৪০ মাইল দূর থেকে হৃদস্পন্দন শনাক্ত করে পাইলট উদ্ধার
দক্ষিণ ইরানে গুলি করে ভূপাতিত হওয়া বিমানের দ্বিতীয় মার্কিন পাইলটকে খুঁজে বের করতে সিআইএ ‘গোস্ট মারমার’ নামে একটি অত্যাধুনিক নতুন যন্ত্র ব্যবহার করেছে। এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত দুটি সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে। জানা গেছে, এই গোপন প্রযুক্তি দূর থেকে মানুষের হৃদস্পন্দনের তড়িৎচুম্বকীয় সংকেত শনাক্ত করতে পারে। এটি কোয়ান্টাম ম্যাগনেটোমেট্রি প্রযুক্তি ব্যবহার করে সেই সংকেত খুঁজে বের করে। এরপর আশপাশের শব্দ বা অন্য সংকেতের ভিড় থেকে মানুষের হৃদস্পন্দনের আলাদাভাবে শনাক্ত করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সফটওয়্যার ব্যবহার করা হয়। গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর জন্য মাঠ পর্যায়ে এই যন্ত্রটির এটিই ছিল প্রথম ব্যবহার। সোমবার বিকেলে হোয়াইট হাউসে এক ব্রিফিংয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং সিআইএ পরিচালক জন র্যাটক্লিফ এই প্রযুক্তি ব্যবহারের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। একটি সূত্র দ্য নিউইয়র্ক পোস্টকে বলেছে, ‘এটা অনেকটা স্টেডিয়ামের ভেতর থেকে কোনো কণ্ঠস্বর শোনার মতো। তবে পার্থক্য হলো, এখানে স্টেডিয়ামটি হাজার বর্গমাইলজুড়ে বিস্তৃত একটি মরুভূমি এবং সঠিক পরিস্থিতি থাকলে, আপনার হৃদস্পন্দন যদি চলতে থাকে, আমরা আপনাকে খুঁজে বের করতে পারব।’ এই সূত্র এবং লকহিড মার্টিনের গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ প্রযুক্তি সম্পর্কে জানা আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, ‘গোস্ট মার্মার’ যন্ত্রটি তৈরি করেছে স্কাঙ্ক ওয়ার্কস। এটি বিমান ও মহাকাশ প্রযুক্তি কম্পানি লকহিড মার্টিনের গোপন উন্নয়ন বিভাগ। তবে এ বিষয়ে মন্তব্য করতে লকহিড মার্টিন সংস্থাটি রাজি হয়নি। দ্বিতীয় সূত্রটি জানিয়েছে, এই প্রযুক্তিটি ইতিমধ্যে ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টারে সফলভাবে পরীক্ষা করা হয়েছে। ভবিষ্যতে এটি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানেও ব্যবহারের সম্ভবনা রয়েছে। ওই পাইলট জনসমক্ষে ‘ডুড ৪৪ ব্রাভো’ নামে পরিচিত। গত সপ্তাহের শেষের দিকে তার এফ-১৫ বিমানটি ইরানিরা গুলি করে ভূপাতিত করার পর তিনি একটি পাহাড়ের ফাটলে লুকিয়ে ছিলেন। ইরানি সেনারা ওই আমেরিকানকে খুঁজতে এলাকাটি অভিযান চালায়। ‘ডুড ৪৪ ব্রাভো’ দুই দিন ধরে সেই জনমানবহীন ভূখণ্ডে টিকে ছিলেন। তাকে ধরার জন্য পুরস্কারও ঘোষণা করা হয়েছিল। প্রথম সূত্রটি জানিয়েছে, তুলনামূলকভাবে ভূখণ্ডটি ‘ঘোস্ট মারমার’ যন্ত্রের প্রথম ব্যবহারিক প্রয়োগের জন্য একটি আদর্শ স্থান ছিল। সূত্রটি বলেছে, ‘এই নামটি ইচ্ছাকৃতভাবে রাখা হয়েছে। ‘মারমার’ হলো হৃদস্পন্দনের ছন্দ বোঝাতে ব্যবহৃত একটি ডাক্তারি পরিভাষা আর ‘গোস্ট’ বলতে এমন কাউকে খুঁজে পাওয়াকে বোঝায়, যিনি কার্যত অদৃশ্য।’ সূত্রটি বলেছে, ওই এলাকাটি যন্ত্রটির ব্যবহারের জন্য প্রায় আদর্শ পরিবেশ ছিল, যতটা এই যন্ত্রের জন্য প্রয়োজন। সেখানে তড়িৎচুম্বকীয় হস্তক্ষেপ বা বাহ্যিক উৎস থেকে সৃষ্ট অবাঞ্ছিত সংকেত খুবই কম ছিল। অন্য মানুষের সংকেতও প্রায় ছিল না। এ ছাড়া রাতে মানুষের শরীর ও মরুভূমির মাটির তাপমাত্রার পার্থক্য স্পষ্ট থাকায় অপারেটররা আরো নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। সূত্রটি আরো জানায়, সাধারণত এই ধরনের সংকেত এতোটাই দুর্বল যে, হাসপাতালের মতো পরিবেশে বুকের খুব কাছে সেন্সর ধরেই তা পরিমাপ করতে হয়। কিন্তু কোয়ান্টাম ম্যাগনেটোমেট্রি নামে যে প্রযুক্তিতে অগ্রগতি ঘটেছে, তার ফলে এখন এই সংকেতগুলো অনেক দূর থেকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়ে উঠেছে। ম্যাগনেটোমিটার হলো এমন একটি বৈজ্ঞানিক যন্ত্র, যা চৌম্বক ক্ষেত্রের দিক, শক্তি বা পরিবর্তন পরিমাপ করে। এটি পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র, ভূ-ভৌতিক জরিপ এবং মেটাল ডিটেকশন বা খনিজ অনুসন্ধানে ব্যবহৃত হয়। স্মার্টফোন, উড়োজাহাজ এবং নেভিগেশন সিস্টেমে এটি কম্পাস হিসেবে কাজ করে। ওই সূত্র আরো জানায়, ‘এটি দূরবর্তী এবং শান্ত পরিবেশে সবচেয়ে ভালোভাবে কাজ করে এবং এর জন্য তথ্য প্রক্রিয়াকরণের জন্য যথেষ্ট সময়ের প্রয়োজন হয়।’ দ্য নিউইয়র্ক পোস্টের সূত্রগুলোর কাছে এটি স্পষ্ট ছিল না যে, এই ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াকরণে ঠিক কতক্ষণ সময় লাগে। এই প্রযুক্তির যুদ্ধকালীন সময়ে ব্যবহারের জন্য আরো কোনো সুযোগ আছে কি না, সেটাও স্পষ্ট নয়। যদিও নিখোঁজ পাইলট বোয়িং-নির্মিত একটি কমব্যাট সারভাইভার এভেডার লোকেটর বীকন চালু করেছিলেন, তবুও অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দলগুলোর কাছে তার সঠিক অবস্থান স্পষ্ট ছিল না। অভিযানটির একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত সময়ে ‘গোস্ট মারমার’ পাইলটকে শনাক্ত করে। প্রথম সূত্রটি বলেছে, উভয় প্রযুক্তিই কাজে লেগেছে। প্রথম সূত্রটি জানায়, ‘বীকন চালু করার জন্য তাকে পাহাড়ের সেই ফাঁক থেকে বেরিয়ে আসতে হয়েছিল। পাঠানো সংকেতের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে, তাকে বের হতে হয়েছে। বীকন হলো এমন একটি যন্ত্র, যা নির্দিষ্ট রেডিও বা আলোক সংকেত প্রেরণের মাধ্যমে জাহাজ, বিমান বা ব্যক্তির অবস্থান ও দিক নির্দেশনা দেয়। ‘খড়ের গাদায় সূঁচ খোঁজা’ এই নাটকীয় অভিযান সম্পর্কে সংবাদমাধ্যমকে ব্রিফ করার সময় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও সিআইএ
