ভোর ৫টা, বেশ ঠান্ডা৷ অনেক দূর যেতে হবে তাই সবাই মালপত্র নিয়ে বাসের সামনে হাজির। বাস ছাড়তে এখনও ঘন্টা খানেক বাকি, আসলে সবাই বাসের সামনের সিট ধরার আশায় অন্ধকার থাকতে থাকতেই হাজির। এমনিতেই দল বেঁধে গেলেই এই সমস্যাটা হয় তবে এবার নেপালের রাস্তার দুরবস্থা এই প্রতিযোগীতাকে অন্য মাত্রা দিয়েছে৷ এটা কাঁথি থেকে যাত্রা শুরু থেকে চলছে এবং শেষ অবদি চলবে, আর অবশ্যই আমিও এই প্রতিযোগীতা থেকে বাদ পড়িনি। ১৩০ কোটির দেশের নাগরিক আমরা লাইন তো পড়বেই।
নেপাল- একমাত্র দেশ যার জাতীয় পতাকা চর্তুভূজ নয়। পুরানো রাজাদের পতাকাই রয়ে গেছে, সদ্য ভোটের মাধ্যমে গণতন্ত্র দেশ হয়েছে, চারদিকে রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ির নির্মাণ চলছে তাই গোটা নেপাল ধুলাময়, আমার কথায় ধুলার সমুদ্র। হ্যাঁ, নেপাল, অন্য দেশ তবে পাসপোর্ট ভিসার বালাই নেই কিন্তু সীমান্তে কাগজপত্র check হয় বইকি। অনেক সময় গেছে তার জন্য, এমনকি নাম-কা-বাস্তে মালপত্রও check হয় তবে ওই বাম হাতের সুড়সুড়ি মিটলেই ছেড়ে দেয়। এবার দুর্গাপূজার পর একাদশীতে নয়, যাত্রা শুরু হয়েছে দ্বাদশীর দিন।
ভোর ৫ঃ৩০-শে বাস ছাড়ার কথা ৫ঃ৪০-শে পৌঁছে দেখি আমরাই প্রথম, বাসের কোন পাত্তা নেই৷ ২-১ জন চেনা মুখ সাথে অনেক অচেনা মুখ৷ অনেক পরে আমাদের বর্ধিত ভ্রমণ পরিবার আশোকবাবুরা পৌঁছালেন। আসলে সেই দক্ষিণ ভারত ভ্রমণ থেকে ওনারা আমাদের সঙ্গী, এবার ওনার ডাক্তার ছোট ছেলেও যাচ্ছে। বাস ছাড়তে ছাড়তে ৭টা বাজল৷ এবার ট্রেন কোলকাতা (চিৎপুর) স্টেশন থেকে তাই বাস ধর্মতলায় নামিয়ে দিল বাকিটা ছোট গাড়িতে যেতে হল, ব্রিজ মেরামতি চলছে তাই। দুপুরে ট্রেন নামব বিহারের গোরক্ষপুরে৷ নেপালে ভারতের sim কাজ করবে না যদি না international roaming না করি, অনেকেই করছে দেখে আমিও করে নিলাম (voda Rs.295) এবারও গতবারের মত টেনশন ছিল RAC, টিকিট confirm হয়নি৷ বারবার PNR status দেখছি, না শেষরক্ষা হল না, এবারেও ২জনের ১টা সিট৷ বাবুদার (ট্রাভেল এজেন্ট) ওপর ভীষণ রাগ হল, তারপর ভাবলাম একটু risk না নিলে বেরোনই হত না, যাক গে! ট্রেনে ঘুমানো ছাড়া তেমন অসুবিধা হয়নি৷
