শুঁড়ি বনাম ব্রাহ্মণ
কাঁথিতে মামাবাড়ী, সেই সূত্রেই আমার বয়স যখন ৬ কি ৭ হবে তখন আমরা কাঁথিতে পাকাপাকিভাবে চলে আসি। বাবার মুখে অনেকবার শুনেছি -দিদার অসুস্থতার কারণে মায়ের অনুরোধে বাবা কলকাতায় ট্রান্সফারের অফার ছেড়ে কাঁথি আসা ঠিক করেন।প্রথমে খড়কীতে ভট্টাচার্য্য জেঠুর বাড়ীর একতলায় ভাড়া থাকতাম, তখন নার্সারীতে পড়ি। পাড়ার ছেলেদের সাথে মেশার সুযোগ কম ছিল। সঙ্গী বলতে জেঠুর মেয়ে মৌ-দি আর পাশের বাড়ীর টুকটুকি & Co. তাই বাড়ীতে আত্মীয়-স্বজনরা এলে খুব ভালো লাগত। তবে জেঠুদের বিশাল বাগান সেখানে গাছেদের সাথে ভালোই সময় কেটে যেত। আমি আর ভাই স্কুলের গাড়ী ধরব বলে প্রতিদিন ‘শক্তি দিদিমনি’দের বাড়ীর বারান্দায় দাঁড়াতাম। সেখানে পাপাই আর বুম্বাও স্কুলে যাবে বলে দাঁড়াত। তবে আলাদা স্কুল তাই বিশেষ কথা হতো না। একটু বড় হতে বুম্বাদের বাড়ির সামনের মাঠে বিকালে যেতাম, তবে খেলতাম না, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ওদের খেলা দেখতাম, হয়তো ওরা নিতো না -ঠিক মনে নেই। তারপর কবে থেকে কিভাবে ওদের সাথে মিশে গেলাম সেটা মনে নেই। তবে পাপাই প্রায় বলে “একটা ছেলের সাহস দেখে আমি আর বুম্বা অবাক হয়ে গিয়েছিলাম, ছেলেটা গরুকে ভয় পায় না, উল্টে গরুর গায়ে হাত বোলায়, তাই ওর সাথে বন্ধুত্ব করি।” -সেই ছেলেটা আমি। আমি আসলে গ্রাম থেকে আমদানী ছিলাম, ছোট থেকেই গ্রামের বাড়িতে গরুর সাথে ওঠা বসা তাই …। তারপর বাকিদের সাথেও বন্ধুত্ব হয়। তবে আমি গ্রামের ছেলে, বুদ্ধিতে বাকিদের থেকে কাঁচা তাই ওদের সাথে পুরোপুরি ওদের মতো করে মিশতে পারতাম না। তবে পাপাইয়ের সাথে প্রথম থেকেই বন্ধুত্বটা বেশ গাড়ই ছিল। পাপাইদের বাড়িতেই সব বন্ধুরা ভিড় করতাম। ওদের দোতলার বারান্দায় খেলতাম। আমি আবার দুপুর বেলায় হামলা করতাম। গ্রামে থাকার সময় ওটাই ছিল আমার শিকারের সময় -আম জাম পেয়ারা। পাপাইয়ের সাথে আমার টানের একটা বড় কারণ ছিল 'চাচা চৌধুরী' কমিক্স। পাপাই, কাকিমার সাথে বাজার গেলেই একটা করে কিনে আনত আর আমি বিনাপয়সায় ওর থেকে পড়ে নিতাম। নার্সারী পেরিয়ে হরিসভায় ঢুকলাম। এবার আমরা এক স্কুলে সুতরাং আরও একসাথে সময় কাটা শুরু হল। এই সময় আমার আর পাপাইয়ের ‘কিশোর জ্ঞান বিজ্ঞান’ পত্রিকা দেখে ইলেক্ট্রনিক্স-এর 'নিজে করো’ একপ্রকার নেশায় পরিণত হয়েছিল। তখন আমাদের একমাত্র প্রিয় গন্তব্য -কুমুদিনী আর বাপিদার দোকান। আমি অবশ্য কিছুই বুঝতাম না, পত্রিকার মালিক ছিলাম আমি আর পাপাই সব করত, আমি শুধু সঙ্গ দিতাম। তবে সফল হলে আমারও খুব আনন্দ হত। এই সময় টানা কিছু বছর দুপুরগুলো এই নেশাতেই কেটেছে। পাপাইয়ের সাথে একসাথে ঘুমিয়েছি, একসাথে খেয়েছি, ওদের ঘরেই সারাদিন কাটাতাম। ঘরে ফিরতে প্রায়দিন রাত ১১টা বেজে যেত। যখন প্রথম প্রথম ল্যান্ডলাইন ফোন এসেছিলো তখন প্রায় প্রতি ঘন্টায় আমরা একে অপরকে কল করতাম -"কিরে স্নান হলো? কিরে খাওয়া হলো? কি খেলি আজ? কি করছিলি? কখন মাঠে যাবি?" এখন কথা বেশি হয় না, তবে ওর কল এলে ভালো লাগে কারণ পাপাই কল করেছে মানে কোথাও ঘুরতে যাওয়ার প্ল্যান করেছে। আমি যতবার ঘুরতে গেছি তার সিংহভাগ পাপাইয়ের সাথেই। এরপর ক্লাস এইটে আমরা কজন দল বেঁধে হরিসভা ছেড়ে হাই স্কুলে ভর্তি হলাম এবারও