইয়ে মানে আমি সাথে তেমন টাকা আনিনি, তুমি এত কিছু কিনছো..” ও জয়ীকে কি বলবে বুছতে পারছে না। ও জানে ওর জন্যই কিনছে সব ও।
জয়ী হেসে ফেললো। “আমি তোমাকে দিচ্ছি, পড়ো। পড়ে তোমার সাথে বই নিয়ে গল্প করবো।”
জয়ী ওর পার্সটা যখন খুললো, এক পলক দেখেই ও বুঝলো আর্থিক ভাবে কি জীর্নদশা। মানিব্যাগ টা সাথে না আনায় গালাগাল করলো নিজেকে। দশ টাকা, পাঁচ টাকা, দু’টাকা গুলো গুনে জয়ী দাম দিলো। হাসিমুখে ব্যাগ টা তুলে নিয়ে বললো, “আরো কিছু দেখবে?”
ব্যাগটা ও হাতে নিয়ে বললো, “আজ আর না, তোমাকে অনেক ধন্যবাদ।”
”আরে কি বলো, তোমাকে ধন্যবাদ। বইয়ের দোকানে আসা হলো তোমার সাথে। খুব ভালো লাগে এদিকটা।” জয়ী হাসলো।
--
ওর হাসি, ব্যক্তিত্বে কখনও দুর্বলতা ছিলো না, কোন অর্থকষ্ট বা হতাশার ছাপও ছিলো না। ওর লাশঢাকা কাপড়টার নিচে ওর দু’চোখ বোজা যে মুখ, ও জানে তাতেও কোন দুর্বলতার ছাপ নেই। থাকতেই পারে না।
চোখ ফিরিয়ে নিয়ে ও অন্যদিকে তাকায়।