আবার ভোর ৫ঃo৫ নামার সময় হয়ে গেছে, অবাক কান্ড ট্রেন right time-এ যাচ্ছে৷ ভেবেছিলাম ট্রেন লেট করবে ভোর ৫ঃo৫ এর বদলে সকাল ৭টার দিকে পৌঁছাবে তাই নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছিলাম (বসে বসে) সময়ে পৌঁছাতে আমার সুবিধাই হল কম কষ্ট হল, এবার হোটেলে একটু ভালো করে ঘুমিয়ে নেব। নাহ! সে সুখ আমার কপালে ছিল না- ১টা রুমে ৪-৫ জন fresh হওয়ার জন্য দিল মানে আমাদের সাথে অন্য family-ও থাকবে৷ ঘুম আর হল না স্নান করে কাছের গোরক্ষ আশ্রম দেখতে ছুটলাম। আমাদের সাথে অবশ্যই অশোক কাকুর family ছিল। আশ্রম ঘুরে এসে হোটেলে খাওয়া-দাওয়া সারলাম৷ ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে আসার এটাই সবচেয়ে বড় সুবিধা, থাকা-খাওয়া-যাতায়াত নিয়ে ভাবতে হয় না৷ ট্রেন থেকে নেমেই হোটেল ready, ঘুরে এসেই খাবার ready, বেরালেই বাস ready. তবে অন্ধকার দিকও আছে- সমান টাকা দিয়েও খারাপ হোটেল রুম সহ্য করতে হয়েছে, খাবারের জন্য লাইন দিতে হয়েছে, অন্যের জন্য ঘন্টা খানেক অপেক্ষা করতে হয়েছে ইত্যাদি৷ তবে নতুন লোকজনের সাথে পরিচয়ের আলাদা আনন্দ আছে, কিছুজন তো মনের খুব কাছাকাছি চলে আসে৷
যাই হোক খাওয়া-দাওয়া সেরে এবার বাসে চড়লাম, গন্তব্য লুম্বিনী, প্রায় ১২ ঘন্টার যাত্রা, অবশ্যই ভারত ছেড়ে নেপালে (পাতাল নয় নেপাল) প্রবেশ। লুম্বিনীর হোটেলে পৌঁছাতে রাত ১২-১টা বেজে গেল। আমি এত ক্লান্ত ছিলাম যে পৌঁছে স্নান করে একটু ঘুমাই বলে যে শুয়েছিলাম- যখন ঘুম ভাঙল তখন ভোর ৪টা৷ নাহ! রাতে খাওয়া হয়নি৷
আজ লুম্বিনী দর্শনের পালা৷ নিজেদেরই দল বেঁধে টোটো ধরে ঘুরতে হবে। সকাল সকাল স্নান সেরে হাল্কা টিফিন করে আশোকবাবুদের সাথে লুম্বিনী দর্শনে বেরিয়ে পড়লাম। টোটোই এক এক করে মন্দির দেখিয়ে নিয়ে চলল। যা বুঝলাম বিভিন্ন বৌদ্ধ দেশ বুদ্ধের জন্মস্থানে আলাদা আলাদা বৌদ্ধ-বিহার বানিয়েছে, কোনটা বার্মা, কোনটা মালয়, কোনটা ভারত৷ তবে আমার ব্যক্তিগতভাবে কম্বোডিয়ার মন্দির সবচেয়ে আকর্ষনীয় লেগেছে। সবশেষে বুদ্ধের জন্মস্থানে ছেড়ে টোটো বালা ভারতীয় ৫oo টাকা নিয়ে চলে গেল, টোটোটায় আমরা ৫জন ছিলাম। অশোকবাবু বুদ্ধের জন্মস্থান দেখার জন্য বারবার বলছিলেন। কিন্তু কিছু বুঝে উঠতে পার ছিলাম না- কোনটা কি? অবশেষে ভাবলাম দেখা শেষ, এবার হোটেলে ফিরতে হবে, তখন হঠাৎ টিকিট কাউন্টারে লাইন দেখে আবিষ্কার করলাম আসল জন্মস্থান দেখা হয়নি। ততক্ষণে দেরী হয়ে গেছে, হোটেলে ফিরে খাবার খেয়ে ১২ঃ৩০-এর মধ্যে বাসে উঠতে হবে। ফেরার পথে প্রাচীরের বাইর থেকে উঁকি-ঝুঁকি মেরে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটালাম৷ স্বভাবতই অশোকবাবুর মন খারাপ হয়েগেল- লুম্বিনীর প্রধান আকর্ষণটাই ভিতর থেকে দেখতে পেলেন না৷ :(