আমি, পাপাই একসাথেই ছিলাম। স্কুলের বাইরে আমরা জুটিতে থাকলেও, স্কুলে আমি-পাপাই জুটিতে থাকতাম না। হরিসভায় আমার জুটি ছিল আদিত্য, হাই স্কুলে ছিল দিব্যেন্দু, কৃষ্ণায়ণ। মনে আছে মাধ্যমিকে আমি আর পাপাই এক রিক্সায় পরীক্ষা দিতে যেতাম। মাধ্যমিক দিয়ে পাপাইয়ের সাথে প্রথম কলকাতা গেছিলাম। ওর দিদির বাড়িতে ছিলাম। পরে রাজুদার সাথে দমদম বিমান বন্দর দেখে কাঁথি ফিরেছিলাম। আরও মনে আছে -আমার জুতো ছোট হয়ে গেছিল বলে পা ব্যথা করছিল, রাজুদা তখন নিজের নতুন জুতো আমাকে পরতে দিল আর আমারটা নিজে পরল। আমি অনেকবার পাপাইদের বাড়ি গুছিয়ে দিয়েছি -এটা আমার একটা রোগ। এরপর কিশোর বয়সের দোষে মেয়েদের প্রতি আমার অতিউৎসাহ আমার সাথে পাপাইয়ের বন্ধুত্ব ক্রমে দুর্বল করে দিল। উচ্চ মাধ্যমিকের সময় আমরা প্রায় আলাদা সময় কাটাতাম। অনেকবার আমার সাথে পাপাইয়ের বিভিন্ন কারণে ঝগড়া হয়, অবশ্যই দোষটা বেশিরভাগ সময় আমারই থাকত। ঝগড়া হয়ে মুখ দেখাও বন্ধ হয়েছে বহুকাল। এরপর পাপাইয়ের বাবা অকালে মারা গেলেন। তখন পাপাইদের ভীষণ খারাপ সময় গেছে। পাপাই পড়া বন্ধ করে কম্পিউটার ব্যবসায় নামে। চাকরী পেতে অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়। চাকরি পেয়ে পাপাই CBZ কেনে, বলাবাহুল্য ওটা আমার পছন্দ ছিল। SONY HiFi কেনে, সেটাও আমার পছন্দ ছিল এরপর বাড়ী সাজায় সেটাও আমার ডিজাইনে। মানে, আমি আমার শখগুলো পাপাইয়ের ওপর দিয়ে পূরণ করে নিতাম -বুম্বা এই কথাই বলতো সবসময়। একটা কথা না বললেই নয় একবার এগরা রাস্তায় পাপাইয়ের বাইকে চলন্ত অবস্থায় ড্রাইভার চেঞ্জ করেছিলাম। ব্যাপারটা বেশ লেগেছিল। তখন প্রায়ই বাইকে দুজনে ঘুরতে যেতাম। পাপাইয়ের ছোট থেকেই ক্যামেরা ছিল। চাকরি পাওয়ার পর প্রথম ডিজিটাল ক্যামেরা (kodak 10x Zoom) কেনে, আমিও সঙ্গে গেছিলাম। পাপাই যখন প্রেম করতো তখন একদিন সন্ধ্যায় আমরা দুজনে বৈশাখীর বাড়ির দেওয়ালে কুকুরের ছবি মাড়িয়ে দিয়ে এসেছিলাম। বেশ অ্যাডভেঞ্চার হয়েছিল, কারণ বৈশাখীর বাবা খুব রাগী ছিলেন। পাপাই-বৈশাখীর বিয়েতে আমি যাইনি, রাগ করে নয় এমনি, তবে ওদের হনিমুনে ছিলাম।
এমনিতে আমি ব্রাহ্মণদের এড়িয়ে চলি কিন্তু পাপাইয়ের ব্যাপারে এটা আমার কখনও মনে হয়নি। ও আমাকে খুব পছন্দ করে। তাই আমি হাজার খারাপ ব্যবহার করলেও, ওকে দুঃখ দিলেও, ও আমাকে ছাড়া কোনো কাজ করে না। এমনকি আমার খারাপ লাগবে বুঝে অনেক কিছুই refuse করেছে ৷ যেদিন আমার কষ্টে পাপাইয়ের চোখে জল দেখেছিলাম সেদিন আমার প্রতি ওর প্রকৃত বন্ধুত্বর কথা বুঝতে পেরেছিলাম। সত্যি আমি ভাগ্যবান পাপাইয়ের মতো বন্ধু পেয়েছি। আর একজন তো আমাদের ছেড়ে অকালে চলে গেল। বুম্বা আমাদের বন্ধন ছিল, ও চলে যেতে আমরাও কেমন ছন্নছাড়া হয়ে গেলাম। পাপাইয়ের অনেক কিছু আমার সহ্য হয় না বিশেষ করে ওর লাইফ স্টাইল -সময় জ্ঞান, রাত করে ঘুমানো, দেরি করে ওঠা, নেশা করা৷ অস্বীকার করবো না- ও অনেকবার চেষ্টা করেছে নিজেকে চেঞ্জ করার কিন্তু আজ পর্যন্ত সফল হয়নি। আমার ধারণা- ও এই লাইফ স্টাইলে আভিজাত্য খুঁজে পায়, তাই ... হয়তো আমি ভুল, ভুল হলেই ভালো। সরাসরি বলতে লজ্জা লাগে তাই এখানে লিখে মনের বোঝা হালকা করি। কেউ পড়ে না তাই নিশ্চিন্তে মনের কথা লিখতে পারি।