পরিচালক র্যাটক্লিফ নতুন প্রযুক্তিটির ইঙ্গিত দেন। অভিযানে শত শত মার্কিন সেনা এবং দুটি উদ্ধারকারী বিমান মাঠে আটকা পড়ে। তাদের উদ্ধার করতে আরো বিমানের প্রয়োজন হয় এবং আটকে থাকা জেট বিমানগুলো ধ্বংস করা হয়। তবে এতে কোনো মার্কিন সেনার আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেনি। ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের কোনো প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে র্যাটক্লিফ বলেন, শনিবার সকালে গোয়েন্দা সংস্থাটি আমেরিকার অন্যতম সেরা ও সাহসী একজন জীবিত ব্যক্তিকে খুঁজে বের করে এবং নিশ্চিত করে আমাদের প্রাথমিক উদ্দেশ্য অর্জন করেছে। তিনি ইরানের পাহাড়ের একটি ফাটলে লুকিয়ে চিরেন। তিনি তখন শত্রুদের কাছে অদৃশ্য ছিল কিন্তু সিআইএর কাছে নন।’ সিআইএ পরিচালক বলেন, ‘যুদ্ধমন্ত্রী পিট হেগসেথ এই বিষয়টি রাষ্ট্রপতিকে জানিয়েছিলেন এবং অভিযানটি দ্রুত বাস্তবায়ন পর্যায়ে চলে যায়।’ ট্রাম্প সংবাদমাধ্যমকে বলেন, সিআইএ নিখোঁজ আমেরিকানকে ‘৪০ মাইল দূর থেকে’ শনাক্ত করেছিল। যদিও এটা স্পষ্ট ছিল না যে, তিনি যন্ত্রটির প্রাথমিক শনাক্তকরণ দূরত্বের কথা বলছিলেন কি না? ট্রাম্প সোমবার বলেন, ‘এই পাইলটকে খুঁজে বের করাটা খড়ের গাদায় সূঁচ খোঁজার মতো এবং সিআইএ ছিল অবিশ্বাস্য। এই ছোট্ট বিন্দুটিকে খুঁজে বের করার জন্য সিআইএ-এর বড় ভূমিকা ছিল।’ প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘র্যাটক্লিফ সেই রাতে একটি অসাধারণ কাজ করেছিলেন।’ প্রেসিডেন্ট রসিকতা করে বলেন, ‘প্রযুক্তিটি গোপনীয়। এ নিয়ে যদি তিনি কথা বলেন তবে আমাকে তাকে (র্যাটক্লিফ) জেলে পুরতে হবে এবং আমি তাকে জেলে পুরতে চাই না। সে এর যোগ্য নয়।’ তবে ট্রাম্প নিজেই গোপন নতুন প্রযুক্তির কিছু তথ্য প্রকাশ করেছেন। জানুয়ারিতে তিনি বলেছেন, মার্কিন মাদক ও অস্ত্র মামলায় ভেনেজুয়েলার স্বৈরশাসক নিকোলাস মাদুরোকে বিচারের মুখোমুখি করার জন্য ৩ জানুয়ারির অভিযানে তিনি ‘দ্য ডিসকম্বোবুলেটর’ নামের একটি অস্ত্র ব্যবহার করেছিলেন, যাতে ভেনেজুয়েলার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অকার্যকর করা যায়। প্রথম সূত্রটি জানিয়েছে, ‘গোস্ট মার্মার’-এর গোপনীয়তার কারণে সবাই এ বিষয়ে খুব সতর্ক ছিল। পাইলটকে ঠিক কিভাবে খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল তা প্রকাশ করা হয়নি।’ তিনি আরো বলেছেন, ‘আমার মনে হয় না, এতো দূর থেকে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা সম্ভব।’

