গতকাল দুপুরে বাসে চড়ে পোখরার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছিলাম আমরা পৌঁছতে রাত হয়ে গেছিল৷ পাহাড়ী রাস্তায় ৯-১০ ঘন্টা পেরিয়ে সবাই ক্লান্ত৷ তবে এবার ঘুমাইনি, রাতের খাবার খেয়েছি।
সকালে হোটেলের বারান্দায় বেরিয়ে গতকালের ধকল একলহমায় ভুলে গেলাম। চারদিক পাহাড়ে ঘেরা, তার মধ্যে কুয়াশা কিম্বা মেঘ খেলা করছে৷ জায়গাটা ঠান্ডা ঠান্ডা৷ সকালে টিফিন করে বাসে চড়ে পোখরা দর্শনে বেরোলাম। প্রথম যেখানে থামলাম, বাস থেকে নেমেই যেটা দেখে 'থ' মেরে গেলাম সেটা হল মাউন্ট অন্নপূর্ণা ৷ রাস্তার প্রান্তে আকাশে কিছুটা উপরে বরফ ঢাকা শৃঙ্গটা৷ নেমেছিলাম কোন একটা মন্দির দেখতে কিন্তু মাউন্ট অন্নপূর্ণা আমার সব আকর্ষণ ছিনিয়ে নিয়েছিল। মন্দিরটা একটা উঁচুতে, সেখান থেকে আরও লাস্যময়ী দেখাচ্ছিল মাউন্ট অন্নপূর্ণাকে। মনের সুখে ছবি তুললাম। আর মনে মনে ভাবলাম -পোখরাতেই এই বরফ ঢাকা শৃঙ্গ দেখা গেলে, হিমালয়ের আরও কাছে কাঠমান্ডু থেকে আরও কতনা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে৷ যাই হোক অন্নপূর্ণার মোহ কাটিয়ে বাকি পোখরা দেখলাম, সত্যি বলতে কি অন্নপূর্ণা দর্শনের পর বাকি জায়গাগুলো গেলাম কিন্তু ভিতরে ঢুকিনি, man made কিছুতেই প্রায় আমি আকর্ষণ খুঁজে পাই না, হ্যাঁ ঐতিহাসিক কিছু হলে চলবে৷ তবে একটা কোন গুহা ছিল অনেকটা বিশাখাপত্তনমের আরাকুর গুহার মত। বৌকে দেখানোর জন্যই তাতে ঢুকেছিলাম, ও এর আগে এমন গুহা দেখেনি তাই।
দুপুর ২টো বেজে গেল হোটেলে ফিরতে ফিরতে। খাওয়া-দাওয়া সেরে বিশ্রাম, বিকালে লেকে নিয়ে যাবে নৌকাবিহার করাবে। যথা সময়ে বেরোলাম, বাকিরাও অনেকে বেরিয়েছে কিন্তু যে লেক ঘোরাবে তার দেখা মিলল না, কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে আমরা হ্রদের রাস্তা জিজ্ঞাসা করতে করতে পৌঁছে গেলাম৷ অশোকবাবুরা নৌকাবিহার করবেন, আমার জলাতঙ্গ আছে- খুব বাধ্য না হলে গভীর জল আমি এড়িয়ে চলি৷ তনুকে (আমার স্ত্রী) বললাম অশোকবাবুদের সাথে চলে যেতে, উনি রাজি হলেন না। অগত্যা পাশের বেঞ্চে বসে হ্রদের সৌন্দর্য দুজনে উপভোগ করা শুরু করলাম। মাঝে মাঝেই ছোট-খাট পোষাক পরা সুন্দরীরা যাচ্ছে ইচ্ছে থাকলেও না দেখার ভান করে অন্য দিকে মুখ ঘোরাতে হচ্ছে। পাশে বৌ বসে, পাছে ... :D ইতিমধ্যে একটা ঘটনা ঘটল, আমার কাছে বেশ আকর্ষণীয় ঘটনা- আমরা যেখানে বসেছিলাম তার কাছেই এক ঝালমুড়িওয়ালা সাইকেলে ঝালমুড়ি বেচছিল, স্হানীয়রা ঝালমুড়ি খাচ্ছিল, আমার বৌও লোলুভ দৃষ্টিতে ওই দিকেই বারবার তাকাচ্ছিল, আমার ভয়ে উচ্চবাচ্চ করেনি, মোটির BP out of controle তাই আমাকেই শক্ত হাতে রাশ ধরতে হয়েছে। সব ঠিক চলছিল এমন সময় এক পাগলগোছের অল্প বয়সী এক বিদেশী ছোকরা (উচ্চতার বহর দেখে ইউরোপীয়ানই মনে হল) ঝালমুড়িওয়ালার কাছে এল, অনেকক্ষণ ধরে সব দেখল, তারপর তারও নতুন খাবার চাখার ইচ্ছে হল, একাই ছিল বিদেশী ছোকরা৷ ইসরায় ঝালমুড়ি চাইল। আমরা তখন বিদেশী ছোকরার থেকে ব্রেক নিয়ে হ্রদের দিকে নজর দিয়েছি। সেখানে আশোকবাবুদের খোঁজার চেষ্টা করলাম, পেলাম না। বরং আমাদের দলের অন্য কিছুজনকে নৌকা বিহার করতে দেখলাম, ওমা একি! ওরা হ্রদের মধ্যেই এক নৌকা থেকে ছোট অন্য নৌকায় উঠছে যে, তাও এতজন ঐটুকু নৌকায়৷ এইজন্য আমি জলযান এড়িয়ে চলি। ওনাদের সাথে পরিচয় নেই বলে জানা হয়নি-ঠিক কি ঘটেছিল, নৌকায় ফুটো জাতীয় কিছু হবে নিশ্চই। ওদের থেকে নজর ঘুরাতেই দেখি বিদেশী ছোকরা আমাদের পাশে বসে তারিয়ে তারিয়ে ঝালমুড়ির মজা নিচ্ছে। আমার খুব ইচ্ছে হচ্ছিল মহাপুরুষের সাথে কথা বলার- বিদেশী বলে কথা, তার ওপর ইউরোপীয়ান (সম্ভবত)। ঠিক তখনই আমার ভিতরের বিবেক বলে উঠল- "থাক! অনেক হয়েছে, ইংরেজীতে তুমি অসম্ভব পটু, তোমার ইংরাজী শুনে উনি আবার ইরাজী বলতে গররাজী না হন।" অগত্যা ইচ্ছাটা গিলতে হল। এদিকে নেপালী লঙ্কার ঝাঁঝে বেচারা নাকের জলে চোখের জলে অবস্থা, বেশীক্ষণ লড়ায়ে টিকতে না পেরে বিদেশী দেশী ভবঘুরেকে বাকি ঝালমুড়ি ধরিয়ে রণক্ষেত্র ছাড়ল৷ না না ভবঘুরেটা আমি না, মানছি আমিও ঘুরতে ভালোবাসি কিন্তু এখনও ভবঘুরে হইনি। এরপর হাঁটতে হাঁটতে পোখরা ডিজনিল্যান্ড আবিষ্কার করলাম এবং অবশ্যই ছবি তুলনাম৷ সন্ধ্যায় হোটেলের দিকেই ছিলাম রাস্তায় মোমোর দোকান দেখে খাওয়ার জন্য ঘ্যানঘ্যান শুরু করতে ১০টা মোমোর জন্য ভারতের ৮০টাকা খসল৷ হোটেলমুখো হাঁটলেও ভরসন্ধ্যায় রুমে বন্দী থাকতে একদম ইচ্ছে করছিল না, তাই হ্রদের পাশের বাজারে ঘুরে বেড়ালাম দুজনে, ছোট হলেও মোটামুখি সাজানো-গোছানো বাজার, ভালোই লাগছিল আলোর সমুদ্রে ভেসে বেড়াতে।
রুমে ফিরে অশোকবাবুর ছেলের কাছে শুনলাম, সবার নৌকাবিহারের জন্য ৫ooটাকা জনপ্রতি ধরা ছিল এবং এজেন্ট অনেক দেরীতে পৌঁচেছিল-শুনে রাগে দাঁত কিড়মিড় করছিল৷
আজ আবার ভোরে আবার ৯-১০ঘন্টার বাস যন্ত্রণা শুরু হল, শুরুতেই বাসে ব্সা নিয়ে হালকা ঝগড়া-ঝাটি হল৷ বাস ছাড়তে দেরীও হল। গন্তব্য কাঠমান্ডু, নেপালের রাজধানী৷ মাঝে মনোকামনা দেবীর দর্শন৷ মন্দির এবং man made হলেও এটাই এই ভ্রমণের সেরা আকর্ষণ ছিল৷ পৌঁছেই সবার মুখ হাঁ, রোপ-ওয়ে। হ্যাঁ প্রায় সকলেই এর আগেও রোপ-ওয়ে চড়েছি কিন্তু এটা অনেক আলাদা৷ প্রথমতঃ অনেক উঁচু পাহাড়, দ্বিতীয়তঃ নদী পেরিয়ে যেতে হয়। কিন্তু বিশাল লাইন, অনেক ধৈর্য ধরে শেষ পর্যন্ত রোপ-ওয়েতে বসলাম, আমরা ৫জন একসাথে। ওঠা শুরু হল, তনু গতবারের মত আর ভয় পায়নি৷ পরপর উপরে উঠছি, নদী পেরোলাম, গাছগুলো ছোট ছোট লাগছে, একসময় পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছে গেলাম, ওমা! একি, এখনও শেষ হয়নি আবার আর একটা পাহাড়ে আরও উঁচুতে উঠলাম, শেষটা এত উঁচু ছিল যেটা আমাদের সত্যিই অবাক করেছিল৷ এই ভালোলাগাটা আমার পক্ষে লিখে বোঝানো সম্ভব নয়, নিজে অভিজ্ঞতা করলেই কেবলমাত্র অনুভব করা সম্ভব। ওপরে মনোকামনা দেবীর মন্দির৷, যাতে আমার বিন্দুমাত্র আকর্ষণ ছিল না, আমি পাহাড় থেকে নীচে ছবি তোলার চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু বিফলে গেল সব চেষ্টা৷ ফেরার পথে ছবি না তুলে নিজের চোখে পাখির চোখে পাহাড় নদীর অপরূপ সৌন্দর্য তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করলাম। দুপুরে যখন নীচে ফিরলাম তখন ভীড় অনেক কমে গেছিল৷ রোপ-ওয়ের নীচে নদীর কাছে আমাদের দুপুরের খাওয়ার বন্দোবস্ত হল। রাত জেগে রান্না করেই এনেছিল তাই সবার খাওয়া-দাওয়া সারতে বেশী সময় লাগল না। নদীর তীরে বেশ জায়গাটা। খাওয়ার পর সবাই মিলে নদীতে নেমে হুল্লোড করলাম। বিকালে আবার বাস ছাড়ল। কাঠমান্ডু পৌঁছাতে রাত ৯টা বাজল৷ সবাই ক্লান্ত, তবু রাধুনীরা রান্না শুরু করে দিল- ওদের যেন ক্লান্তি থাকতে নেই। রাতে খেতে ১২টা বাজল।
পরেরদিন সবাই নিজের দায়িত্বে কাঠমান্ডুর প্রধান আকর্ষণ পশুপতিনাথের (শিব) মন্দির দর্শন৷ আমরা অবশ্যই অশোকবাবুদের সাথে বেরোলাম, হোটেলের কাছেই তাই বেশী হাঁটতে হল না। এবং অবশ্যই আমি ভিতরে ঢুকলাম না, বাইর থেকে মন্দিরের চারপাশটা ক্যামেরাবন্দী করা শুরু করলাম। পুরো একপাক ঘুরে ওদের বেরোনোর আগেই গেটের কাছে পৌঁছে গেলাম। তারপর কিছু দোকানে ঘুরে দুপুরে হোটেলে ফিরলাম।
ফিরে খাওয়া সেরে বিশ্রাম তবে বেশীক্ষণের নয়, দুপুরেই বাসে করে কাঠমান্ডুর বাকি দর্শনীয় দেখতে বেরোন হবে। যেমন কথা তেমন কাজ, বেরিয়ে পড়লাম রেডি হয়ে। কিন্তু বাঙালীর ব্যবস্থা আর মহাপুরুষ জর্জরিত বাঙালীর সময়জ্ঞান-তার নির্দশন আবার পেলাম৷ বেরিয়ে আধঘন্টা রাস্তায় দাঁড়াতে হল বাকিদের অপেক্ষায়, তারপর ৩০মিঃ রোদে হেঁটে বাস-স্ট্যান্ডে পৌঁছালাম। তারপরও বাস ছাড়ে না অগত্যা অপেক্ষা। আরও প্রায় ১ঘন্টা পর বাকিদের প্রায় কোলে তুলে আনতে বাস ছাড়ল- Great Indian Circus. পরে শুনেছিলাম যারা পরে এসেছিল তাদের জানানোই হয়নি, তারা অন্য হোটেলে ছিল। বলিহারি ব্যবস্থাপনা৷ যাই হোক আরও কিছু মন্দির দেখলাম, সবগুলো অবশ্য বোরিং ছিল না। নিয়ম করে ফিরেও এলাম, তবে আজকের ঘোরাটা... কি আর করা যাবে তৃতীয় বিশ্বের নাগরিক হয়ে মানিয়ে নেওয়া ছাড়া কি আর উপায় আছে? আছে! সবাই আমার মত নয়, দলের কিছুজন পরের দিনের ঘোরার ব্যাপারে কিছু change করার উদ্যোগ নিল। অনেক নাটকের পর সিংহভাগ সদস্যই রাজি হল৷
ই হি হি হি ... এখন ভোর ৪টা ... বেশ ঠান্ডা! বরফ ঢাকা পাহাড়ের কোলে সূর্যোদয় দেখার লোভে সবাই ৪টাতেই বাসে চড়ে বসেছি, গন্তব্য নাগরকোট৷ ১ঘন্টার মধ্যে পৌঁছেও গোলাম, কাছের একটা টিলায় সবাইকে উঠে অপেক্ষা করতে বলল। কিন্তু অনেকের সন্দেহ হল এখান থেকে পাহাড় তো দেখা যাচ্ছে না, অগত্যা স্থানীয়দের জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হল। তখন জানা গেল সামনে টিকিট কেটে কিছুটা যেতে হবে। সবাই তখন তাড়াহুড়ো করে টিকিট কেটে প্রায় দৌড় শুরু করলাম, যে কোন মুহুর্তে সূর্যোদয় হয়ে যাবে। কিছুক্ষণ হনহন করে হাঁটার পর পিছনে ফিরে তাকাতে আমাদের কাউকে দেখতে পেলাম না, এদিকে viewpoint-এরও কোন পাত্তা নেই তাই ভাবলাম ফিরে যাই। ঠিক তখনই আমাদের দলের একজনকে দেখতে পেয়ে আবার ছুট লাগালাম কিন্তু পথ আর শেষ হয় না, মাঝে আমাদের দলের এক মহিলাকে দেখলাম এক বাইকওয়ালাকে ম্যানেজ করে হাসতে হাসতে হুস করে বেরিয়ে গেল। আমিও হাল ছাড়লাম না, আমার পিছনে অন্যজনও হাল ছাড়েনি ঠিকই আসছেন৷ এইভাবে আর কতদূর? দূর ছাই ফিরে যাই গোছের দ্বন্দ করতে করতে পৌঁছালাম এবং মুগ্ধ হলাম৷ কুয়াশা/মেঘের সাথে লুকোচুরির মাঝেই প্রকৃতির নৈস্বর্গিক সৌন্দর্য দেখে হারিয়ে গেলাম। অবশ্য সূর্যোদয় পথেই দেখতে হল তবে একটা ব্যাপার অাবিষ্কার করলাম - ইন্টারনেট/পত্রিকায় যে sleeping buddha-র কথা পড়তাম সেই sleeping buddha এখান থেকে দেখা যাচ্ছে, এই অযাচিত আবিষ্কার আমার উৎসাহ আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিল৷ এরপর একে একে অনেকেই পৌঁছালেন, এমনকি ৫ বছরের বাচ্চা, ৭০ বছরের বৃদ্ধ বৃদ্ধাও বাদ ছিল না। তবে আমার বৌ সহ অশোকবাবুরা আসেনি৷ বৌএর কথা মনে পড়তে আমি একাই হেঁটে ফেরার পথ ধরলাম। এরপর কিছু মন্দির দেখে হোটেলে যখন ফিরলাম দুপুর হয়ে গেছে। খেয়ে দেয়ে বিশ্রাম৷ বিকালে অশোকবাবুদের সাথে কাছের বাজারে ঘুরলাম, ওনারা কেনাকাটা করলেন আমরা শুধু ঘুরলাম। সন্ধ্যায় সবাই হোটেলে ফিরলাম, আমার রুমে বন্দী থাকার ইচ্ছে ছিল না তাই একাই আশপাশটা চরতে বেরালাম।
সকাল সকাল বেরোতে হল এবার মালপত্র নিয়ে, ফেরার ঘন্টা বেজে গেছে তবে আপাতত গন্তব্য বিহারের রক্সোল৷ কিছুই নেই শুধু চলা আর চলা, দুপুরে একটা ফাঁকা হোটেল দেখে খাওয়া সারা হল৷ রক্সোল পৌঁছাতে পৌঁছাতে সন্ধ্যা হয়ে গেল৷ রেলক্রসিং-এ ৪৫ মিনিট দাঁড়িয়ে অবশেষে হোটেলে পৌঁছালাম, হোটেল রুম দেখে মন খারাপ হয়ে গেল। আরও ভেঙে পড়লাম যখন শুনলাম অন্যদের রুম শুধু better নয় অনেক বেশী ভালো৷ মশার কামড় খেয়ে সারা রাত একদম ঘুম হয়নি, সালারা মশারির ব্যবস্থাও রাখেনি। একই পয়সা দিয়ে এই কষ্ট মোটেও পছন্দ হল না, রাগে ঘি পড়ল যখন ভালো রুম পাওয়া লোকজন জ্ঞান দিল ১টা তো মাত্র রাত এত নখরার কিছু নেই গোছের মন্তব্যে৷ এবার অবশ্যই ভাবব booking করার আগে। সবাই যাতে একই মানের সার্ভিস পায় সেটা ensure করাই ওদের কাজ, সেটা না পেলে আমি আর নেই। সেদিন রাতে খাসি মাংস হলেও আমার কিছুই ভালো লাগছিল না।
আজ সকালেই ট্রেন, তাই তলপি-তলপা গুটিয়ে কাছেই স্টেশনে পৌঁছে গেলাম। বাকিটা রুটিন কাজ৷ এত মন খারাপের মাঝে একটা আনন্দ আছে ফেরার টিকিট RAC নয়, confirm টিকিট। বেশ আরামেই কাটল ফেরার ট্রেন যাত্রা৷ সকাল সকাল ভারী খেয়েই ট্রেনে চড়েছিলাম তাই দুপুরে খাওয়ার ঝামেলা ছিল না, রাত্রে কষ্ট করে খাওয়া সেরে নিশ্চিন্তে ঘুম৷
ভোর ৫টা, এবারও ট্রেন on time আছে। অবাক কান্ড! ভারতে আছি তো? ট্রেন সময়ে দৌড়াচ্ছে কি করে৷ মালপত্র নিয়ে সবাই নামলাম, বাস আমাদের অপেক্ষায় ছিল, কাঁথি ফিরতে বেশী সময় লাগেনি। বাড়ি যখন পৌঁছালাম তখন সকাল ৮ঃ৩০ বাজে। যাক! বাসে বিদেশ যাত্রা ভালোয় ভালোয় মিটে গেল, ওনাকে অশেষ ধন্যবাদ!